কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (ষষ্ঠ পর্ব)

কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান (ষষ্ঠ পর্ব)

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

(ঙ) মানবিক সাহায্য প্রদান: দেশের সহায়হীন একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে মানবিক সাহায্য প্রদান করে যাচ্ছে কওমী-জগৎ। সহায়হীন অংশটি হচ্ছে–এতীম-শিশু। উল্লেখ্য,এতীম শিশু(Orphan)সম্পর্কে বাংলাদেশে চলছে ঔপনিবেশিক শক্তি বৃটিশদের রেখে যাওয়া সংজ্ঞা। বৃটিশ-আইন THE ORPHANAGES AND WIDOWS’ HOMES ACT, 1944 (BENGAL ACT NO. III) অনুসারে এতীমদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হচ্ছে: “orphan” means a boy or girl under eighteen years of age who has lost his or her father or has been abandoned by his or her parents or guardians(ক্লিক). অর্থাৎ, ‘এতীম’ অর্থে সেই ছেলে বা মেয়েকে বোঝাবে যাদের বয়স ১৮ এর নিচে যারা বাবাকে হারিয়েছে অথবা অভিভাবক কর্তৃক পরিত্যক্ত।

এবার দেখা যাক ইসলামী পরিভাষায় এতীম ( মূল: ‘ইয়াতীম’ এর বঙ্গীয় উচ্চারণ) কাকে বলে? অভিধানে বলা হচ্ছে:
اليتيم: من فقد والده قبل بلوغه (وليس أباه)
العَجيّ: من فقد والدته قبل بلوغه (وليس أمّه)
اللطيم: من فقد والديه كليهما قبل بلوغه (وليس أبويه)
(ক্লিক)
[Orphan: who lost his/her father before reaching puberty (not his father)
Al-Ajji: Who lost his/her mother before reaching puberty (not his mother)
Al-Latim: Whoever lost both his/her parents before puberty ( not his/her parents)]

স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ইসলামী পরিভাষায় সহায়হীন শিশু সম্পর্কে তিনটি ভাগ করা হয়েছে। ১. ইয়াতীম (اليتيم) ২. আজী (العَجيّ) এবং ৩. লাতীম (اللطيم)। ‘ইয়াতীম’ বলা হয়েছে যে শিশু বালিগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তার বাবাকে হারিয়েছে অর্থাৎ, পিতৃহীন শিশু। ‘আজী’ বলা হয়েছে সেই শিশুকে যে বালিগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তার মাকে হারিয়েছে অর্থাৎ মাতৃহীন শিশু এবং ‘লাতীম’ সেই শিশুকে বলা হয়েছে যে বালিগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই তার মা-বাবা উভয়কে হারিয়েছে অর্থাৎ পিতৃমাতৃহীন শিশু।

এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। ইংরেজ কর্তৃক রেখে যাওয়া বর্তমানে বাংলাদেশে (এতীম সম্পর্কে) চলমান আইনের ভাষ্য ইসলামী ব্যাখ্যার প্রথমশর্তকে পূরণ করলেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় বাস্তবতা সম্পর্কে কোন ধারণা দেয় নি। ফলে, মাতৃহীন ও পিতৃমাতৃহীন: এই উভয়শ্রেণীর শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর বর্তায় কিনা তা নির্দ্ধারিত হয় নি। আমাদের ধারণা, যেহেতু সরকার আইনের বাইরে যেতে সক্ষম নয় তাই সরকারি শিশুসদনে ঐ দুই শ্রেণীর অসহায় শিশুর স্থান পাওয়ার কথা নয়। বলা দরকার, আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় উক্ত দুই শ্রেণীর শিশুর সার্বিক অবস্থা ব্যতিক্রম বাদে খুবই নাযুক। বিশেষ করে মাতৃহীন শিশু সৎমা বা অন্য কোন কারণে অবহেলার শিকার হয়ে পিতা কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়ে এক দুর্বিসহ অবস্থায় পতিত হয়। যেহেতু এদের আশ্রয় দেয়ার ও লালন-পালনের বিষয়ে আইনত সরকারের বাধ্যবাধকতা নেই তাই এরা ক্রমেই জাতির একটি সহায়-সম্বলহীন অংশে পরিণত হয়। এমন সংকটাপন্ন সন্ধিক্ষণে উক্ত দুই শ্রেণীসহ সকল অসহায়-শিশুর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় একমাত্র কওমী-মাদরাসা। এখানে আমরা আলোচনার স্বার্থে ঐ তিনশ্রেণীর শিশুকে বলবো–অসহায় বা সহায়হীন শিশু।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে ১১ থেকে ১৫ লক্ষ অনাথ শিশু আছে। দেশে কর্মরত এনজিওগুলোর হিসাব মতে, এ সংখ্যা ৫৫ লাখের মত ( সুপ্রভাত বাংলাদেশ, ২১ এপ্রিল, ২০১৬)। বলা বাহুল্য, দেশের প্রতিটি কওমী-মাদরাসা (ছোট, মাঝারি ও বড়) এতীমখানাযুক্ত। আগেই ধরে এসেছি, দেশের মোট কওমী-মাদরাসার সংখ্যা ২২ হাজারের মতো। বিভিন্ন মাদরাসার সংগৃহীত খবর অনুযায়ী ধরে নিলাম গড়ে প্রতিটি মাদরাসায় অসহায়-শিশুর সংখ্যা ৪০-৫০ জন। তাহলে আপাতত ৫০ জনকে ধর্তব্য মনে করে যদি হিসাব করা যায় তবে সর্বমোট দাঁড়ায় ১১ লক্ষ। বলা যায়, এনজিওগুলোর হিসাবমতে ৫৫ লাখ অসহায় শিশুর মধ্যে দেশের ২২ হাজার কওমী-মাদরাসা ১১ লাখ অসহায় শিশুর শিক্ষা ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করছে। বিশাল একটা ব্যাপার! কিন্তু কি করে এটা সম্ভব হচ্ছে? হ্যা, এটাই হচ্ছে কওমী-জগতের অন্যতম একটি নীরব সামাজিক ব্যবস্থাপনা যা সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ব্যতিরেকে উপলব্ধি করা যায় না। এটি নতুন কিছু নয়। ১৮৬৬/৬৭ সালে ভারতে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সমাজের অসহায় মুসলিম-শিশুদের দেখভালের যে দায়িত্ব কওমী-মাদরাসা কাঁধে তুলে নিয়েছে তা আজ সুশৃঙ্খল একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। কওমী-মাদরাসার সামাজিক চরিত্র সম্পর্কে যারা জানেন, বিলক্ষণ বু্ঝবেন কওমী-মাদরাসা তাদের নির্বাহ-খরচ তুলে আনে দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনসাধারণের কাছ থেকে। কারো কারো কাছে প্রক্রিয়াটি দুর্বোধ্য হলেও কওমী-মাদরাসার সাথে এদেশের মাটি ও মানুষের সুগভীর বন্ধনের প্রভাব বুঝতে পারলে বিষয়টি সহজবোধ্য হয়ে যায়। দেশের প্রত্যন্ত-অঞ্চলের কওমী-মাদরাসার বাৎসরিক মাহফিলগুলোতে উপস্থিত থাকতে পারলে দেখতে সক্ষম হবেন সম্পর্ক কতো গভীর হলে গাঁয়ের গৃহিণীরা ঘরের সামান্য চাল-ডাল থেকে মুঠোমুঠো মাদরাসার জন্য তুলে দেয়, অর্থ-সাহায্য দেয় এমন কি পরলৌকিক মুক্তির আশায় ও নেশায় গলার গয়না পর্যন্ত তুলে দেয়। এমন ছবির কিছু প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছে বলেই বলছি। এভাবে নগর পর্যায়েও কওমী-মাদরাসার জন্য হস্ত প্রসারিত করেন দেশের ধর্মপ্রাণ নাগরিকেরা। আমি কিছুদিন আগে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের একজন উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল ও নেত্রী বেগম সাজেদা চৌধুরীর একটি বক্তব্য শুনছিলাম। তাতে তিনি বলছিলেন: আমার ব্যক্তিগত মোট অনুদানের ৮০ শতাংশ যায় কওমী-মাদরাসায়। তাঁর এ বক্তব্য এবং সহজ স্বীকারোক্তি এদেশের সামাজিক সংস্কৃতির কতো গভীর-বন্ধনে কওমী-মাদরাসার আত্মীয়তা তা নির্দেশ করে। আমি অনুরোধ করবো, যারা এখনো কওমী-জগৎকে সঠিক অর্থে উপলব্ধি করতে অক্ষম থেকে গেছেন তারা অনুগ্রহ করে, ক’কদম গিয়ে একটি কওমী-মাদরাসার পরিবেশের সাথে ক’টা দিন কাটিয়ে আসুন। তাহলেই বোধগম্যতা আসবে ইনশা আল্লাহ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দেশের কওমী-মাদরাসাগুলো সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীকে যে মানবিক সাহায্য দিয়ে, তাদের শিক্ষা দিয়ে ও ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করে যে জাতীয় দায়িত্ব পালন করছে তা এদেশের গণমাধ্যম বলুন অথবা প্রচারমাধ্যম বা বুদ্ধিজীবিমহল সম্ভবত অজ্ঞতার কারণে কখনো উপস্থাপন করেন না। এটা খুব দূঃখজনক।

