সবর: নিশ্চিত সাফল্যের সোপান

সবর: নিশ্চিত সাফল্যের সোপান

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর


সবর বা ধৈর্য এমন এক মহৎ গুণ যা মানবিক মূল্যবোধ উন্নত করে, সফলতার পথ সুগম করে, সম্প্রীতির ছায়া বি¯তৃত করে, সর্বোপরী শান্তিময় সমাজ গঠনে নিয়ামক হিসেবে প্রতিফলিত হয়। অপরদিকে ধৈর্যচ্যুতির ফলে সামান্য ইস্যুতেও বড় দূর্ঘটনা ঘটে যায়, অশান্তি সৃষ্টি হয়, মানবতা লংঘিত হয়, সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়। যা ইসলাম কখনো অনুমোদন করেনা। তাই মু’মিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শান্ত, স্থির ও ধৈর্যশীল হওয়া।
ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বীর হিসেবে ঘোষণা করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা (র.) বর্ণনা করেন, রাসূলে কারীম (স.) ইরশাদ করেন, “ওই ব্যক্তি বীর নয়, যে তার প্রতিপক্ষকে পরাভূত করতে পারে; বরং (প্রকৃত) বীর ওই ব্যক্তি যে রাগের সময় (ধৈর্যধারণপূর্বক) নিজেকে সংবরণ করতে পারে।”Ñ(বুখারী ও মুসলিম শরীফ)। মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ ও শাশ্বত জীবন বিধান ইসলাম সে নৈতিক গুণের আলোয় মানবাত্মাকে আলোকিত করার তাকিদ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে কারীমের বিভিন্ন আয়াতে সুস্পষ্টভাবে মহান আল্লাহ সবর করার নির্দেশ দিয়েছেন। সবরকারী তথা ধৈর্যশীল ব্যক্তি সবমহলে প্রশংসিত হন। স্বয়ং আল্লাহ তা’আলাও ধৈর্যশীল ব্যক্তির প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “আমি তো তাঁকে (আইয়ুব আ.) সবরকারী হিসেবে পেয়েছি। কতই উত্তম বান্দা সে! নিশ্চয় সে ছিল আমার অভিমূখী।”Ñ(সূরা সোয়াদ, আয়াত-৪৪)। হযরত লুকমান (আ.) নিজের আদরের সন্তানের উদ্দেশ্যে যে নসিহত করেছিলেন, তা আল্লাহ তা’আলার এত বেশি পছন্দনীয় হয়েছে যে, ওই সব নসিহত কুরআনে কারীমের আয়াত হিসেবে নাযিল হয়েছে। তৎমধ্যে অন্যতম নসিহত হলো সবর করা। যথা- “হে বৎস, নামায কায়েম কর, সৎ কাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ কর এবং মুসীবতের সময় ধৈর্যধারণ কর, নিশ্চয়ই এটা সাহসিকতার কাজ।” (সূরা- লুকমান, আয়াত- ১৭)।
ধৈর্য্য মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাফল্যের দ্বার উন্মোচন করে। তাই যেকোন কাজে সফলতা অর্জনে ধৈর্য ধারণের বিকল্প নেই। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ, ধৈর্যধারণ কর, ধৈর্যে প্রতিযোগিতা কর এবং মুকাবিলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।”Ñ(সূরা-আলে ইমরান, আয়াত-২০০)। যারা নিজেরা সবর করে এবং অন্যকে সবরের উপদেশ দেয় মহান আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্থতা থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, “মহাকালের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ। কিন্তু তারা নয়; যারা ঈমান আনে ও সৎ কর্ম করে এবং যারা পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও সবরের উপদেশ দেয়।”Ñ(সূরা- আসর)।
