পিপড়ার কথোপকথন : কুরআন এবং আধুনিক বিজ্ঞান

আরিফ আজাদ


প্রাণী জগতে মানুষকেই ভাবা হয় সবচে বুদ্ধিমান।
মানুষ সংঘবদ্ধ ভাবে বসবাস করে। মানুষ কথা বলে। হাসে, কাঁদে, খেলে, তামাশা করে। মানুষ কষ্ট পায়। মানুষ ‘ভাষা’ ব্যবহার করে, বর্ণমালা আবিষ্কার করে। মানুষ সুউচ্চ অট্টালিকা বানায়। মানুষ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সবকিছুকে করে তুলেছে আরো সহজ থেকে সহজতর….
মানুষ যুদ্ধ করে, অস্ত্র বানায়। একে-অন্যের উপর হামলে পড়ে…

কাজী নজরুল একটা সময়ে বসে লিখেছিলেন মানুষের কথা, মানুষের আকাঙ্ক্ষার কথা।
বলেছিলেন-
”পাতাল ফেড়ে নামব আমি
উঠব আমি আকাশ ফুঁড়ে,
বিশ্বজগৎ দেখব আমি
আপন হাতের মুঠোয় পুরে।”

ঠিক ঠিক মানুষ পাতাল ফেড়ে নেমে গেছে। আকাশ ফুঁড়েও দিব্যি সে চষে বেড়াচ্ছে মহাশূন্যে।
মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট আর সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বজগতকে সে সত্যি সত্যিই হাতের মুঠোয় ভরে নিয়েছে।
বাংলাদেশে বসে সে যেন নিউ ইয়র্কের ভোরের স্বাদ নিতে পারে…..
ঢাকার বেইলী রোডে বসেও সে যেন মিশে আছে বার্সেলোনার ন্যু ক্যাম্পে। মিনিট টু মিনিট নয়, ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যেই সে পেয়ে যাচ্ছে সমস্ত আপডেট…

আচ্ছা, মানুষ যদি দেখে, তার চেয়ে ক্ষুদ্র কোন প্রাণী, ঠিক তার মতোই বুদ্ধিমান, তাহলে কেমন হবে?
অর্থাৎ, সেই অতিকায় ক্ষুদ্র প্রাণীটাও কথা বলে। হয়তো ‘ভাষা’, ‘বর্ণমালা’ ব্যবহার করে।
তারাও সংঘবদ্ধভাবে সমাজে বসবাস করে। চাষাবাদ করে। খাদ্য মজুদ করে। অসাধারণ সব কারুকার্যময় ঘরবাড়ি তৈরি করে। তারা যুদ্ধ করে। কেউ নিহত হলে তাকে দাফন করে ইত্যাদি?
ভাবছেন এরা আবার কারা, তাই না? এলিয়েন নাকী?
একদম না। এলিয়েন হলে তো অবাক হওয়ার কিছুই ছিলো না। কিন্তু এতোক্ষণ যে ক্ষুদ্র প্রাণীটার বর্ণনা দিলাম সেটা কোন এলিয়েন নয়, অন্য গ্রহের কোন প্রাণীও নয়। সেটা হলো সকলের পরিচিত, অতিকায় ক্ষুদ্র জীব- পিঁপড়া……..

অবাক হলেন, তাই না? হবার মতোই…
পিঁপড়ার শরীর, ব্রেইন, ব্রেইনের সাইজ, কাজ এবং বুদ্ধির সাথে কম্পেয়ার করলে মাঝে মাঝে মানুষকে আপনার তুচ্ছই মনে হবে।

একটা সময়ে মনে করা হতো, পিঁপড়া কথা বলতে পারেনা। পিঁপড়াকে তখনো অবশ্য আলাদা করা হয় নি। ভাবা হতো, কীট পতঙ্গ শ্রেণী কথা বলতে পারেনা।
পিঁপড়ার ব্যাপারে কিছু বছর আগেও শুধু এটুকু জানা ছিলো যে- পিঁপড়া কেবল তাদের শরীর থেকে নিঃসারিত ‘ফেরোমন’ নামের রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে নিজেদের কর্ম সম্পাদন করে।
আমরা যে পিঁপড়াদের লাইন ধরে সারিবদ্ধভাবে চলতে দেখি, তা এই পদার্থের কারণেই।
পিঁপড়া যে কথা বলতে পারে, বা কথা বলে- এ কথা আমরা তখন স্বপ্নেও ভাবি নি।
রূপকথার গল্পের মতো শোনালেও সত্য এই যে- পিঁপড়া সমাজ কথা বলতে পারে। তারা শব্দ করেই কথা বলে। হয়তো বা তাদের নিজস্ব ভাষা আছে, বর্ণমালা আছে।

