ইসলামী সংস্কৃতি: প্রেক্ষিত সমাজ

ইসলামী সংস্কৃতি: প্রেক্ষিত সমাজ

সভ্যতা ও কৃষ্টি কালচারকে সংস্কৃতি বলে। সংস্কৃতি হচ্ছে জীবন সত্তার অন্তরঙ্গ ও বহিরাঙ্গের সামগ্রিক রূপ। সংস্কৃতি মানুষকে যেমন সুসংহত করতে পারে,তেমনি আবার মানুষকে বিধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। প্রত্যেকজাতির নিজস্ব একটি সংস্কৃতি রয়েছে। মুসলিমদের সংস্কৃতি হচ্ছে কুরআন-হাদীস ও ধর্মীয় গন্ডির ভিতরে নিয়ম-নীতি মেনে চলা।কুরআন ওসুন্নাহ’রসাথে সাংঘর্ষিক যা কিছু হবে,সবই ইসলাম ধর্মের জন্য অপসংস্কৃতি।প্রত্যেক ধর্মে তার নিয়ম-নীতি ও প্রথাকে সংস্কৃতি বলা হয়ে থাকে। আর অন্য সমাজ তথা প্রথাকে বলা হয় অপসংস্কৃতি।যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা নবী ও রাসূলদেরকে পৃথিবীতে প্রেরণ করে মানব জাতিকে ইসলামী জীবন যাপনের পদ্ধতি শিক্ষাদিয়েছেন। আর এই শিক্ষাইহচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা তথা সংস্কৃতি। এছাড়া কুরআন-হাদীস প্রদত্ত সীমানা তথা চিরায়ত নীতির বিরোধী যা কিছু হবে সবই অপসংস্কৃতি। ধর্মের সাথে সংস্কৃতি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। যে জাতির সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেছে,তাদের ধর্মীয় নিয়ম-নীতি,আচার-আচরণও বিধ্বংসের পথে।আমরা মুসলমান এবং ধর্মের নাম ইসলাম।ইসলাম ধর্মেও সংস্কৃতি রয়েছে। আজ আমাদের ধর্মীয় ও দেশীয় সংস্কৃতি মাতৃকূলচ্যুত হয়ে ভূত-প্রেত ও মানবরূপী শয়তানী কর্মকান্ড সেখানে স্থানে করে নিয়েছে। অপসংস্কৃতির বিষাক্ত ছোবলে মিল্লাতে মুসলিম হাবুডুবু খাচ্ছে।ইসলামি সংস্কৃতি বাদ দিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতি পালন করার কারণে মুসলমান জাতি আজ পথভ্রষ্টতার দিকে অগ্রগামী হচ্ছে। অশান্তির আগুনে মানুষ ডুব দিচ্ছে।সংস্কৃতির নামে যতসব অপসংস্কৃতি,অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিদ্ধ হচ্ছে।

বিদেশীদের পাচারকৃত সেসব নষ্ট (নোংরা) সংস্কৃতির আগ্রাসনে জাতি তথা সমাজ দিন দিন দূষিত হয়ে যাচ্ছে।আজ সুস্থ ধারার সংস্কৃতি আমাদের কাছ থেকে বিদায়নিচ্ছে।বিজাতীদের কালচারে সমাজের চিত্র দিনে দিনে পরিবর্তন হচ্ছে।পশ্চাত্য বিশ্বের এই অপসংস্কৃতির বিষক্রিয়ায় পুরো বিশ্ব আজ অসুস্থ।বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব,তন্মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। মুসলমানরা আজ এ কালনাগিনী (অপসংস্কৃতি) থেকে উত্তরণের কোন পথ খুঁজে পাচ্ছে না। মুসলিম পরিবারেও অপসংস্কৃতি ধুমধামের সাথে উদযাপন হচ্ছে। বিজাতীরা অপসংস্কৃতিকে মার্কেটে বিক্রি করছে,আর আমরা মুসলমান জাতি হয়েও বিজাতীয় অপসংস্কৃতি,কৃষ্টি-কালচার ক্রয় করছি।দেশে নানা ধরণের অপসংস্কৃতির রয়েছে।এখানে সবক’টি নিয়ে আলোকপাতের সুযোগ নেই। আসন্ন পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতির নামে যা হচ্ছে,সে বিষয়ে সংপ্তি আকারে আলোকপাতের চেষ্টা করব,ইনশাআল্লাহ।

বাংলা সনের পয়লা মাস বৈশাখ।বছর ঘুরে আবারও আমাদের দুয়ারে সমুপস্থিত বৈশাখ।পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে উদযাপন হবে বিভিন্ন রকমের অনুষ্ঠান।শহরের আনাচে-কানাচে বসবে অশ্লীল নাচ-গান ও জুয়ার আসর।আবার কোন কোন স্থানে বৈশাখ উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হবে, ‘বৈশাখীমেলা’। লটারীর নামে চলবে ধান্ধাবাজির ব্যবসা। হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে থাকবে পান্তা-ইলিশের জমজমাট আয়োজন।বিভিন্ন হোটেল ও মেলার রেস্টুরেন্টে থাকবে তরুণ-তরুণীদের উপচেপড়া ভীড়।পহেলা বৈশাখের দিন সূর্যোদয়ের পর থেকেই মডার্ণ তরুণরা কথিত বৈশাখী পাঞ্জাবি-পায়জামা ও তরুণীরা লাল-সাদা বৈশাখী শাড়ি পরিধান করে সাজগোজ করে ভীড় জমাবে গানের কনসার্ট ও বিনোদন পার্কগুলোতে।জোড়ায় জোড়ায় মিলিত হয়ে‘এসো হে বৈশাখ এসোএসো’এইগানে কণ্ঠ মিলাবে।অনেক ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন হিসাব পহেলা বৈশাখের দিন শুরু করবেন।বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তথা দোকানে আয়োজন করা হবে‘শুভ হালখাতা’ও‘মীলাদমাহফিল’।মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হবে,মেহমান ও ক্রেতাদের।