যুগে যুগে প্রেরিত নবী-রাসুলগণ সকলেই কঠিনতম বালা-মুসীবতের সম্মুখীন হয়ে ধৈর্যের সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ বিষয়ে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “এবং ইসমাঈল (আ.), ইদ্রিস (আ.) ও যুল-কিফল (আ.) এর কথা স্মরণ করুন, তারা প্রত্যেকেই সবরকারী ছিলেন।”Ñ(সূরা-আম্বিয়া, আয়াত-৮৫)। এভাবে কুরআনে কারীমের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তা’আলা নবী-রাসূলগণের ধৈর্যশীলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কাফিরদের ঠাট্টা-বিদ্রুপের কারণে মর্মাহত বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) কে সান্তনাদানের উদ্দেশ্যে সবরের উপদেশ দিয়ে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “তারা যা বলে তাতে আপনি ধৈর্যধারণ করুন এবং স্মরণ করুন আমার শক্তিশালী বান্দাহ্ দাউদ (আ.) কে। সে ছিল অতিশয় আমার অভিমূখী। আমি পর্বতমালাকে তার অনুগামী করে দিয়েছিলাম। যেন তারা সকাল-সন্ধ্যায় তার সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা করে। আর সমবেত পক্ষীকূলও সবাই ছিল তার অভিমূখী। আমি তাঁর সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাঁেক দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও ফয়সালাকারী বাগ্মীতা।”Ñ(সূরা সোয়াদ, আয়াত- ১৭-২০)
সবর জাতির নেতৃত্বদানের জন্যও একটি অপরিহার্য গুণ। যেটি নেতার মধ্যে থাকা আবশ্যক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, “আমি তাদের (বনী ইসরাঈল) মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম; যারা আমার আদেশে পথ প্রদর্শন করত। কারণ তারা ধৈর্যধারণ করত এবং আমার আয়াত সমূহে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল।”Ñ(সূরা-সিজ্দাহ, আয়াত- ২৪)। এ আয়াত দ্বারা প্রতিভাত হয় যে, ধৈর্যধারণ করা ও মহান আল্লাহ্র ওপর অটুট বিশ্বাস স্থাপন করা জাতির নেতা বা পরিচালক হওয়ার পূর্বশর্ত। (মা’আরিফুল কুরআন, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৬১, ৬২, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত)।
কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা’আলা সবর করার নির্দেশ যেমন প্রদান করেছেন, তেমনিভাবে সবরকারীদের জন্য মহাপুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছেন। মহান রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, “তাদেরকে তাদের সবরের প্রতিদানে জান্নাতে সু-উচ্চ কক্ষ দেয়া হবে এবং তাদেরকে তথায় দু’আ ও সালাম সহকারে অভ্যর্থনা জানানো হবে।”Ñ(সূরা-ফুরকান, আয়াত-৭৫)। অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, “যারা সবরকারী তারাই তাদের পুরস্কার পায় অগণিত।”Ñ(সূরা-যুমার, আয়াত-১০)। এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে ‘তাফসীর মা’আরিফুল কুরআনে উদ্ধৃত হয়েছে, হযরত আনাস (র.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (স.) ইরশাদ করেন, “কিয়ামতের দিন ইনসাফের দাড়িপাল্লা স্থাপন করা হবে। দাতাগণ আগমন করলে তাদের দান-খয়রাত ওজন করে সে হিসাবে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে। এমনিভাবে নামায, হজ্ব ইত্যাদি ইবাদতকারীদের ইবাদত পরিমাপ করে, তাদেরকে প্রতিদান দেয়া হবে। অতঃপর বালা-মুসীবতে সবরকারীরা আসলে তাদের জন্য কোন ওজন হবে না; বরং তাদের অগণিত সওয়াব দেয়া হবে।” কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “যারা সবরকারী তারাই তাদের পুরস্কার পায় অগণিত।”Ñ(মা’আরিফুল কুরআন, ৭ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৫৩৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত।)
