সেকুলার ঈদ বনাম বাস্তবতা

তারেকুল ইসলাম


ঈদ মানে আনন্দ। তবে শুধু আনন্দ দিয়েই ঈদকে মূল্যায়ন করা সমীচীন হবে না। কারণ ঈদের আনন্দের যেমন জাগতিক বা পার্থিব দিক আছে, তেমনি তার আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও রয়েছে। আধ্যাত্মিক তাৎপর্যকে উপেক্ষা বা অবহেলা করে স্রেফ আনন্দের নামে লাগামহীন বস্তুবাদী কার্যকলাপ ও যথেচ্ছাচার সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। কেননা ঈদের আনন্দ বল্গাহীন নয়, বরং এর পার্থিব উল্লাস ততটুকুই সমর্থনযোগ্য, যতটুকু ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সীমা লঙ্ঘনের পর্যায়ে না যাবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা সীমা লঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।
বর্তমানে আমাদের দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষণীয় যে, মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় ঈদোৎসবকে নিয়ে সেকুলার মিডিয়া তো বটেই, দেশের তথাকথিত একটি উগ্র সেকুলার শ্রেণিও যেন রীতিমতো তামাশা ও প্রহসন শুরু করেছে। ঈদের মাহাত্ম্যের সুযোগ নিয়ে দেশের একটি সক্রিয়তাবাদী গোষ্ঠী প্রতি বছরই মুসলমানদের ঈদ উৎসবকে সেকুলারিজমের মোড়কে আবৃত করার প্রাণান্ত চেষ্টা করে থাকে। ঈদকে শুধু নিরর্থক আনন্দের মাপকাঠিতে বিবেচনাপূর্বক তারা এর আধ্যাত্মিক আবেদনকে অগ্রাহ্য করে সম্পূর্ণ বস্তুবাদী সেকুলারিজমের ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস চালায়।

এদেশে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় ঈদ উৎসবকে ধর্মনিরপেক্ষকরণের অভূতপূর্ব এক হাস্যকর তৎপরতা দেখা গিয়েছিল বিগত ২০১১ সালে শহীদ মিনারে। বামপন্থী সেকুলার ব্যক্তিত্ব ও প্রবীণ বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের তথাকথিত সেকুলার বুদ্ধিজীবী-শ্রেণি শহীদ মিনারে ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলনের নামে ‘ঈদ’ উদ্যাপন করেছিল। সেখানে সৈয়দ আবুল মকসুদ নিজেই ইমাম হয়ে ‘খুতবা’ (বক্তৃতা) পড়েন, কিন্তু নামাজ পড়ান নি। শরিয়তের আহকাম ও নিয়মবিরোধী ঐ তথাকথিত নামাজবিহীন ঈদ যে আসলেই ছিল নিদারুণ তামাশা ও প্রহসনের নাটক তা বলাই বাহুল্য। অবশ্য সেদিন শহীদ মিনারে তাদের ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলন তথা ঈদের নামে তামাশা ও প্রহসনের নাটক দেখার জন্য দেশের কৌতূহলোদ্দীপক অনেক মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছিল। শ্রদ্ধেয় বড় ভাই মোহাম্মদ শাহ আলম এ প্রসঙ্গে অনেক আগে একটি মূল্যবান মন্তব্য করেছিলেন: “যীশুখৃস্টের (বানোয়াট) জন্মদিন ২৫শে ডিসেম্বর এখন পালিত হয় ধর্মীয় তাৎপর্যহীন (সেক্যুলার) উৎসব হিসেবে তামাম পশ্চিমা দুনিয়ায়। বাংলাদেশের সেক্যুলার ‘বুদ্ধিজীবীদের’ একটি অংশ অনেক আগে থেকে ‘বাঙালি’দের জন্য অনুরূপ ধর্মীয় তাৎপর্যহীন নিতান্ত সেক্যুলার একটি জাতীয় উৎসব আবিষ‹ারের তথা প্রবর্তনের লক্ষ্য স্থির করে। বেছে নেয় ১লা বৈশাখকে। এতে ১লা বৈশাখ উদ্যাপনের দিক থেকে জাঁকজমক ও জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠায় সফল হলেও দেশের বৃহত্তর মুসলমান সমাজে ঈদ তার ধর্মীয় আমেজ ও তাৎপর্য নিয়েই বহাল থাকে। ফলে এই সেকুলার বুদ্ধিজীবী সমাজ ঈদের ধর্মীয় তাৎপর্য মুছে দিয়ে এটাকে খাঁটি বাঙালি উৎসবে রূপান্তরের বুদ্ধিজীবীসুলভ যে-উদ্যোগ নেয় তারই প্রাথমিক কর্মসূচি শহীদ মিনারে নামাজবিহীন এই খুতবা’র ঈদ। নামাজ থাকার কারণে তাদের কাছে ঈদ একটি ‘সাম্প্রদায়িক’ উৎসব হিসেবে বিবেচ্য।” তাই হাইব্রিড সেকুলার বুদ্ধিজীবীকুল পরিকল্পিতভাবে দেশের উঁচুতলার বেদী শহীদ মিনারে তথাকথিত নামাজবিহীন ‘খুতবা’র ঈদ উদ্যাপন করে এদেশের মানুষকে ধর্মীয় রীতিনীতি ও মূল্যবোধহীন নতুনধারার খাঁটি বাঙালি তথা ধর্মনিরপেক্ষ ‘ঈদ’ উপহার দিতে চেয়েছিলেন। দেখা যাচ্ছে তাঁরা সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা সৃষ্টি ও ধারণ করার জন্য খোদ ধর্মেরই অপব্যবহার করেছেন। অথচ তাঁরাই নাকি আবার দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় আলেম-ওলামাদের ‘ধর্মব্যবসায়ী’ বলে গালি দেন। সত্যিই সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ! কী দারুণ তাঁদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নীতি! ফুড পয়জনিং হলে পাকস্থলীর যেমন বিকার ঘটে, তেমনি সেকুলার পয়জনিং মস্তিষ্কের বিকারও ঘটায় বৈকি!

সেকুলারিজমের আবরণে ঈদকে ধর্মের তথা ইসলামের লেবাস থেকে বের করে আনার অপপ্রয়াস সত্যিই হাস্যকর বিষয়। এটা সম্ভব নয়। তাছাড়া এতদ্অঞ্চলের তীব্র ধর্মপরায়ণ জনপদে এটা যে কোনোকালেই কল্কে পাবে না তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। এদেশের জ্ঞানপাপী ও বিকারগ্রস্ত সেকুলারদের এইসব উদ্ভট প্রকৃতির চিন্তাভাবনা অতি কৌতুকবৎ। প্রকারান্তরে তাদের এসব হাস্যকর তৎপরতা সমাজে উট্কো ঝামেলারই সৃষ্টি করে। জনমানসে বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। শেষপর্যন্ত তাদের বিভ্রান্তিমূলক কোনো তৎপরতাই হালে পানি পায় না।
ঈদ শুধু ধর্মীয় আবেদনই সৃষ্টি করে না, সম্যকভাবে সামাজিক আবেদনও তার রয়েছে। ইদানীং কি মিডিয়ায় কি সংবাদপত্রে ব্যাপকভাবে বলা হচ্ছে, ‘সার্বজনীন ঈদ উৎসব’। ঈদকে বিশেষভাবে ‘সার্বজনীন’ বলায় আমার আপত্তি আছে। এটা আমার কাছে বাহুল্য মনে হয়। হ্যাঁ, অবশ্যই ঈদ সার্বজনীন, কিন্তু গোঁড়া সেকুলার মিডিয়া ও সংবাদপত্রে ঈদকে কেবল ‘সার্বজনীন’ বলে বিশেষায়িত ও প্রচার করার পেছনে কী ধরনের মতলববাজি কাজ করে সেটাই হচ্ছে আমার প্রশ্ন। কেননা যেখানে ইসলামের তাওহীদ বা একত্ববাদ সমগ্র বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম সার্বজনীন মতবাদ হিসেবে বিবেচ্য, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই ‘সার্বজনীনতা’ ঈদের অন্যতম গুণ বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিদ্যমান। তাই আগ বাড়িয়ে ‘সার্বজনীন ঈদ’ বলার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না আমি। আমার দৃষ্টিতে এই মনগড়া সার্বজনীনতার পথে মুসলমানদের আহ্বান করাটা সুস্পষ্টভাবেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ একদিকে ঈদকে যেমন সার্বজনীন বলা হচ্ছে, তেমনি শারদোৎসব কিম্বা দুর্গোৎসবকেও একইভাবে বলা হচ্ছে সার্বজনীন। যদি দুটোই সার্বজনীন হয়ে থাকে তাহলে ধর্মীয় ভিন্নতার কোনো প্রয়োজনই তো দেখছি না। মুসলমানরা হিন্দুদের দলে কিম্বা হিন্দুরা মুসলমানদের দলে এলেই তো হয়ে যায়! কিন্তু এটা কি সম্ভব? পাঠক লক্ষ করুন, এখানে দুই ধর্মের দুই মেরুর সম্পূর্ণ পার্থক্য দুটো ধর্মীয় উৎসবকে সার্বজনীনতার নামে একত্রিত করে স্ব-স্ব ধর্মের আদর্শিক বা আক্বিদাগত বিশ্বাস ও চেতনাকে গুলিয়ে ফেলে সেকুলারিজমের আড়ালে বিদঘুটে ধরনের চিন্তা হাজির করা হচ্ছে। এটাই নাকি তাদের ঈদ এবং দুর্গোৎসবের ধর্মনিরপেক্ষকরণ!!
সচেতন পাঠক মাত্রই আঁচ করতে পারবেন যে, হাল আমলে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম থেকে শুরু করে কালচারাল ফ্যাসিজমের মাধ্যমে ঈদকে কীভাবে তামাশা আর প্রহসনের বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। মুসলমানদের আবহমানকালের ধর্মীয় ও সামাজিক ঈদ-সংস্কৃতিকে কীভাবে সর্বাবস্থায় বিকৃত করে এর সেকুলারাইজেশন করার প্রয়াস চলছে। না বললেই নয় যে, তথাকথিত সেকুলার মিডিয়াগুলোতে ঈদের মূল চেতনাকে অঘোষিতভাবে করা হয়েছে অবাঞ্ছিত। বিশিষ্ট নাট্যকার, টিভিব্যক্তিত্ব ও স্বনামখ্যাত কলামিস্ট আরিফুল হক লিখেছেন, “সেকুলার ঈদ হলো সেই বাউল গানটার মতো ‘আমি রাঁধিব বাড়িব, ব্যঞ্জন বাড়িব, তবু হাঁড়ি ছোঁব না’। বিটিভির ঈদের অনুষ্ঠান অনেকটা সেই রকম। ঈদের অনুষ্ঠান হবে, কিন্তু ইসলামকে ছোঁয়া যাবে না। ইসলামি জীবনদর্শন, অস্তিত্ব-চেতনা-ভাবনা থেকে গা বাঁচিয়ে চলতে হবে অর্থাৎ ঈদ-সংস্কৃতির দিকটা কিংবা ঈদের মূল স্পিরিটটা কোনো মতে বেরিয়ে আসতে দেয়া যাবে না। কারণ পাছে বাবু কিছু বলে। ধর্মনিরপেক্ষতা মার খায় সদা এই ভয়। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে পূজার দিনে প্রতিমা দেখানোতে ধর্মনিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয় না, বুদ্ধঠাকুর দেখানোতে দোষণীয় হয় না, ক্রিস্টমাস-ট্রি বা সান্টাক্লজ দেখানোতেও ধর্মনিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয় না, কিন্তু মুসলমান সংখ্যাগুরুর দেশে, যে দেশের সংবিধানে ইসলাম এখনও রাষ্ট্রধর্ম– সেই দেশের জাতীয় টেলিভিশনে বছরে দু’একবার ইসলামি রিচ্যুয়াল পালিত হবে বা ইসলামিক স্পিরিট অনুযায়ী ঈদের অনুষ্ঠান সাজানো হবে, এটা যেন টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ সহ্যই করতে পারে না। ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে এরা বরাবরই ঈদের অনুষ্ঠানকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করে” (পৃ: ১৭, সংস্কৃতির মানচিত্র, আরিফুল হক)।

আরো পরিতাপের বিষয় হলো, এখন শুধু জাতীয় টিভিচ্যানেল বিটিভিতেই নয়, অধিকাংশ বেসরকারি টিভিচ্যানেলগুলোতেও ঈদ নিয়ে সীমাহীন প্রহসন শুরু হয়েছে। বরং বলা যায়, প্রাইভেট চ্যানেলগুলো বিটিভিকেও সব দিক থেকে হার মানিয়েছে। ঈদকে উপলক্ষ করে চ্যানেলগুলোর প্রোগ্রাম ও যাবতীয় কালচারাল আয়োজন এমনভাবে সাজানো হয়, যেখানে সত্যি কথা বলতে ঈদের মূল স্পিরিটের কোনো ছিঁটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া যায় না। শ্রদ্ধেয় আরিফুল হক তাঁর বইটিতে আরো লিখেছেন, “ওরা বিবৃতি প্রচার করে বলেন, ঈদ আনন্দের। কিন্তু সে আনন্দ যে বেলেল্লাপনার আনন্দ নয় সে কথা ওরা জানে না। ওরা বলেন, ঈদ মিলনের, কিন্তু সে মিলন যে যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরীর গলাগলি, ঢলাঢলির মিলন নয় সে কথা ওরা জানে না।” ঈদের মূল স্পিরিটটাকে এখন কালচারাল ফ্যাসিজমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সঙ্কীর্ণ ও গুরুত্বহীন করে তোলা হচ্ছে। যা আমাদেরকে ঈদের মূল মর্ম অনুধাবন ও ঐতিহ্য ধারণ করা থেকে নিতান্তই বঞ্চিত করছে। পূর্বেই বলেছিলাম, ঈদ কোনো অর্থহীন বা মূল্যবোধহীন নিছক আনন্দের উৎসব নয়, এর রয়েছে অর্থপূর্ণ জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় রূপ। আরিফুল হক লিখেছেন, “ওদের অনুষ্ঠানগুলো দেখলে বা শুনলে ঈদের ঐতিহ্যটাকেই নড়বড়ে মনে হয়, গুরুত্বহীন মনে হয়। ওরা জানে না ঈদ আর পাঁচটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতো শুধু মূল্যবোধহীন আনন্দের উৎসব নয়। সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের বিচ্যুতি ঘটায় এমন কোনো কাজ বা উৎসবে মুসলমানরা বিশ্বাস করে না। ঈদ সমস্ত মানুষকে এক উদার বিস্তৃত প্রাঙ্গণে আহ্বান জানায় ঠিকই, কিন্তু সাথে সাথে অন্ধ নেশা ও বেসাতিপনার পথ পরিত্যাগ করে সুন্দর উন্নত জীবনের পথে ফিরে আসতে বলে।” একজন প্রখ্যাত নাট্যকার ও টিভিব্যক্তিত্ব হিসেবে শ্রদ্ধেয় আরিফুল হকের বক্তব্যের যথার্থতা ও উপলব্ধি ছাড়াও আমাদের নিজ চোখের দেখাও তো তথৈবচ। এছাড়া হাতে গোনা দু-একটি সংবাদপত্র ছাড়া বেশির ভাগ সংবাদপত্রের বার্ষিক ‘ঈদসংখ্যা’গুলোতে ঈদের প্রকৃত চেতনা বা মেজাজ খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। ঈদ উপলক্ষে সেখানের সব আয়োজনই থাকে সৃজনশীল কিন্তু ঈদের মূল চেতনা সেখানেও কার্যত অধরা।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহনশীলতা এবং আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থান এ জনপদের মাটি ও মানুষের আবহমানকালের আজন্ম লালিত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। এদেশের উগ্র সেকুলারপন্থীরা সংখ্যালঘুদের অধিকার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে যতই বেহুদা মায়াকান্না করুক, তাদের মূল উদ্দেশ্য তথা ইসলামের সার্বজনীন আদর্শ ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষকরণের বিজাতীয় এজেন্ডা ও নীতি বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভবপর নয়।