কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (পঞ্চম পর্ব)

কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (পঞ্চম পর্ব)

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

(ঘ) মানবসম্পদ উন্নয়ন: Human resource development বা মানবসম্পদ উন্নয়নে কওমী-জগতের রয়েছে অসামান্য অবদান। এখানে বুঝতে হবে মানবসম্পদ উন্নয়ন বলতে আসলে কী বোঝায়। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত UNDP(United Nations Development Programme)-এর এক রিপোর্টে বলা হচ্ছে: “মানবসন্তান সুনির্দিষ্ট কিছু সুপ্ত ক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। উন্নয়নের উদ্দেশ্য হল এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে সকলেই তাদের যোগ্যতার প্রসার ঘটাতে পারে। প্রত্যেক মানুষেরই যে জীবনের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধায় জন্মগত অধিকার আছে সার্বজনীন স্বীকৃতিই হল মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ভিত্তি”( HDR report, P-14, সৌ: লোকপ্রশাসন সাময়িকী, মার্চ ১৯৯৭, অষ্টম সংখ্যা, পৃ: ১২১, বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ঢাকা)। উক্ত সাময়িকীর বর্ণিত পৃষ্ঠায় আরো বলা হচ্ছে: “একটি সমাজের সকল মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়ানোর প্রক্রিয়াই মানবসম্পদ উন্নয়ন”( M.M Verma, P-14, HDR)। সুতরাং মানবসম্পদ উন্নয়ন বলতে আমরা বুঝবো দেশের সার্বিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জনের প্রক্রিয়া। এদিক থেকে আমরা এবার কওমী-মাদরাসার ভূমিকা পর্যালোচনা করতে পারি।

উল্লেখ্য, সারাদেশে কওমী-মাদরাসার সংখ্যা সরকারী হিসাবমতে প্রায় ১৪ হাজার বলা হলেও কওমী আলিম-সমাজের পর্যালোচনায় এই সংখ্যা যথার্থ নয়। তাঁরা বলছেন, এটা ২৫ হাজারের মতো হবে। কারণ, দেশের সর্ববৃহৎ কওমী-বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরবিয়া বলছে কেবল তাদের অধীনেই আছে ২০ হাজার মাদরাসা। এ’ছাড়া অন্যান্য বোর্ড তো রয়েছেই। সুতরাং বলা যায় দেশের সর্বমোট কওমী-মাদরাসার সংখ্যা ২৫ হাজারের কাছাকাছি। আমরা এখানে ধরে নিলাম ২২ হাজার। এখন মাদরাসাভিত্তিক ছাত্রসংখ্যার যেহেতু কোন পৃথক পরিসংখ্যান নেই তাই ধরে নিলাম বড়, মাঝারি ও ছোট মিলিয়ে গড়ে প্রতিটি মাদরাসার ছাত্র-ছাত্রী বয়সভেদসহ ৫ শত। এটা কমবেশি হতে পারে। তবুও এই হিসাবে বলা যায় দেশের কওমী ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১ কোটি ১০ লক্ষ। এই ১ কোটি ১০ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে নতুন সম্মিলিত কওমী বোর্ড হাইয়াতুল উলয়ার এবারের পরীক্ষার্থীদের পরিসংখ্যনকে বিবেচনায় নিয়ে ধরে নিচ্ছি এই বিশাল-সংখ্যক কওমী ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে ছাত্রীদের হার ১৫ শতাংশ এবং ছাত্রদের হার ৮৫ শতাংশ। এবার আমরা মানবসম্পদ উন্নয়নে কওমী অবদানে ফিরে আসি। এই বিশাল-সংখ্যক অর্থাৎ ১ কোটি ১০ লক্ষ কওমী ছাত্র-ছাত্রী উঠে আসে এই বহমান সমাজ থেকে যেখানে তৃণমূলের অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশের বেশি। নিঃসন্দেহে এই বিশাল-সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী দেশের একটি সুসংগঠিত মানবসম্পদ। এরা শিক্ষা গ্রহণের শুরু থেকে সমাপনী পর্যন্ত পূর্ণ ১৬-১৮ বছর সময়কাল কওমী-মাদরাসার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকে। উক্ত মেয়াদকালীন সময়ে ১ কোটি ১০ লক্ষের বিশাল মানবসম্পদটা গড়ে উঠে অধিকাংশ ধর্মীয় শিক্ষা, প্রয়োজনীয় সাধারণ শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে।