ধৈর্যধারণে ইসলাম মানবজাতিকে এভাবেই অধিকতর তাকিদ ও উৎসাহ প্রদান করেছে। পুরো জীবনকে ধৈর্যের গুণে বিভূষিত করতে হলে, বিশেষত তিনটি পর্যায়ে ধৈর্যধারণের প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।
এক. মহান আল্লাহ’র হুকুমের আনুগত্য ও ইবাদতে ধৈর্যশীলতাঃ
শরীয়তের যাবতীয় হুকুম মেনে চলা যত কষ্টকরই হোক না কেন, তাতে মন স্থির রেখে ধৈর্যশীলতার পরিচয় দেওয়াই মু’মিনের বৈশিষ্ট্য। যেমন- মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) নিজের আদরের কোমলমতি সন্তানকে কুরবানী করার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়ে মহান আল্লাহ’র হুকুমের প্রতি অবিচল আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। আর হযরত ইসমাঈল (আ.)ও মহান রবের নিকট কুরবানী হতে সম্মতি দিয়ে বলেছিলেন, “হে আমার পিতা আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা-ই করুন। ইনশাআল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।”Ñ(সূরা- সাফফাত, আয়াত- ১০২)। এই ঈমানদীপ্ত উচ্চারণ মহান আল্লাহ’র হুকুমের প্রতি হযরত ইসমাঈল (আ.) এর আনুগত্য ও ধৈর্যশীলতার প্রকৃষ্ট নজির। যাবতীয় শরয়ী আহ্কাম ও ইবাদত-বন্দেগীতে এমনই আনুগত্য ও ধৈর্যশীলতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। কারণ ইবাদতের মূল মর্ম হল আল্লাহ তা’আলার দরবারে আত্মসমর্পণ করা। আর আত্মসমর্পণে প্রয়োজন সর্বোচ্চ নম্রতা ও স্থিরতা। যা প্রতিফলিত হয় ধৈর্যশীলতার মাধ্যমে। “হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী কারীম (স.) (তাহাজ্জুদের নামাযে) দীর্ঘ সময় দাঁড়াতেন, এমনকি হযরতের পদযুগল ফুলে উঠত।”Ñ(বুখারী শরীফ)।

এটি ইবাদতের ক্ষেত্রে ধৈর্যশীলতার সুমহান দৃষ্টান্ত। হযরত আলী (রা.) এক যুদ্ধে পায়ে তীরবিদ্ধ হলেন। সাথীগণ ওই তীর বের করার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বেছে নিলেন নামাযরত অবস্থাকে। কারণ নামাযে তিনি অধিকতর স্থির থাকবেন। ফলে নামাযরত অবস্থায় সেই তীর বের করা হলো। এসময় হযরত আলী (রা.) এমন ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিলেন, যাতে করে স্থিরতায় ন্যুনতম ব্যাঘাতও ঘটেনি। মু’মিনগণ মহান আল্লাহর সামনে এরকম বিনম্র আত্মসমর্পণই করেন। যেমনটি আল্লাহতা’আলা ইরশাদ করেন, “অবশ্যই সফলকাম মুমিনরাই, যারা নিজেদের সালাতে (নামাযে) বিনয়ী-নম্র।” (সুরা-মু’মিনুন, আয়াত- ১, ২)। শরীয়তের অন্যান্য বিধান ও ইবাদত যথা- হজ্ব পালনে অত্যধিক আর্থিক ও শারিরিক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তেমনিভাবে যাকাত আদায়েও আর্থিক আত্মত্যাগই মূখ্য। রামাযানুল মোবারকের রোযা রাখাও প্রচন্ড কষ্টসাধ্য। সুতরাং, এসব ইবাদত ও আহ্কাম বাস্তবায়ন অতিকষ্টসাধ্য হওয়ায় তা পালনে শয়তান কুমন্ত্রণা জাগাতে পারে। তথাপি মহান আল্লাহ’র এসব বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতাও সৃষ্টি হতে পারে। এমতাবস্থায়ও ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিয়ে যারা হকের উপর সুদৃঢ় থাকবে তারাই প্রকৃত মু’মিন। মু’মিনদের এসব গুণাবলী সূরা মু’মিনুনসহ কুরআনে কারীমের বিভিন্ন আয়াতে সু-ষ্পষ্টভাবে ইরশাদ হয়েছে।
