কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (দ্বিতীয় পর্ব)

কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (দ্বিতীয় পর্ব)

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

বলছিলাম, কওমী-জগতের সামাজিক শক্তি হয়ে উঠার কথা। কিন্তু কেমন করে কওমী-জগৎ সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ বিস্ফোরণের মতো সবার অলক্ষে নীরবে-নিভৃতিতে নিজেদের দুর্দান্ত সামাজিক শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে গেলো সে সম্পর্কে কিছু তথ্য পাঠকদের জানা থাকা দরকার।

১. বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নে কওমী-জগতের অবদান:

আগেই বলে এসেছি, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী রাজনীতি ও আলিম-সমাজের তৎপরতার উপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো। এ সময় কওমী আলিম-সমাজকে বড়জোর মাদরাসার দরসকেন্দ্রিক তৎপরতাতেই মাশগুল থাকতে হয়েছে। সরকারিভাবে এবং দলীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে তাঁদের দেখা হতো স্বাধীনতা-বিরোধী এবং প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী হিসাবে। সমাজে যেনো তাঁরা অনুগ্রহের পাত্র।
অনেকটা নিজের দেশে উদ্বাস্তুর মতো। জাতীয় কোন কাজে তাঁদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের সুযোগ ছিলো না। সেই বিভীষিকাময় যুগের কথা স্মরণ করে বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক A.L.Khatib তাঁর অনূদিত গ্রন্থ ‘কারা মুজিবের হত্যাকারী?’ ( Who killed Mujib?)-র ৩৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-“… দেশ স্বাধীন হবার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রতিদিন প্রচলিত ‘ইনশাল্লাহ’ এবং ‘আসসালামু আলাইকুম’ শব্দ দুটি শুনলেও রাগে ফেটে পড়তো”(প্রথম প্রকাশ:১৯৯২, শিখা প্রকাশনী, ঢাকা)।

যদিও লেখক এ ধরনের মনোভাবকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ইসলামের নামে শোষণ-নির্যাতনের প্রতিক্রিয়া বলেছেন তবুও এটা স্বীকার্য যে, ঐ সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে ও দলীয়ভাবে দেশে ইসলামবৈরী মনোভাব বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৭২ সালে ধর্মনিরপেক্ষতার কারণে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বিলুপ্ত করা হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামবৈরী পরিবেশের বার্তা পৌঁছে যায়। এমনসব কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে নব্যস্বাধীন বাংলাদেশের পরিচিতি হয়ে উঠলো একটি হিন্দু-বান্ধবরাষ্ট্র হিসাবে যা কোনভাবেই এ দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মঙ্গলজনক ছিলো না। তাই সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ‘৭৫ পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নি। ১৯৭৫ সালে সরকার পরিবর্তনের পর মেজর জিয়াউর রহমান বীরোত্তম দেশের নেতৃত্বে আসীন হলে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। শুরু হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের এক নবযাত্রা। এ সময় প্রেসিডেন্ট জিয়ার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় দু’টো বিষয়: এক. দেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন এবং দুই. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রসার। এ দু’টোর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেন্জ ছিলো বহির্বিশ্বে বিশেষত আরব ও মুসলিমবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নতকরণ। কারণ, বাংলাদেশ তখন সম্পূর্ণরূপে বিদেশী সাহায্যনির্ভর একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ। আভ্যন্তরীণ উন্নয়ন-অবকাঠামো( infrastructure) নির্মাণে বিদেশী সাহায্যের কোন বিকল্প ছিলো না। ফলে, সবচেয়ে বেশি সাহায্যকারী দেশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ‘৭২-‘৭৫-এর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন করাটা ছিলো বড় রকমের জটিল একটি কাজ। প্রেসিডেন্ট জিয়াকে সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। ঠিক এখানটায় তৎকালীন দারিদ্র্যজর্জরিত কওমী আলিম-সমাজ সবার অজান্তে-অলক্ষে বিস্ময়করভাবে আরবদেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে যে ভূমিকা রাখেন তা ইতিহাস কখনোই ভুলবে না। কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব হলো? আসুন তা হলে সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।

