কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (তৃতীয় পর্ব)

কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (তৃতীয় পর্ব)

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

২. দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কওমী-জগৎ:


দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন(Socio-economical development ) উন্নয়নে কওমী-জগতের অবদান এক-কথায় বিস্ময়কর। বিষয়টি প্রথমে বুঝে নেয়া দরকার। প্রাথমিকভাবে এর ব্যাখ্যা হলো: Socio-economic development is the process of social and economic development in a society. অর্থাৎ,সমাজে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া। এটাকে আরো ব্যাখ্যা করে বলা যায়: সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন হল একটি প্রক্রিয়া যা একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদাগুলো চিহ্নিত করতে চায় এবং দীর্ঘমেয়াদে সম্প্রদায়ের সর্বোৎকৃষ্ট স্বার্থে এমনসব কৌশল তৈরি করতে চেষ্টা করা হয় যা তাদের চাহিদাগুলো পূরণ করবে। মোদ্দাকথা হলো, মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। এবার আসুন এই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কওমী-জগৎ কী অবদান রাখলো সেটা খতিয়ে দেখি। এখানে আমরা মৌলিকভাবে ৬ টি বিষয় বিবেচনায় নিচ্ছি:
(ক) শিক্ষা।
(খ) কর্মসংস্থান।
(গ) সামাজিক স্থিতিশীলতা।
(ঘ) মানবসম্পদ উন্নয়ন।
(ঙ) মানবিক সাহায্য প্রদান।
(চ) সমাজ-সংস্কার।

আসুন, এবার আলোচনা করা যাক:
(ক) শিক্ষা: শিক্ষার ক্ষেত্রে কওমী-মাদরাসার অবদান অনস্বীকার্য হলেও একশ্রেণীর স্বার্থান্ধমহল ও প্রচারমাধ্যম শিক্ষায় কওমী-জগতের অবদানকে ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করে রাখতে চায়। এখানে প্রথমে বুঝতে হবে, কওমী-শিক্ষাব্যবস্থা মূলত কুরআন-সুন্নাহনির্ভর হলেও সমাজের তৃণমূলে রয়েছে এর গভীর-শেকড়। শহুরে এলিট-শ্রেণী এ বিষয় সম্পর্কে নিতান্ত অজ্ঞ বা অজ্ঞতার ভারে ভারাক্রান্ত। স্মর্তব্য, কওমী-শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক-কাঠামো কিন্তু শুরু হয় মসজিদভিত্তিক মক্তব দিয়ে, বিশাল কোন মাদরাসা-ভবন দিয়ে নয়। মক্তবের শিক্ষার প্রধান দুই উপাদান হলো: সমাজের তৃণমূল থেকে উঠে আসা শিক্ষক এবং সমাজের তৃণমূল থেকে উঠে আসা ছাত্রছাত্রী। এই দুই উপাদানের নিচে আর কোন স্তর নেই। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো মক্তবভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায় যা অন্য কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাওয়া অসম্ভব। সেটা হলো, মক্তবের শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীর মানসিক ভারসাম্য এতোই নিখুঁত যে, সেখানে উভয়পক্ষ আপন-আপন সামর্থ্য ও প্রাপ্তি সম্পর্কে পূর্ণজ্ঞাত। সঙ্গতকারণে, মক্তবের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার সরলতা, সহজবোধ্যতা, শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যকার উদারনৈতিক ও সংশোধনমূলক সম্পর্ক এবং সুভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিজ্ঞা মক্তবভিত্তিক শিক্ষাকে সমাজের গভীরে প্রোথিত বলে আখ্যায়িত করতে বাধ্য করে। তা’ছাড়া, মক্তবভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় গ্রন্থগত শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক আদব-কায়দা, নেতিবাচক কর্ম সম্পর্কে প্রাত্যহিক সতর্কবাণী ইত্যাদি শিশু-ছাত্রছাত্রীদের মননে এমন গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে যা বয়োবৃদ্ধ হলেও মানুষ স্মরণ করে। অর্থনৈতিক দিকের কথা উঠলে বলতে হয়, মক্তবের শিক্ষকদের জাগতিক পাওনা গ্রামবাসীর উৎপাদিত বা অর্জিত শস্য, ধান, চাউল অথবা অর্থ সাহায্যে মিটানো হয়। মক্তবের শিক্ষক গ্রামের বাসিন্দাদের অন্যতম সদস্য হওয়ার কারণে অর্থনৈতিক লেনদেনে সমস্যা দেখা দেয় না।

