মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের ওপর নির্যাতন কেন?


বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম


একটা লম্বা সময় পর প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন। মাঝে তার গলব্লাডারে সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং তিনি সুস্বাস্থ্যে দেশে ফিরেছেন।

এজন্য আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। মাননীয় নেত্রী আমেরিকায় গলব্লাডার অপারেশন করলেন ২০১৭-তে। ’৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু করিয়েছিলেন রাশিয়ায়। কথাটা এজন্য মনে আছে যে বঙ্গবন্ধু যখন গলব্লাডার অপারেশনের জন্য রাশিয়ায় তখন কালিহাতীর রামপুরে এক নির্মম পুলিশি নির্যাতন হয়েছিল। রামপুর-কুকরাইলের শত শত মানুষ গৃহহারা হয়েছিল। ঘটনাটা ছিল অতি সাধারণ। বল্লা-রামপুর-কুকরাইল আমাদের এলাকার সমৃদ্ধ গ্রাম। সেই গ্রামে ডাকাতি করতে গেলে গ্রামবাসী চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে দুজন ডাকাতকে ধরে ফেলে। গণপিটুনিতে দুজনই মারা যায়। পরদিন দেখা যায় গণপিটুনিতে নিহত দুজনের একজন বল্লা পুলিশ ফাঁড়ির। আরও হয়তো থাকতে পারে। তারা পালিয়েছিল ধরা পড়েনি। পরদিন বল্লার পুলিশরা দল বেঁধে রামপুর-কুকরাইলে গিয়ে নির্বিচারে মারধর করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। ঘটনার দিন আমি দিল্লি ছিলাম। পরদিন ঢাকায় ফিরেই গভীর রাতে বড় ভাইয়ের ফোন পাই। তিনি আমার সঙ্গে প্রচণ্ড রাগারাগি করেন। আমার পুলিশ মানুষ মেরেছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে তার বিচার চান। তিনি এমপি, আমি কিছুই নই। তবু আমার সরকার আমার বঙ্গবন্ধু। পরদিন সবাইকে নিয়ে গিয়েছিলাম রামপুর-কুকরাইলে। সে অবর্ণনীয় দৃশ্য দেখে চোখে পানি রাখা যায়নি। একটা গ্রামে হাজার-বারো শ মানুষ। তার অর্ধেক মহিলা। তারা পুলিশি নির্যাতনে সবাই আহত, ক্ষত-বিক্ষত। অনেকের রান্নাঘরও ছিল না। সব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিয়েছিল। হানাদারদের গৃহদাহ দেখেছি, এ ছিল তার চেয়েও ভয়াবহ। রামপুর থেকে ফিরতে না ফিরতেই হুজুর মওলানা ভাসানী সন্তোষে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তার কাছে যেতে তিনিও রাগ, ‘এসব কী হচ্ছে? তুমি কিছুই করবা না?’ বড় ভাই বলেন, ‘তোমার সরকার’। হুজুর মওলানা ভাসানী বলেন, ‘কিছুই করবা না?’ কী করতে পারি? পরদিন হুজুর গিয়েছিলেন রামপুর। গাড়ি-ঘোড়া আমিই ব্যবস্থা করেছিলাম। পোড়া ঘর-দুয়ারের মাঝ দিয়ে হুজুরের পিছে পিছে ঘুরছিলাম কত কথা তিনি বলেছিলেন লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। রামপুর প্রাইমারি স্কুলমাঠে তাত্ক্ষণিক এক সভা হয়। হুজুর একপর্যায়ে হুঙ্কার ছেড়ে বলেন, ‘পুলিশের ডাকাতি করায় কোনো দোষ নেই, গণপিটুনিতে মারা যাওয়ায় গ্রামবাসীর দোষ। ’ ডিসি-এসপিরা পাশেই ছিল। একপর্যায়ে হুজুর হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘এক ঘণ্টার মধ্যে যদি গ্রেফতারকৃতদের ছেড়ে দেওয়া না হয় আমি টাঙ্গাইল জ্বালিয়ে দেব। ’ মারাত্মক ব্যাপার। মনে হয় ৫৩ জনকে গ্রেফতার করেছিল। ডিসিকে বলেছিলাম, এখনই ওদের ছেড়ে দিন। ৫২ জনকে ছেড়ে দেওয়ায় ডিসির কোনো আপত্তি ছিল না। একজনের নামে সুনির্দিষ্ট মামলা আছে তাকে ছাড়তে গড়িমসি করছিল। বলেছিলাম, এখনকার মতো ছেড়ে দিন। পরে যদি গ্রেফতার করতে হয় করবেন। আমরা সহযোগিতা করব। তখন এখনকার মতো মোবাইল ছিল না। ল্যান্ডফোন পেতেও মুশকিল হতো। সঙ্গে সঙ্গেই ছেড়ে দিয়েছিল। টাঙ্গাইল ফিরে মনসুর ভাইকে ফোন করেছিলাম। সিরাজগঞ্জের ক্যাপ্টেন মনসুর আলী তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বড় ভালো সাহসী মানুষ ছিলেন। বলেছিলাম, আপনার ডিসি-এসপিকে বলে দেন রামপুরের ঘটনায় যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল হুজুরের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সবাইকে ছেড়ে দিতে বলেছি। তখনকার মন্ত্রীরা এখনকার মন্ত্রীদের মতো ছিলেন না। তাদের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব ও ব্যক্তিত্ব ছিল। মনসুর ভাই ডিসিকে বলেছিলেন, ‘তুমি ঠিক করেছ। পরেও হুজুর যদি কিছু বলেন, কাদের যদি কিছু বলে তাদের কথা শুনে গর্ববোধ করো। ’ ভেবেছিলাম ব্যাপারটা সেখানেই মিটে গেছে। গভীর রাতে আবার মনসুর ভাইয়ের ফোন। তখন মন্ত্রীর ফোন পাওয়া ছিল এক পরম ভাগ্য। ফোন ধরে সালাম দিতেই তিনি বললেন, ‘কাদের! যত কষ্টই হোক সকাল ৮টার আগে আমার বাসায় আসতে হবে। তোমার নেতা তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। ’ তখন পাগল ছিলাম। নেতার কথা শুনলে সকাল-বিকাল-রাত খেয়াল থাকত না। মনে হয় সাড়ে ৭টায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি পৌঁছেছিলাম। যে বাড়ি হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাসদরা ঘেরাও করেছিল। যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোতলায় নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চেষ্টার পর মস্কোয় লাইন পাওয়া গেল। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘রামপুরে পুলিশি নির্যাতনের কথা শুনেছি। যেভাবে পারিস সামাল দে। শত্রুপক্ষ সব সময় ষড়যন্ত্র করছে। কোনো কিছু যাতে না হয় ব্যাপারটা তুই দেখবি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আজই রামপুরে যাবি। ’ মনে হয় এর এক বা দুই দিন আগে বঙ্গবন্ধুর গলব্লাডার অপারেশন হয়েছিল। তার কণ্ঠ খুব ক্ষীণ ছিল। তখনকার অপারেশন আর এখনকার অপারেশনে অনেক পার্থক্য। সে সময় ছিল কুকরাইলে পুলিশি নির্যাতন আর জননেত্রী শেখ হাসিনা আমেরিকায় অপারেশন করে ২১ দিন পর যখন দেশে ফিরলেন তার আগে মিয়ানমার থেকে শত সহস্র নির্যাতিত ছিন্নমূল মানুষের ঢল নেমেছিল বাংলাদেশে।
প্রথম দিকটায় সরকার তাদের আশ্রয় দিতে দ্বিধা করছিল। আসলে ব্যাপারটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বর্মি সেনাবাহিনী, অং সান সু চি খুন-খারাবি করে হয়তো পার পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের আশ্রয় না দিয়ে পার পাওয়ার কোনো পথ ছিল না। প্রাথমিক কাজটা খুবই ভালো হয়েছে। আমাদের দুয়ার খুলে না দিয়ে জননেত্রী জাতিসংঘে গেলে কত রকম সমালোচিত হতেন আমরা কেউ ভাবতেই পারি না। তিনি ভিআইপি