ব্রিটিশ এবং স্প্যানিশ বিজ্ঞানীরা একটা এক্সপেরিমেন্ট করলো এটার উপরে। তারা করলো কী, ৪০০ লাল পিঁপড়ার ঘরের মধ্যে 4 mm এর মাইক্রোফোন এবং স্পীকার বসিয়ে দিয়ে আসলো।
দেখা গেলো, পিঁপড়াগুলো বেশ কয়েক ধরণের শব্দ করলো। সেই শব্দ রেকর্ড করা হলো।
সেই রেকর্ড অন্য কর্মী পিঁপড়াদের কাছে নিয়ে অন করা হলে দেখা গেলো, কর্মী পিঁপড়াগুলো সেই আওয়াজ শুনে ছুটোছুটি শুরু করে। তারা বিভিন্ন রকম এক্সপ্রেশান দেখাতে আরম্ভ করে।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর Jermey Thomas, যিনি এই এক্সপেরিমেন্ট পরিচালনার একজন, তিনি বলেন,- ‘When we played the queen sounds they (other ants) did “en garde” behaviour’

‘They would stand motionless with their antennae held out and their jaws apart for hours –the moment anyone goes near they will attack.’

‘Our study shows for the first time that different members make different sounds and that the sounds result in different behaviour.’ (১)

শুধু তা-ই নয়, পিঁপড়ারা যে কথা বলে বা বলতে পারে, তার উপরে ABC News একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছে। (২)

মজার ব্যাপার হচ্ছে, পিঁপড়ার কথা বলতে পারাটা একটা সময় অবিশ্বাস্য ঠেকলেও, এখন তা বাস্তব।
কিছু বছর আগেও আমরা এমনটি ভাবতে পারিনি। পিঁপড়ার কথা বলাটা কেমন যেন রূপকথার গল্পের মতো যেখানে সব-ই সম্ভব।
আরো অবাক করা ব্যাপার, পিঁপড়ারা যে কথা বলার ক্ষমতা রাখে বা কথা বলতে পারে, সেটা আমরা পবিত্র আল কোরআনেও দেখতে পাই।
আজ থেকে সাড়ে ১৪০০ বছর আগে নাজিল হওয়া একটি কিতাবে উল্লেখ করা আছে যে ‘পিঁপড়া কথা বলছে’। ব্যাপারটা দারুন না? এই তো সেদিন, গুনে গুনে হয়তো কয়েক বছর আগেই বিজ্ঞানীরা এই তথ্য বের করেছে যে পিঁপড়াও কথা বলে।
কিন্তু সাড়ে ১৪০০ বছর পুরোনো কোন কিতাবে যদি সেটার উল্লেখ থাকে, ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়?
আলহামদুলিল্লাহ্‌।

বলা হচ্ছে,- ‘যখন তাঁরা (সুলাঈমান আঃ এবং তাঁর বাহিনী) পিঁপড়ার উপত্যকায় পৌঁছালো, তখন একটি পিঁপড়া (সুলাঈমান আঃ এবং তাঁর বাহিনীকে আসতে দেখে) বলে উঠলো,- ‘হে পিঁপড়ার দল, তোমরা নিজেদের গৃহে ঢুকে পড়ো, যাতে অজ্ঞাতঃবসত (না দেখতে পেয়ে) তাঁরা (সুলাঈমান বাহিনী) তোমাদের পিঁষে না দেয়।’- সূরা আন নামল ১৮

কিছু বছর আগেও কেউ এই আয়াত দেখে ব্যঙ্গভরে বলতো,- ‘এটা কী ধর্মীয় কিতাব নাকী রূপকথার বই যেখানে পিঁপড়াও কথা বলে?’
কিন্তু আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে, বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব কল্যাণের মাধ্যমে আমরা জানতে পারছি, কোরআন পিঁপড়ার কথা বলার ব্যাপারে যে তথ্য দিয়েছে, তা বিজ্ঞানসম্মত, প্রমাণিত….

