রক্তাক্ত আরাকান

রক্তাক্ত আরাকান

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মাওলানা এরফান শাহ্


শিক্ষা-সংস্কৃতি, সভ্যতা ও মানবতার ধারক-বাহকের নাম মানব। যারা মানব হয়ে সভ্যতা ও মানবতাকে লালন করে না, তারা মানব জাতির কলঙ্ক। আর দ্বীন তথা ধর্ম হচ্ছে পরস্পর কল্যাণ কামনা। যে ধর্ম পরস্পর মঙ্গল কামনা করে না, তা ধর্ম হওয়ার মর্যাদা রাখে না। আর রাজনীতি মানে জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন। যে নীতির কারণে জনগণ নিজ দেশ, জন্মভূমি ও মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত হয়, তা রাজনীতি নয় বরং বলা যায় পোড়ামাটি নীতি!

পৃথিবী দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আকাশ-মহাকাশ, সাগর-মহাসাগর জয় করে মানুষ এখন চাঁদে। মঙ্গলগ্রহে বসবাসের আয়োজন চলছে। বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। অথচ বিশ্বায়নের এ যুগে কিছু মানুষের কোনো রাষ্ট্র্র নেই! ভূখন্ড নেই! নাগরিকত্ব নেই! মানুষের জন্য এর চেয়ে অপমানের, কষ্টের, পরাজয়ের আর কী থাকতে পারে! তারই মতো আর কিছু মানুষ এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য কোনো ভূখন্ড পায় না! জান-মালের নিরাপত্তা পায় না! মৌলিক অধিকার পায় না! আমরা কী তবে এখনো মানুষ হতে পারি নি? এই পৃথিবী কী তবে মানুষের পৃথিবী নয়? তাহলে এত শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি কার জন্য? বাস্তবে আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মুখোশ পরা এক অমানবিক ও হিং¯্র সভ্যতার মধ্যে বসবাস করছি। একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানবতা ও সভ্যতায় মানুষ এখনো কত পিছিয়ে তার নজির সাম্প্রতিক মগের মুল্লুক আরাকান ও ভিকটিম রোহিঙ্গা মুসলমান!
ইংরেজীতে একটি প্রবাদ আছে যার অর্থঃ “আমরা সবাই ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত বর্ণ আমাদেরকে ভিন্ন না করে, ধর্ম আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন না করে, রাজনীতি আমাদেরকে বিভাজিত না করে এবং সম্পদ আমাদেরকে শ্রেণিবদ্ধ না করে”। বর্ণ, ধর্ম, রাজনীতি আর সম্পদের ব্যবহারে ক্ষমতাকেন্দ্রিক যে বিশ্বব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলেছি সেখানে মনুষত্বেরই আজ বড় দুর্দিন। ড. র‌্যামেলের একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বিগত শতাব্দীতে পৃথিবীতে যত মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে, তার চেয়ে ছয়গুণ বেশি মানুষ মারা গেছে রাষ্ট্রের নিপীড়নে (Democide)।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। যে যার মতো করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শহর, গ্রাম সব একাকার হয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমও অসাধারণ মানবিক দায়িত্ব পালন করে চলেছে। নাফ নদের ওপারে মানবিকতার নির্লজ্জ পরাজয়ে জনপদ যখন ভারি হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই এপারে রচিত হয়েছে ভালোবাসা আর মানবিকতার অমর কাব্য। লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে ছোট্ট বাংলাদেশ মানবিকতার যে মহান জয়গানে মুখরিত হয়ে উঠেছে, তা বিশ্বে বিরল। হে মিয়ানমারের জান্তা সরকার! হে সুচি! নদীর এ পারের দৃশ্য দেখে যাও। সুচির কাছে জানতে ইচ্ছে করে, ‘শান্তি’ শব্দটি শুনলে সে কী বিব্রতবোধ করে না? নোবেল পুরস্কারের সনদটি কী তার ঘরের দেয়ালে এখনো টানানো আছে? সেটি চোখে পড়লে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায় না?

ইতিহাস থেকে জানা যায় সপ্তম বা অষ্টম শতাব্দী থেকে মুসলমানরা আরাকানে বসবাস করে আসছেন। (১৪৩০-১৭৮৪) প্রায় সাড়ে তিনশত বছর আরাকান মুসলমানরা শাসন করেছে। গৌড়ের সুলতানদের সহযোগিতায় আরাকানের স¤্রাট নরমিখলা ২৪ বছর বাংলায় নির্বাসিত থাকার পর ১৪৩০ সালে আরাকানের সিংহাসন ফেরত পান। পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আরাকানি রাজারাও বাঙালি ও মুসলমানদের আরাকানের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেন। সুতরাং আরাকানের রোহিঙ্গাদের বাঙালি বা মুসলমান যা-ই বলা হোক না কেনো, তারা কোনোভাবেই বহিরাগত নয়, বরং ১৭৮৪ সালে স্বাধীন রাজ্য আরাকান দখলকারী রাজা বোদাপায়া ও বর্মিরাই হলো দখলদার, নবাগত ও বহিরাগত।