বিষয়গুলো মক্তবভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার শেকড় যে সমাজের কতো গভীরে তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে। মূলত মক্তবভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার ধারা ইতিহাসের প্রাচীন অধ্যায়( সুলতানী আমল) থেকে শুরু হলেও ১৮৬৬/৬৭ সালে উত্তর-ভারতে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পর মক্তবভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। দারুল উলূম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালকগণ মক্তবের দেখভালের ভার গ্রামবাসীর উপর অর্পণ করেন। ফলে, সমাজের তৃণমূল-পর্যায়ের মানুষ নিজেদের পরিচর্যায় একটি শিক্ষাব্যবস্থা পেয়ে সেটার সাথে নিজেদের আত্মার সম্পর্ক খুঁজে পান।

এখানেই কওমী-জগতের সামাজিকশক্তির শেকড় নিহিত। কওমী-জগতের মূলরস এখান থেকেই আহরিত হয়। তাই, দেখা যায় কওমী-মাদরাসাগুলোতে সমাজের এলিটশ্রেণীর পরিবর্তে তৃণমূলের মাটির মানুষের সন্তানেরা অধিকহারে লেখাপড়া করে যারা মূলত মক্তবভিত্তিক শিক্ষার মৌলিক উৎপাদন। বড়ো হয়েও তাদের আত্মার সাথে মিশে থাকে কওমী-শিক্ষালয়ের অবিচ্ছিন্ন ভালোবাসা। শিক্ষা এবং আত্মার সমন্বয়ে এমন ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোন শিক্ষায় পাওয়া যায় না। এভাবেই কওমী-জগৎ তাদের মৌলিক সামাজিক শক্তির সঞ্চয় ও ক্রমবিকাশ ঘটায়। আজ যারা কওমী-মাদরাসাভিত্তিক শিক্ষার উৎপাটন চায় আসলে তারা জানেনই না কওমী-জগতের মূল এদেশের মাটি আর মানুষের গভীর নিগড়ে আবদ্ধ, পাশ্চাত্য থেকে ধার করা কোন সংস্কৃতিতে নয়। এ দেশের মাটি আর মানুষের সাথে মিশে থাকা মক্তবভিত্তিক এ শিক্ষাব্যবস্থার সামাজিক শক্তি সম্পর্কে যেখানে খোদ আমরাই অসচেতন সেখানে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আঁচ করতে পারে মক্তবভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার শক্তি সম্পর্কে। তাই তারা পরিকল্পনা করে মক্তবকে অকার্যকর করতে চালু করে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা। কারণ, খুব সকালে শুরু হওয়া মক্তবে প্রতিদিনকার অপরিহার্য অংশ কুরআন-পাঠের শিক্ষা। প্রথমাবস্থায় সরকারও পাশ্চাত্যবাদী শক্তির ইশারায় কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাকে প্রচুর পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। এতে প্রাথমিকভাবে মক্তবের চিরাচরিত প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটেছে বটে কিন্তু কওমী-মাদরাসাকেন্দ্রিক মক্তব বা নাজেরা শিক্ষাব্যবস্থার কারণে পাশ্চাত্যবাদী শক্তির উদ্দেশ্য পূরণ হয় নি। পরবর্তীতে ‘৮০-র দশকের শুরুতে এক কওমী-সন্তান কারী বেলায়েত হুসাইন রহ. কর্তৃক উদ্ভাবিত ‘নুরানী শিক্ষা পদ্ধতি’র বিস্ময়কর প্রসারে পাশ্চাত্যবাদী শক্তির মক্তববিরোধী সকল অপচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায়।

