ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা না থাকায় মুসলিম সমাজ অপসংস্কৃতি দ্বারা লাঞ্ছিত

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুহাম্মাদ আবু আখতার
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া ৷


মুসলমানগণ ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা করবে এবং অপসংস্কৃতির চর্চা থেকে দূরে থাকবে এটাই তাদের ঈমানের দাবি৷ কিন্তু বর্তমান মুসলিম সমাজ এ গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী দাবিকে উপেক্ষা করে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণে উল্টো স্রোতে ভাসছে৷ অধিকাংশ মুসলমান ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা থেকে মুখ ফিরিয়ে অপসংস্কৃতির চর্চায় মেতে উঠেছে৷ এর ফলে শান্তির ফোয়ারা বিদায় নিয়ে তাদের মাঝে অশান্তির দাবানল দাউ দাউ করে জ্বলছে৷ কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে৷
বেগানা নারী-পুরুষ পরস্পরে পর্দা রক্ষা করে চলা ইসলামের অন্যতম একটি সংস্কৃতি৷ মহান আল্লাহ এ ব্যাপারে কুরআনে বলেন,
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ
মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য পবিত্রতা রয়েছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ সে ব্যাপারে অবহিত আছেন।

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَىٰ عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। (সুরা নুরঃ আয়াত নং ৩৹ ও ৩১)

বর্তমানে কয়জন মুসলমান এ ইসলামী সংস্কৃতি মেনে চলে? হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অধিকাংশই পর্দার সংস্কৃতি চর্চা থেকে বিমুখ৷ এর ফলে মুসলিম সমাজে ক্রমবর্ধমানহারে ইভটিজিং, অবৈধ প্রেম, পরকিয়া, লিভ-টুগেদার, জেনা-ব্যভিচার, ধর্ষণ, অবৈধ গর্ভপাত, আত্মহত্যা, নেশা করা, অপহরণ ইত্যাদি জঘন্যতর অপরাধগুলো বেড়েই চলছে৷ এসব অপরাধ নির্মূল করার জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন প্রচেষ্টা চলছে৷ কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না৷ কারণ এসব অপরাধের মূল কারণ ইসলামের ফরয হুকুম পর্দাকে অবজ্ঞা করে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা চালু রাখা৷ এ ক্ষেত্রে ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা ব্যতীত এসব অপরাধ সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব নয়৷ আর এসব অপরাধ সমাজ থেকে দূর করতে না পারলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়৷

ধনী মুসলমানগণ কর্তৃক গরীব অসহায় মুসলমানদের যাকাত প্রদান করা একটি গুরুত্বপুর্ণ ইসলামী সংস্কৃতি৷ আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারে বলেন,
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায় কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণ গ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সুরা তাওবাঃ আয়াত নং ৬০)

বর্তমানে কয়জন ধনী মুসলমান ঠিকভাবে যাকাত দেয়? সকল ধনী মুসলমান যদি ঠিকভাবে যাকাত আদায় করত তাহলে গরীব অসহায়দের এ করুণ দুর্দশা থাকত না৷ অভাবের তাড়নায় পড়ে অনেকে চুরি করে, ডাকাতি করে, ভিক্ষা করে, দুর্নীতি করে, মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে ইত্যাদি আরো অনেক পাপ করে৷ কথায় বলে অভাবে স্বভাব নষ্ট৷ যাকাতের টাকা দ্বারা যদি তাদের অভাব দূর করা যেত তাহলে তাদের স্বভাব নষ্ট হত না এবং এসব জঘন্য অপরাধও করার প্রয়োজন বোধ করত না৷

জালিমের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ইসলামী সংস্কৃতি৷ পৃথিবীর কোন প্রান্তের মুসলমান যদি জালিমের দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে ঐ মাজলুম মুসলমানদের রক্ষায় জালিমের বিরুদ্ধে অন্য মুসলমানদের জিহাদে ঝাপিয়ে পড়াই তো ইসলামের হুকুম৷ এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا
আর তোমাদের কি হল যে, তেমারা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও। (সুরা নিসাঃ আয়াত নং ৭৫)

ফিলিস্তিনের মুসলমানগণ ইয়াহুদীদের দ্বারা, মায়ানমারের মুসলমানগণ বৌদ্ধদের দ্বারা, কাশ্মীরের মুসলমানগণ হিন্দুদের দ্বারা, আফগানিস্তান ও ইরাকের মুসলমানগণ খ্রিস্টানদের দ্বারা যখন নির্যাতিত হয় তখন কি কোন মুসলিম রাষ্ট্র তাদের রক্ষায় জিহাদে ঝাপিয়ে পড়েছিল? হায় আফসোস! মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ববোধ ও ধর্মীয় চেতনাবোধ কোথায় গিয়েছিল তখন? মুসলামানদের মাঝে ইসলামী সংস্কৃতি জিহাদের চর্চা নেই বলেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক অসহায় মুসলমান মজলুম হয়ে জীবন যাপন করছে৷ বিধর্মীরা যখন তখন মুসলমানদের রক্ত নিয়ে খেলা করার সাহস পাচ্ছে! ইসলাম বিভিন্ন অপরাধীর জন্য বিভিন্ন ধরণের শাস্তি নির্ধারণ করেছে৷ জেনা-ব্যভিচারের শাস্তি একশত বেত্রাঘাত, অপবাদের শাস্তি আশি বেত্রাঘাত, চুরির শাস্তি হাত কাটা, ডাকাতি ও সন্ত্রাসের শাস্তি হত্যা করা/শুলি করা/দেশান্তরিত করা/হাত পা কেটে দেয়া, হত্যার শাস্তি কিসাস/দিয়াত ইত্যাদি৷ আল্লাহ তায়ালা এ সম্পর্কে অনেক আয়াত নাযিল করেন,
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ
ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। (সুরা নুরঃ আয়াত নং ২)
وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً وَلَا تَقْبَلُوا لَهُمْ شَهَادَةً أَبَدًا وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অতঃপর স্বপক্ষে চার জন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত করতে সক্ষম হয় না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই নাফরমান। (সুরা নুরঃ আয়াত নং ৪)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে হুশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়। (সুরা মায়েদাঃ আয়াত নং ৩৮)
إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلَافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الْأَرْضِ ذَٰلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে বা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে কিংবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি। (সুরা মায়েদাঃ আয়াত নং ৩৩)
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنفَ بِالْأَنفِ وَالْأُذُنَ بِالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ فَمَن تَصَدَّقَ بِهِ فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَّهُ وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখম সমূহের বিনিময়ে সমান যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গোনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম। (সুরা আলমায়েদাঃ আয়াত নং ৪৫)
অপরাধীদের এসব শাস্তি প্রদান করা মুসলিম রাষ্ট্রের দায়িত্ব৷ কিন্তু কতটি মুসলিম রাষ্ট্রের সরকার এ দায়িত্ব পালন করে? অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রই এ ব্যাপারে উদাসীন৷ ফলে এসব পাপের অপরাধীরা ক্রমবর্ধমানহারে বেড়ে চলেছে এবং তারা দেশ ও সমাজে ব্যাপক অশান্তি সৃষ্টি করছে৷ মুসলমানগণ পুরোপুরি ইসলামী ইসলামী সংস্কৃতি পালন করা ব্যতীত এ অশান্তির আগুন নিভানো সম্ভব নয়৷