কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (প্রথম পর্ব)

কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (প্রথম পর্ব)

একটি দেশের জনগণ দেশটির মূলশক্তি। এই শক্তির সাথে যে অংশের সম্পর্ক যতো গভীর ও নিবিড় সেদেশের জনগোষ্ঠীতে সেই অংশের সামাজিক প্রভাবও ততো প্রবল। সাধারণত একটি দেশের কোন রাজনৈতিক শক্তিকে সে দেশের সামাজিক শক্তি হিসাবে বিবেচনায় নেয়া হয়। আসলে এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। কারণ, রাজনৈতিক শক্তি এবং সামাজিক শক্তির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতামুখী আর সামাজিক শক্তি সমাজমুখী। বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ উপর থেকে নিচের দিকে নিম্নগামী আর সামাজিক শক্তির বিকাশ নীচ থেকে উপরের দিকে অগ্রসরমান। যেমন: রাজনৈতিক দলগুলো তৃণমূল পর্যায়ের জনগণ থেকে সৃষ্ট নয়। কিন্তু একটি সামাজিক শক্তি জনগণের একেবারে নিম্নস্তর থেকে শক্তি সঞ্চয় করে গঠিত হয়। বিকাশের সাথেসাথে এর ডালপালাও চতুর্দিকে সমৃদ্ধ হতে থাকে। উদাহরণ সরূপ বলা যায়, বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক দলগুলো গঠিত হয়েছে সেগুলোর কোনটাই তৃণমূলে গঠিত হয় নি, হয়েছে রাজধানীতে। আর রাজধানী মানেই এলিট-শ্রেণীর কেন্দ্র। পরবর্তীতে সেসব রাজনৈতিক দল ক্ষমতামুখী রাজনীতির খাতিরে তৃণমূলে গেছে কালেভদ্রে যদিও তাদের সাথে তৃণমূলের সম্পর্ক ছিলো কেবলি রাজনৈতিক, সামাজিক নয়। আমাদের দেশে দু’টি রাজনৈতিক দল তাদের শুরুর সময়টাতে তৃণমূলে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করেছিলো। দল দু’টি হলো: মুক্তিযুদ্ধের অভিভাবক মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এবং স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। তাঁদের চলে যাবার পর দল দু’টিই নিজেদের সামাজিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে। এখন দল দু’টি এলিট-শ্রেণীর পূর্ণ-নিয়ন্ত্রণে। তবে বাংলাদেশে এমন কোন শক্তি আজো সৃষ্টি হয় নি যারা সমভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি।