সত্তরের দশকের শেষের কথা, যখন দেশের সার্বিকবিষয়ে আমূল পরিবর্তন আসলো, কওমী আলিম-সমাজ মাদরাসাগুলোর পরিকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়কে গুরুত্বের সাথে নিলেন। তাঁদের চিন্তা-চেতনায় বাংলাদেশের দরিদ্র অর্থনীতির প্রভাবহেতু সীমাবদ্ধতার চিত্র আগে থেকেই আঁকা ছিলো। তাই তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের আরবদেশগুলোর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। সে সময় আরবদেশগুলোতে তেল-সম্পদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উর্দ্ধগতি বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশব্যাপী অনুন্নত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য এবং মাদরাসা-মসজিদের অনুদান সংগ্রহের নিমিত্ত কওমী-আলিমসমাজ দেশীয় ধনাঢ্য ও ধর্মপ্রিয় ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় এবং প্রবাসরত শুভাকাঙ্খীদের অনুরোধে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সফর করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই মোতাবেক ১৯৭৮ সালে সর্বপ্রথম(সংগৃহিত তথ্যানুসারে) বাংলাদেশের সুপরিচিত কওমী মাদরাসা চট্টগ্রামের জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার তৎকালীন পরিচালক সর্বজন শ্রদ্ধেয় বুজুর্গ-ব্যক্তিত্ব শাহ মুহাম্মাদ ইউনুস সাহেব রহ. ( যিনি আলিম-সমাজে হাজী সাহেব হুজুর নামে পরিচিত ছিলেন) আরব আমিরাত সফরে যান। এরপর চট্টগ্রামের জিরি মাদরাসার মুফতী নুরুল হক সাহেব রহ. সৌদি আরব ও দুবাই সফর করেন(১৯৭৮)। এরপর নিকটবর্তী কোন সময়ে( আনুমানিক ১৯৭৯-১৯৮০) দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর মাওলানা কাসেম সাহেব ফতেহপুরী রহ. আরব আমিরাত সফর করেন। আনুমানিক ১৯৮০-১৯৮১ সালের মধ্যে চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ফটিকছড়ির জামিয়া আরবিয়া নছিরুল ইসলাম(নাজিরহাট মাদরাসা)-এর পরিচালক আল্লামা হাফিয শামছুদ্দীন সাহেব রহ. সৌদি আরব সফর করেন। এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে, কওমী আলিম-সমাজ যখন মধ্যপ্রাচ্যে যান তাঁরা সেখানকার ধনাঢ্যব্যক্তিবর্গ বা সংস্থা থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে পূর্ব থেকে সৃষ্ট নেতিবাচক ধারণানির্ভর প্রশ্নের সম্মুখীন হন। এখানকার কওমী-আলিমসমাজ সেখানে বাংলাদেশ সম্পর্কে সকল-প্রকার নেতিবাচক ধারণার বিপরীতে ইতিবাচক ধারণা প্রদান করেন এবং আরব-জনগণকে একথাটি বোঝাতে সক্ষম হন যে, বাংলাদেশ মোটেও হিন্দু-বান্ধব রাষ্ট্র নয়। এখানে হাজার হাজার মাদরাসা, মসজিদ, মক্তব আছে। এখানে সাহায্যের প্রয়োজন আছে। এখানকার নব্বই শতাংশ মুসলমান। আরব-ভাইদের প্রতি এদেশের মুসলমানের আন্তরিক ভালোবাসা আছে। এখানে ধনী মুসলিমরাষ্ট্রগুলোর সাহায্যের প্রয়োজন আছে; এখানে মানুষ কষ্টে দিনাতিপাত করছে; এখানে দরিদ্র-মানুষের আধিক্য আছে; এখানে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে গভীর নলকূপ বসানোর প্রয়োজন আছে; এখানকার সরকারকে অর্থনৈতিক সাহায্য দেয়া উচিৎ ইত্যাদি। প্রসঙ্গত বলতে হয়, সে সময়কার পরিস্থিতিতে আরব-সমাজে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেয়ার বিষয়টা ছিলো যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। এমন কি এখানকার বাস্তবতা