কোরবানির ইতিহাস

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

এহসান বিন মুজাহির


কোরবানি শব্দটি আরবি। এর উৎপত্তি হয়েছে ‘কুরবানুন’ মাসদার থেকে। কুরবানি শব্দটির বেশ কয়েকটি অর্থ রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি হলো; নৈকট্য, সান্নিধ্য, আত্মত্যাগ, জবেহ, রক্তপাত ইত্যাদি।

শরীয়তের পরিভাষায় কুরবানি বলা হয়, মহান রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য ও সন্তোষ লাভের আশায় নির্ধারিত তারিখের মধ্যে হালাল কোন পশু আল্লাহর নামে জবেহ করা। আবার এভাবেও বলা যেতে পারে যে, প্রত্যেক এমন নেক আমল বা ত্যাগ, যার মাধ্যমে মহান রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করা সম্ভবপর হয়। কুরবানি নতুন কোন প্রথা নয়, বরং এটা আদিকাল থেকে চলে আসছে। হযরত আদম (আ:) এর যুগে কুরবানির সুচনা হয়েছিল। আদম (আ:) এর সন্তান হাবিল কাবিলের মধ্যে বিবাহ-শাদী নিয়ে যখন মতানৈক্য দেখা দিল তখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ইখলাসের সঙ্গে হালাল পশু কুরবানি করার নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন তোমাদের মধ্যে যার কুরবানি আমার নিকট কবুল হবে তার নিকট মেয়ে বিবাহ দেয়া হবে। হাবিল এবং কাবিল কুরবানির নির্দেশ পেয়ে কুরবানি করল। হাবিলের কুরবানি আল্লাহর কাছে কবুল হল, কাবিলের হলোনা। কাবিলের কুরবানি কবুল না হওয়ার কারণে সে ক্ষিপ্ত হয়ে হাবিলকে বলল আমি তোমাকে হত্যা করে ফেলব। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-‘হে নবী আপনি তাদের নিকট যথাযথভাবে আদম (আ:) এর পুত্রদ্বয়ের কথা আলোচনা করেন, যখন তারা মহান রবের নিকট তাদের কুরবানিকে পেশ করল, তখন একজনের কবুল হল অন্যজনের হলো না। যার কুরবানি কবুল হলো না সে ক্ষিপ্ত হয়ে অন্যজনকে বলল আমি তোমাকে খুন তথা হত্যা করে ফেলবো। পালনকর্তা একমাত্র মুত্তাকীদের কুরবানি কবুল করেন’। (সূরা মায়িদা:২৭)

কুরবানির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
প্রথমে হযরত ইবরাহিম (আ:) এর কোন সন্তান ছিল না তাই তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বললেন ‘হে আল্লাহ! আমাকে আপনি নেককার সন্তান দান করেন। তাঁর এ দুয়া মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে কবুল হয় এবং তিনি তাঁকে এক পুত্রের সুসংবাদ দিলেন। ইবরাহিম (আ:) একদিন স্বপ্নে দেখলেন যে মহান রাব্বুল আলামিন তাঁকে নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁর কলিজার টুকরা পুত্র সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় কুরবানি দেয়ার জন্য। কোন কোন রেওয়াত থেকে জানা যায় যে, এই স্বপ্ন ইবরাহিম আ: কে পরপর তিনদিন দেখানো হয় । এ প্রসঙ্গে তাফসিরের কিতাবে বর্ণিত রয়েছে যে, হযরত ইবরাহিম আ: এর বয়স যখন তের অথবা পুর্ণবয়স্কে পৌঁছেছিল তখন তাকে এ স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল । ইবরাহিম (আ: স্বপ্নের আধ্যমে এ নির্দেশ পেয়ে চিন্তিত হয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন ইসমাঈল কি মেনে নিবে। সে কি আল্লাহর রাস্তায় জান বিলাতে রাজি হবে। তিনি তার ছেলের কাছে গেলেন এবং বললেন আমি স্বপ্নের মাধ্যমে তোমাকে কুরবানি করার নির্দেশ পেয়েছি তোমার কি মতামত? তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন, আব্বা আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ পেয়েছেন তা বাস্তবায়ন করেন। ইনশাল্লাহ আমাকে আনুগত্য ও ধৈর্যশীলদের অন্তভূক্ত পাবেন। পুত্র ইসমাইল (আ:) এর মুখ থেকে প্রাণভরা কথা শুনে তিনি আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তাকে কুরবানি করার জন্য ময়দানে নিয়ে গেলেন। ইসমাাঈল (আ:) এর হাত, পা, বেঁধে জমিনে শুইয়ে দিলেন । ধারালো চাকু দ্বারা তাঁর গলাতে পোঁচ দিতে লাগলেন কিন্তু আল্লাহর কি অপার মহিমা ছুরি তথা চাকু দ্বারা গলা কাটবে তো দূরের কথা তার গলায় দাগও বসাতে পারেনি। ইবরাহিম (আ:) নতুন আরেকটি ছুরি হাতে নিলেন এবং পুত্রের গলায় ছুরি চালাতে লাগলেন তখন গায়েবীভাবে একটি আওয়াজ তার কানে পৌঁছলো, হে ইবরাহিম তুমি মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছো, তোমার কলিজার টুকরা সন্তানকে আর কষ্ট দিও না, এবার তাকে ছেড়ে দাও। তোমার কুরবানি হয়ে গেছে। পুত্রের বদলে তুমি একটি তর-তাজা দুম্বা কুরবানি করো। তখন ইবরাহিম আ: একটি দুম্বা কুরবানি করে আল্লাহর নির্দেশ পালন করলে ।

হযরত ইবরাহিম (আ:) ইসমাইল (আ:) কে কুরবানি করতে গিয়ে শয়তান অনেক কুমন্ত্রণা ও প্রতারণা দেয়ার প্রাণপণ প্রচেষ্টা করছিলো কিন্তু খলিলুল্লাহ শয়তানের সব প্ররোচনাকে পাড়ি দিয়ে মহান রবের নির্দেশ পালনে মনযোগী হলেন । হজরত ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত তিনি বললেন যখন ইবরাহিম ছুরি চালালেন তখন জিবরাইল আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, না জানি আমি পৌঁছার আগেই জবাই কাজ শেষ হয়ে যায় কিনা তাই তিনি জোরে জোরে আ্ল্লাহু আকবারের ধ্বনি বলে আসছিলেন, আর এ তাকবিরের আওয়াজ ইবরাহিম (আ:) এর কানে পৌছলো তিনি উপরের দিকে তাকালেন এবং বুঝতে পারলেন যে, জিবরাইল আ তাকবির ধ্বনি দিয়ে আসতেছেন তখন তিনি বলে উঠলেন ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার’ আর এই তাকবীর শুনার পর ইসমাঈল (আ:) পরবর্তী লাইন ‘ওয়ালিল্লাহিল হামদ’বলে উঠলেন। (তাফসিরে মাযহারি)
পিতা পুত্রের এই মহা আত্মত্যাগ আজও আমাদেরকে প্রেরণা যোগায়। এই অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগের ইতিহাসকে স্মরণ রাখার জন্য আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মোহাম্মদির উপর কুরবানিকে ওয়াজিব করেছেন।


লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট