রোহিঙ্গা-ইস্যু নিয়ে ভারত, মায়ানমার ও চীনের ত্রিকৌণিক বলয় এবং বিপদে বাংলাদেশ [দ্বিতীয় পর্ব]

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

আমরা এতোক্ষণ ধরে যে আলোচনা করে এলাম তাতে চীন-মায়ানমার ও ভারত-মায়ানমার সম্পর্ক নিয়ে মোটামুটি ধারণা আত্মস্থ করতে পেরেছি। বাকি থাকলো ভারত-চীন সম্পর্ক। বলতে দ্বিধা নেই, ভারত-চীন সম্পর্কে বন্ধুসুলভের চেয়ে বৈরীর চিত্রই প্রকট। মাত্র কিছু দিন আগেও চীন সেনা পাঠিয়ে ভারত-সীমান্তে মারমুখী অবস্থান নেয়। এর আগে ১৯৬২ সালে তাদের মধ্যে যুদ্ধও হয়েছিলো। যা হোক, বক্ষ্যমান আলোচনায় চীন-ভারত সম্পর্ক আগের বিষয়গুলোর মতো গুরুত্ব বহন করে না বলে বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না।

বাংলাদেশ-মায়ানমার সম্পর্ক
বাংলাদেশ ও মায়ানমার পরস্পর সীমান্ত-প্রতিবেশী হলেও তাদের মধ্যে সুপ্রতিবেশীমূলক সম্পর্ক প্রমাণীত হয় নি মূলত বার্মার সামরিকজান্তার কারণে। ২০০০ সালে টেকনাফের নাফ নদীর তীরে এক সীমান্তযুদ্ধে বাংলাদেশের বিডিআর-এর কাছে প্রাণ হারায় বার্মার ৭ শত সেনা। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের কোন সেনা আহতও হয় নি। তিন দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে প্রচণ্ডভাবে মার খাবার পর বার্মার কর্তৃপক্ষ আত্মসমর্পণ করে সন্ধির প্রস্তাব দেয়। সেই থেকে বার্মার সাথে বাংলাদেশের বৈরী সম্পর্ক বিশ্ব জেনে যায়। বার্মার সামরিকজান্তার হটকারী ও ঔদ্ধত্যমূলক আচরণের কারণে সম্পর্ক আর স্বাভাবিক হয় নি। এর সাথে রোহিঙ্গা-ইস্যু বৈরী সম্পর্ককে আরো উচ্চমাত্রায় নিয়ে গেছে।

এবার প্রসঙ্গ: বাংলাদেশ
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং কৌশলগত সম্পর্কের প্রশ্নে প্রথমেই উঠে আসে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। অধিকাংশ পর্যবেক্ষকদের মতে Bangladesh-India relations are perhaps the most complex bilateral relations in the subcontinent. অর্থাৎ, সম্ভবত এই উপমহাদেশে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সব চাইতে জটিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে অনায়াসে একটি জটিল ও মিশ্র সম্পর্ক বলে আখ্যায়িত করা যায়। বাংলাদেশের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরিত্র পর্যবেক্ষণে অধিকাংশ মানুষের মনে বদ্ধমূল ধারণা হলো: ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আড়ালে বাংলাদেশের উপর বড়ভাইসূলভ আচরণ করতে চায়, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে আগ্রহী এবং রাষ্ট্র বাংলাদেশের চাইতে ভারত তার মতপন্থী আওয়ামী লীগের সাথেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে অধিকতর মনযোগী। এ ছাড়া, সীমান্ত-সমস্যা, পানি-সমস্যা, পার্বত্য-সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে ভারতপ্রশ্নে বাংলাদেশের মানুষ অস্বস্তিতে ভুগছে। তাই বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব প্রকট। এর উপর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার অভিযোগ তো আছেই।