প্রমাণে কওমী আলিম-সমাজ আরব-সাহায্যদাতা ব্যক্তিবর্গকে বাংলাদেশ সফর করারও আমন্ত্রণ জানান। পরে দেখা যায়, কওমী-আলিমসমাজের প্রাণান্তকর চেষ্টায় আরব-সমাজের তৃণমূলে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বিদূরিত হয়। এভাবে সময়ের ব্যবধানে তৃণমূলের উক্ত পরিবর্তন আরব-সমাজের উচ্চস্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এমন কি কওমী আলিম-ব্যক্তিত্ববৃন্দের সাথে আরব-প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ে সাক্ষাতের কারণে প্রশাসনেও বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণার উদয় হয়। এরই ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে পবিত্র মক্কা ও মদীনার সম্মানিত ইমামগণ চট্টগ্রামের জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী এবং ফটিকছড়ির জামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর পরিদর্শনে বাংলাদেশ সফর(‘৯০-এর দশক) করেন যা সরকারের পক্ষেও আয়োজন করা সম্ভব হয় নি। ফলে, একদিকে যেমন দেশের দরিদ্র এলাকায় মানবিক সাহায্য আসতে শুরু করে পাশাপাশি কওমী আলিম-সমাজের এই ভিত্তিগত দা’ওয়াতের সুফল চলে যায় বাংলাদেশ সরকারের হাতে( ‘৭৬-‘৮১)। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংযোগ ও পাশাপাশি কওমী আলিম-সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের সংযোগ–এ দু’য়ের সংমিশ্রণে মধ্যপ্রাচ্যের আরব-দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়। বাংলাদেশে আসতে শুরু করে বৈদেশিক সাহায্যের একটি বিশাল অংশ যা এখানকার পরিকাঠামো নির্মাণে অসামান্য অবদান রাখে। এর সাথে শুরু হলো মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমশক্তি রফতানীর ধারা। বলতে দ্বিধা নেই, এখনো কওমী আলিমসামজের যে অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষত বিভিন্ন মসজিদে ইমাম-মুয়াজ্জিন হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তাঁরা সার্বক্ষণিকভাবে আরব-সমাজে দেশ ও জাতি সম্পর্কে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট। আমরা অনেকেই জানি না, তাঁদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অসংখ্য শ্রমিক বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে ঢুকতে সক্ষম হয়েছেন।

আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্মলগ্নে কওমী-সন্তানদের এই অসামান্য অবদান ইতিহাস একদিন সঠিকভাবেই বিচার করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, ইতিহাসের এই অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে এ জাতি মূল্যায়ন করতে কেবল ব্যর্থই থেকে যায় নি উপরন্তু জাতীয় উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির সংগ্রামে অভিভক্ত জাতিসত্ত্বার স্বাদ ভোগ করতেও অক্ষম থেকে গেছে। (তৃতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক করুন)


জরুরী ঘোষণা: কেউ যদি ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত ‘গবেষণা প্রতিবেদন’ বিভাগের কোন প্রবন্ধের কোন অংশ বা লাইন উদ্ধৃত করতে চান বা কোন তথ্য ব্যবহার করতে চান তবে তাঁদের কাছে সবিশেষ অনুরোধ যে, তাঁরা অনুগ্রহপূর্ক প্রবন্ধ, লেখক এবং ইনসাফ-এর সূত্র ব্যবহার করবেন। অন্যথায় বিষয়টি বেআইনী বলে বিবেচিত হবে।

-বিভাগীয় সম্পাদক