শুধু কী তাই? বিজ্ঞান প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে, পিঁপড়া তথা পতঙ্গ শ্রেণীর প্রধাণ থাকে স্ত্রী পতঙ্গ।
মৌমাছির উপর গবেষণা করে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী Karl Von Frinch তা প্রমাণ করেছিলেন।
আল কোরআনের সূরা নমলের ১৮ নম্বর আয়াতে যে পিঁপড়ার কথা বলার ব্যাপারে বলা হয়েছে, এ্যারাবিক গ্রামারের দিক থেকে তার জন্য স্ত্রী লিঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে।
অর্থাৎ, যে পিঁপড়াটি অন্য পিঁপড়াদের সুলাঈমান আ: এবং তাঁর বাহিনী আগমনের সংবাদ দিচ্ছিলো, সেটি নিশ্চই দলের প্রধাণ এবং তাঁর নির্দেশ পালনে সবাই বাধ্য। এবং এই পিঁপড়ার জন্য কোরআন স্ত্রী লিঙ্গ ব্যবহার করেছে।
আলহামদুলিল্লাহ্‌, আজকে আমরা জেনেছি, পিঁপড়াদের দলনেতা হয় স্ত্রী পিঁপড়া….

এখানেই শেষ নয়। কোরআন যেখানেই বুদ্ধিমান প্রাণীর কথা বর্ণনা করেছে, সেখানেই পুংলিঙ্গ ব্যবহার করেছে।
মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীকে নির্দেশ করার সময় ‘ইয়া আইয়্যুহা’ বলে সম্বোধন করেছে।
এটা এমন একটা সম্বোধন, যা বুদ্ধিমান এবং বোধ সম্পন্ন শ্রেণীর জন্য ব্যবহৃত। এমনকি, নবীদের সম্বোধনের জন্যও এটা ব্যবহার হয়েছে। বলা হয়- ‘ইয়া আইয়্যুহান নাবিয়্যু’- (হে নবী’) …….
ঠিক এই সম্বোধনটি মহিলা পিঁপড়াটি অন্য পিঁপড়াদের নির্দেশ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেছে।
বলা হয়েছে- ‘ইয়া আইয়্যুহান নামালতু’- হে পিঁপড়ার দল’….
এই সম্বোধন থেকে বোঝা যায়, পিঁপড়াও মানুষের মতো বোধ সম্পন্ন। মানুষের মতো কথা বলতে পারে। সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করে ইত্যাদি…
আয়াতের পরের শব্দে পিঁপড়াদের গর্তে ঢুকে পড়ার জন্য যে ‘উদখুলু’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, এটাও একটা ইউনিক শব্দ। আল কোরআনের অসংখ্য জায়গায় মানুষকে নির্দেশ দানের ক্ষেত্রে এই শব্দের ব্যবহার আছে। আল কোরআনের শব্দ ব্যবহারের এই ধারা থেকে বোঝা যায়, পিঁপড়ারাও বোধ সম্পন্ন মানুষের মতো, যে রহস্য বিজ্ঞান আজ আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে…
ক্যামব্রিজ এবং হার্ভাড প্রেস থেকে ১৯৯০ সালে প্রকাশিত, Bert Hölldobler এবং Edward O. Wilson তাদের বই ‘The Ants’ এর ২৭ পৃষ্টায় লিখেন,- ‘মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সবচে যে পতঙ্গের জীবন সাদৃশ্যপূর্ণ, সেটা হলো পিঁপড়া..’

Bert Hölldobler, Edward O. Wilson এর বই ‘The Ants’ এবং Dr. Eleanor এর ‘Book Of Common Ants’ পড়লে আপনি জানতে পারবেন আরো বিশদভাবে যে, পিঁপড়াদের কলোনী আছে, তাঁরা চাষাবাদ করে, কথা বলে, ফ্রি টাইম পাস করে, এমনকি, তাদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহও বিদ্যমান।

পিঁপড়াদের এই বোধ আছে বলেই আল কোরআন মানুষের জন্য ব্যবহৃত শব্দ তাদের জন্যও ব্যবহার করেছে। আল কোরআন সাড়ে ১৪০০ বছর আগে যে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে, তা বর্তমান বিজ্ঞান প্রমাণ করে চলেছে মাত্র।
আল কোরআন একটি আয়াতে যা যা বুঝালো, ঠিক সেগুলো বর্ণনার জন্যই হার্ভাড-ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজার হাজার পৃষ্টার বই লেখা হচ্ছে এখন।

সুতরাং,, ‘তারা কী কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা-ভাবনা করেনা? নাকী তাদের অন্তর তালাবদ্ধ?’- সূরা মুহাম্মদ, ২৪


‘পিঁপড়া বিদ্যার ইতিকথা’/ আরিফ আজাদ

ফেসবুক থেকে