লাউঞ্জে গণসংবর্ধনায় বলেছেন, ‘রেহানা একসময় বলছিল ১৬ কোটি মানুষকে যদি খাওয়াতে পারো আর ২-৪ লাখ মানুষকে কেন পারবে না। আল্লাহর নাম নিয়ে তাদের আশ্রয় দাও। ’ রেহানার কথায় অনেক গভীরতা আছে। এখন সে অনেকটা মায়ের মতো কথা বলে। রোহিঙ্গা সমস্যার শুরু আজকের নয়, এটা অনেক পুরনো। কিন্তু এবার এর প্রকৃত সমাধান করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বার্মার সরকারের প্রতিনিধি এসে কথা বলে যাওয়ায় শুভলক্ষণ মনে করেছেন। আমি যদি তার সঙ্গে একমত হতে পারতাম খুবই ভালো লাগত। কিন্তু কেন জানি একমত পোষণ করতে সবদিকে দ্বিধা। জাতিসংঘকে বাদ দিয়ে আলোচনায় বসায় আমরা প্রথমবারই অনেকটা হেরে গেছি। খুন করে শিনাজুরি করে গেলেন ভাবতেও অবাক লাগে। তাদের প্রমাণপত্রের ওপর ভিত্তি করে রোহিঙ্গাদের দেশে যেতে হবে এক-দুই শ বছর তো লাগবেই। আমাদের প্রথমই দরকার জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রাখাইন রাজ্যকে নিরাপদ অঞ্চল ঘোষণা করে সেখানে সম্মানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের বসবাসের ব্যবস্থা করে যত দিন লাগে তত দিন রাজনৈতিক, কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া। দেশের মানুষ যে দরদ দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের দরদে যাতে ঘাটতি না পড়ে সেদিকে প্রতিনিয়ত খেয়াল করা। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সফল নেতৃত্ব দিতে পারলে সারা পৃথিবীর কাছে আমরা যেমন অত্যন্ত সম্মানিত জাতি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে পারব, ঠিক তেমনি বিফল হলে পরিণতি ভয়াবহ হবে। তবে একটি কথা অবশ্যই বলতে হবে, এখন পর্যন্ত জাতীয়ভাবে তেমন কোনো কিছু হয়নি এবং জাতীয় ঐকমত্যের যে আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল তাকে খুব একটা কাজে লাগানো যায়নি।

জাতিসংঘ থেকে ফেরার পথে লন্ডনে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে দলীয় ও ব্যক্তিগত নানান অভাব-অভিযোগের কথা তুলে ধরেন। সেখানে সিলেট-৩-এর এমপি মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী কয়েছের নামে আওয়ামী লীগ নেত্রী রাহেলা শেখ তার পৈতৃক ভিটে-মাটি বিষয়-সম্পত্তি ছিনিয়ে নেওয়া বা দখল করার অভিযোগ করেন। স্বাধীনতার পর ’৭২ অথবা ’৭৩-এর শুরুর দিকে পাহাড়ি ঢলে সিলেটে এক প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয়েছিল। মানুষের দুর্ভোগের শেষ ছিল না। বিয়ানীবাজার, কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, সুনামগঞ্জ, ধিরাই, শাল্লা এমন কোনো জায়গা ছিল না যেখানে বন্যা ছোবল মারেনি। সেই দুর্যোগে সিলেটে এক মাস ত্রাণকার্য পরিচালনা করেছিলাম। ঢাকা-সিলেট রাস্তা অনেক জায়গায় ডুবে গিয়েছিল। ত্রাণসামগ্রী নিতে অনেকটা অসুবিধা ছিল। মিজান চৌধুরী তখন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী। সেই সঙ্গে বোধহয় তথ্যমন্ত্রীও। আমাদের কিছু ত্রাণসামগ্রী বিমানবাহিনীর দুটি হেলিকপ্টারে সিলেটে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় শাহ আজিজ, লালা, তোফা, বাবরুল হোসেন, রেড ক্রস