এখন প্রশ্ন করা যেতে পারে: এই বিশাল মানবসম্পদ নিয়ে কওমী-জগৎ কেমন করে মানবসম্পদ উন্নয়নের শর্তাদি পূরণ করছে? আসুন তাহলে সেই উত্তর খোঁজা যাক। মাসবসম্পদ উন্নয়নের অনেক তথ্যই ঘেটে দেখলাম। সবখানেই মানবসম্পদ উন্নয়নের মূলশর্ত বলা হয়েছে শিক্ষা। অর্থাৎ শিক্ষা এবং শিক্ষার উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কারণ জাতি শিক্ষিত না হলে জাতির সদস্যদের উন্নয়ন অসম্ভব। যদিও এখানকার পরিবেশ অনুযায়ী মানবসম্পদ উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসাবে শিক্ষার পরে স্বাস্থ্য, পুষ্টি সরবরাহ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ইত্যাদিকে যুক্ত করা হয়েছে তবে আমরা মূলত শিক্ষা নিয়েই আলোচনা করবো। বাকিগুলো কওমী-জগতের আওতাধীন নয় বলে এখানে বাহুল্য বিবেচনায় বাদ দেয়া হলো। উল্লেখ্য, কওমী-মাদরাসাগুলো মূলত কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। আগেই বলে এসেছি, এখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সাধারণ-শিক্ষা যেমন: বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস ইত্যাদিও শিক্ষা দেয়া হয়। তবে একটি কথা বলে নেয়া প্রয়োজন যে, কওমী-মাদরাসায় কুরআন-সুন্নাহনির্ভর আরবী শিক্ষায় যুক্তিবিদ্যা, প্রাচীন দর্শনশাস্ত্র ও ঐতিহাসিক ভূবিদ্যা সম্পর্কেও জ্ঞান দান করা হয়। উদাহরণ হিসাবে একটি মেডিক্যাল কলেজে যেমন সিংহভাগ শিক্ষা চিকিৎসানির্ভর তাই সেখানে ইংরেজি ভাষ্যের চিকিৎসা-শিক্ষার বিকল্প নেই। তদ্রূপ কওমী-মাদরাসার মতো কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষালয়ে সিংহভাগ আরবী পদ্ধতির শিক্ষারও বিকল্প নেই। সঙ্গতকারণে, সেখানে অন্য জাগতিক শিক্ষার প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক ও অবান্তর। যাই হোক, কওমী-মাদরাসায় প্রদত্ত শিক্ষা মূলত স্রষ্টা এবং সৃষ্টির পারস্পরিক সম্পর্ক, স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির করণীয় ইত্যাদি বিবেচনায় ধর্মীয়-নৈতিক উচ্চ-চরিত্রের মানুষ তৈরির সর্বোত্তম মাধ্যম। বিশ্বে বর্তমানে ইসলামী, ধর্মনিরপেক্ষ ও নিরেট বস্তুবাদী বা নাস্তিকতাবাদী এই তিনশ্রেণীর শিক্ষা-পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। কোন শিক্ষা-পদ্ধতি কেমন, কেমন সেটার পরিণতি সেই ফলাফল আশা করি আর বলার প্রয়োজন নেই। কারণ ফলই বৃক্ষের পরিচয়।

