মুসলমানদের পতন কেন

মুসলমানদের পতন কেন

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুহাম্মাদ আবু আখতার


প্রথম পর্ব


ভুমিকা


রাসুলুল্লাহ (সা) এর আভির্ভাবের পর ইসলামের উত্থানের খুব অল্প সময়ের মধ্যে মুসলিমজাতি সব দিক দিয়ে অন্যান্য জাতির চেয়ে খুব দ্রুত গতিতে উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করে৷ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, আন্তর্জাতিক ইত্যাদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে৷ জাহেলী যুগে যাদের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নানা পাপাচারে পরিপুর্ণ ইসলামের পরশে তাদের জীবন হয়ে উঠে অত্যন্ত পুণ্যময়৷ ইসলামের শিক্ষা গ্রহণ করে তারা এমন উন্নতমানের চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করে যা দেখে বিধর্মীগণ দলে দলে ইসলামগ্রহণ করে৷ জাহেলীযুগের পারিবার ব্যবস্থা ছিল বিশৃঙ্খল ও অশান্তিময়৷ নারী নির্যাতন ও ব্যভিচারের ব্যাপক প্রচলনে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়েছিল৷ ইসলামের দিকনির্দেশনায় নির্ধারিত নিয়মনীতি অনুসরণের মাধ্যমে মুসলমানদের মাঝে সুশৃঙ্খল ও শান্তিময় পরিবার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়৷ মক্কার মুসলমানগণ যখন কাফির মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মদীনায় হিজরত করে তখন তাদের মাঝে একটি শান্তিপুর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়৷ মদীনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণের পর তাদের দীর্ঘ দিনের শত্রুতা ভুলে গিয়ে মক্কার নির্যাতিত মুহাজির মুসলমানদের আশ্রয় দেয়৷ তারা সবাই মিলে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সৌহার্দপূর্ণ সামাজিক জীবন যাপন করে৷ রাজনৈতিকভাবে মুসলমানগণ এমন ক্ষমতাশীল হয়ে ওঠে খুব অল্প সময়ে তারা সমগ্র আরব এবং পারস্য ও রোম সম্রাজ্যেসহ প্রায় অর্ধ পৃথিবীতে তাদের ক্ষমতা বিস্তার করে৷ খিলাফাতে রাশেদার ত্রিশ বছর শাসনের পর পর্যায়ক্রমে উমাইয়া খিলাফত, আব্বাসী খিলাফাত, ফাতেমী খিলাফাত, উসমানী খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়৷ ১৯২৪ সাল পর্যন্ত খিলাফতের শাসন ব্যবস্থা চলে৷ সামরিক দিক থেকে মুসলিম জাতি এমন শক্তিশালী হয়ে উঠে তৎকালীন পরাশক্তি রোম ও পারস্য রাজ্যের সৈন্যবাহিনী তাদের মোকাবেলায় টিকে থাকতে পারে নি৷ অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা এমন স্বাবলম্বী হয়ে পড়ে যে, যাকাত গ্রহণের মত লোক তাদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যেত না৷ মুসলমানদের মাঝ থেকে জাহিলিয়্যাতের অপসংস্কৃতি দূরীভুত হয়ে ইসলামী সংস্কৃতির বিজয় সাধিত হয়৷ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শিতা অবলম্বন করে তারা তৎকালীন সমস্ত জাতির চেয়ে অগ্রগতি লাভ করে৷ অন্যান্য ধর্মের লোকেরা মুসলমানদের উন্নত চরিত্র এবং ক্রমবর্ধনমান উন্নতি ও অগ্রগতি দেখে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে৷ ফলে অতি দ্রুত মুসলমানদের সংখ্যা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়৷

কিন্তু বর্তমান বিশ্বে মুসলিম জাতির অবস্থা সম্পুর্ণ বিপরীত৷ অন্যান্য জাতির চেয়ে মুসলিম জাতির অবস্থা অত্যন্ত করুণ৷ অধিকাংশ মুসলমানের ব্যক্তিগত জীবন বিভিন্ন পেরেশানি ও দুশ্চিন্তায় পরিপুর্ণ৷ প্রত্যকেই তার জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন৷ অধিকাংশ মুসলিম পরিবারে শান্তি নেই৷ স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের মাঝে প্রায় সময়ই মনোমালিন্য সৃষ্টি হচ্ছে৷ এমনকি বিবাহবিচ্ছেদ ও পরকিয়া ক্রমবর্ধমানহারে বেড়েই চলছে৷ বর্তমান মুসলিম সমাজ অশ্লীলতা-বেহায়াপনা, ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি-হানাহানি, কপটতা-প্রতারণা, মিথ্যা-ধোকাবাজি, অন্যায়-দুর্ণীতি ও নানা প্রকার পাপাচারে পরিপুর্ণ৷ মুসলমানদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থাও খুব করুণ৷ তুরস্কের ইসলামবিদ্বেষী শাসক মোস্তফা কামাল খিলাফত ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পর মুসলিম বিশ্ব ছোট ছোট রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে পড়ে৷ ফলে সবখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়৷ গনতন্ত্রের নামে তারা নিজেরা পরস্পরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিবাদে জড়িয়ে পড়ে৷ সরকারী দল ও বিরোধীদলের পারস্পরিক শত্রুতাপুর্ণ মনোভাবের কারণে দেশের উন্নয়ন ব্যহত হয়ে পড়ে৷ বর্তমানে অর্থনৈতিক দিক থেকে অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র অনেক পিছিয়ে৷ মুসলিম রাষ্ট্রসমুহের মাথাপিছু আয় অন্য রাষ্ট্রসমুহের চেয়ে অনেক কম৷ জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায়ও মুসলমানরা এখন অনেক পিছিয়ে৷ অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রেই ইসলামী সংস্কৃতির চেয়ে পাশ্চাত্য সাংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার বহুগুণ বেশি৷ মুসলিম রাষ্ট্রগুলো বর্তমানে সামরিক দিক থেকেও অত্যন্ত দুর্বল৷ ইরাক ও আফগানিস্তানে ইঙ্গমার্কিন খ্রিস্টান বাহিনী, ফিলিস্তিনে ইসরাইলের ইয়াহুদী বাহিনী, ভারতের কাশ্মীরে হিন্দু বাহিনী, মায়ানমারের আরাকানে বৌদ্ধবাহিনী নির্বিচারে অন্যায়ভাবে মুসলমানদের ওপর অবর্ণনীয় জুলুম নির্যাতন চালাচ্ছে৷ কিন্তু এসব মাজলুম মুসলমানদেরকে জুলুম থেকে রক্ষার জন্য মুসলিম বিশ্বের কোন রাষ্ট্র কিছুই করতে পারছে না৷ সবদিক থেকে মুসলমানদের পতনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে৷ কেন একসময়ের বিশ্ববিজয়ী মুসলিম জাতির আজ এরূপ অধঃপতন? এ প্রশ্ন আজ সকলের মনে৷

