নির্বাচন কমিশনে ইসলামী ঐক্যজোটের ১১ দফা প্রস্তাব পেশ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন দলের সঙ্গে সংলাপের অংশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় নির্বাচন কমিশনের সাথে ইসলামী ঐক্যজোটের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামীর নেতৃত্বে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিনিধিদল সংলাপে অংশগ্রহণ করেন। ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে ১১ দফা লিখিত প্রস্তাব ইসির সামনে তুলে ধরেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা সংলাপে সভাপতিত্ব করেন। অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারসহ ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিবও উপস্থিত ছিলেন। ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতী ফয়জুল্লাহ, ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী, মাওলানা আবদুল হামিদ (পীর সাহেব মধুপুর), মাওলানা আবদুর রশিদ মজুমদার, মাওলানা যোবায়ের আহমদ, মাওলানা জসিমউদ্দিন, অধ্যাপক মাওলানা এহতেশাম সারেয়ার, যুগ্ম মহাসচিব মুফতী মুহাম্মাদ তৈয়্যব হোসাইন, মাওলানা ফজলুর রহমান, মাওলানা আবুল কাশেম, মাওলানা শেখ লোকমান হোসাইন, মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াছেল, মাওলানা মঈনউদ্দিন রুহী, সহকারী মহাসচিব মাওলানা আলতাফ হোসাইন, মাওলানা একেএম আশরাফুল হক, সাংগঠনিক সচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন, মজলিসে শুরার সদস্য পীরজাদা সৈয়দ মোঃ আহসান প্রমুখ এসময় উপস্থিত ছিলেন।

জোটের চেয়ারম্যান মাওলানা নেজামী বলেন, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত, যে সংসদে জনগণের আশা-আকাঙক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে, এদেশের জনগণের চিন্তা-চেতনার রুপায়ণ ও অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি প্রতিফলিত হবে। এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বাতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে প্রয়াস চালাবে সংসদ। যে সংসদ দেশ, জাতি ও জনগণের কল্যাণে আইন প্রণয়ন করে এবং এর পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিবর্জন, পরিমার্জন ও সংশোধনী আনার দায়িত্ব পালন করে, এমন একটি সংসদ নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সর্বোপরি সংসদ সদস্যরাই দেশ পরিচালনার জন্যে সরকার গঠন করবেন এবং জাতির সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণে সংসদ সদস্যরা ব্রতী হবেন।

তিনি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ভোটার, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা এই নির্বাচন জাতীয় ঐক্যের চেতনার জগৎকে আলেড়িত করবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি নির্ণিত হবে। এই নির্বাচন জাতিকে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণীত করে উন্নতির ও উৎকর্ষের পথে পরিচালিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বজ্রকঠিন মনোবল, ইস্পাত কঠিন সংগ্রামী চেতনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে শত উস্কানির মুখেও দূরদর্শিতার মাধ্যমে সকল চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে হবে এবং ঝড়ঝঞ্ঝার মূখেও সত্যের পথ সব সময়ই আঁকড়ে থাকতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। আবেগ ও উচ্ছাস পরিহার করে বুদ্ধিবৃত্তিক কলাকৌশল অবলম্বন করার মাধ্যমে দুর্জয় বিশ^াস নিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। তিনি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ইসলামী ঐক্যজোটের নি¤েœাক্ত প্রস্তাব পেশ করেন :

(১)কারো প্ররোচনায় নয়, বরং অন্তরের তাগিদেই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বিবেকের আলোকে বিচার-বিবেচনার নিরিখে ভোট প্রদানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকালে প্রার্থী ও ভোটাররা যাতে শ্বাসরুদ্ধকর এবং বিভীষিকাময় পরিস্থিতির অশুভ থাবায় আক্রান্ত না হয়, সেদিকে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। নির্বাচনে অনৈতিকভাবে জেতার প্রয়াসকে যেকোন মূল্যে প্রতিহত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে, (২) পোলিং বুথে সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, (৩) প্রতিটি কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল জনসমক্ষে ঘোষণা করতে হবে এবং প্রত্যেক প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সার্টিফিকেট ইস্যু বাধ্যতামূলক করতে হবে, (৪) নির্বাচনের সময় প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা মূল্যায়ন করত প্রয়োজনে স্পর্শকাতর এলাকায় সেনাবাহিনী নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে সেনাবহিনী নিয়োগ করার প্রয়োজন নেই, (৫) নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে সকল প্রার্থীর নাম, দল ও প্রতীকের উল্লেখ সম্বলিত অভিন্ন পোস্টারের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল যোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাবে। নির্বাচনকালে প্রার্থীদের সকল প্রকার রঙিন পোষ্টার, ব্যানার ও অহেতুক আঞ্চলিক অফিস স্থাপন বন্ধ করতে হবে, (৬) তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠন পর্যন্ত বিদ্যমান সরকার শুধু রুটিন ওয়ার্ক করবেন। এমন কোনো পরিকল্পনা নিতে পারবেন না, যাতে ভোটাররা প্রভাবিত হতে পারে, (৭) নির্বাচনী বিরোধ পাঁচ বছরেও শেষ না হওয়ার বর্তমান পদ্ধতি পরিবর্তন করে নির্বাচনী অভিযোগ তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিধান করতে হবে। এর জন্যে হাইকোর্টে একটি পৃথক বেঞ্চ গঠন করা যেতে পারে, (৮) নির্বাচনকে কালো টাকা এবং পেশীশক্তির প্রভাবমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, (৯) নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দ-িত ব্যক্তিদের (দু’বছর পর) সংসদ নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ বাতিল করতে হবে, (১০) যে সকল দল ৩০-এর অধিক প্রার্থী মনোনয়ন দেবে, সে সকল দলকে বেতার ও টিভিসহ সরকারী প্রচার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সুযোগ দেয়ার বর্তমান নিয়ম বহাল রাখার দাবি জানাচ্ছে, (১১) সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচন কমিশনকেও নিরপেক্ষ করতে হবে। তাই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচন কমিশন থেকে প্রত্যাহার করতে হবে।

মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী আরও বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নির্ধারিত নির্বাচনী এলাকা এবং ভোটকেন্দ্র পুনঃনির্ধারণের দাবি জানান। তিনি ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে নতুন ভোটার তালিকাভুক্ত করা এবং মৃত ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ারও দাবি জানান।

তিনি পরিশেষে নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করার স্বার্থে নির্বাচন কমিশনের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান।

মতবিনিময়কালে ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ, ভাইস চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুল হামিদ (পীর সাহেব মধুপুর) ও সাংগঠনিক সচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসেনও বক্তব্য দেন।