জামিয়া দারুল উলূম হাটহাজারীর নতুন শিক্ষাবর্ষের দরস শুরু

বিশ্বের অন্যতম প্রধান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়  আল-জামিয়ায়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী’র নতুন শিক্ষাবর্ষের (১৪৩৮-৩৯হিঃ) পাঠদান আজ (১৯ জুলাই) বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয়েছে। পাঠদান উদ্বোধন করেন জামিয়ার মহাপরিচালক সর্বজন শ্রদ্ধেয় শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী। এ সময় জামিয়ার সুপ্রশস্ত দারুল হাদীস মিলনায়তন ও বারান্দায় ছাত্রদের জমায়েতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।

উদ্ভোধনী দরস শুরু হওয়ার পর জামিয়ার শিক্ষাসচিব ও প্রধান মুফতী আল্লামা মুফতী নূর আহমদ ছাত্রদের উদ্দেশ্যে সূচনা বক্তব্য পেশ করেন। বক্তব্যে তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা দুনিয়ার সকল লোভলালসা ত্যাগ করে এখানে এসেছেন দ্বীনি ইলম অর্জন করার জন্য। সুতরাং নিয়্যাতকে খালেস করে এবং অন্তরে তাকওয়া ও আল্লাহর ভয় নিয়ে নিজেদেরকে পড়ালেখায় আত্মনিয়োগ করবেন।

এরপর জামিয়ার সহযোগী পরিচালক ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ জুনায়েদ বাবুনগরী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে দিক-নির্দেশনামূলক হিদায়াতী বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি উলূমে নবুওয়াতের ফযীলত, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার উপর বক্তব্য রাখেন। এরপর তিনি ছাত্রদের প্রশংসা করে বলেন, আপনারা দ্বীনের বৃহৎ পরিসরে খেদমত করার মহান লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়েই দুনিয়াবী শিক্ষা ও খ্যাতির সম্ভাবনাকে পরিত্যাগ করে মাদ্রাসা শিক্ষাকে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এই উদ্দেশ্যে সফলতা আসতে হলে অবশ্যই আপনাদেরকে পূর্ণ মনোযোগ ও কঠোর অধ্যাবসায়ের সাথে দরসে নিয়মিত হাজির থাকতে হবে এবং অন্য সময়ে কিতাব মুতালায়া করতে হবে। তিনি বলেন, মুসলমানদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করার জন্য এবং দ্বীনি বিষয়ে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য ইসলাম নির্মূলবাদি চক্র বহুমুখী ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা শুরু করেছে। নতুন নতুন নানা ফেরকার উদ্ভব ঘটানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এসব ফেরকা ও ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে হলে যোগ্য আলেম হয়ে আপনাদেরকে গড়ে ওঠতে হবে। এই জন্য পবিত্র কুরআন-হাদীস ও ইলমে ফিক্বাহর মৌলিক জ্ঞানসহ অন্যান্য সকল বিষয়েও পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। ইলমে দুর্বলতা থেকে গেলে এটা উপকারীর চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং এ বিষয়ে সকলকে সযত্ন ও সতর্ক থাকতে হবে।

আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, সকল শিক্ষার্থীদের জামিয়ার আভ্যন্তরীণ সকল আইন ও নিয়ম-শৃঙ্খলা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। এ ব্যাপারে কোন শিথিলতা করা যাবে না। যথারীতি দরসে সকল ছাত্রকে হাজির থাকতে হবে এবং দরসের বাইরে সময়ের উত্তম ব্যবহার করে পূর্ণ মনোযোগের সাথে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে হবে।

তিনি ছাত্রদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনামূলক বয়ানে আরো বলেন, জামিয়ার সকল উস্তাদ, কর্মকর্তাসহ যিম্মাদারগণের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় রেখে আপনাদেরকে চলতে হবে। আপনাদেরকে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা ও চলাফেরায় পারস্পরিক সম্মান ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হবে। দোকানপাট ও বাজারে ঘোরাফেরা করবেন না এবং কোথাও আড্ডা দিবেন না। এসব বিষয়ে জামিয়ার পক্ষ থেকে কঠোর তদারকী করা হবে। আমরা চাই, আপনারা এখানে এসেছেন সহীহ দ্বীনি ইলম অর্জন করতে এবং দ্বীনি বিষয়ে উম্মাহ’র পথপ্রদর্শক হয়ে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করতে। আমরা আপনাদেরকে সেভাবেই গড়ে তুলতে চেষ্টা করবো ও সাহায্য করবো, ইনশাআল্লাহ।

আল্লামা বাবুনগরী বলেন, মনে রাখবেন- কুরআন-হাদীস ও ইসলামের মৌলিক ইলম হাসিল করার জন্য আমাদের আকাবির ও পূর্বসূরীগণ সীমাহীন মেহনত-পরিশ্রম ও সাধনা করে গেছেন। নানা বিভ্রান্তি, অপব্যাখ্যা চিনতে ও বুঝার যোগ্যতা অর্জন করে সহীহ ইলমে দ্বীন হাসিল করতে হলে অক্লান্ত মেহনত- পরিশ্রম ও সাধনা করতে হবে। আর ইলম অর্জনের পাশাপাশি এখন থেকেই নিজেদের আমল-আখলাকের মধ্যেও তার অনুশীলন শুরু করে দিতে হবে। নিয়মিত জামাতে নামায আদায় করবেন, প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করবেন। রাত ১০টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে গভীর রাতে ওঠে তাহাজ্জুদ পড়ে ফজরের আগে ১-২ ঘণ্টা কিতাব পড়বেন। চলাফেরার সবপর্যায়ে সুন্নাতের পাবন্দীর উপর গুরুত্ব দিয়ে চলবেন। এভাবে যদি মেহনত-সাধনা করে এবং জামিয়ার সকল আইন মেনে নিজেকে আদর্শ ও পরিশুদ্ধতা নিয়ে চলতে পারেন, ইনশাআল্লাহ আপনারা এখান থেকে শিক্ষাউত্তীর্ণ হয়ে কওম-মিল্লাতের যোগ্য রাহবার ও খাদেম হয়ে সম্মান-শ্রদ্ধার্জনের সাথে দ্বীনের বহুমুখী কাজ আঞ্জাম দিতে পারবেন। তিনি বলেন, বর্তমানে ইসলাম ও মুসলমানদের নানামুখী সংকট ও দুর্দিনে কওম আপনাদের নেতৃত্বের অপেক্ষায় আছে। আর আপনারা যোগ্য আলেম রূপে গড়ে ওঠতে সক্ষম হলে তবেই কওমের পীপাসা নিবারণ করতে পারবেন।

উদ্ভোধনী দরসে জামিয়ার সকল মুহাদ্দিস, মুফতী ও উস্তাদবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।