মজলুম রোহিঙ্গা মুসলমানদের জিম্মি করে লুটপাট চালাচ্ছে জলদস্যুরা

মজলুম রোহিঙ্গা মুসলমানদের জিম্মি করে লুটপাট চালাচ্ছে জলদস্যুরা

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

আল মুহাজির শাইখ


অবশেষে ওপারে আটকে পড়া ভাইদের পারাপার প্রকল্প স্থগিত করতে বাধ্য হলাম। আমাদের একমাত্র বাঁধা হলো জলদস্যু ওরফে মাঝি। প্রথম যেদিন উদ্ধারকার্যের রূপরেখা তৈরী করতে করতে শাহপুরী দ্বীপ থেকে সিএনজিযোগে দক্ষিণপাড়া যাচ্ছিলাম তখন সিএনজি-চালক খুব আন্তরিকতার সাথে আমাদেরকে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়্। আসার সময় তার নাম্বার ও ছবিও সংগ্রহ করে রাখি।

পরদিন বিশ্বস্ত মাঝি খুঁজতে গিয়ে সিএনজি চালকের তথ্য অনুযায়ী পেয়ে গেলাম আপদমস্তক সুন্নতাবৃত একজন নৌকা-মালিককে। জনাব নূরুল কবীর থাকেন শাহপুরী দ্বীপের মাঝপাড়াতে। বেশভূষা ও কথাবার্তায় এমন দ্বীনদার লোক পাওয়া দুষ্কর। আল্লাহ-রাসূলের নাম ছাড়া কোন কথাই তিনি জানেন না। বিগত দিনগুলোতে নিজের নৌকা দিয়ে রহিঙ্গাদের উদ্ধার ও নিজের ঘরে তাদের আশ্রয়দানে তিনি কী কী অবদান রেখেছেন তা বলতে লাগলেন। এখন বিভিন্ন সীমাবদ্ধতায় খুব বেশি কিছু করতে পারছেন না। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলাম। আশ্বস্ত হলাম, এবার বুঝি দ্বৈত-উদ্যোগে প্রাণরক্ষা-প্রকল্প সফল হবেই হবে।

অবশেষে ঠিক হলো, কবীর মাঝিকে ২২ হাজার টাকা ও স্থানীয় দালালগোষ্ঠিকে কমবেশি ৮ হাজার টাকা দিলে আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়নে আর কোন বাঁধা থাকবে না। রাজী হয়ে ৪টি নৌকা ভাড়া করা হলো। প্রতি নৌকায় প্রাপ্তবয়স্ক ১৫জন করে মোট ৬০জনকে উদ্ধারের সিদ্ধান্ত হয়। সাথে গাট্টি-বোঁচকা ও ছোট ছোট বাচ্চা একদম ফ্রী। এমন সুন্দর সুযোগ দ্রুত বাস্তবায়নে টীম ছুটে চললো নৌকাঘাটে। মাঝিদের আন্তরিকতা ও সেবাধর্মীয় বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা শুনে তো আমাদের আস্থা ও স্বস্তি আরো বেড়ে গেলো। হিসাব কষতে শুরু করলাম, তাহলে ১,০০,০০০ লোক আনতে কতগুলো নৌকা ও কত খরচ হবে, ইত্যাদি।

ঠিক ভরদুপুরে নৌকা ছাড়লো মিয়ানমারের নাইক্ষংদিয়া অভিমুখে। সাথে আমাদের একজন প্রতিনিধিও থাকছেন। পুরো নদীপথে মাঝি-মহোদয় খোশহালে থাকলেও ওপারে পৌছার সাথে সাথে চূড়ান্ত হিংস্র চেহারায় সে আভির্ভুত হয়। নৌকা থেকে নেমে কোন কথাবার্তা ছাড়াই দু’হাত দিয়ে মালামাল তুলতে শুরু করে। প্রথমে বুঝতে না পারলেও অসহায়দের নিরন্নপায়ী চিৎকারে বুঝা গেলো, ছিনতাই চলছে। টানা ১০-১৫ দিন না খাওয়া দূর্বলগুলো কি জলদস্যুদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারে? বাঁধা নয়, কিঞ্চিত প্রতিবাদ করায় আমাদের প্রতিনিধিকে মাঝ নদীতে ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ করে বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো শুরু করে। এক পর্যায়ে পাটাতনের নিচ থেকে ভারী ভারী অস্ত্র ও বড় বড় রাম দা দেখিয়ে বলে, সামান্য উচ্চবাচ্চ করলে গুলি করে নদীতে ফেলে দেওয়া হবে।

পরদিন। আমাদের প্লানিং আরো নিখুঁত ও নিরাপদ করার জন্য আজ আর সেদিকে যাওয়া হয় নি। সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন জনের সাথে মাঝিদের এসব বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা জেনে কর্মপদ্ধতি নির্ণয়ের চেষ্টা চলছে। ঘুরতে ঘুরতে দেখা হলো একজন ২৭-২৮ বছর বয়সী বোনের সাথে। তিনি ভুক্তভোগী। নাম নূর বেগম। তার কেউ নেই। কিচ্ছু নেই। শুধু চার হাত-পা নিয়ে বাঁচার আশায় ওপারে বসে ছিলেন। নিজের নিঃস্বতার কথা কাকুতি-মিনতি করে মাঝিকে বললে মাঝি রাজী হয়ে গেলো। বিনা-পারিশ্রমিকে তিনি এপাড়ে পৌছবেন। আহ, মাঝিরা কত্ত ভালো!!!