চেয়ারম্যান রুরান সিরাজ আরও অনেকের সঙ্গে পরিচিত হই। লেছ, কয়েছ আরও কতজন। সিলেটের এমন কোনো জায়গা ছিল না যেখানে সেবার যাইনি হয় ত্রাণ দিতে, না হয় সভা করতে। প্রথম প্রথম ছাত্রলীগের লতিফ সিদ্দিকীবিরোধী গ্রুপ আমাদের অসহযোগিতা করেছিল। কিন্তু আমাদের রাতদিন ছোটাছুটি দেখে সব ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ সহযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে ভালোবাসা এখন পর্যন্ত অব্যাহত আছে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানি হানাদাররা ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা ডিনামাইট মেরে অকেজো করে দিয়েছিল। তখন খুব সম্ভবত একটাই সার কারখানা। তাই ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা দেখতে গিয়েছিলাম। এক বিশাল জনসভা হয়েছিল সেখানে। সে সময় মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরী কয়েছের বাবা স্বাধীনতাবিরোধী শান্তি কমিটির লোক হওয়ায় পালিয়ে ছিলেন। সামাদের বাবা ও তাদের আত্মীয়স্বজন পরিবার-পরিজনের কুকীর্তি প্রতিটি বক্তা উল্লেখ করে আমাকে বিচারের ব্যবস্থার জন্য বার বার দাবি জানাচ্ছিল। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তান সমর্থকের ছেলে মাহমুদ-উস সামাদ এখন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলের মনোনীত সংসদ সদস্য। খুব সম্ভব এমনি হয়। পাকিস্তান আন্দোলনের পুরোভাগে যারা ছিলেন তারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বাদ পড়েন। আর পাকিস্তানবিরোধীরা হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানপ্রেমিক। এসব বলার ভাষা নেই। যুগে যুগে অমন হয়েছে, এখনো হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্ন কেমন যেন ভূলুণ্ঠিত।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আরেকজনের কথা বলি। ঘাটাইলের বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধি, নিউজ টোয়েন্টিফোরের রিপোর্টার আতিকুর রহমান আতিককে নিয়ে এক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। শুনতাম কাকের মাংস কাকে খায় না। কিন্তু এখন সাংবাদিকের ভালো সাংবাদিকরা চায় না। একজন আরেকজনকে কতটা ছোট, কতটা হেয় করতে পারে সে নিয়ে সবাই ব্যস্ত। তা না হলে সাগর-রুনি খুনের বিচার হবে না কেন? অন্যদিকে হলুদ সাংবাদিকতাও সাংবাদিকদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিক্ষুব্ধ ও বীতশ্রদ্ধ হওয়ার এক মস্ত বড় কারণ। প্রথম প্রথম ঘটনাটি যখন শুনি তখন তেমন গুরুত্ব দিইনি। মনে হয়েছে আর দশটি ঘটনার মতো এটিও একটি। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা একসময় ধনে-জ্ঞানে-সম্মানে অনেক ওপরে ছিল। ’৭১-এ ঘাটাইলের মাকড়াইয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলাম। ইয়েমেন থেকে এসে আমাদের পূর্বপুরুষ ঘাটাইলের আঠারদানা, ব্রাহ্মণশাসন, নিয়ামতপুর, বেলদহ, দিঘলকান্দি, গৌরঙ্গীতে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সম্রাট হুমায়ুন, আকবর, শাহজাহানের লাখেরাজ পাট্টা ছিল তাদের। সেই ঘাটাইল এখন সন্ত্রাসের চারণভূমি। স্বাধীনতার