(চ) সমাজ-সংস্কার: সমাজ রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদান। সমাজ বাদে রাষ্ট্র হয় না। মূলত সমাজের উপর ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের গঠন। তাই একটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক চরিত্র মূলত সেই রাষ্ট্রের সমাজের চরিত্রের প্রতিফলন। তাই রাষ্ট্রের চরিত্রকে সঠিকপথে রাখতে সমাজের সংস্কার ও পরিমার্জন অপরিহার্য। কওমী-মাদরাসার সমাজ-সংস্কার মূলত ইসলামের নিখুঁত আকীদা-বিশ্বাস ও কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক অনুশীলনের সংস্কার হলেও ইসলামের চিরন্তন মানবতা ও সমাজের প্রতিটি অংশে ন্যায্য অধিকার প্রদানের তাগিদকে সামনে রেখে তারা সমাজকে স্থিতিশীল রাখতে যথেষ্ট অবদান রাখে। বিশেষ করে তাঁদের বার্ষিক মাহফিলগুলোতে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে যেসব উপদেশ প্রদান করা হয় সেগুলো দেশের সামষ্টিক পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখতে অভাবনীয় অবদান রাখে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কওমী-মাদরাসার প্রভাবাধীন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সূচক অত্যন্ত উঁচু। বিচ্ছিন্নভাবে যা ঘটে তা রাজনৈতিক ইন্ধনপ্রসূত বৈ কিছু নয়। তা’ছাড়া সাপ্তাহিক জুমআর আলোচনায় কওমী-খতীববৃন্দ মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বিদআত-শিরকমুক্ত, নারী-নির্যাতনমুক্ত এবং শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে উপদেশমূলক ও জাতি-গঠনমূলক যে-সব আলোচনা রাখেন তা নিঃসন্দেহে জাতীয়-সংহতির জন্য খুবই ফলদায়ক বলে গণ্য হয়। যেহেতু বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার গভীরে কওমী-জগতের বন্ধন তাই কওমী আলিম-সমাজের প্রভাব সমাজে প্রচণ্ডভাবে দৃশ্যমান। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। সেদিক থেকে বলা যায়, দেশের কওমী-জগৎ পুরো জাতির জন্য একটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টিতে সার্বক্ষণিক অবদান রেখে চলেছে।