(খ) কর্মসংস্থান: আমরা যখন প্রাইমারি ছেড়ে হাইস্কুলে উঠি তখন বাংলা-রচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি রচনা ছিলো– বেকার সমস্যা। বেকারত্বের অভিশাপ কাকে বলে এবং তা কতো প্রকার ও কি কি সেটা কেবল ভুক্তভোগীই অনুধাবন করতে সক্ষম। আমাদের দেশে প্রচলিত সাধারণশিক্ষাকে সরকারীভাবে ‘মূলধারা’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। এই তথাকথিত মূলধারার পেছনে ফী-বছর ঢালা হচ্ছে রাষ্ট্রের হাজার-কোটি টাকা। কিন্তু এত্তোসবে প্রসব করছে টা কি? কেউ কি সে খবর রেখেছি? সেই স্বাধীনতার পর থেকে বলা হচ্ছে বেকারত্ব দূর করতে হবে, ওটা দূর না হলে দেশ অচল হবে। কৈ, বেকারত্ব তো গেলোই না বরং উল্টো বেড়েই চললো খরগোশ-গতিতে। স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছর পরে এসেও বেকারত্বের অভিশাপ দিনদিন বেড়েছে। এ-রি মধ্যে কতো মায়ের সন্তান যে বেকারত্বের বোঝা সইতে না পেরে গলায় ফাঁস লাগিয়েছে সে হিসাব কে দেবে? জনগণের টাকায় গড়া এতোগুলো সরকার গদিতে বসলো তাতে কর্মসংস্থান হলো না, বাড়লো বেকার মানুষের কাতার। আসুন তবে একটা পরিসংখ্যান দেখি–” যুব মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে দেশে বর্তমানে(২০১১) ১৮ থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত যুব পুরুষ ও মহিলার সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। আগামীবছর(২০১২)-এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় পাঁচ কোটিতে। ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে এদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি। তার মধ্যে শিক্ষিত বেকার হচ্ছে ২ কোটি ২০ লাখ। অপরদিকে দেশে পরিবারের সংখ্যা সোয়া পাঁচ কোটি। প্রত্যেক পরিবার থেকে একজনকে চাকরি দিতে হলে সোয়া পাঁচ কোটি লোককে চাকরি দিতে হয়, যেটা বাংলাদেশের বাস্তবতায় খুবই কঠিন।

দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। স্বল্প শিক্ষিতের পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষিত কর্মহীনের সংখ্যাও বাড়ছে। সেই সঙ্গে ছোট হয়ে আসছে কর্মসংস্থানের পরিধি। ইঞ্জিনিয়ারিং ও এমবিবিএস এর মতো সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে অনেক উচ্চ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী ঘুরছেন বেকারত্ব নিয়ে। দেশে স্বল্প শিক্ষিত ও মধ্যম শিক্ষিতের কর্মসংস্থানে যে সংকট, প্রায় তার অনুরূপ সংকট উচ্চ শিক্ষিতের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও”(ক্লিক)। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে কর্মক্ষম ২৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বেকার। এর মধ্যে পুরুষ ১৪ লাখ, নারী ১২ লাখ ৩০ হাজার। যা মোট শ্রমশক্তির সাড়ে ৪ শতাংশ। তিন বছর আগে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৯০ হাজার। এক দশক আগে ছিল ২০ লাখ (ক্লিক)। এ তো গেলো তথাকথিত মূলধারার শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের চিত্র। (চতুর্থ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন)


জরুরী ঘোষণা: কেউ যদি ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত ‘গবেষণা প্রতিবেদন’ বিভাগের কোন প্রবন্ধের কোন অংশ বা লাইন উদ্ধৃত করতে চান বা কোন তথ্য ব্যবহার করতে চান তবে তাঁদের কাছে সবিশেষ অনুরোধ যে, তাঁরা অনুগ্রহপূর্ক প্রবন্ধ, লেখক এবং ইনসাফ-এর সূত্র ব্যবহার করবেন। অন্যথায় বিষয়টি বেআইনী বলে বিবেচিত হবে।

-বিভাগীয় সম্পাদক