সংস্কৃতি চর্চার নামে মুসলমানদের করের টাকা কোথায় ব্যয় করা হয়; জানতে চায় হেফাজত

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী | ছবি : কাজী যুবাইর মাহমুদ

হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ। দেশের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অরাজনৈতিক সংগঠন। ধর্মীয় ইস্যুর পাশাপাশি জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যুতেও অতীতে কথা বলতে দেখা গেছে এই সংগঠনের নেতাদের। বর্তমানে দেশের অন্যতম আলোচিত ইস্যু ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের বাজেট। বাজেট নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলো তাদের নিজের মতামত তুলে ধরেছে।

বাজেট নিয়ে হেফাজতে ইসলামের মতামত ও ভাবনা নিয়ে  কথা হয়েছে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর সঙ্গে। মাওলানা ইসলামাবাদীর সঙ্গে কথা বলেছেন ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সহ-সম্পাদক আরিফুল ইসলাম


ইনসাফ : কি ভাবছে হেফাজত ২০১৭-১৮ সালের বাজেট নিয়ে ? এই বাজেট কি জনগনের আশা আকাংখা পূরন করতে পারবে ?

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী : দেখুন ইতিমধ্যে আমাদের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব বিবৃতির মাধ্যমে এই বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন যে এই বাজেট দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার বাজেট। তাই এই বাজেট কোনভাবেই গন আকাংখা পূরন করতে সক্ষম হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি না। একটি ন্যায় ইনসাফ ভিত্তিক বাজেটই পারে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নতি করতে।

ইনসাফ : ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন বাজেটে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে। যৌথভাবে এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬৫ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। যা মোট বাজেটের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এই সম্পর্কে আপনার মতামত কি ?

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী : দেখুন শিক্ষা হল একটি জাতির মেরুদন্ড । তাই শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় বরাদ্দ অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় উদ্দ্যেগ। কিন্তু এখানে যে বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে একটি জাতির উন্নয়নের জন্য নৈতিক এবং কারিগরী শিক্ষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী। আর আমাদের দেশের নৈতিক শিক্ষার মূলকেন্দ্র হল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো । কিন্তু বরাবরই এই বিষয়টি বাজেটে উপক্ষিত থাকে। এবং সেই সাথে কারিগরি শিক্ষাকেও যথাযথ গুরত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না। যেখানে শিক্ষা মন্ত্রনালয়, প্রাথমিক ও গনশিক্ষা বাবদ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা, সেখানে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার জন্য বরাদ্দ মাত্র তিন- চার হাজার কোটি টাকা।

ইনসাফ : ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নারী উন্নয়নের জন্য গত বছরের তুলনায় এবার ২৫ হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে নারীর জন্য ১ লাখ ১২ হাজার ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা মোট বাজেটের ২৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এই বিশাল অংকের বাজেট নারীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে এতে কি আপনাদের বিশেষ কোন আপত্তি আছে ?

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী : অবশ্যই না, আপত্তি থাকার কোন প্রশ্নই ওঠে না। তবে আমাদের কিছু প্রশ্ন আছে । যেমন এত বিশাল বাজেট নারীদের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করা হলেও প্রকৃত পক্ষে নারীবান্ধব একটি পরিবেশ কি কোন সরকার উপহার দিতে পেরেছে ? আমাদের দেশের যেসব অসহায় নারীরা জীবিকার প্রয়োজেন বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামেন তাদের নিরাপত্তার জন্য কি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে ? আমরা চাই বাজেটে নারীদের কর্মস্থল এবং যাতায়াত যেন নারীবান্ধব হয় সেই ব্যবস্থা করা হোক। যার দ্বারা নারী রাস্তা ঘাটে যেভাবে যৌন হয়রানী সহ বিভিন্নভাবে অপদস্থ হচ্ছে তার থেকে তারা নিরাপত্তা লাভ করতে পারে। নারী যেন ধনতান্ত্রিক সমাজের স্রেফ শ্রমের চাকা না হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রাখা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।

ইনসাফ : আপনার কাছে আমাদের চতুর্থ প্রশ্ন সংস্কৃতি বিষয়ে বাজেটে বরাদ্দ নিয়ে। হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ অপসংস্কৃতি রোধে অঙ্গীকারাবদ্ধ একটি সংগঠন । আর সরকার সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ও বিনোদনের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখছেন। কিভাবে দেখেন বিষয়টিকে ?