সুতরাং আজ ভাবার সময় এসেছে, দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কওমী-মাদরাসাভিত্তিক কওমী-জগৎ এ-দেশের মাটি থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানো; এ-দেশের মাটিতেই তাঁদের বসত; এ-দেশের মাটিতেই তাঁদের শেকড়। এঁদের শিক্ষা-সংস্কৃতি হাজার বছর ধরে এ-দেশেরই মাটির লালনে লালিত; এ-দেশের মাটির বন্ধনে আবদ্ধ। মূলত, কওমী-মাদরাসার শিক্ষাই এ-দেশের মূলধারার শিক্ষা। ঔপনিবেশিক শিক্ষা এ-দেশের মূলধারা নয়। যারা আমাদের ছয় শ’ বছর শোষণ করেছে সেই ইংরেজ বেনিয়াগোষ্ঠীর দেয়া শিক্ষাকে মূলধারা মেনে নিয়ে কওমী-জগৎ এ-দেশের মাটি আর মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার শিক্ষা পায় নি।

কৈফিয়ত


কওমী-জগতের অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির বিশদ বর্ণনার একেবারে প্রান্তে চলে এসেছি। এ দীর্ঘ আলোচনার এ প্রান্তে এসে আমার অনুভুত হচ্ছে সুপ্রিয় পাঠকবৃন্দের কাছে বর্ণিত শিরোনামের একটা কৈফিয়ত তুলে ধরার গরজ। কেন এ আলোচনা? কিসের তাগিদে এতো তথ্য ও তত্ত্বের অবতারণা? এ প্রশ্নের সুরাহা না হলে বোধ করি পাঠকবৃন্দের কাছে এবং আমার বিবেকের দুয়ারে একটি অসম্পূর্ণ ও অতৃপ্ত-ভাবের আবহ থেকে যাবে। তাই, সেই কৈফিয়ত নিয়ে হাজির হচ্ছি।

আমার হৃদয়ের ভালোবাসা-মিশ্রিত সম্মানিত পাঠ-সমাজ! আপনাদের অনেকেই জানবেন, স্বাধীনতা পরবর্তী ‘৭২-‘৭৫ পর্যন্ত সময়কাল বাংলাদেশের কওমী আলিম-সমাজের জন্য ছিলো এক বেদনাবিদূর ক্রান্তিকাল। এ সময়টাতে তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিলো ঝুঁকিপূর্ণ। নব্য-স্বাধীন দেশের উগ্র-বামপন্থী ও উগ্র-সেক্যুলারগোষ্ঠী পরিবেষ্টিত সরকারের সন্দেহের জাল মাথার উপর টাঙ্গানো থাকতো সর্বক্ষণ। মনে হতো কওমী-মাদরাসার আলিম-ছাত্রেরা ভিনগ্রহের বাসিন্দা। এদেশের মাটিতে জন্ম নিয়েও এঁদের কোন মানবাধিকার নেই। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে অনেক আলিমকে শহীদ করে দেয়া হয় যাঁদের সংখ্যা কখনো কেউ জানবে না। বর্তমানে বেঁচে থাকা কিছু প্রবীণ আলিমের সাথে কথা বলে সেসব জেনেছি আমি। অথচ তাঁদের শতবছরের ঐতিহ্যের ইতিহাসের পাতাগুলো তখনো ছিড়ে যায় নি। আপনারা যারা মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়টা প্রত্যক্ষ করেন নি তারা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হবেন কী অবর্ণনীয় অবস্থার মধ্য দিয়ে কওমী আলিম-সমাজ দ্বীনি মাদরাসাগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তখন থেকেই মূলত কওমী-জগৎকে উপহাসের পাত্র হিসাবে দেখার পর্ব শুরু হয়। একশ্রেণীর বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও অধ্যাপক তাদের লেখায় ইসলাম, মাদরাসাশিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক রম্যরচনা, কবিতা, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখতে থাকেন। এদের পেছনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিলো স্পষ্ট। কিন্তু এতো কিছুর পরও কওমী আলিম-সমাজের প্রতি হৃদয়ের ভালোবাসা নিঙরে দিয়েছিলেন; কওমী-মাদরাসাগুলোর দিকে হাঁড়ির চাল-ডাল দিয়ে সর্বাত্মক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন এদেশের খেটে খাওয়া তৃণমূলের জনগণ, মেহনতি মানুষ, মজদুর আর শ্রমিক-শ্রেণী। এখানে একটি কথা না বললে সত্য আড়ালে থাকবে। তাহলো, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তার সময়কালের এসব অপতৎপরতা নিয়ে বিরক্ত ছিলেন বরাবরই। তাই তিনি বহুবার বলেছেন: ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দিলে এই দেশ জ্বলে উঠবে। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোরদার করা উচিৎ(দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা, দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি সংখ্যা, ১৭ই আগস্ট ১৯৯৪, পৃ:১৬)। কিন্তু তাঁর সতর্কবাণীতে কান দেয় নি উগ্র-বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি। সরকারেও শেখ মুজিবুর রহমানের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ ছিলো না বলে প্রশাসনের একটি অংশ ইসলাম ও মাদরাসাবিরোধী এসব অপতৎপরতায় হাওয়া দিতে থাকে।

