রোহিঙ্গা-ইস্যু নিয়ে ভারত, মায়ানমার ও চীনের ত্রিকৌণিক বলয় এবং বিপদে বাংলাদেশ [প্রথম পর্ব]

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

গোড়ার কথা
গত বছর অর্থাৎ ২০১৬’র শেষের দিকে বাংলাদেশের প্রতিবেশী বার্মার আরকান রাজ্যে শাসকগোষ্ঠী ও সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর নেমে এসেছিলো শতাব্দীর ভয়াবহতম গণহত্যা। গণহত্যার ভয়াবহতায় প্রমাণীত হয় বার্মার বৌদ্ধ সম্প্রদায় বিশ্বের সবচেয়ে বর্বর ও পাশবিক একটি জাতি। এ বছরের আগস্টে আবার সেই দৃশ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি। প্রতিদিন শতশত নিগৃহীত মুসলিম পরিবার প্রতিবেশী বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আশ্রয় নিচ্ছে। ২০১৬-তে বাংলাদেশ সরকার নির্মমভাবে পুশব্যাক করেও ঠেকাতে পারে নি আশ্রয়প্রার্থীদের ঢল। পরিবর্তে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্নাম কুড়াতে হয়েছে। এবারে সরকার কিছুটা নমনীয় পন্থা অবলম্বন করেছে বলে মনে হয়। তবে আঞ্চলিক রাজনীতি, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সেই মিসকীনধর্মী অবস্থান এখনও আগের মতো দৃশ্যমান।

এতোদিন রোহিঙ্গা-ইস্যুটি বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যকার একটি শরণার্থীসমস্যা হিসাবে দেখা হলেও হালে বিষয়টি ভিন্ন এক বর্ণে বর্ণায়িত হচ্ছে প্রকাশ্যে। এখন নিছক শরণার্থীসমস্যাটিকে কেন্দ্র করে বিকাশ হচ্ছে একটি বিশেষ ভূ-রাজনীতি(Geo-Politics) যাকে আমরা বলতে পারি ‘ত্রিকৌণিক ভূ-রাজনীতি’ বা Tri-angular Geo-Politics। বিষয়টি বুঝতে হলে সামনে রাখতে হবে দক্ষিণ এশীয় মানচিত্র যা চীন, মায়ানমার, বাংলাদেশ এবং ভারতের ভৌগলিক অবস্থানকে নির্দেশ করবে। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির এই বিকাশমান প্রক্রিয়াটির জন্ম মূলত আরও আগে। রোহিঙ্গা-ইস্যুর যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশ-মায়ানমারের মধ্যকার সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি ইত্যাদির সাথে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির ক্রম-পরিবর্তনের মধ্য থেকে উক্ত বিকাশমান ভূ-রাজনীতির জন্ম। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, রোহিঙ্গা-ইস্যুকে অবলম্বন করে গড়ে উঠা এই ত্রিকৌণিক ভূ-রাজনীতির একটি পক্ষ হচ্ছে বাংলাদেশ এবং অপর পক্ষ হচ্ছে মায়ানমার, চীন ও ভারত। যদিও এখানে দেশ চারটি তবুও আমি ত্রিকৌণিক ভূ-রাজনীতি এ জন্য বলছি যে, বাংলাদেশ একাই একটি পক্ষ এবং ঐ তিনটি দেশের লক্ষ্য। বিকাশমান এই ত্রিকৌণিক ভূ-রাজনীতিকে আরও খোলাসা করে বুঝতে এই চারটি দেশের পারস্পরিক ভৌগলিক অবস্থানকে বোঝার বিকল্প নেই। যেহেতু ত্রিকৌণিক ভূ-রাজনীতির একটি পক্ষ এবং লক্ষ্যবস্তু বাংলাদেশ, তাই বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডের দিক থেকে মায়ানমার,চীন এবং ভারতকে প্রতিরক্ষার পরিভাষায় Stone throwing distance বা পাথর নিক্ষেপযোগ্য দূরত্বের আওতাধীন বলা যায়। অর্থাৎ দেশ তিনটির ভৌগলিক অবস্থান বাংলাদেশের এতোই নিকটে যে, সেটাকে স্টোন থ্রোয়িং ডিস্টেন্সের মধ্যে বলে আখ্যায়িত করা হয়। আসুন তা’হলে দেশ চারটির পারস্পরিক ভৌগলিক অবস্থান ও স্বার্থ সম্পর্কে ধারণা নিই।
সমস্যা যেহেতু মায়ানমার(সাবেক বার্মা) থেকে উদ্ভূত তাই সেখান থেকেই আলোচনা শুরু করা যাক।

