আল্লামা আবুল ফাতাহ মোহাম্মাদ ইয়াহইয়া আমার চলার পথের প্রেরণা: মাওলানা মামুনুল হক

১৯শে মে’১৭ বাংলার এলমী আকাশ থেকে ঝরে পড়ল আরো একটি নক্ষত্র ৷ এ দিন ইন্তেকাল করেন বহু গ্রন্থ প্রণেতা, প্রতিথযশা লেখক, গবেষক, মুহাদ্দিস আল্লামা আবুল ফাতাহ মোহাম্মাদ ইয়াহইয়া ৷ বাংলার ইসলামী সাহিত্য যাদের অনবদ্য লেখনীর মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছে, গবেষণাপূর্ণ মৌলিক রচনার গুণে ভাবগাম্ভীর্য পেয়েছে, মরহুম আবুল ফাতাহ রাহিমাহুল্লাহ তাদের অন্যতম ৷ অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিচারব্যবস্থাসহ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে তিনি কলম ধরেছেন এবং তার হক আদায় করে দিয়েছেন ৷ অনন্য অসাধারণ লেখকসত্বার পাশাপাশি চতুর্মুখী চৌকান্না নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার সমাহার ঘটেছিল মরহুমের মাঝে ৷

১৯৮২ সালে মালিবাগ জামিয়া থেকে দাওরায়ে হাদীস ফারেগ হয়ে দুই বছর সিলেটে শিক্ষকতার পর মালিবাগ মাদরাসায় যোগদান করেন ৷ ৮৮ থেকে ৯২ মধ্যখানের এই চার বছর বাদে কর্মজীবনের বাকি পুরোটা সময় তিনি মালিবাগ জামিয়ায় শিক্ষকতার খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন ৷ ভাইস প্রিন্সিপাল হিসাবে কিছু দিন দায়িত্ব পালন করলেও মরহুমের মূল মনযোগ ছিল শিক্ষকতা বিশেষ করে হাদীসের শিক্ষকতার প্রতি ৷ এ ছাড়়া বেফাকুল মাদিরিসিল আরাবিয়ার যুগ্মমহসচিব ছিলেন আমৃত্যু ৷ চিন্তাশীল, সচেতন, পরোপকারী ও নিরহংকারী আলেমে দ্বীন হিসাবে ওলামা মহলে বিশেষ পরিচিতি ছিল মরহুমের ৷ তবে এটা নিশ্চিত যে, এত সব গুণাবলী ও অবদানকে ছাপিয়ে মাওলানা আবুল ফাতাহ মোহাম্মাদ ইয়াহইয়া তাঁর লেখক পরিচয়েই অমর হয়ে থাকবেন বাংলার এলমী অঙ্গণে ৷
মাওলানার সাথে আমার দীর্ঘ ঘনিষ্টতা বা শিষ্যত্বের সুযোগ না হলেও মাঝে মাঝে সান্যিধ্য পাওয়ার সৌভাগ্য জুটেছে ৷ আর তাঁর কর্মের মাধ্যমে তাঁকে কিছুটা উপলব্ধির প্রয়াস পেয়েছি ৷ তাঁর কিছু বিষয় আমাকে যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি কিছু বিষয় দেখেছি তাঁর জীবনে যা আমাকে অনুপ্রাণিত করে ৷

আব্বাজান মরহুম হযরত শায়খুল হাদীস রাহিমাহুল্লাহ ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মালিবাগ জামিয়ায় শায়খুল হাদীস হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন ৷ এর মধ্যে আবার শেষ দুই বছর এহতেমামের দায়িত্বও পালন করেন ৷ মালিবাগ মাদরাসায় হযরত শায়খের এভাবে দায়িত্ব পালন করা ছিল অনেকটা অপ্রত্যাশিত ৷ ঢাকার মাদরাসাগুলো এক সময় দুই ধারায় প্রবাহিত ছিল ৷ একটি ছিল, বড় কাট্রা-লালবাগ-নূরিয়ার ধারা ৷ আর অপরটি, মালিবাগ-বারিধারা-চৌধুরি পাড়ার ধারা ৷ হযরত হাফেজ্জী হুজুরের খেলাফত আন্দোলনে যখন গোটা বাংলাদেশ উত্তাল এবং তার নেতৃত্বে লালবাগ-নূরিয়া, তখন মালিবাগে কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থা ৷