‘৭৫ পরবর্তী অনুকূল সময়ে কওমী-মাদরাসাগুলো নতুনভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ পায়। সুযোগ সৃষ্টি হয় কওমী আলিম-সমাজের একটু মুক্ত নিঃশ্বাস নেবার। কিন্তু সেই বৈরী-শক্তি গোপনে তাদের লেখালেখিতে ইসলাম ও মাদরাসা-শিক্ষাবিরোধী অপপ্রচার চালাতে থাকে। এদের অপপ্রচারের কিছু বিশেষ দিক ছিলো। সেগুলোকে কেন্দ্র করেই ওরা প্রশাসন ও বিদেশীশক্তিকে প্রভাবিত করতে সচেষ্ট থাকতো। বিষয়গুলো হলো: মাদরাসাওয়ালারা স্বাধীনতাবিরোধী; এরা দেশের জনশক্তিকে মধ্যযুগের দিকে নিয়ে যেতে চায়; এরা প্রগতিশীল নয়, প্রতিক্রিয়াশীল ; এরা আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করে না; এরা কেবল মিসকীনমার্কা মোল্লা তৈরি করে; এরা এ দেশের জন্য বোঝাসরূপ; জাতীয় উন্নয়নে এদের কোন অবদান নেই; এরা দেশের প্রগতিবিরোধী শক্তি; রাষ্ট্রীয় কোন দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ইত্যাদি, ইত্যাদি। এসব অভিযোগের পালা বসেছে যুগের পর যুগ। শুনতে শুনতে অনেক সাধারণের মনে জেগেছে নানা প্রশ্ন। কিন্তু সঠিক সময়ে উত্তরটা পায় নি বলে বিভ্রান্ত হয়েছেন অনেকে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ‘৭৫ পরবর্তী প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসলে আবার জেগে ওঠে সেই অপশক্তি। ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারো ক্ষমায় এলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয় সেই ইসলামবিদ্বেষী ও কওমীবিরোধী অপশক্তি। এবার তারা স্থান পায় মন্ত্রীসভায়। আবার শুরু হলো সেই পুরনো খেলা। এবার বাজার গরম করতে নামে খোদ প্রশাসন। ২০১৩ সালে ইতিহাসের বর্বরোচিত শাপলা গণহত্যায় অনেকগুলো উপাদানের মাঝে সেই বানোয়াট অভিযোগগুলোও ইন্ধন যোগালো নিখুঁতভাবে। শেখ হাসিনা, ইনু, মখা আলমগীর, মেনন, বাদল সবার কণ্ঠে যেন এক-ই স্লোগান–ওদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। কিন্তু সেই মর্মান্তিক ক্ষণগুলোতেও গুমরে কেঁদেছে সে-সব মিথ্যা আর বিদ্বেষপ্রসূত অভিযোগের না দেয়া জবাবগুলো। রক্তাক্ত শরীরে পড়ে থাকা নিষ্প্রাণ দেহগুলো তখন অবাক-বিস্ময়ে শুনছিলো শেখ হাসিনার উপহাসমিশ্রিত কণ্ঠে শরীরে রঙ মেখে শুয়ে থাকার নতুন উপাখ্যান।