মায়ানমার-চীন সম্পর্ক
প্রথমেই মায়ানমার-চীন সম্পর্কের কথা।
চীনের সাথে মায়ানমারের রয়েছে ১৩৪৮ মাইলের এক বিশাল সীমান্ত। মায়ানমারের সাথে চীনের সম্পর্ক ছিলো প্রথম থেকে দ্বিমাত্রিক। প্রথমত, দ্বিরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও দ্বিতীয়ত, কম্যুনিস্ট পার্টির সম্পর্ক। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে তৎকালীন বার্মার কম্যুনিস্ট পার্টির সম্পর্ক ছিলো ঘনিষ্ঠ।চীনে মাও সেতুঙের কম্যুনিস্ট বিপ্লবের পর বার্মিজ কম্যুনিস্ট পার্টিকে সহযোগিতা করার কারণে চীনের সাথে তৎকালীন বার্মার রাষ্ট্রীয় সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে মায়ানমারে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে নেবার পর বার্মিজ কম্যুনিস্ট পার্টির অন্তঃকোন্দলের কারণে চীন তাদেরকে সহযোগিতা করার নীতি ত্যাগ করলে মায়ানমারের সাথে চীনের সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে থাকে। ফলশ্রুতিতে, মায়ানমারের সামরিক শাসক থান শুয়ে ১৯৮৯ সালে চীন সফর করেন এবং চীনের সাথে মায়ানমারের নতুন সম্পর্কের সূচনা করেন। এরপর থেকে মায়ানমার পরাশক্তি থেকে অস্ত্র না কিনে চীন থেকে অস্ত্র ক্রয় করে সেনাবাহিনীকে আধুনিকীকরণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পাশাপাশি মায়ানমার চীনের কাছ থেকে আর্থনীতিক ও কৌশলগত সুযোগ-সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্র তৈরি করে। ফলে, কিছুদিনের মধ্যেই মায়ানমার চীনের ঘনিষ্ঠ-মিত্রে পরিণত হয়। তৎকালীন সামরিক সরকার আন্তর্জাতিকভাবে টিকে থাকতে চীনের উপর ক্রমে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ১৯৯৭ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর মায়ানমার পুরোপুরি চীননির্ভর হয়ে পড়ে এবং জাতীয় আমদানীর এক-তৃতীয়াংশ চীন থেকে আমদানী করতে শুরু করে। সাথেসাথে চীন মায়ানমারের অভিভাবক-রাষ্ট্রের ভূমিকা পালন করতে থাকে। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মায়ানমার চীনের Client-state বা মক্কেল-রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। ২০১২ সালে অং সান সুচি’র দল ক্ষমতায় আসলেও উক্ত নীতির কোন পরিবর্তন হয় নি।