পয়লা বৈশাখ উদযাপনের নামে দেশের বিভিন্নশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন স্তরেরশিক্ষার্থীরা,বিশেষ করে তরুণীরাবাঙালি সংস্কৃতি পালনের নামে বেসামাল হয়ে উঠে।তরুণীরা বৈশাখী ড্রেস পরে নিজেদের রূপ-সৌন্দর্য উজাড় করে প্রদর্শনের জন্য রাস্তায় নেমে আসে।তারপর বিভিন্ন হোটেল-রেস্টুরেন্টে জোড়ার জোড়ায় মিলিত হয়ে পান্তা-ইলিশ খেয়ে বৈশাখি সংস্কৃতি (রেওয়াজ) পালন করে।পান্তা-ইলিশ খাওয়ারপূর্ব শেষে বৈশাখী মেলা ও বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলোতে তরুণ-তরুণীরা জোড়ায় জোড়ায় মিলিত হয়ে নীরবে-নিভৃতেপ্রেমিক-প্রেমিকার খোশ গল্প,অসামাজিকতা,অনৈতিকতা,অশ্লীলতা,বেহায়াপনা,নগ্নতায় জড়িয়ে পড়ে।এ হলো পয়লা বৈশাখের বাস্তব চিত্র! আচ্ছা,বৈশাখ আসলে পান্তা-ইলিশ,শুভ হালখাতা,বৈশাখী গান ইত্যাদি অপসংস্কৃতি পালন করাতেই বুঝি বাঙালির পরিচয়?এটাই কি বাঙালি সংস্কৃতি?এটা কোন মুসলমান ও বাঙালির সংস্কৃতি হতে পারে না।সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি উদযাপন ও বেহায়াপনা ইসলামে কখনোই সমর্থন করে না।এই সংস্কৃতি তো বাঙালি সংস্কৃতি নয়;বরং এটা তো কলকাতার পৌত্তলিক সংস্কৃতি।আর এ সংস্কৃতি পালন করে আমরা গর্বের সাথে বাঙালির পরিচয় দেই।বড় তাজ্জব লাগে এসব ব্যাপার!
বাংলা সনের নতুন একটি সাল গণনা শুরু হতে যাচ্ছে।আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে গত বছরের পর্যালোচনা করে আগামীর সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণে সচেষ্ট হওয়া।পাশাপাশি এই দিনে পেছনের ভুলগুলোর অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনা করে আগামী বছরের কল্যাণ কামনা করে সিজদাবনত হয়ে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার।

তাওবাহ,ইস্তিগফার,দোয়া-দরূদ,নফল নামায ইত্যাদি ভাল কাজে পুরো দিনকে কাটানো।কিন্তু এসব কল্যাণকর কাজের ধারে কাছেও না গিয়ে নিত্য-নতুন অশ্লীলতা ও গোনাহের কাজে প্রতিনিয়ত আরো বেশী হারে জড়িয়ে যাচ্ছি।বৈশাখকেন্দ্রিক প্রচলিত সকল বেহায়াপনা ও অপব্যয়ের আয়োজন ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ তথা হারাম।এতে অংশগ্রহণ করাকেও অনৈসলামিক কাজে অংশগ্রহণ করার সমান বলেই বিবেচ্য হবে।এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন,‘যে ব্যক্তি কোন ধর্মের মানুষের (ধর্মীয় আচারের) অনুকরণ বা সাদৃশ্য গ্রহণ করবে,সে তাদের অন্তর্ভুক্তহবে’।(সুনানে আবু দাঊদ)।

ইসলামের আলোকে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বেপর্দা ও বেহায়াপনার সাথে অপব্যয় ও গুনাহের যেসব আয়োজন হয়ে থাকে,তা পুরোপুরিভাবেই নিষিদ্ধ। ইসলাম বিভিন্ন উৎসব-অয়োজন ও আচার-অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রদান করেছে এবং বাতলে দিয়েছে নানাবিধ নীতিমালা।ে সজন্য তাদের (অমুসলিমদের) উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া,আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ইসলাম বিরোধী কাজ।অমুসলিমদের কৃষ্টি-কালচার,ইসলাম বিরোধী পথ ও পদ্ধতি অনুযায়ী আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে একমত পোষণ করা গুরুতর গোনাহের কাজ।কারণ,ইসলাম এমন ভোগ-বিলাসিতাতে কখনোই সমর্থন করে না,যা জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য তথা পরকালকে ভুলিয়ে দিয়ে মানুষের মনে পার্থিব লালসা বাড়ায়।

লেখক:
সাংবাদিক,আলেম


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74