এতোসবের ভেতর বার্মার আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর চালানো নিপীড়ন-নির্যাতন এ অঞ্চলে নতুনমাত্রা যোগ করেছে। বার্মা বলছে, রোহিঙ্গারা বার্মার অধিবাসী নয়, তারা বাংলাদেশী। অথচ অধুনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ওয়েবসাইট এইমর্মে একটি খবর প্রচার করেছে যে, ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ এবং বার্মা সরকারের মধ্যে সম্পাদিত এক চুক্তিতে বার্মা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের আরাকানে আইনগত আবাস রয়েছে স্বীকার করে তাদের ফিরিয়ে নিতে অঙ্গীকার করে (সূত্রঃ ক্লিক)। সাইটটি সম্পাদিত চুক্তির ছবিসম্বলিত অনুলিপিও প্রকাশ করেছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনে নি বা আন্তর্জাতিক কোন ফোরামে উত্থাপনও করে নি। মনে করা হয়, এই চুক্তির কারণেই ১৯৭৯ সালে বার্মার তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান নে উইন বাংলাদেশে ঢুকে পড়া ২ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বার্মায় ফিরিয়ে নেন। পরবর্তীতে দু’দেশের মধ্যে ১৯৯১ সালে চুক্তির আওতায় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জনকে ফেরত নেয় মায়ানমার। কিন্তু ২০০৫ সালে হঠাৎ করেই এ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় তারা। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪ লক্ষ ৩ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম আশ্রিত রয়েছে ।(সূত্রঃ ক্লিক) আসলে বার্মার সামরিক জান্তা কোন অবস্থাতেই রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বার্মার অধিবাসী মানতে নারায। তাই তারা রোহিঙ্গাদেরকে বহিরাগত বিবেচনা করে তাদেরকে উৎখাত করতে বর্ণনাতীত নিপীড়ন-নির্যাতন ও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে এমন তৎপরতার পেছনে যেমন রয়েছে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক রাজনীতি তেমনি ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক রাজনীতির বিষয়টি বিস্তারিত জানতে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ইনসাফ ডট কম-এ প্রকাশিত “আরাকান থেকে রোহিঙ্গারা উৎখাত হলে বাংলাদেশ বিপদে পড়বে” শীর্ষক প্রবন্ধটি দেখা যেতে পারে (সূত্রঃ ক্লিক)। বাকি রইল ভূ-রাজনীতির বিষয়টি।

রোহিঙ্গা-ইস্যু এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি
রোহিঙ্গা-ইস্যুকে একপাশে রেখে অনেকটা দৃশ্যের আড়ালে চলছে দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির জটিল খেলা। এ খেলার তিন খেলোয়ার হচ্ছে: চীন, ভারত ও বার্মা। কিন্তু খেলার মাঠ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশকে পুরোপুরি কোলে রেখে। বাংলাদেশ কেবল খেলোয়ারদের বুটের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হবে আর খেলার কৃতিত্ব যাবে তিন খেলোয়ারের পকেটে। সর্বসাম্প্রতিক দু’টি ঘটনা সেই খেলার মূলচিত্রকে সামনে নিয়ে আসে। একটি হলো, জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি বিবৃতি প্রদানকে আটকে দিয়েছে চীন। আরেকটি হলো, ভারত রোহিঙ্গাপ্রশ্নে সরাসরি বিবৃতি দিয়ে বলেছে সে বার্মা-সরকারের পাশেই থাকবে। এ দু’টি বিষয় সামনে আসায় অনিবার্যভাবে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বিষয়টিও সামনে চলে আসে যেমনটা কান টানলে মাথা আসে। এ দু’টি বিষয়কে মাথায় রেখে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের সর্বসাম্প্রতিক ঘটনাবলী, ইতিহাস এবং কূটনৈতিক চরিত্র বিশ্লেষণ করে ভূ-রাজনীতির এক নতুন দিক উম্মোচিত হয়েছে যা পর্বেক্ষকমহলকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ এনে দেবে। বিষয়টি হলো: দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ভারত-মায়ানমার-চীন মিলে এক ত্রিকৌণিক বলয় তৈরি হচ্ছে যা বাংলাদেশকে এক কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আসুন এবার সে বিষয়ে আলোচনা করি।

ভারত-মায়ানমার-চীনের ত্রিকৌণিক বলয়: বিপদে বাংলাদেশ।
আমাদের ধারাবাহিক আলোচনায় আমরা গুরুত্বপূর্ণ চীন-মায়ানমার ও ভারত-মায়ানমার সম্পর্ক এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তথ্য- উপাত্তের খোঁজ-খবর নিয়েছি। আরো বিভিন্ন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্য ঘেঁটে একটি বিষয় খুব কৌতুহলোদ্দীপক ঠেকেছে আর তা হলো, উপমহাদেশীয় আঞ্চলিক রাজনৈতিক কৌশল আলোচনায় বাংলাদেশকে খুব গৌণ করে দেখানো হয়েছে বা বাংলাদেশের কথা এড়িয়ে আলোচনা এগিয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে খুব ভেবেছি এবং কারণ সম্পর্কে ধারণা নেয়ার সমূহ চেষ্টা করেছি। তবে সে বিষয়ে যাবার আগে আমরা চীন, মায়ানমার ও ভারতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রত্যাশাগুলোকে আরো একটু ঝালিয়ে নিতে চাই। এতে আসন্ন উপসংহার নিয়ে আর কোন ধোঁয়াশা থাকবে না আশা করি।