চীন-মায়ানমার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে Wikipedia-য় বলা হচ্ছে: Burma was the first non-Communist country to recognize the Communist-led People’s Republic of China after its foundation in 1949. Burma and the People’s Republic of China formally established diplomatic relations on June 8, 1950. China and Burma signed a treaty of friendship and mutual non-aggression and promulgated a Joint Declaration on June 29, 1954, officially basing their relations on the Five Principles of Peaceful Co-existence. However, Burma maintained a neutralist foreign policy in the 1950s and 1960s. Anti-Chinese riots in 1967 and the expulsion of Chinese communities from Burma generated hostility in both countries. Relations began to improve significantly in the 1970s. Under the rule of Deng Xiaoping, China reduced support for the Communist Party of Burma (“CPB”) and on August 5, 1988 China signed a major trade agreement, legalizing cross-border trading and began supplying considerably military aid. Following the violent repression of pro-democracy protests in 1988, the newly formed State Peace and Development Council, facing growing international condemnation and pressure, sought to cultivate a strong relationship with China to bolster itself; in turn, China’s influence grew rapidly after the international community abandoned Burma. (বলা হচ্ছে: অ-কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে বার্মাই প্রথম ১৯৪৯ সালের পর কম্যুনিস্ট চীনকে স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৫০ সালে দেশ দু’টি পরস্পরের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে। চীন এবং বার্মা পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও অনাগ্রাসন চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ১৯৫৪ সালের ২৯ জুন এ বিষয়ে যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে যদিও বার্মা তার জোট-নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি রক্ষা করে চলে কিন্তু ১৯৬৭ সালে বার্মায় চীনবিরোধী দাঙ্গা এবং বার্মা থেকে চীনা বসবাসকারীদের বিতাড়নের ফলে দু’দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। ১৯৭০ সালের দিকে দেং জিয়াও পেং-এর আমলে চীন বার্মার কম্যুনিস্ট পার্টিকে সহযোগিতা করার নীতি পরিত্যাগ করলে সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে থাকে। ১৯৮৮ সালের ৫ আগস্ট চীন-বার্মার মধ্যে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর চীনের সাথে বার্মার সীমান্ত-বাণিজ্যের সূত্রপাত ঘটে এবং চীন বার্মাকে সামরিক সহায়তা দিতে শুরু করে। ১৯৮৮ সালে বার্মার গণতন্ত্রী-পন্থীদের জোরাদার আন্দোলনের মুখে বর্মী সরকারের উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলে চীনের সাথে বার্মার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠরূপ নেয়।)

ভারত-মায়ানমার সম্পর্ক
এবার আসা যাক ভারত-মায়ানমার সম্পর্ক নিয়ে। উল্লেখ্য, ১,২৬৯,২১৯ বর্গমাইল আয়তনের বিশাল ভারতের সাথে রয়েছে ২,৬১,২২৮ বর্গমাইল আয়তনের মায়ানমারের(বার্মা) ১০০৯ মাইল দীর্ঘ সীমান্ত। বলাবাহুল্য, মায়ানমার ভারতের সাত সীমান্তবর্তী প্রতিবেশীর অন্যতম। ভারত ও মায়ানমারের সাথে একটি অভিন্নতা শুরু থেকে ছিলো আর তা হলো উভয় দেশই জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনে শরীক থাকা। দেশ দু’টির আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক মোটামুটি একটা ইতিহাস। ২০১৪ সালের ১২ আগস্টের এক সংখ্যায় ভারতের একটি প্রভাবশালী ইংরেজি সাময়িকী The Diplomat ভারত-মায়ানমার সম্পর্ক নিয়ে “The Strategic Importance of Myanmar for India” (ভারতের জন্য মায়ানমারের কৌশলগত গুরুত্ব) শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। নিবন্ধের শুরুতেই উপ-শিরোনামে লেখা হয় তাৎপর্যপূর্ণ একটি বাক্য। লেখা হয়–Myanmar is India’s bridge east, and an important ally for growing its regional power. অর্থাৎ, মায়ানমার হলো পূর্বদিকে ভারতের সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি সেতু এবং ভারতের আঞ্চলিক-শক্তি বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক মিত্র। এখানে মায়ানমারকে যে পূর্বের সাথে সেতুবন্ধনের কথা বলা হয়েছে সেটা হচ্ছে ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতি সংস্থা’ (Association of Southeast Asian Nations) যাকে ASEAN( আসিয়ান) নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। আসিয়ান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দশটি রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্থা, যা ১৯৬৭ সালের ৮ আগস্ট ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর থেকে, ব্রুনেই, কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, এবং ভিয়েতনাম আসিয়ানের সদস্যপদ লাভ করে। এর লক্ষ্য: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক বিবর্তন তার সদস্যদের মধ্যে ত্বরান্বিত করা, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা সুরক্ষা, এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করা। ভারত মূলত এই আসিয়ানের সাথে সম্পর্ক গড়তে মায়ানমারকে সংযোগমিত্র হিসাবে পেতে চায়। এটাই ভারতের প্রধান কৌশলগত অবস্থান। বর্ণিত নিবন্ধতে মায়ানমারের সাথে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক নিয়ে আরো বিশদভাবে বলা হয়–“………..In fact, India and Myanmar have traditionally had much in common, with cultural, historical, ethnic and religious ties, in addition to sharing a long geographical land border and maritime boundary in the Bay of Bengal. India and Myanmar’s relationship officially got underway after the Treaty of Friendship was signed in 1951, after which the foundation for a more meaningful relationship was established during Prime Minister Rajiv Gandhi’s visit in 1987. Bilateral ties received another significant boost when the two countries signed a trade agreement in 1994. For many years India did not open up to the authoritarian regime, and it was only over a period of time that India started engaging with the military junta of Myanmar.
…..Myanmar is strategically important to India as it is the only ASEAN country that shares a border with India. It is also the only country that can act as a link between India and ASEAN. Myanmar is India’s gateway to Southeast Asia and could be the required impetus to realize India’s Look East Policy.” (বলা হচ্ছে: বস্তুত, ভারত এবং মায়ানমারের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, জাতিগত এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যগত পরিচিত বন্ধন রয়েছে। এর সাথে মিশে আছে দু’দেশের ভূখণ্ডগত ও বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় সীমান্ত। ভারত এবং মায়ানমারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫১ সালে বন্ধুত্বচুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর থেকে। এরপর ১৯৮৭ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীর সরকারি সফরের মধ্য দিয়ে মায়ানমার ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। ১৯৯৪ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক আরো একধাপ এগিয়ে যায়। এরপর মায়ানমারের সামরিক জান্তার সাথে ভারত বেশ কয়েক বছর ধরে উর্দ্ধতন-সম্পর্ক বজায় রাখে যা সে কখনোই প্রকাশ করে নি।
……..কৌশলগতভাবে ভারতের কাছে মায়ানমারের বিশেষ গুরুত্বের কারণ হলো মায়ানমার একমাত্র আসিয়ানভুক্ত দেশ যার সাথে ভারতের লাগোয়া সীমান্ত রয়েছে। আর এটাই একমাত্র দেশ যা আসিয়ানের সাথে ভারতের সংযোগ ঘটাতে পারে। মোট কথা, মায়ানমার ভারতের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বার। এবং ভারতের জন্য তার ‘পূর্বদিকে মনযোগ দাও’ নীতির ক্ষেত্রে মূল-নিয়ামক হিসাবে দেখা দিতে পারে।)

উক্ত কৌশলগত স্বার্থ অর্জনে ভারত মায়ানমারকে বেশ কিছু বিষয়ে ছাড় দিয়েছে যা আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের নৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়। Wikipedia.org বলছে–” India was hesitant in reacting to the 2007 Burmese anti-government protests that had drawn overwhelming international condemnation. India also declared that it had no intention of interfering in Burma’s internal affairs and that the Burmese people would have to achieve democracy by themselves as it respects the sovereignty of Myanmar. This low-key response has been widely criticised both within India and abroad as weakening India’s credentials as a leading democratic nation. Indo-Burma relations went into pleasant phase over Burmese steps towards democracy.

As of 2013, India has provided loan to Myanmar for its development, about US$500 million. India and Myanmar are set to cooperate in military and help modernize Myanmar’s military.” (অর্থাৎ, ভারত বরাবরই বার্মার গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ২০০৭ সালে সংঘটিত সরকার-বিরোধী প্রতিবাদে প্রতিক্রিয়া জানাতে দ্বিধাগ্রস্থ থেকেছে। অথচ সে-সময় সামরিক সরকার আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত হয়। এমন কি ভারত বিবৃতি দিয়ে জানিয়ে দেয়, তারা বার্মার আভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী নয়। বার্মার জনগণই তাদের গণতন্ত্র উদ্ধার করবে এবং সেটাকে বার্মার সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণে ভারত সম্মান জানাবে। অবশ্য ভারতের মতো একটি অগ্রগামী পরিচিতিসম্পন্ন গণতান্ত্রিক দেশের এমন নমনীয় বিবৃতিতে ভারতের ভাবমূর্তি ভেতরে-বাইরে প্রচণ্ডভাবে ক্ষুণ্ন হয়। পরবর্তীতে গণতন্ত্রের প্রতি বার্মার পদক্ষেপ ভারত-বার্মার সম্পর্ককে স্বস্তির দিকে নিয়ে যায়।
২০১৩ সালের দিকে ভারত মায়ানমারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দান করে। ভারত বার্মার সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণের জন্য সামরিক সহায়তাও দিতে শুরু করে।)

২০০৯ সালের ১৫ মে ভারতের নয়া দিল্লীতে Institute for Defence Studies and Analyses(IDSA) এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে “Myanmar’s Relations with Bangladesh since 1988″( ১৯৮৮ পরবর্তী বাংলাদেশ-মায়ানমারের সম্পর্ক) শিরোনামে একটি নিবন্ধ পাঠ করা হয়। নিবন্ধটি তৈরি করেন সংস্থাটির সহযোগী গবেষক প্রণামিত বড়ুয়া। নিবন্ধের এক জায়গায় বলা হচ্ছে–” For India, both Bangladesh and Myanmar have their own special significance from geopolitical as well as strategic points of view. On the Indian side, terrorism prone states like Arunachal, Nagaland, Manipur and Mizoram shares border with Myanmar. The problem of insurgency and economic underdevelopment in this region cannot be addressed adequately without India’s cooperation with Myanmar on these issues. Indo-Myanmar relationship is also significant due to India’s emphasis on Look East policy. Growing Myanmar-China relations may affect India’s interest in the region until and unless we too start improving our relations with Myanmar. Besides, an amicable relationship with resource rich Myanmar will also help India to improve its energy security in the long run. However, it remains undeniably true that the success of New Delhi’s policy toward Myanmar would be incomplete if its objectives with regard to Bangladesh were undermined. Whether to tackle the growing insurgency problem in the region or to deal with rise of China, India needs to have a region wide comprehensive policy, including positive policies toward its immediate neighbours.”( বলা হচ্ছে, ভারতের কাছে বাংলাদেশ এবং মায়ানমার উভয়ই ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের দিকে সন্ত্রাস-কবলিত রাজ্য অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মনিপুর ও মিজোরামের সীমান্ত মায়ানমারের সাথে লাগোয়া। এসব রাজ্যে বিদ্রোহ ও অনুন্নয়নের সমস্যাগুলো মায়ামারের সাথে ভারতের সহযোগিতা ছাড়া সমাধান করা যেতে পারে না।ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ‘পূর্বদিকে মনযোগ দাও’ নীতির( Look East Policy) দৃষ্টিকোণেও ইন্দো-মায়ানমার সম্পর্ক গুরুত্বের দাবিদার। মনে রাখতে হবে, যতোক্ষণ না আমরা মায়ানমারের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের কাজে হাত দিতে পারছি সেই পর্যন্ত ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হওয়া চীন-মায়ানমার সম্পর্ক ভারতীয় স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে। তা সত্ত্বেও, মায়ানমারের সাথে উর্দ্ধতন পর্যায়ের একটি গ্রহণযোগ্য সম্পর্ক ভারতকে তার দীর্ঘ মেয়াদে শক্তির নিরাপত্তায় সাহায্য করবে। যাই হোক না কেন, এটা অনস্বীকার্য একটি সত্য যে, মায়ানমারকে নিয়ে নয়াদিল্লীর নীতির সফলতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি এর বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া না হয়। মোদ্দা কথা, ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহ-সমস্যার এবং চীনের উর্দ্ধগতির মোকাবিলা করতে ভারতের প্রয়োজন তার আবশ্যকীয় প্রতিবেশী অভিমুখী অঞ্চলব্যাপী একটি ইতিবাচক ব্যাপক নীতি গ্রহণ।)


রোহিঙ্গা-ইস্যু নিয়ে ভারত, মায়ানমার ও চীনের ত্রিকৌণিক বলয় এবং বিপদে বাংলাদেশ [দ্বিতীয় পর্ব]