ধর্মনিরেপক্ষ(Secular) শিক্ষা-পদ্ধতির কথা এখানে কিছু বলতে হয়। ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা যেমন ধর্ম ও জাগতিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে পৃথকীকরণের কথা বলে তেমনি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থাও প্রকারান্তরে ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় সার্বজনীন শিক্ষার মধ্যে পার্থক্যকে গ্রহণ করে। তবে কৌশলগত কারণে এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আংশিক ধর্মীয় শিক্ষা রাখা হলেও ধীরেধীরে ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্বহীন করে তোলা হয়। যেহেতু এদেশের নব্বই ভাগ মানুষ বিশ্বাসগতভাবে মুসলমান তাই তাঁদের ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে রাষ্ট্রীয় শিক্ষায় ইসলামী শিক্ষার প্রভাবকে গুরুত্ব দেয়ার বাধ্যবাধকতার কথা বলেন এদেশের আলিম-সমাজ ও সচেতন শিক্ষাবিদগণ। কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দূর্ভাগ্যজনকভাবে সেক্যুলার শিক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় শিক্ষায় ইসলামী শিক্ষাকে কেবল উপেক্ষাই করা হয় নি বরঞ্চ কট্টর বামপন্থী শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের তত্ত্বাবধানে এবং বামপন্থী ও উগ্রসেক্যুলার বুদ্ধিজীবিদের যোগসাজশে সেক্যুলার ও প্রগতিশীল শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের নামে হিন্দুয়ানী, ক্ষেত্রবিশেষে নাস্তিক্যবাদী পাঠ সংযুক্ত করে দেশব্যাপী বিতর্কের জন্ম দেয়া হয়। ফলে, ছাত্রসমাজে নৈতিকতার চরম ধস আসে যা এখনকার পত্র-পত্রিকার পাতা উল্টালে বোঝা যায়। এই নৈতিক অবক্ষয়ের স্রোতে বিপর্যস্ত অভিভাবকেরা এখন তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত হতে সচেতন হয়ে উঠেছেন। দেখা যাচ্ছে, দেশের সাধারণ শিক্ষিতশ্রেণী নিজেদের সন্তান রক্ষায় কওমী-মাদরাসায় শিক্ষা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইতোমধ্যে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজেদের সন্তানকে কওমী-মাদরাসায় দেয়ার কথা জানিয়েছেন। এখানে আরও একটি বিষয় বিচার্য। সেটি হলো, বর্তমানে যে প্রজন্ম সাধারণ শিক্ষায় অর্থাৎ তথাকথিত মূলধারায় শিক্ষিত হচ্ছে তাদের মধ্যে নৈতিকতা, স্বদেশপ্রেম, দায়িত্ব-সচেতনতা ও ধর্মীয় অনুভুতির লক্ষণীয় অভাবের কারণে জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের যে মাপকাঠি ধরা হয় তা ভেস্তে যেতে বসেছে। এ অবস্থায় লাগাম টেনে ধরা না গেলে পরিণতি যে কতো ভয়াবহ ধারণ করবে তা বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। এ অবস্থায় জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নে আদর্শ, শিক্ষিত ও নৈতিকশক্তিসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তুলতে কওমী-মাদরাসার গুরুত্ব উদীয়মান সূর্যের মতো প্রতিভাত হচ্ছে। তাই সরকার বাস্তবতা অনু্ধাবন করে কওমী-মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদকে এম.এ সমমান ঘোষণা করেছেন দেওবন্দের মূলনীতি অনুসারে।

বলছিলাম, মানবসম্পদ উন্নয়নের শর্ত পূরণে শিক্ষিত, দক্ষ ও দেশপ্রেমী নাগরিক তৈরিতে কওমী-মাদরাসার ভূমিকা নিয়ে। বলতে দ্বিধা নেই, কওমী-সন্তানেরা ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক অনুশীলন ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রতি তীব্র বাধ্যাধকতা নিয়ে গড়ে ওঠে। তাই দেখা যায় মাদরাসা-শিক্ষা শেষ করে তাঁরা অধিকাংশ দেশের ভেতরে ধর্মীয় শিক্ষাবিস্তারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন এবং সর্বোপরি এদেশের দরিদ্র ও অসামর্থ্য জনগোষ্ঠীকে শিক্ষাদীক্ষার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে সন্নিবেশিত করেন। এটা প্রকৃত বাস্তবতাদৃষ্টে বিশাল এক জাতীয় অবদান। আর যাঁরা অর্থনৈতিক কারণে বিদেশে যাচ্ছেন তাঁরা একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিপূল রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন তেমনি বিদেশে এদেশের জনশক্তি রফতানীতে অবদান রেখে চলেছেন। অনেক কওমী-সন্তান এমন আছেন যাঁরা শিক্ষকতার পাশাপাশি স্বল্প-বিনিয়োগে ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। অথচ তাঁরা কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পান না। তবুও নিজেদের সামান্য সম্বল বিক্রি করে বা ঘনিষ্ঠজন থেকে ঋণে ছোটখাট ব্যবসা করছেন ব্যক্তিগতভাবে বা সমিতির মাধ্যমে। এতে যে জাতীয় অর্থনীতি লাভবান হচ্ছে না তা কি কেউ বলতে পারেন? আশা করি কওমী-জগৎ যে মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার মাধ্যমে এবং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গড়ার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন তা বুঝতে কারো অসুবিধা থাকার কথা নয়।


জরুরী ঘোষণা: কেউ যদি ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত ‘গবেষণা প্রতিবেদন’ বিভাগের কোন প্রবন্ধের কোন অংশ বা লাইন উদ্ধৃত করতে চান বা কোন তথ্য ব্যবহার করতে চান তবে তাঁদের কাছে সবিশেষ অনুরোধ যে, তাঁরা অনুগ্রহপূর্ক প্রবন্ধ, লেখক এবং ইনসাফ-এর সূত্র ব্যবহার করবেন। অন্যথায় বিষয়টি বেআইনী বলে বিবেচিত হবে।

-বিভাগীয় সম্পাদক