আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাসের রসদ

আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাসের রসদ

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ


ন্যায়, ইনসাফ, সুবিচার একথাগুলো  স্রেফ   আইন বা বিচারিক পরিভাষা নয়স; চিন্তা, দৃষ্টি, মূল্যায়ন ও জীবনবোধের প্রত্যেকটি পরতে এর প্রতিফলনই সভ্যতার বুনিয়াদি শর্ত। এর ব্যত্যয় ঘটলে বৈষয়িক উন্নতি আর বস্তুগত চাকচিক্যের অবকাঠামোগত সভ্যতা অস্তিত্বমান থাকলেও মানুষ আর ‘সভ্য’ থাকে না। শত্রু-মিত্র এমনকি সৃষ্টিজগতের যে কারও সঙ্গেই ন্যায্য আচরণ আর ইনসাফচর্চার যেখানে বিলুপ্তি ঘটে সেই অন্ধকারের অতলেই হারিয়ে যেতে থেকে মনুষ্যত্ব। কাজেই অন্তত সেই মানবিক চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং বাস্তব অর্থে একটি সভ্য পৃথিবীর জন্য চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ন্যায়, ইনসাফ ও সুবিচারের ভারসাম্যপূর্ণ জায়গাটি নিরাপদ রাখতে হবে। ঢালাওভাবে কোনো ব্যক্তি, শ্রেণী, গোষ্ঠীকে ‘ভালো’র সনদ প্রদান কিংবা ‘মন্দ’র তকমা লাগানোর আগে তার ভেতরে-বাইরে গভীর দৃষ্টিপাত, আগাগোড়া পর্যবেক্ষণ ও ইতিহাস ঘেঁটে দেখা বিচারবোধ আর যৌক্তিকতার দাবি।

রানা প্লাজায় দুর্গত মানুষের পাশে প্রায় সকলের অলক্ষে দিনরাত একাকার করে উদ্ধার তৎপরতায় একটি দল অবিশ্রান্ত কাজ করেছে ওরা কারা ? জাতিগত নির্মূলের শিকার, অসহায়, আহত, ক্ষুধার্ত লাখো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মুখে খাবার তুলে দেবার জন্য দলে দলে ছুটে যাওয়া সাহায্যকারী কাফেলার প্রথম সারিতে কাদের দেখা মেলে ? শতকরা একভাগও সরকারি সাহায্য ছাড়া সীমিত পর্যায়ে হলেও আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও স্বাবলম্বনের নির্ভৃতচারী আড়াল কারিগরদের খোঁজ রাখে কয়জন ? হাজারো সীমাবদ্ধতা আর গড়পড়তা ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও একটি বিশাল শ্রেণীর অসংখ্য ইতিবাচক অবদান আর কৃতিত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কতকিছুই তো অজানা ! জানার দুয়ারে যে, মিথ্যা আর সবল প্রচারণা দুর্ভেদ্য দেয়াল ! একলম কাড়তে হবে এ দেওয়াল ভাঙতে হবে। …সে প্রসঙ্গ আলাদা।

বলতে চাইছি, কওমী-জগৎ এবং অন্তর্নিহিত সামাজিক শক্তির খতিয়ান শীর্ষক বিশিষ্ট কলামিস্ট, সম্পাদক ও বিশ্লেষক মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদীর ছয় পর্বের প্রবন্ধসমষ্টি প্রসঙ্গে। অনলাইন পত্রিকা ইনসাফ টুয়েন্টিফোর ডটকম-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশিত হচ্ছে জেনে আমি খুবই আনন্দিত হবার পাশাপাশি একধরনের প্রশান্তিবোধ করছি। লেখককে অভিনন্দন নয় কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। ষষ্ঠ পর্বের শেষে ‘কৈফিয়ত’ শিরোনোমের অধীনে লেখক এক ধরনের দায়শোধের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। আমি বলবো তিনি পুরো কওমী সন্তানদের অনেকটা নির্ভার করেছেন। কৃতজ্ঞতা সেই কারণে। আমার প্রতি শ্রদ্ধাভাজন লেখকের হয়ে-ভালোবাসার সমান্তরালে খানিকটা উচ্চ ধারণা মাঝেমধ্যে আমাকে বেকায়দায় ফেলে দেয়। প্রত্যাশার চাপ সামলাতে বাস্তব কারণেই হিমশিম খেতে হয়। আমার ক্ষুদ্রতা, মূর্খতা ও ব্যর্থতা সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। তবে তার অনুরোধ তো আমার কাছে হুকুমের সমান। ছয় পর্বের এই প্রবন্ধগুলোতে তিনি তথ্যের যে সমাহার ঘটিয়েছেন তা ‘পেয়ালায় সমুদ্র ভর্তি’র সঙ্গে তুলনাযোগ্য মনে করি। ছোট কলেবরে বিপুল উপাত্ত সাজিয়ে উপজীব্য বিষয়ের একটি সামগ্রিক চিত্র এঁকেছেন বিজ্ঞ লেখক। কিছু কিছু কাজ হাতেগোনা লোকদের দিয়েই যথাযথভাবে হয়। তারা সাধারণের কাতারে নয় বিশিষ্টদের সারিতে অবস্থান করেন। কোনো অতিশয়োক্তি ছাড়াই মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী একজন সব্যসাচী লেখক এ দাবির আমার নয়, সমঝদার বহু পাঠকের; বহু প্রতিষ্ঠিত লেখকের। কাজেই ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টিতে এমন একটি গ্রন্থ রচনার জন্য তিনি যথাব্যক্তি।