দুই. নাজায়েয ও হারাম থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে দৃঢ়তাঃ
সর্বপ্রকার নাজায়েয ও হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে ধৈর্য তথা সর্বোচ্চ দৃঢ়তা অবলম্বন করতে হবে। কারণ কুপ্রবৃত্তি মানুষকে মন্দ কর্মের দিকে প্ররোচিত করে। তাই সব লোভ-লালসা ত্যাগ করে কুপ্রবৃত্তি দমনে সর্বোচ্চ ধৈর্যশীলতার মাধ্যমেই হকের ওপর অটল অবিচল থাকতে হয়। এক্ষেত্রে হযরত ইউসুফ (আ.) এর ঘটনা সকলের জন্য অনুপম আদর্শ। সাতটি কক্ষ আবদ্ধ করে মিশরের রানী জুলাইখা স্বীয় মনস্কমনা পূর্ণ করার মিনতি জানালে হযরত ইউসুফ (আ.) ‘মা’আযাল্লাহ’ বলে নাফরমানী থেকে মহান আল্লাহর কাছে পানাহ্ চেয়ে সামনের দিকে দৌড় আরম্ভ করলে সকল দরজা একটির পর একটি খুলে গিয়েছিল। এ ঘটনা পবিত্র কুরআনে কারীমের সূরা ইউসুফে উল্লেখিত হয়েছে। হালাল উপার্জন করা, হারাম বর্জন করা আল্লাহ তা’আলার মহান হুকুম। তাই সুদ-ঘুষের মত সব লোভনীয় হারাম উপায় সমূহ বর্জন করে হালাল উপার্জনের ক্ষেত্রে ধৈর্যশীলতার পরিচয় দেয়া মু’মিনদের ঈমানী কর্তব্য। এমনভাবে ধৈর্যশীলতার সাথে প্রতিকুলতা মাড়িয়ে সম্মুখপানে অগ্রসর হলে মহান আল্লাহর সাহায্য আসে। সফলতা হাতছানি দেয়।
তিন. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা ঃ
বিপদাপদ মু’মিনদের ওপর মহান আল্লাহর পরীক্ষা। তাই বালা-মুসীবতে, রোগে-শোকে ধৈর্যধারণ করে মহান আল্লাহর সাহায্য চাওয়াই ইসলামের বিধান এবং সমস্ত নবী-রাসুলগণের চিরন্তন আদর্শ ও শিক্ষা। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।”Ñ(সুরা-বাকারা, আয়াত-১৫৩)। অপর আয়াতে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, “আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তবে (এক্ষেত্রে) সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।”Ñ(সূরা-বাকারা, আয়াত-১৫৫)।
এজন্যইতো সমস্ত নবী-রাসুলগণ জীবনের বাঁকে বাঁকে বহুমুখী বালা-মুসীবতের সম্মুখীন হয়েও ধৈর্য,সহনশীলতা ও মহানুভবতার সমোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উহুদ যুদ্ধের হৃদয় বিদারক ঘটনা স্বাক্ষী। এ যুদ্ধে মানবতার মুক্তির পথদিশারী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর দন্দান মোবারক শহীদ হয়। দুশমনের আঘাতে হুজুর (স.) এর চেহারা মোবারক রক্তাক্ত হয়। সে সময় আহত ও ব্যথিত সাহাবায়েকেরাম বদনসীব দুশমনদের নিপাতসাধনের জন্য বদ দু’আ করার অনুরোধ করলে উত্তরে মহানবী (স.) ইরশাদ করেন, “আমি বদ দু’আ করার জন্য প্রেরিত হইনি। আমি বিশ্বমানবের কল্যাণে ‘রহমত’ স্বরূপ প্রেরিত হয়েছি। তিনি এ দুঃসময়ে করুণ কণ্ঠে আল্লাহর দরবারে দু’আ করলেন, “হে আমার রব, আমার কওমকে হেদায়ত দান করুন, কারণ ওরা অজ্ঞ।”Ñ(বুখারী ও মুসলিম শরীফ)। এর চেয়ে ধৈর্যশীলতা ও মহানুভবতা আর কি-ই হতে পারে! শুধ তাই নয়; প্রিয় মাতৃভূমি মক্কার জমিনে নির্মমভাবে নির্যাতিত এবং তায়েফের প্রান্তরে রক্তাক্ত হয়েও সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ধৈর্য ও সহনশীলতার যে অপূর্ব নজির স্থাপন করেছেন, তা আমাদের জন্য সুমহান আদর্শ।
