ইবদেতায়ী মাদরাসা শিক্ষকদের করুণ জীবন

ইবদেতায়ী মাদরাসা শিক্ষকদের করুণ জীবন

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

যুবায়ের আহমাদ


বাংলাদেশে দুই ধরণের মাদরাসা চালু আছে। কওমি ও আলিয়া। সরকারি ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর ইবতেদায়ী। দাখিল (মাধ্যমিক), আলিম (উচ্চ মাধ্যমিক), ফাজিল (স্নাতক) কিংবা কামিল (স্নাতকোত্তর) আলিয়া মাদরাসাগুলোর প্রাইমারি স্তরকে বলা হয় ‘সংযুক্ত ইবতেদায়ী’ মাদরাসা। এর বাইরে থাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো কেবল প্রথম শ্রেণি থোক পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মাদরাসাগুলোকে বলা হয় ‘স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা’। সংযুক্ত ইবদেতায়ী মাদরাসাগুলোর শিক্ষকরা সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতনো মূল অংশ পান। কিন্তু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসাগুলোর শিক্ষকদের জন্য আজো কোনো স্কেল দেওয়া হয়নি। এসব মাদরাসার হাজার হাজার শিক্ষক যুগের পর যুগ বেতন-ভাতার অপেক্ষা করে বেতনভাতা না পেয়েই অবসর গ্রহণের রেকর্ড করেছেন। অনেকে সরকার স্বীকৃত এব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করে শিক্ষকের ন্যূনতম মর্যাদা পাওয়া বুক ভরা আশা নিয়েই জীবন শেষ করেছেন। জীবন ফুরিয়ে গেল, স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী শিক্ষকদের অপেক্ষা ফুরাল না। সরকার আসে সরকার যায়, কেউ এ শিক্ষকদের দিকে তাকায় না। নতুন সরকার এলেই হাজার হাজার শিক্ষক স্বপ্ন দেখেন, ‘এই বুঝি আমরা শিক্ষকের মর্যাদা পাব’। কিন্তু তা হয় না। স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা থেকে উচ্চ শিক্ষায় এসে অনেকে ভালো চাকরি করছেন, কিন্তু ওই মাদরাসাগুলোর শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন কী নির্মম!

১৯৮৪-৮৫ সালে ১৮ হাজার ১৯৮টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ি মাদরাসা রেজিস্ট্রেশন পায়। ১৯৯৪ সালে একই পরিপত্রে বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠা রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষকদের মাসিক ৫০০ টাকা হারে সম্মানী দেওয়া হয়। রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে। ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয় কিন্তু একই সময়ে রেজিষ্ট্রিকৃত স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসাগুলোর ভাতা ৫০০ টাকাই থেকে যায়। (দৈনিক আমাদের সময় : ১০ অক্টোবর, ২০১৭)। এমনকি বিগত চারদলীয় জোট সরকার গণমানুষের ইসলামী মূল্যবোধকে পুঁজি করে ক্ষমতায় আসলেও একটি বারের জন্যও ফিরে তাকায়নি এই চরম অবহেলিত ইবতেদায়ি শিক্ষকদের দিকে। রেজিস্টার্ড স্কুলগুলো সরকারিকরণের ঘোষণার দিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণ জাতীয়করণের ঘোষণাও করেছিলেন। সেই থেকে ইবতেদায়ী শিক্ষকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। একই বছর তাদের (এমপিওভুক্ত ৬ হাজার ৭৬ জন শিক্ষকের) ভাতা ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। তারপর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষাদের বেতনভাতা নিয়ে বিরাজমান সমস্যা সমাধানে শিক্ষামন্ত্রণালয় একটি গঠন করে। সে কমিটি তিনটি প্রস্তাব তৈরি করে। প্রস্তাবগুলো ছিল : ১. প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতোই স্কেল দেওয়া। ২. স্কেলের ৫০ শতাংশ দেয়া। ৩. ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করা। (যুগান্তর: ২৭-০৯-২০১৬)। প্রথম প্রস্তাব অর্থাৎ প্রাথমিকের সমান স্কেল দেওয়ার বিষয়টি কার্যকর হয়নি। হয়নি দ্বিতীয়টিও। তৃতীয় প্রস্তাব অনুযায়ী ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করা হয়েছে। আফসোস! সে প্রস্তাব বান্তাবায়নের ক্ষেত্র মানুষগড়ার কারিগর শিক্ষকদের মানবেতর জীবনযাপনের দিকে তাকানো হয়নি। অথচ যারা চাইলেই শিক্ষকদের জন্য প্রাথমিকের সমান স্কেল প্রদানের প্রস্তাব কার্যকর করতে পারতেন, কিন্তু করেননি তারাও তো কোনো না কোনো শিক্ষকেরই ছাত্র। ভুলে গেলন শিক্ষকসামাজকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণে সরকারের সদিচ্ছার কথা আবারো উঠে আসে মিডিয়ায়। ইবতেদায়ী মাদারাসা জাতীয়করণ এবং শিক্ষকদের সব সুবিধা দিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আলাদা বৈঠক করে। গত ৪ মে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ইবতেদায়ী শিক্ষকদের জাতীয়করণের দাবি মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মন্ত্রী, সচিব হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পেলেই শিক্ষকদের এ স্বপ্ন আশার আলো দেখবে। (মানবজমিন : ৩১ মে, ২০১৭)। আশা করা যাচ্ছে ইবতেদায়ী মাদরাসা জাতীয়করণের সাহসী ও মহান কাজটি করে ইতিহাসের স্থায়ী অংশ হওয়ার সুযোগটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাতছাড়া করবেন না।

আজ মাদরাসা অবহেলিত অথচ ভারতীয় উপমহাদেশের মূল ধারার শিক্ষাই হলো কোরআনী শিক্ষা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বৃটিশদের হাতে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে আমদের পূর্ব পুরুষদের প্রণীত একমাত্র শিক্ষাব্যবস্থা ছিল মাদরাসা। মুসলিম শিশুদের শিক্ষা শুরু হতো কোরআন শিক্ষার মাধ্যমে। তৎকালীন সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা ছিল পূর্ণাঙ্গ ইসলামী। বিখ্যাত একজন ঐতিহাসিক বলেছেন, ‘, ‘Between the age of four and five years the Muslim boys and girls were required to attend the Primary Madrasah for their primary education. It was customary to start with Bismillah ceremony of a boy or girl at the age of four years, four months and four days.’  (A. R. Mallic, British policy and Muslim in Bengal: 149). -অর্থাৎ ‘মুসলিম বালক-বালিকাদের জন্য চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই ইবতেদায়ি (প্রাথমিক) মাদরাসায় ভর্তি হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এটা ছিল প্রতিটি মুসলিম পরিবারের অপরিহার্য প্রথা যে, যখন কোনো সন্তানের বয়স চার বছর চার মাস চার দিন পূর্ণ হলে ‘বিসমিল্লাহ অনুষ্ঠান’ নামের একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার শিক্ষার সূচনা হতো।’ পবিত্র কোরআনের কিছু অংশ শিশূকে পাঠ করে শুনানো হতো শিশু তা পুনরাবৃত্তি করত।

প্রাথমিকের সীমা অতিক্রম করার পর মাদরাসায় তাদেরকে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রকৌশলবিদ্যা পড়তে হতো। ৭০০ বছরের মুসলিম শাসনের সময়ে উপমহাদেশের মাদরাসাগুলো ব্যয়ভার বহনের জন্য বিশাল সম্পত্তি ওয়াকফ করা ছিল। বৃটিশরা এসে প্রাথমিক শিক্ষার শত শত বছর ধরে চলে আসা সেই মাদরাসাগুলোকে বন্ধ করে দেয়। মাদরাসার জন্য ওয়াকফকৃত সম্পত্তিগুলো বাজেয়াপ্ত করে দিয়ে চাঁপিয়ে দেয় ধর্মহীন প্রাথমিক শিক্ষা। বৃটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা উদ্ধার হলেও ওয়াকফকৃত সম্পত্তি আর ফিরে পায়নি আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যের ধারক মাদরাসাগুলো। বৃটিশ পরবর্তী সময়েও মাদরাসা থেকে অনেক সূর্যসন্তানের জন্ম হয়েছে। শহীদ তিতুমীর, হাজী শরিয়তুল্লাহ, মওলানা ভাসানী, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশের মতো সূর্য সন্তান তৈরি হয়েছিলেন মাদরাসা থেকেই। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতা আলিয়া মাদসারার ছাত্র। পিতা মৌলুভি মো. ইয়াসিন খান সাহেবের কাছে গ্রহণ করা দ্বীনি শিক্ষাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের বুনিয়াদ। আজো মাদরাসার ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়। বিসিএসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখে। অন্যদিকে সন্ত্রাস, জুয়া, ইয়াবা, ফেনসিডিলের মতো মাদকসহ সব ধরণের অসামাজিক কর্মকা-ে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ প্রায় শূন্যের কোটায়।

শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড অত্যন্ত প্রশংসিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছে ইবতেদায়ী শিক্ষকরা। আশা করি তাদের হতাশার দিন ফুরাবে এ সরকারের হাত ধরেই। এমপিও বা কোনো প্রকার বেতনভাতা না পাওয়ায় যেসব মাদরাসা অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে সেগুলোকে প্রাণ সঞ্চারকরণসহ সবগুলো স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসাকে জাতীয়করণ করে প্রমাণ করবেন যে তিনিই বৈষম্যহীন শিক্ষাবান্ধব প্রধানমন্ত্রী। ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে বঞ্চিত শিক্ষকদের মুখে হাসি ফুটিয়ে কোটি তাওহিদী জনতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেবেন। বাংলা ইংরেজির পাশাপাশি কেরআনের সোনালি অক্ষর ‘আলিফ, বা, তা, ছা’র শিক্ষার উন্নয়ন করে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা’আলার দরবারেও মর্যাদার স্থান অর্জন করবেন।


লেখক:
কলামিস্ট ও গবেষক; বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজি জাতীয় দৈনিকের নিয়মিত লেখক।
jubayer.ahmad93@gmail.com