১৯৪৭ সালে বার্মার প্রথম সংবিধানসভার নির্বাচনে রোহিঙ্গারা ভোট দিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে বার্মা স্বাধীন হওয়ার পর রোহিঙ্গারা সে দেশের সংসদে নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। ১৯৫১ সালে তারা পায় আরাকানের অধিবাসী হিসেবে পরিচয়পত্র। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের আরাকানের জাতিগোষ্ঠী বলে অভিহিত করেছিলেন। স্বাধীন মিয়ানমারের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম শাও সোয়ে থাইক বলেছিলেন, ‘রোহিঙ্গারা যদি স্থানীয় অধিবাসী না হয়, তাহলে আমিও তা নই’। কিন্তু নে উইনের নেতৃত্বে ১৯৬২ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকেই শুরু হয় রোহিঙ্গা দুর্ভোগের মহাকাব্য। তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়। বন্ধ হয়ে যায় রোহিঙ্গা ভাষায় রেডিও অনুষ্ঠান প্রচার। শুরু হয় ‘অপারেশন ড্রাগন কিং’ নামে রোহিঙ্গাবিতাড়ন কর্মসূচি। দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিধন চলে আসছে। রোহিঙ্গারা যদি মিয়ানমারের নাগরিক না হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রী উনু’র শাসনামলে সুলতান মাহমুদ কীভাবে মন্ত্রী হয়েছিলেন? কী করে শ্রমমন্ত্রী ছিলেন আব্দুর রশিদ? কেনো আব্দুর রাজ্জাককে মিয়ানমারের সংবিধানের খসড়া প্রণয়নকারীর গুরু দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল? রোহিঙ্গা মুসলিম কৃতিসন্তান সুলতান মাহমুদ, আব্দুর রশিদ ও আব্দুর রাজ্জাককে কীভাবে অস্বীকার করবে মিয়ানমার ও বিশ্ব সম্প্রদায়?

গৌতম বৌদ্ধের বাণী ‘জীব হত্যা মহাপাপ’। তাহলে কার সন্তুষ্টির জন্য রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে? বৌদ্ধের দর্শন ‘পৃথিবীর সকল প্রাণী সুখী হোক’। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে কীভাবে সুখ নিশ্চিত হতে পারে? ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ বৌদ্ধের এ বাণীর সাথে পৈশাচিকতা ও বর্বরতা কীভাবে সমান্তরালভাবে চলতে পারে? গৌতম বৌদ্ধের বাণী ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’র শরণ রোহিঙ্গারা পায় না বিধায় তারা আজ আমাদের দুয়ারে শরণার্থী। ওকূলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগদস্যু আর একূলে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মুসলিম। এ হচ্ছে নাফ নদীর দু’ কূলের চিত্র, পার্থক্য ও চরিত্র।

এ নশ্বর পৃথিবীতে কোনো কিছুই অমর বা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি উজির, সচ্ছল, ক্ষমতাবান, হতে পারেন কাল উনিই ফকির, নিঃস্ব, অসহায়। অপরের দুঃখে যদি আমরা দুঃখিত হতে না পারি, অপরের ব্যথায় যদি ব্যথিত হতে না পারি, মানুষের বিপদে যদি আমরা পাশে না দাঁড়াই, তাহলে এত আয়োজন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও মানবতা সবকিছু বৃথা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলেন, ‘তুমি পিতৃহীনের প্রতি কঠোর হয়ো না এবং ভিক্ষুককে ধমক দিয়ো না’।

আরাকান আজ আধুনিক এক মগের মুল্লুক! সাম্প্রতিক নতুন এক কারবালা! ভাগ-ভাটোয়ারার বৈশি^ক এক উর্বর ভূমি! এ বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ, আশা, স্বপ্ন, গতি ও গন্তব্যের যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে বিশ্বজনমত, মানবিকবোধ, বিশ্ববিবেক, জাতিসংঘ, আর্ন্তজাতিকমহল সবার সম্মিলিত প্রয়াস এবং রোহিঙ্গাদের নিজ জন্মভূমিতে পেরেক ঠুকে বাঁচার মরণকামড় ও প্রতিরোধ সংগ্রামই রোহিঙ্গাদের জন্য বিলম্বে হলেও ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনবে ইনশাআল্লাহ। যারা গণহত্যার শিকার হয়েছেন নিঃসন্দেহে উনারা শহীদ। আমরা উনাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করছি। আল্লাহপাক উনাদের জান্নাতবাসী করুন আমিন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক বলেনঃ “তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মু’মিন হও তবে তোমরাই জয়ী হবে”- ৩ঃ১৩৯।


লেখকঃ গ্রন্থকার ও গবেষক