স্মরণীয় যে, হযরত ইব্রাহীম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর একটুও বিচলিত না হয়ে মহান আল্লাহ’র ওপর ভরসা করে ধৈর্যের অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। হযরত আইয়ুব (আ.) এর পুরো শরীর দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। তারপরও তিনি নৈরাশ না হয়ে সর্বক্ষণ মহান রবের যিকিরে মশগুল থেকে ধৈর্যশীলতার অনুপম দৃষ্টান্ত পেশ করেন। হযরত ইয়াকুব (আ.) বৃদ্ধাবস্থায় আদরের পুত্র ইউসুফ (আ.) কে হারিয়েও হতাশ না হয়ে অতিশয় ধৈর্যশীল ছিলেন। হযরত মূসা (আ.) ফিরআউন কর্তৃক সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়েও অসম ধৈর্যশীলতার পরিচয় দেন। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তা’আলা নবী-রাসুলগণের এমন ধৈর্যধারণের সুফল প্রত্যক্ষভাবেও দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তা’আলা নমরুদের অগ্নিকুন্ডকে শীতল ও আরামদায়ক করে হযরত ইব্রাহীম (আ.) কে জান্নাতের প্রশান্তি দান করেছেন এবং ইব্রাহীম (আ.) কে ‘খলীলুল্লাহ’ ও ‘মুসলিম মিল্লাতের পিতা’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। নমরুদকে পঙ্গু মশার কামড়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছেন। হযরত আইয়ুব (আ.) কে রোগমুক্ত করেছেন। মহান আল্লাহ’র রহমতে হযরত ইয়াকুব (আ.) নিজের হারানো পুত্র ইউসুফ (আ.) কে ফেরত পেয়েছেন এবং চোখের জ্যোতিও পুনরায় ফেরত পেয়েছেন। ফিরআউনের নির্যাতন থেকে হযরত মূসা (আ.) ও তাঁর কওম মুক্তি পেয়েছেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদীনা সনদ’ প্রণয়নের মাধ্যমে মদীনায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য কল্যাণকর আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছেন এবং কোন ধরণের রক্তাপাত ছাড়া মক্কা বিজয় করতে পেরেছেন। এ সবই ধৈর্যশীলতার মহান পুরষ্কার।
নবী-রাসূলগণ কর্তৃক বালা-মুসীবতে, রোগে-শোকে ধৈর্যধারণ ও সাফল্য অর্জনের এসব ঘটনাবলীর বিশদ ও স্পষ্ট বিবরণ পবিত্র কুরআনে কারীমের সূরা- আম্বিয়া, সূরা- সোয়াদ, সূরা- ইউসুফ, সূরা- বাকারাসহ বিভিন্ন আয়াত এবং বিশুদ্ধ হাদিসের কিতাব ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থসমূহে দীপ্তিমান হয়ে আছে। এছাড়াও সাহাবায়েকেরাম (র.), বুযুর্গানেদ্বীন ও ইসলাম প্রচারকদের ধৈর্যশীলতার বহু অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত রয়েছে।
অতএব, আসুন, মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ধৈর্যের মহত্ত্বে¡ নিজেদের জীবনকে দীপ্তিময় করি। অটুট করি মানবিক সম্প্রীতির বন্ধন। আত্মনিয়োগ করি শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে। নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের প্রতি সে নসীহতই করি, যে নসিহত মহান আল্লাহর স্বীকৃত বুদ্ধিমান মনীষী হযরত লুকমান (আ.) নিজের প্রিয় সন্তানের উদ্দেশ্যে করেছিলেন।) তবেই সমাজে মানবিক সম্প্রীতির আবহ বিরাজিত হবে। বইবে শান্তির সু-বাতাস। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সকলকে উত্তম ধৈর্যশীল হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।


লেখক: খতিব, শহীদ তিতুমীর ইনস্টিটিউট জামে মসজিদ, পৌরসভা, কক্সবাজার।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার ইসলামী সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ।