ভারতে মুসলিম হত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চায় হেফাজত

গরু রক্ষার নামে ভারতীয় হিন্দু কর্তৃক সেই দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর ধারাবাহিক নির্যাতন, হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী।

তিনি ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সরকার যেন প্রতিবেশী দেশটিতে জাতিগত মুসলিম নিধন বন্ধে ভারত সরকারকে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে তাগিদ দেয়।

আজ (৬ জুলাই) বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঈমান-আক্বীদা ভিত্তিক অরাজনৈতিক ইসলামী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী একটি বিবৃতি প্রেরণ করেন।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ২০১৪’র নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)’র দুইটা শ্লোগান ছিলো- “Vote for Modi, give life to the cow”। অর্থাৎ- মোদিকে ভোট দিয়ে গরুকে জীবন দিন এবং “The cow will be saved, the country will be saved” গরু বাঁচলে দেশ বাঁচবে। যদিও ভারত অন্যতম প্রধাণ গরুর মাংস রপ্তানিকারক দেশ। তারা পৃথিবীর মোট গরুর মাংসের ২৫% চাহিদা পুরণ করে এবং বছরে চার বিলিয়ন ডলার আয় করে। অথচ হিন্দু সমাজের বাইরে অহিন্দুদের জন্য সবচেয়ে সস্তা প্রোটিনের উৎস গরুর গোস্ত নিষিদ্ধ করে মানুষের খাদ্যাভ্যাসকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে ভারত সরকার।

আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, শুধু এখানেই থেমে থাকলে কথা ছিল না। তারা নিয়মিত বিরতিতে গো হত্যার অভিযোগে, গরু বহনের অভিযোগে নির্মমভাবে পিটিয়ে মারছে মুসলমানদেরকে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে এই সন্ত্রাসের টার্গেট হচ্ছে মুসলমানেরা, যদিও মুসলমানেরাই একমাত্র সম্প্রদায় নয়, যারা গরুর গোস্ত খায়। এই গরুর ইস্যুটাকে মুসলমান সম্প্রদায়ের উপরে সহিংসতার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক হচ্ছে, সরকারি পর্যায়েও এই সহিংসতা উস্কে দেয়ার জন্য হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদেরা হিংসাত্মক কথা বলেন। গুজরাটের আইনমন্ত্রী প্রদীপ সিং জাদেজা ২০১৬ সালে বলেছিলেন, “Anybody who does not spare cows, the government will not spare him.” অর্থাৎ- “যদি কেউ গরুকে ছাড় না দেয়, তাহলে সরকারও তাঁদের ছাড় দেবে না”। গরু হত্যা করলে যাবজ্জীবন কারাদ- হবে, গুজরাটে এই মর্মে আইন পাস করা হয়েছে এবং ঠিক তার পর পরই ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংও জানিয়েছেন, গো-হত্যাকারীদের তার সরকার সোজা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেবে। এর মানেই হচ্ছে, এই গো হত্যার জন্য সহিংসতায় শুধু উন্মত্ত জনতাই জড়ি নয় নয়, বরং তার পেছনে রীতিমতো রাষ্ট্রীয় সমর্থনও আছে।

বিবৃতিতে হেফাজত মহাসচিব আরো বলেন, বিজেপি শাসিত এবং বিজেপি প্রভাবিত এলাকায় প্রতিদিনই গো-রক্ষাবাহিনীর তা-বের শিকার হচ্ছেন মুসলিম ও দলিতরা। গো-রক্ষার নামে সর্বত্র সন্ত্রাস ও ভয়ের রাজত্ব তৈরি করা হচ্ছে। গো-হত্যা আদতেই হয়েছে কিনা, তার সত্যাসত্য বা প্রমাণ-অপ্রমাণের কোন বালাই নেই। গো-রক্ষাবাহিনীর দুষ্কৃতীকারীরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে বা গুজব রটিয়ে আক্রমণ করছে নীরিহ মুসলিম ও দলিতদের। আর তাদের এই বেআইনী ও অপরাধমূলক কাজের সাফাই গাইছে আরএসএস এবং বিজেপি নেতারা।

জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, গো রক্ষার বিষয়টা সামনে আনা হয় হিন্দু জাতিগোষ্ঠীর প্রভাব বলয় তৈরির বাসনা থেকেই। গো রক্ষার নামে যা করা হচ্ছে, তা একই সাথে মুসলমান ও দলিত-বিরোধী এবং ফলতঃ এটা ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠার চিন্তা। বর্তমানে এই হিন্দুত্বের ধারণায় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং গো-রক্ষার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাবেই মুসলমান-বিরোধী একটি বৈশ্বিক হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজে লাগানো হচ্ছে।

বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, ভারত নিজেকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র বলে দাবী করে। কিন্তু নিজেই তার বিভেদাত্মক পরিচয়বাদী হিন্দু রাজনীতির স্বার্থে রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনকে উস্কে দিচ্ছে; যা শুধু দুঃখজনকই নয়, ভবিষ্যতের উপমহাদেশের রাজনীতির জন্য ভয়াবহ এক অশনি সংকেতও এটা। তিনি বলেন, ধর্মীয় বিষয়ের চিন্তা ধর্মীয় ব্যক্তিদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত। এই ধর্মকে ব্যবহার করে যদি শুধুই রাজনৈতিক ক্ষমতাকে পোক্ত করার কাজে ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতিবিদেরা ধর্মের ব্যবহার শুরু করেন, তাতে ধর্মের মর্যাদা বাড়ে না, বরং ক্ষতি হয় ধর্মের। সেই সাথে ক্ষতি হয় সেই সমাজের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তিনি বলেন, নর-হত্যা কোন ধর্মেই অনুমোদন দেয়া নেই। সেই কথাটা ভুলে গিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা গরু হত্যার বদলা হিসেবে নিরীহ মানুষ হত্যা করছে। তাহলে ধর্ম কোথায় থাকে? যেখানে ধর্ম মানুষকে সুউচ্চ আসনে বসায়, সেখানে ধর্ম রক্ষার নামে মানুষের অপমান, অমর্যাদা এবং প্রাণহানী; আর যাই হোক ধর্ম হতে পারে না।

বিবৃতিতে আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী বলেন, আমরা ভারতের সাম্প্রতিক গোরক্ষার রাজনীতিতে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গো-রক্ষার উন্মত্ততায় অহরহ চলতে থাকা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বন্ধে আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তদন্ত করে ভারতীয় রাজনীতির সহিংসতা থেকে সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়কে হিন্দুত্ববাদিদের জাতিগত নিপীড়ন থেকে রক্ষা করার জন্য আমরা উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি আমরা এটাও চাই যে, ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু মুসলমানদের রক্ষায় ভারত সরকারকে বাংলাদেশ সরকার যেন নিজেদের গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়ে গো-রক্ষার নামে জাতিগত মুসলিম নির্যাতন ও হত্যা বন্ধে জোর তাগিদ দেয়।