চীন উপমহাদেশের কেবল বৃহত্তম রাষ্ট্রই নয় বরং বলা চলে একটি উদীয়মান পরাশক্তি। তার সাথে রয়েছে মায়ানমার ও ভারতের স্থল-সীমান্ত। পার্শ্ববর্তী দুই দেশের সাথে চীনের সম্পর্কের চরিত্র বিচারে বলা যায়, সম্পর্ক ভারতের সাথে ইতিবাচক না হলেও মায়ানমারের সাথে ইতিবাচক। আবার বাংলাদেশের সাথে চীনের স্থল-সীমান্ত না থাকলেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইতিহাস আছে। চীনের সাথে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সম্পর্কের বিচারে এই দুই দেশের মধ্যে মায়ানমার যে বর্তমানে এগিয়ে গেছে তা স্বীকার করতে হবে। কারণ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ভারতমুখী পররাষ্ট্র নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। ভারতের সাথে চীনের বৈরী সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যে কৌশলগত দিক থেকে চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থান দখল করে ছিলো সেই অগ্রগামী অবস্থান বাংলাদেশ ধরে রাখতে পারে নি তার ভারতপন্থী পররাষ্ট্রনীতির কারণে। এর প্রতিক্রিয়ায় চীন আপাতত মায়ানমারকে কোলে উঠার সুযোগ দিচ্ছে। রোহিঙ্গা-ইস্যুতে চীন নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতি আটকে দিয়ে বাংলাদেশকে সে বার্তাই দিয়েছে। এতে রোহিঙ্গা-ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্থান নেয়া কঠিন হয়ে গেলো এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভূমিকাহীন ও অকর্মণ্য দেশ হিসাবে পরিগণিত হবার পথ প্রশস্ত হলো। অন্যদিকে মায়ানমারের সাথে চীনের স্থল সীমান্তের বদৌলতে আর্থনীতিক ও সামরিক সহায়তা নিয়ে মায়ানমার বাংলাদেশকে টেক্কা দেয়ার এবং বাংলাদেশের শক্তিকে চ্যালেন্জ করার পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। সত্যি সত্যি এমনটা ঘটলে ভারত ও বার্মার মতো দুই বৈরী প্রতিবেশীর চাপে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের জন্য ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসাবে দেখা দেবে। বার্মার সাথে চীনের ঘনিষ্ঠ হবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বার্মাকে বৈরী ভারতের Look East Policy বা পূর্বদিকে মনযোগ দেয়ার নীতি অর্থাৎ আসিয়ান( ASEAN)-এ প্রবেশের পথকে বাধাগ্রস্থ করা। সেই হিসাবে চীন মায়ানমারকে কূটনৈতিক ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে বাগে রাখতে বদ্ধপরিকর থাকবে। উপরন্তু চীন মায়ানমারের বিপদের বন্ধু ও অভিভাবক।

অন্যদিকে ভারত মায়ানমারের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চাওয়ার মূল কারণ দু’টি। এক. বাংলাদেশকে চাপে রেখে স্বার্থ আদায় এবং দুই. আসিয়ানের সাথে সম্পর্কের পথ প্রশস্তকরণ। যেহেতু বার্মা বাংলাদেশের একটি বৈরী প্রতিবেশী তাই বার্মাকে বাংলাদেশের উপর কোন না কোনভাবে চাপ সৃষ্টির মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করা। আরেকটি হলো, বার্মা যেহেতু আসিয়ানভুক্ত দেশ তাই বার্মার মাধ্যমে আসিয়ানের সাথে সম্পর্ক স্থাপন। এই দুই স্বার্থকে সামনে রেখে ভারত বার্মাকে সব রকমের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। রোহিঙ্গা-ইস্যুতে বার্মার পাশে থাকার ভারতীয় বিবৃতি বাংলাদেশ ও বার্মার প্রতি ভারতের স্পষ্ট বার্তা বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এই বার্তা বাংলাদেশের জন্য সতর্কীকরণমূলক ও বার্মার জন্য উৎসাহব্যঞ্জক বলে ধারণা করা যায়। এখানেও ভারতের এই বিবৃতির কারণে স্পষ্টতঃই বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা-ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থান নেয়ার সুযোগ কঠিন হয়ে গেলো।

বাকি রইল মায়ানমার। দীর্ঘ সামরিক শাসনে অতিষ্ঠ বার্মা যে ভাবেই হোক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢুকতে চায়। বার্মার এই স্বার্থ হাসিলে বার্মা চীন ও ভারতকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে ছাড় দিয়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হতে বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি চীন ও ভারতের সহযোগিতার সুযোগে বার্মা আরকানকে রোহিঙ্গাশূণ্য অঞ্চল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তাই আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষত জাতিসঙ্ঘের যে কোন উদ্যোগে বার্মা বর্ম হিসাবে চীন ও ভারতকে কাছে পেতে আগ্রহী যেমনটা ইসরাঈল পেয়েছে আমেরিকাকে। চীন ও ভারত চাইছে বার্মার রোহিঙ্গা-ইস্যুতে উচ্চবাচ্য না করে বার্মার কাছ থেকে স্বার্থ হাসিল করা।

এখানে আমরা চেষ্টা করেও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটাকে কোন মূখ্য ভূমিকা পালনকারী হিসাবে আলোচনায় টেনে আনতে পারি নি বাংলাদেশ নিজেই নিজেকে কূটনৈতিক ব্যর্থতার নিচে সমাহিত করে রাখার কারণে। রোহিঙ্গা-ইস্যুতে বাংলাদেশ একদিকে যেমন নির্লজ্জভাবে নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছে তেমনি একটি মানবিক ইস্যুতে ভূমিকা রাখার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনেও ব্যর্থ থেকে গেছে। ফলে, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ভারত, মায়ানমার ও চীনের ত্রিকৌণিক নতুন এক কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত হবার সুবর্ণ-সুযোগ সৃষ্টি হলো যা বাংলাদেশকে উক্ত দৃষ্টিকোণে ভয়াবহ বিপদে ফেলে দিচ্ছে–এতে আপাতত কোন সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ মানবিক দৃষ্টিকোণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবে আর সেটার সমাধান খোঁজার বা কোন প্রত্যাবাসনের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক দৃঢ় সমর্থন পাবে না। সেটাই হবে বার্মার জন্য অন্যতম একটি ইতিবাচক দিক। এটাতে মায়ানমারের সফলতার চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতাই বেশি প্রতিভাত হবে।

এখন কী করবে বাংলাদেশ?
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এখন এক অস্বস্তিকর সঙ্কটের মুখোমুখী। সরকারের অদূরদর্শীতা, অসচেতনতা এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার চাপ পুরো রাষ্ট্রকে অস্থির করে তুলছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা-ইস্যুই সম্ভাব্য উত্তরণের একমাত্র পথ। অর্থাৎ, সাপের বিষ সাপকে দিয়েই তুলতে হবে। সঙ্গত কারণে, বাংলাদেশ এখন যা করতে পারে:

১. একটি স্বাধীন ও উদার পররাষ্ট্রনীতির আলোকে রোহিঙ্গা-ইস্যুকে পর্যবেক্ষণ করা।
২. রোহিঙ্গা-ইস্যুতে চীনের সাথে কূটনৈতিক আলোচনার সূত্রপাত করা এবং চীনকে দিয়ে মায়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করা।
৩. দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক-এর বৈঠক ডেকে রোহিঙ্গা-ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা।
৪. মুমলিম-বিশ্বের সংস্থা ওআইসি (OIC)-র ফোরামে রোহিঙ্গা-ইস্যু উত্থাপন করা।
৫. ইতঃপূর্বে বাংলাদেশের সাথে মায়ানমার সরকারের রোহিঙ্গাবিষয়ক চুক্তিগুলো আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরা।
৬. আঞ্চলিক দেশসমূহের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের উপর রোহিঙ্গা-ইস্যুর নেতিবাচক প্রভাব তুলে ধরা।
৭. রোহিঙ্গাদের উপর বার্মার গণহত্যার চিত্র তুলে ধরে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে মনযোগী হওয়া যেমনটা ১৯৭১ সালে ভারতের ইন্দিরা গান্ধী করেছিলেন।
৮. রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে প্রবেশাধিকার দেয়া, তাদেরকে নৈতিক সাহায্য প্রদান এবং রোহিঙ্গা যুবকদেরকে বাংলাদেশের নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা যেমনটা ১৯৭১ সালে ভারত করেছিলো।
৯. আন্তর্জাতিক প্রটোকলকে সামনে রেখে রোহিঙ্গা-ইস্যু নিয়ে আলোচনার জন্য মায়ানমানের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেশ করা।
১০. জাতিসঙ্গে রোহিঙ্গা-ইস্যু উত্থাপন করা। প্রয়োজনে তুরস্কের মতো শক্তিশালী দেশের সহযোগিতা গ্রহণ করা।

দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থকে সামনে রেখে উক্ত বিষয়গুলোকে বিবেচনা করা যেতে পারে।


সমাপ্ত