শাহপুরী দ্বীপে নৌকা ভিড়ার পর সবাই নেমে পড়ে। কিন্তু বোনটিকে মাঝিরা নামতে দেয় নি। তাকে আটকিয়ে ৫০ হাজার টাকা দাবী করে। অনাদায়ে রাম দা দেখিয়ে গলা কাটার হুমকি। বোনটি বারবার নিঃস্বতার কথা বলেই যাচ্ছে। আর তার উপর চলছে শারীরিক ও মানসিক অবর্ণনীয় নির্যাতন। অবশেষে সৌদিতে থাকা একজন আত্মীয়ের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা দিলে মুক্তি মিলে তার।

সব বাদ দিয়ে অন্য একভাবে কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে গতকাল ১৮ই সেপ্টেম্বর। নৌকা ছেড়ে যাবে টেকনাফের ভাঙ্গাঘাট থেকে। নাইক্ষংদিয়া হয়ে এই নৌকা এসে ভিড়বে এই ভাঙ্গাঘাটেই। একজন আরাকানী দ্বীনদার ভাইয়ের সহযোগিতায় কয়েকজন নামাজী মাঝিকে ঠিক করা হয়। তারা প্রথমে নিজেদের জীবন-ঝুঁকির কথা বলে মাফ চায়। কারণ, ভাঙ্গাঘাট থেকে সেদিকে নৌকা যাওয়ার অনুমতি নেই। জলদস্যুদের সিণ্ডিকেট বিষয়টি জানতে পারলে আর জীবন রক্ষা হবে না। তবুও বহুত বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজী করানো হলো। ছেড়ে গেলো ৩টি নৌকা। ওপারে গিয়েই ধরা খেলো সিণ্ডিকেট চক্রের এক সদস্যের কাছে। তার কাজই হলো, কাদের কাছে টাকা-পয়সা, গহনা ও স্বর্ণালঙ্কার আছে তা খুঁজে খুঁজে বের করে তাদেরকে এক পাশে একত্র করা। নৌকাগুলো ভিড়ার সাথে সাথে অপরিচিত মাঝিদেরকে দেখে সে চতুর্দিকে ফোন দেওয়া শুরু করে। ইতোমধ্যে প্রতিটি নৌকাতেই ১০-১২ জন করে উঠে পড়েছে। ফোন পেয়ে দ্রুত ছুটে আসা একটি ট্রলার দেখে আমাদের নৌকাগুলো রওয়ানা হয়ে যায়। সিদ্ধান্ত হয়, দিনে আর নয়। আমরা রাতে আবার যাবো।

সন্ধার পর নামলো ভাটা। প্রায় ৩-৪ কি.মি. হাঁটু-কাঁদা পাড়িয়ে মাঝিদের সাথে কিছু সেচ্ছাসেবী রওয়া হলেন। কাঁপা কণ্ঠে দুআ ইউনুস পড়তে পড়তে এগুতে থাকলেন। ঘুটঘুটে অন্ধকারে নতুন রুটের অপরিচিত গন্তব্যে পৌছতে কিছুটা কষ্ট ও সময় লেগে গেলো। কোন সংবাদ না পেয়ে আমরাতো হতাশ। বেশ কিছুক্ষণ পর খালিই ফিরে এলো নৌকাগুলো। এবারও তারা সিণ্ডিকেটের হাতে ধরা খেয়েছে। পরিষ্কার বলে দেওয়া হয়েছে, আরেকবার যদি এদিকে দেখি তাহলে তুইও যাবি, তোর নৌকাও যাবে। “ভাই, মাফ করেন। আমাদের দিয়ে সম্ভব না।”

প্রিয় পাঠক! আর কী করতে পারি? হয়তো করণীয় আরো অনেক কিছু ছিলো। কিন্তু আমরা এরচে’ বেশি পারি নাই। মাথায় রাখতে হয়েছে, এখানে যদি আমাদের কোন ঝামেলা হয়ে যায় তাহলে পরবর্তীতে এই এলাকায় ত্রাণ নিয়েও কেউ আসতে চাইবে না। এসব বিষয় মাথায় নিয়ে আপাতত আমরা ক্ষান্ত দিলাম। এই অভিশপ্ত জলদস্যুদের নামে শুধু আল্লাহর কাছেই বিচার দিলাম।

মাফ করে দিও! তোমাদেরকে শেষ পর্যন্ত আর রক্ষা করতে পারলাম না। হয়তো ওপারের ভূ-গর্ভে নয়, ভূ-পৃষ্ঠেই তোমাদের সমাধী। এই জগতে কষ্ট করলেও পরজগতে তোমরা সুখী হবে ইনশা আল্লাহ। সুধারণাবশতঃ আল্লাহর দরবারে আশা রাখি, জান্নাতুল ফিরদাউসই হবে তোমাদের পরম শান্তির ঠিকানা।


ফেসবুক থেকে