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী : দেখুন প্রথম কথা হল ইসলাম সাংস্কৃতিক বৈচিত্র স্বীকার করে। ইসলাম তার অনুসারী তথা মুসলমানদের সংস্কৃতিকে পরিশুদ্ধ করে প্রত্যেক জাতির মাতৃভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে এবং একই সাথে ভিন্ন ধর্মের সংস্কৃতিকেও তাদের মত জীবন যাপন করার নিরাপত্তা প্রদান করে। আর তাই আপনি হয়তো জেনে থাকবেন ইসলামে শুকুর সহ অনেক প্রানী খাওয়া নিষিদ্ধ হলেও ইসলাম অন্য ধর্মের লোকদের সেইসব খেতে বাধা দেয় না। বরং তাদের বৈচিত্রকে মেনে নেয়।
কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হল বর্তমানে সাংস্কৃতিক চর্চা বলতে যৌনতা নির্ভর বিষয়কে উস্কে দেওয়া এবং ইসলামের বিরুদ্ধচারন করাই যেন মূখ্য হয়ে উঠেছে। আর তাই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ইসলাম বিরোধী এইসব সংস্কৃতি চর্চার লাগাম টেনে ধরতে বদ্ধ পরিকর। সরকার জনবিচ্ছিন্ন কিছু মানুষকে সংস্কৃতি চর্চার যে সুযোগ দিয়েছে তার অপব্যবহার ঐসকল লোকেরা ইতিমধ্যে বহুবার করেছে । আর তাই সামনের দিন গুলোতে কোন ধরনের সংস্কৃতি চর্চায় রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের করের টাকা ব্যয় করে তার জবাব সরকারের কাছে হেফাজত চাইবে।

ইনসাফ : ব্যাংকে এক লাখ টাকার বেশি থাকলে এখন থেকে ৫০০ টাকা আবগারি শুল্কের পরিবর্তে ৮০০ টাকা দিতে হবে সরকারকে। এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি ?

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী :  প্রথমে আমাদের একটা বিষয় বুঝতে হবে আর তা হল আমরা সাধারন নাগরিকরা বহুকাজে ব্যংকে টাকা পয়সা রাখতে বাধ্য । অর্থ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হস্তান্তরেও বহুক্ষেত্রে ব্যংকা ছাড়া ভিন্ন কোন পন্থা নেই। এখন সরকার যদি ব্যাংকের লুটপাট বন্ধ না করে , দূনীর্তি দূর না করে সাধারন নাগরিকদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে সরকার পরিচলনা করতে চায় তাহলে সরকারের গনভিত্তি আরো বেশী দূর্বল হয়ে পড়বে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য বুমেরাং হবে বলেই আমি মনে করি। এবং আশা করি সরকার এই সিদ্ধন্ত থেকে পিছু হটে আর্থিক দূর্নীতি দুরীকরনে অধিক মনোনিবেশ করবেন।

ইনসাফ : সর্বশেষ আপনার কাছে জানতে চাইবো এই বাজেট নিয়ে আপনাদের বিশেষ কোন দাবি আছে কি না ?

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী : অবশ্যই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে আমরাও চাই জনগনের টাকা যেন সঠিক ভাবে ব্যবহার হয়। তবে বাজেট একটা বিশাল বিষয় যা নিয়ে এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। তবুও প্রথমে আমি প্রতিরক্ষা খাতে সরকারের বরাদ্দ বৃদ্ধিতে ধন্যবাদ জানাই এবং সেই সাথে বিড়ি সিগারেটের উপর কর বৃদ্ধির বিষয়েও ধন্যবাদ জানাই। সংস্কৃতির জন্য যে যে বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে সেই বরাদ্দ এই সব বিড়ি সিগারেট সহ মাদক দ্রব্যেকে অনুৎসাহিত করার কাজে ব্যবহারের দাবি আমরা সরকারের কাছে করছি। সেই সাথে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক মানের অনুবাদ সেন্টার তৈরি করা বিশেষ প্রয়োজন বলে মনে করি।যাতে করে দ্রুততম সময়ে বিজ্ঞানের সকল বিষয় আমাদের শিক্ষার্থীরা অতি সহজে আয়ত্ত করতে সক্ষম হয় । প্রবাসীরা এদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছেন অথচ প্রবাসী কল্যানের জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা কখনোই গ্রহন করা হয়নি। প্রবাসীদের জন্য তাই বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকা দরকার যাতে করে তাদের সমস্যা গুলো দ্রুততম সময়ে সমাধান করা সম্ভব হয়।