স্বাধীনতার আজ ছিচল্লিশ বছর অতিক্রান্ত। দূর্ভাগ্যজনকভাবে কওমী-জগৎ থেকে উগ্র-বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ শিবির থেকে আসা অভিযোগগুলোর কোন জবাব দেয়া হয় নি। কেন হয় নি এ নগণ্যের সেটা জানা নেই। জাতি আজ জানুক, দেখুক–এ দেশের জাতীয় উন্নয়নে, সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পথযাত্রায়, রাষ্ট্রের মানবসম্পদ উন্নয়নে, মানবিক সাহায্য প্রদানে এবং ধর্মীয় শিক্ষায় নৈতিকতা সৃষ্টিতে কওমী-জগতের অবদান সরকারের অন্য যে কোন বিভাগের চেয়ে বেশি ছাড়া কোন অংশে কম নয়। তাই কওমী-মাদরাসার বারান্দায় গড়াগড়ি দেয়া একজন নগণ্য কওমী-সন্তান হিসাবে আমি বিবেকের কাছে বারবার আঘাতে জর্জরিত হয়েছি, আহত হয়েছি। মনের প্রতিটি অলিতে-গলিতে বেদনার ভারে ভারাক্রান্ত হয়েছি। হন্য হয়ে খুঁজেছি, সেই অভিযোগগুলোর জবাব। যাঁদের কাছে কওমী-মাদরাসার লোকমা তুলে দু’হরফ পড়ে মানুষ হতে শিখেছিলাম; যাঁদের জুতোর স্পর্শে ধন্য হয়েছে এ জীবন সেই-সব মহাত্মাদের সম্পর্কে অবাস্তব প্রশ্ন উঠবে আর আমরা নীরবে হেঁটে যাবো সে কেমন করে হয়? এই কঠিন বাস্তবতার দৃষ্টিকোণে নেহায়েত কওমী-মাদরাসার ইজ্জতের দিকে তাকিয়ে, আমার ঋণগ্রস্থ-সত্ত্বার সতীত্বের আহ্বানে অবশেষে কলম ধরতে হলো স্বাধীনতার প্রায় চারযুগ প্রান্তে। আমার এ আলোচনা থেকে কোন কওমী-সন্তান যদি খুঁজে পান কওমী-শত্রুদের প্রত্যুত্তরের জবাব তবে এ নগণ্য এ আশায় বুক বাঁধবে: এটাকেই আমার নাযাতের উপায় হিসাবে গণ্য করা হবে কালকের কঠিন দিবসে। আল্লাহ হাফিয।


সমাপ্ত


জরুরী ঘোষণা: কেউ যদি ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ প্রকাশিত ‘গবেষণা প্রতিবেদন’ বিভাগের কোন প্রবন্ধের কোন অংশ বা লাইন উদ্ধৃত করতে চান বা কোন তথ্য ব্যবহার করতে চান তবে তাঁদের কাছে সবিশেষ অনুরোধ যে, তাঁরা অনুগ্রহপূর্ক প্রবন্ধ, লেখক এবং ইনসাফ-এর সূত্র ব্যবহার করবেন। অন্যথায় বিষয়টি বেআইনী বলে বিবেচিত হবে।

-বিভাগীয় সম্পাদক