গ্রন্থটির প্রতিপাদ্য বিষয় সম্পর্কে বিস্তৃত মন্তব্যের প্রয়োজন তেমন নেই। স্বয়ং লেখক নিজের কৈফিয়তে লেখাগুলো তৈরির ‘শানে নুযুল’ বেশ মুনশিয়ানার সঙ্গেই লিখে দিয়েছেন। তিনি এভাবে বলেছেন।

স্বাধীনতার আজ ছিচল্লিশ বছর অতিক্রান্ত। দূর্ভাগ্যজনকভাবে কওমী-জগৎ থেকে উগ্র-বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ শিবির থেকে আসা অভিযোগগুলোর কোন জবাব দেয়া হয় নি। কেন হয় নি এ নগণ্যের সেটা জানা নেই। জাতি আজ জানুক, দেখুক–এ দেশের জাতীয় উন্নয়নে, সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পথযাত্রায়, রাষ্ট্রের মানবসম্পদ উন্নয়নে, মানবিক সাহায্য প্রদানে এবং ধর্মীয় শিক্ষায় নৈতিকতা সৃষ্টিতে কওমী-জগতের অবদান সরকারের অন্য যে কোন বিভাগের চেয়ে বেশি ছাড়া কোন অংশে কম নয়। তাই কওমী-মাদরাসার বারান্দায় গড়াগড়ি দেয়া একজন নগণ্য কওমী-সন্তান হিসাবে আমি বিবেকের কাছে বারবার আঘাতে জর্জরিত হয়েছি, আহত হয়েছি। মনের প্রতিটি অলিতে-গলিতে বেদনার ভারে ভারাক্রান্ত হয়েছি। হন্য হয়ে খুঁজেছি, সেই অভিযোগগুলোর জবাব। যাঁদের কাছে কওমী-মাদরাসার লোকমা তুলে দু’হরফ পড়ে মানুষ হতে শিখেছিলাম; যাঁদের জুতোর স্পর্শে ধন্য হয়েছে এ জীবন সেই-সব মহাত্মাদের সম্পর্কে অবাস্তব প্রশ্ন উঠবে আর আমরা নীরবে হেঁটে যাবো সে কেমন করে হয়? এই কঠিন বাস্তবতার দৃষ্টিকোণে নেহায়েত কওমী-মাদরাসার ইজ্জতের দিকে তাকিয়ে, আমার ঋণগ্রস্থ-সত্ত্বার সতীত্বের আহ্বানে অবশেষে কলম ধরতে হলো স্বাধীনতার প্রায় চারযুগ প্রান্তে। আমার এ আলোচনা থেকে কোন কওমী-সন্তান যদি খুঁজে পান কওমী-শত্রুদের প্রত্যুত্তরের জবাব তবে এ নগণ্য এ আশায় বুক বাঁধবে: এটাকেই আমার নাযাতের উপায় হিসাবে গণ্য করা হবে কালকের কঠিন দিবসে

আমি বরং তরুণ প্রজন্মের পাঠক আর কওমী ঘরানার সঙ্গে সংযোগ-সংশ্লেষ রাখেন এমন বিজ্ঞ মহলের খেদমতে বিনয়ের সঙ্গে এটুকু মন্তব্য করতে চাই।

প্রথমত, গ্রন্থটি কওমী সন্তানদের আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাসের রসদ যোগাবে। দ্বিতীয়ত লেখাগুলো আমাদের চিন্তার পরিগঠন আর দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের বলিষ্ঠ পথনির্দেশনা দেবে।

আমি শ্রদ্ধেয় লেখক ও প্রকাশকদের জন্য মহান কাছে আল্লাহর কাছে জাযায়ে খাইর (সর্ববিধ কল্যাণকর উত্তম প্রতিদান) এবং গ্রন্থটির ব্যাপক প্রচার ও পাঠকপ্রিয়তার দোয়া করছি।