হযরত হাফেজ্জীর ইরান সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে কিছু বিতর্ক তৈরি হয়েছিল ৷ শায়খুল হাদীস রহঃ শিয়াদেরকে সরাসরি তাকফীর করা থেকে বিরত থাকতেন ৷ এ বিষয়টি নিয়ে শায়খুল হাদীসের সাথে যাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল, তারা কঠোর সমালোচনামুখর ছিলেন ৷ মালিবাগ-চৌধুরি পাড়া-বারিধারা পাড়ার অনেক বুযুর্গের আদালতেই হযরত শায়খুল হাদীস রহঃ ছিলেন আসামীর কাঠগড়ায় ৷ হযরত শায়খুল হাদীস রহঃ যখন মালিবাগ মাদরাসার শায়খুল হাদীস এবং প্রিন্সিপাল হলেন তখনও শায়খের এ বিষয়টিতে মালিবাগের শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে প্রশ্ন ছিল ৷ তবে মালিবাগের শিক্ষকগণ ছিলেন যেমন জ্ঞান ও যোগ্যতার দিক থেকে অনেক উচ্চমানের, মন-মানিসকতার দিক থেকেও অনেক উদার ৷ তারা শায়খের ছাত্র না হলেও শায়খকে আন্তরিকভাবে ভালোবেসেছিলেন ৷ ঐ সময়ে তারা শায়খের ব্যপারে আলোচিত প্রশ্নগুলো নিয়ে কথা বলতে চাইলে শায়খ রহঃ স্বানন্দে সম্মত হন এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে তাদের সাথে মিলিত হন ৷ আলোচনায় ঐ সময়ের মালিবাগের শীর্ষ উস্তাদগণ উপস্থিত ছিলেন ৷ হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর কাছ থেকে মালিবাগের শিক্ষকবৃন্দ প্রশ্নগুলোর এমন সন্তোষজনক জবাব পান যে, তাতে তারা শুধু তৃপ্তই নন, বরং অভিভূত হয়ে পড়েন ৷ আমরা ঐ সময়ের মালিবাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষকদের এই অনুভূতির কথা শুনতে পেতাম ৷ তাদের কেউ কেউ ক্লাসে এমন মন্তব্যও করেছেন যে, শায়খুল হাদীস সাহেবের মাওকিফ অনেক সুচিন্তিত ও মুদাল্লাল ৷

এই কথাগুলো হযরত শায়খুল হাদীস রহঃএর ইন্তেকালের পর তাঁর স্মরণসভায় মরহুম আবুল ফাতাহ মোহাম্মাদ ইয়াহইয়া রাহিমাহুল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছিলেন ৷ শায়খুল হাদীস রহঃএর সন্তান হিসাবে মরহুমের এই স্মৃতিচারণে আপ্লুত হয়েছিলাম ৷ সময়ের একটি স্পর্ষকাতর বিষয়ে এমন অকপট উচ্চারণ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও সত্যাশ্রয়ী মনোভাবের প্রমাণ
মরহুম আবুল ফাতাহ সাহেবের জীবন ও কর্ম থেকে বিশেষ আরেকটি প্রেরণা আমি পেয়েছি ৷
বিগত তিন যুগ ধরে বাংলাদেশের ওলামা মহলে চিন্তাশীল ও গবেষক হিসাবে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের গড়ে ওঠবার পেছনে মরহুমের অবদান অসামান্য ৷ তিনি ও তাঁর সঙ্গী-সাথীরা সত্তুরের দশকে ছাত্রদেরকে সংগঠিত করে যোগ্য হিসাবে গড়ে তুলতে নানা গঠনমূলক কর্মসূচী গ্রহন করেছিলেন ৷ কওমী মহলে ছাত্রদের সাংগঠনিক এ সকল তৎপরতার কঠোর সমালোচনাও তখন বিভিন্ন মহলে স্বোচ্চার ছিল ৷ কিন্তু চল্লিশ বছরের মাথায় এসে আজ জাতি তার সুফল দেখতে পাচ্ছে ৷ আসলে নিছক রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি না করে গঠনমূলক কাজ করলে ছাত্রদের সাংগঠনিক তৎপরতা ছাত্রসমাজকে অনেক ভালো কিছু উপহার দিতে পারে ৷ ছাত্রসংগঠনের চর্চা করে ষাট ও সত্তুর দশকের বামপন্থী ছাত্রনেতারা আজ বাংলাদেশের মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবি পাড়ায় দখল কায়েম করে আছে ৷ ইসলামী অঙ্গণেও বুদ্ধিবৃত্তিক সাংগঠনিক তৎপরতা সুফল দিতে পারে, মরহুম ইসহাক ফরিদী রহঃ, আবুল ফাতাহ ইয়াহইয়া রহঃ প্রমূখ আমাদের সামনে তার উজ্জল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন ৷ আমিও ব্যক্তিগতভাবে এমনতরো সাংগঠনিক কাজকেই জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহন করেছি ৷ আমরা ছাত্রসংগঠনকে কেবল রাজনীতি চর্চার কেন্দ্র নয়, বরং বৃহত পরিসরের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করে থাকি এবং সে লক্ষেই নিয়ত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি ৷ মরহুম মাওলানা আবুল ফাতাহ মোহাম্মাদ ইয়াহইয়া রাহিমাহুল্লাহ এ পথে আমার প্রেরণার অন্যতম উৎস ৷

তিনি চলেগেছেন, রেখে গেছেন সাফল্যের পদচিহ্ন ৷ জ্বেলে গেছেন আলোর মশাল ৷ ভবিষ্যত প্রজন্মের হাতে হাতে সে মশাল তুলে দিতে আমরা পথ চলছি ৷ ইনশাআল্লাহ চলবো অবিরাম…