বলছিলাম, সামাজিক শক্তির কথা। একটি আদর্শ সামাজিক শক্তি বৃহত্তর সমাজের ভেতর থেকে তার প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখে। আদর্শ সামাজিক শক্তির মূল-বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বৃহত্তর সমাজের মৌলিক উপাদান জনগোষ্ঠীর কল্যাণ, সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করা। সেদিক থেকে সকল বিবেচনায় দেশের কওমী-জগৎ একমাত্র আদর্শ সামাজিক শক্তি হিসাবে বিবেচনার যোগ্য। কেমন করে কওমী-জগৎ দেশের একমাত্র আদর্শ সামাজিক শক্তিতে পরিণত হলো সে অলোচনাই আজকের বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করেন তাদের বেশির ভাগই এই কওমী-জগৎ সম্পর্কে খুব বেশি জ্ঞাত নন। জ্ঞাত নন বলেই কওমী-জগৎ সম্পর্কে ভ্রান্ত-ধারণার শিকার হন। প্রথমেই কওমী-জগতের কিছু রাজনৈতিক-সংস্কারমূলক ইতিহাসের চিত্র স্মরণ করা যাক। এখানে একটি কথা বলে নিতে হয় যে, ‘৭৫ পরবর্তীযুগে কওমী-জগৎ যেসব রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় হয় সে সবের মূল-লক্ষ্য ছিলো সমাজ-সংস্কার, ক্ষমতা নয়। যেহেতু সংস্কারের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ইসলাম থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়–সেই পরিপ্রেক্ষিতে কওমী-জগতের যাঁরা রাজনীতিতে সক্রিয় হন তাঁরা নিখাদ ধর্মীয় দায়িত্ব থেকেই রাজনৈতিক দল বা জোট গঠন করেন। পশ্চিমা গণতন্ত্রের বিশ্বাস থেকে কওমী আলিম-সমাজ কখনো রাজনীতির ময়দানে পা রাখেন নি। ৮০-র দশকের প্রারম্ভে যখন বিখ্যাত বুজুর্গ জাতির আধ্যাত্মিক দিশারী আমীরে শরীয়াত মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলনের সূচনা হয় দেশের মানু্ষ নতুনভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পায় কওমী-জগতের রাজনৈতিক সচেতনতার সাথে। যদিও পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনৈতিক তৎপরতার কথা জনগণ জেনে এসেছে কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বলতে গেলে খেলাফত আন্দোলনই দেশের মানুষের কাছে বৃহত্তর পরিসরে কওমী-জগতের রাজনৈতিক সচেতনতার খবর পৌঁছে দেয়। উল্লেখ্য, হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর খেলাফত আন্দোলন নিছক রাজনৈতিক ও ক্ষমতামুখী আন্দোলন ছিলো না; ছিলো রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সৎ ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্ব সৃষ্টির সংস্কারমূলক আন্দোলন। নির্বাচনে খেলাফত আন্দোলনের অংশ নেবার উদ্দেশ্য কখনোই প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো ক্ষমতামুখী ছিলো না; ছিলো জনমুখী আত্মশুদ্ধিতা সৃষ্টির মাধ্যমে একটি খোদাভীরু প্রশাসন সৃষ্টি করা। তাই হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. তাওবা-দিবসের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি সেই দা’ওয়াত নিয়ে প্রথমে প্রসিডেন্ট জিয়া এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট এরশাদের সাথে বঙ্গভবনে সাক্ষাৎ করেন। হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. উভয়কে বলেন: আমি ক্ষমতা চাই না, আপনারাই ক্ষমতায় থাকুন। কেবল আল্লাহকে ভয় করে দেশ চালান, দেশে ইসলামের আইনগুলো প্রবর্তন করুন। তবেই দেশে শান্তি আসবে। সেদিন কওমী-জগতের দা’ওয়াতের ডাক বঙ্গভবন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। স্মর্তব্য যে, ‘৭২-‘৭৫ পর্যন্ত ইসলামী রাজনীতির উপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিলো এবং এর ফলে কওমী আলিম-সমাজের মাঝে দেশ ও জাতির বৃহত্তর উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবার কারণে বঞ্চনার যে মানসিক চাপ তৈরি হয় তা থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছিলো খেলাফত আন্দোলনের অগ্রযাত্রা। সন্দেহ নেই, এই আন্দোলনের পথ ধরেই কওমী আলিম-সমাজ ইসলামী রাজনীতিতে ও বৃহত্তর জাতীয় উন্নয়নে সক্রিয় হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, জাতীয় উন্নয়নে কওমী আলিম-সমাজের সক্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে মূল নিয়ামক শক্তি ছিলো তাঁদের সুসংগঠিত সামাজিক শক্তি। (দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন)


জরুরী ঘোষণা: কেউ যদি ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত ‘গবেষণা প্রতিবেদন’ বিভাগের কোন প্রবন্ধের কোন অংশ বা লাইন উদ্ধৃত করতে চান বা কোন তথ্য ব্যবহার করতে চান তবে তাঁদের কাছে সবিশেষ অনুরোধ যে, তাঁরা অনুগ্রহপূর্ক প্রবন্ধ, লেখক এবং ইনসাফ-এর সূত্র ব্যবহার করবেন। অন্যথায় বিষয়টি বেআইনী বলে বিবেচিত হবে।

-বিভাগীয় সম্পাদক