প্রবাসী ইমামরা হতে পারেন রেমিট্যান্সের বড় উৎস

প্রবাসী ইমামরা হতে পারেন রেমিট্যান্সের বড় উৎস

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

যুবায়ের আহমাদ


মাওলানা মাহফুজ আহমাদ। লন্ডনের ইকরা টিভির নিয়মিত আলোচক, লন্ডনের ফরেস্ট গেটের জামিয়া দুরুস সুন্নাহ মাদরাসার উসতাদ ও মসজিদের খতিব হিসেবে কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের সিলেটের এ কৃতিসন্তান । তার মতো অনেক বাংলাদেশি আলেমই মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপ অ্যামেরিকার বিভিন্ন মসজিদে সগৌরবে দায়িত্ব পালন করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মূদ্রা বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন। সম্প্রতি সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পৃথিবীর ৭৩টি দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাকে বিশ্ব দরবারে উজ্জ্বল করে আমাদের দেশের কৃতিসন্তান হাফেজ আব্দুল্লাহ আল মামুন। পুরস্কার হিসেবে পায় ২৬ লাখ টাকা। প্রায় ১ কোটি টাকার পুরস্কার নিয়ে এসেছিলেন দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ২১তম দুবাই হলি কোরআন অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতায় ১০৩টি দেশকে পেছনে ফেলে বিজয়ী হওয়া বাংলাদেশের হাফেজ ত্বরিকুল ইসলাম। এভাবেই প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সন্তানরা বিজয়ী হয়ে কোটি কোটি টাকা রেমিট্যান্স নিয়ে আসছেন। বাংলাদেশের হাফেজ ও আলেমদের যথাযথ দায়িত্বপালন, মনোমুগ্ধকর তিলাওয়াতের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপ অ্যামেরিকা পর্যন্ত তাদের ইমাম হিসেবে পেতে চায়। কাতারের আমিরের প্রাসাদের রাজকীয় খতিব ঢাকার মারকাজুত তানজিল আল ইসলামিয়া ইন্টা: মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশের গৌরব হাফেজ মাও. সাইফুল জর্ডান, সৌদি আরব ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরস্কার হিসেবে বাংলাদেশে এনেছেন ১ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে দুবাইয়ের শ্রেষ্ঠ ইমাম নির্বাাচিত হয়ে বাংলাদেশের গৌরব বয়ে এনেছিলেন মাওলানা আবদুস সালাম। ব্রিটেনের অন্যতম বড় মসজিদ রিজেন্ট পার্ক মসজিদে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের কৃতিসন্তান মাওলানা কাজী লুৎফুর রহমান। দুবাইয়ের ৫০০ বছরের প্রাচীন আল বিদিয়া মসজিদে দীর্ঘ দিন ধরে ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রামের হাফেজ আহমাদ। বাংলাদেশের এ কৃতিসন্তানরা প্রবাসে থেকে দেশের জন্য প্রচুর রেমিটেন্স পাঠিয়ে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করে চলেছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে ৪ হাজার মসজিদ। এসব মসজিদে বাংলাদেশি খতিব ও ইমামের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও আমিরাতের ৭০ ভাগ মসজিদের মুয়াজ্জিনই বাংলাদেশি। তবে যারা মুয়াজ্জিন হিসেবে কর্মরত আছেন, তারাও ইমামের মর্যাদাই পান। (বাংলাদেশ প্রতিদিন : ১১ আগস্ট, ২০১৭)। যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন এবং শুদ্ধ উচ্চারণ ও সুকণ্ঠে কোরআন তিলাওয়াতে পারদর্শী হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে তাদের অনেক কদর। সেখানে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও শিক্ষক হিসেবে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বাংলাদেশি দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্তরা বাংলাদেশি টাকায় মাসে দেড় লাখ টাকা বেতন পান। এর বাইরে রয়েছে মুসল্লিদের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত হাদিয়া (সম্মানি উপহার)। পরিবার নিয়ে যাওয়া-আসা ও থাকার সব ব্যবস্থা করা হয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেই। যেহেতু থাকা-খাওয়ার খরচ হয় না তাই তারা যা বেতন এবং হাদিয়া পান তা দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা তারা দেশে পাঠাতে পারেন। সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের বাইরে রয়েছেন অনেক বেসরকারি ইমাম বা মুআজ্জিন। তাদের বেতন কিছুটা কম হলেও তারা কিছু ছাত্র পাড়িয়ে আয় করতে পারেন অতিরিক্ত টাকা। ফলে তারাও প্রচুর অর্থ দেশে পাঠাতে পারেন। এভাবে মাসে প্রায় ৭০ কোটি টাকা রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত ইমাম, খতিব, মুআজ্জিন ও ধর্মীয় শিক্ষকরা।

পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ ধনী দেশ কাতারে কর্মরত আছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ বাংলাদেশি ইমাম মুয়াজ্জিন। কাতারে মসজিদের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার। সেখানে ইমাম নিয়োগ হয় সরকারিভাবে। বাংলাদেশি আলেমদের মেধা, আচরণ, মনোমুগ্ধকর তিলাওয়াত, শুদ্ধ আরবি ও অন্যান্য সাফল্যের কারণে কতারিদের কাছে বাংলাদেশি ইমামদের ব্যাপক চাহিদা পূরণে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ থেকে কাতার সরকার ইমাম নেয়া শুরু করে। কাতারের আমিরের রাজকীয় প্রাসাদের খতিবের পদসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মসজিদের খতিব পদে বাংলাদেশি আলেম কর্মরত আছেন। কাতারে কর্মরত খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০ হলেও খতিবের সংখ্যা খুব কম। অধিকাংশই সহকারি ইমাম ও মুদাররিস (শিক্ষক)। খতিব ও মুদাররিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে বেতন পান ৭ হাজার ৭০০ রিযাল বা ১ লাখ ৭০ হাজার ৫৫৫ টাকা। এর বাইরে রয়েছে মুসল্লিদের পক্ষ থেকে প্রদত্ত হাদিয়া (সম্মানি উপহার)। যারা শুধু সহকারি ইমাম ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন, তারা পান ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪৫ টাকা বেতন। কাতারে খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য পানি, বিদ্যুৎ ও প্রয়োজনীয় সুবিধাসহ মানসম্মত আবাসন একেবারেই ফ্রি। চিকিৎসার খরচও বহন করে কাতার সরকার। ইমামরা তাদের সন্তানদের কাতারের সরকারি বিদ্যালয়ে একদম ফ্রি পড়ানোর সুযোগ পান। ফলে তারা বেতন ও হাদিয়া যাই পান পুরোটাই দেশে পাঠাতে পারেন। গড়ে ২ লাখ টাকা দেশে পাঠালে প্রায় ২৫ কোটি টাকা প্রতি মাসে তারা রেমিটেন্স পাঠিয়ে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছেন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে।

সউদি আরবে সাধারণত কোনো অনারব লোককে খতিব বা ইমাম পদে নিয়োগ দেওয়া হয় না। তবে ইমামদের সহকারি, মুয়াজ্জিন এবং খাদেম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিভিন্ন কোম্পানির মসজিদসহ সাহকারি ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম হিসেবে বেসরকারিভাবে প্রায় ২ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত। তারা মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা সম্মানী পান। মসজিদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত কিছু কাজও তারা করেন। তাদের জন্য সপরিবারে আবাসনের ব্যবস্থা করে মসজিদ কর্তৃপক্ষই। অনেক ক্ষেত্রে খাবারও দেয় মসজিদ কর্তপক্ষ। থাকা-খাওয়ার খরচ ঁেবচে যাওয়ায় মসজিদের বেতন ও অতিরিক্ত হালকা কাজের যে উপার্জন হয় তা দিয়ে মাসে ৫০ হাজার টাকার মতো তারা দেশে পাঠাতে পারেন। এভাবে সৌদি আরবে সহকারি ইমাম বা মুয়াজ্জিন হিসেবে কর্মরত বাংলাদেশি আলেমদের পক্ষ থেকে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে প্রায় ১০ কোটি টাকার রেমিটেন্স।

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে প্রসারিত হচ্ছে ইসলাম। মুসলমানের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মসজিদের সংখ্যাও। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় আড়াই হাজার মসজিদ রয়েছে। সেগুলোতে রয়েছে বাংলাদেশি ইমামদের চাহিদা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন মসজিদে কর্মরত বাংলাদেশি ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিন হিসেবে ২ হাজারেরও বেশি আলেম কর্মরত আছেন। তবে তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি কমিউনিটি পরিচালিত মসজিদগুলোতে কর্মরত। উল্লেখ্য, বাংলাদেশি কমিউনিটিতে প্রায় ৫ শত মসজিদ আছে। মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি তারা সেখানে শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেন। ইভিনিং মকতব, সাপ্তাহিক ক্লাস ও ইমামতি মিলে সপ্তাহে প্রায় ৫০০ পাউন্ড, মাসে ২ হাজার পাউ›ড বেতন পান ইমামরা। বর্তমান রেট অনুযায়ী (১ পাউন্ড ১১০ টাকা) মাসে ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশী ইমামরা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতন পান। তবে যুক্তরাজ্যে জীবনযাপন বেশি ব্যয়বহুল হওয়ায় এর অনেকটাই তাদের খরচ হয়ে যায় সেখানেই। তবু হিসেব করে চললে প্রায় ১ লাখ টাকা প্রতি মাসে তারা দেশে পাঠাতে পারেন। সে হিসেবে যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি ইমামদের থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২০ কোটি টাকা যোগ হচ্ছে আমাদের অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে কর্মরত ইমামরা দেশের গৌরব বয়ে আনার পাশাপাশি মাসে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা, বছরে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন। এ খাতে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনশক্তি নিতে আগ্রহী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পারস্পরিক বোঝাপড়া, সমঝোতা এবং ভিসা প্রসেসিংয়ের জটিলতার অবসানসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুবিধার হাত প্রসারিত করলে এ খাতে দক্ষ লোকবল দেশে অবদান রাখার পাশাপাশি দেশের বাইরেও গুরুত্বপূর্ন অবদান রেখে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করবে, অন্যদিকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জল করবে বিশ্ব দরবারে।


লেখক :
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্বারি ও খতিব, বাইতুশ শফীক মসজিদ, বোর্ড বাজার (আ. গনি রোড), গাজীপুর