সময় ঘাটাইলের সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা ছিলেন শামসুর রহমান খান শাহজাহান। তার এক ছেলে রাজনীতির আগেপাছে নেই। শামসুর রহমান খান শাহজাহানের ছোট ভাই আতাউর রহমান খান সেই সময় পাকিস্তান ন্যাশনাল ব্যাংকে চাকরি করতেন। এসপিও পদমর্যাদা হয়তো হবে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসই চাকরি করেছেন। দেখতে-শুনতে সুন্দর থাকায় পাকিস্তানের পছন্দের ছিলেন। পাকিস্তানের চাকরি করে এখন তিনি নাকি মুক্তিযোদ্ধা। তার চার-পাঁচ ছেলে একসময় সারা টাঙ্গাইল দখল করে নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর তারা সবাই ছিল ছোট ছোট। এখন খানেরা বেকায়দায়, অন্যেরা একই ভূমিকায়। তারই এক ছোট্ট প্রমাণ ঘাটাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাজমারা হাবিবুর রহমান বীরবিক্রমের ছেলে আতিকুর রহমান আতিককে ঘাটাইল পৌরসভার মেয়র শহীদুজ্জামান শহীদ পৌরসভা অফিসের বাথরুমে ৪ ঘণ্টা আটকে রাখে। পুলিশের সহায়তা চাইলে থানার ওসি মেয়রের সঙ্গে গালগপ্পো করেন। কিন্তু এই অমানবিক কাজের কোনো প্রতিকার করেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এত ভালো মানুষ, তার ওসি এমন খারাপ কেন? কিছুই বুঝতে পারি না। শহীদকে ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালো করে জানি না, চিনি না। রাস্তাঘাটে দু-এক বার দেখা হয়েছে। ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্টে সেনা দিবসে দেখা-সাক্ষাতে যে বিনয় দেখিয়েছে তাতে এসব ঘটনা শুনে প্রথম দিকে কিছুটা আশ্চর্যই হয়েছি। কিন্তু এখন দেখছি কারও সুকর্ম-কুকর্ম সম্পর্কে যতই লেখা হোক সবটুকু লেখা কোনো লেখকেরই ক্ষমতা থাকে না। শহীদের টিনের ঘর এখন দালান হয়েছে তাতে কোনো দোষ দেখি না। স্বাভাবিকভাবে হলে স্বাভাবিকভাবেই নেওয়া উচিত। কিন্তু সবই দেখছি অস্বাভাবিক। কাদেরিয়া বাহিনীর পাঁচ-ছয় জন কমান্ডারের নাম করলে জাহাজমারা হাবিব বীরবিক্রমের নাম আসে। কাদেরিয়া বাহিনীর একজন বীরউত্তম, তিজন বীরবিক্রম আর ১৪ জন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে হাবিবুর রহমান অন্যতম। সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের খুব একটা গুরুত্ব ও সম্মান থাকে না— এটা তার এক উজ্জ্বল প্রমাণ। মোস্তাফিজুর রহমান লালন আর আতিকুর রহমান নামে কমান্ডার হাবিব দুই ছেলে এবং হামিদা, পারভীন, রিতা সুলতানা, মর্জিনা, রোজী সুলতানা ও সেলিনা নামে ছয় মেয়ে রেখে গেছে। মারা যাওয়ার কিছু দিন আগেও ছেলেমেয়েদের আমার হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কই, আমি বেঁচে থাকতেও তাদের নিরাপত্তা দিতে পারলাম না।

বড় দুঃখ হয়। তবে একজন স্থানীয় সাংবাদিকের জন্য দেশের প্রায় সব জায়গায় সাংবাদিকরা জ্বলে ওঠায় তাদের অভিনন্দন জানাই। দেশকে স্বাভাবিক ও সুন্দর রাখতে ন্যায় ও সত্যের জন্য প্রতিবাদমুখর হতে হবে। অন্যায় করা যেমন অপরাধ, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা তার থেকে অনেক বড় অপরাধ।


লেখক : রাজনীতিক।


সৌজন্যে: বিডি প্রতিদিন


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74