রাসুলুল্লাহ (সা) এর নবুয়্যত লাভের পর হতে মুসলমানগণ ক্রমবর্ধমানহারে বিভিন্ন দিক দিয়ে উন্নতি লাভ করেছিল৷ কিন্তু বর্তমান বিশ্বের মুসলমানগণ ক্রমবর্ধমানহারে পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে৷ কোরআন, হাদিস এবং ইতিহাসের আলোকে এর কারণ সম্পর্কে সামান্য কিছু কথা আলোকপাত করতে চাই৷৷ ওয়া মা তাওফিকী ইল্লা বিল্লাহ৷ ফাতাওয়াক্কালতু আলাইহি৷ (আল্লাহর সাহায্য ব্যতিত কোন কিছুই করা সম্ভব নয়৷ তাই আল্লাহর উপর ভরসা করলাম৷)


মুসলিমদের পতনের কারণসমুহ
প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান উন্নতি এবং বর্তমান যুগের মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান অবনতির পেছনে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে৷ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রহস্য ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করব ইনশাআল্লাহ৷

(১) ঈমানী দুর্বলতা ও নেক আমলে অবহেলা


প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান উন্নতি এবং বর্তমান যুগের মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান অবনতির প্রধান রহস্য হচ্ছে ঈমান ও আমলের ব্যবধান৷ সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর ঈমান ও আমল এবং বর্তমান মুসলমানদের ঈমান ও আমলের বিরাট ব্যবধান সম্পর্কে পর্যালোচনা করলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠে৷ ঈমান মুসলমানের সবচেয়ে বড় শক্তি৷ সত্যিকার ঈমানদারগণের বিজয় সুনিশ্চিত যদিও তারা সংখ্যায় কম হয়৷ আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারগণের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেছেন,
“আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে।”
(সুরা আলি ইমরানঃ ১৩৯)
ইসলামের ইতিহাসে বর্ণিত অসংখ্য ঘটণায় আল্লাহর এ বাণীর সত্যতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে৷ স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা) ও খোলাফায়ে রাশিদার যুগে প্রায় প্রতিটি যুদ্ধে মুসলমানদের লোকসংখ্যা ও অস্ত্রসস্ত্র কম হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমবাহিনী কাফিরবাহিনীর উপর বিজয় লাভ করে৷ ঈমানী শক্তির জোরে বদর যুদ্ধে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবী ১৹৹৹ কাফির সৈন্যের মোকাবেলায় বিজয় লাভ করে৷ মুতার যুদ্ধে মাত্র তিন হাজার সাহাবী এক লক্ষ রোমান সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করে৷ এরূপ আরো অনেক দৃৃষ্টান্ত ইসলামের ইতিহাসে আছে৷
ঈমান গ্রহণের পর যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী সৎকর্ম করবে তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা ৩ টি বিষয়ের ওয়াদা করেছেন৷ এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।”
(সুরা নুরঃ আয়াত নং ৫৫)
প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ ঈমান গ্রহণের পর আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতিটি হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করত৷ এ কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের সাথে কৃত ওয়াদা পুর্ণ করেছিলেন৷ তাদেরকে পৃথিবীতে অন্যান্য জাতির উপর শাসনকর্তৃত্ব দান করেছিলেন৷ ইসলামকে সকল ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন৷ আর কাফির বেঈমানদের জুলুম নির্যাতন থেকে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করেছিলেন৷
বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলমান সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর অনুসৃত পথ থেকে দূরে সরে আসায় তাদের অধঃপতন শুরু হয়েছে৷ এর ফলে তারা যেমন দুনিয়ার শাসনকর্তৃত্ব হারিয়েছে তেমনি কাফির বেঈমানদের নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে৷ কারণ তাদের অবস্থা এমন যে, ইসলামের যেসব বিধান তাদের পছন্দনীয় ও পালন করা সুবিধাজনক সেসব মেনে চলে৷ পক্ষান্তরে যেসব বিধান পালন করা একটু কষ্টসাধ্য সেসব বিধান মানতে তারা অবহেলা করে৷ এর ফলে তারা দুনিয়াতেও কাফির বেঈমানদের দ্বারা লাঞ্চিত হচ্ছে৷ পরকালীন জীবনেও আল্লাহর কঠিন শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠছে৷ এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে তাদের জন্য রয়েছে চরম লাঞ্চনা। আর কিয়ামতের দিন তাদের কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।”
(সুরা বাকারাঃ আয়াত নং ৮৫)


(চলবে)