ভারত ও বাংলাদেশের হওয়া উচিত একে অপরের উপকারী বন্ধু ও স্থায়ী সুপ্রতিবেশী: মুহিব খান

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুহিব খান

এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই যে, হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য ও বিপুল সমৃদ্ধ বর্ণিল ভাষা সংস্কৃতি জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মের মহামিলনভূমি বিশাল শক্তিধর রাষ্ট্র ভারত আমাদের স্থায়ী প্রতিবেশি।

বাংলাদেশের দক্ষিণদিকজুড়ে বঙ্গোপসাগর আর দক্ষিণ-পূর্বকোণের মায়ানমারটুকু ছাড়া ভারতই আমাদের তিনদিক ঘেরা একমাত্র প্রতিবেশি দেশ। আর এই বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটির তিনদিকে বিস্তৃত ভূখণ্ড ভারতকে তো আল্লাহই স্থাপন করে দিয়েছেন, ইচ্ছে করলেই আপনি আপনার এ প্রতিবেশিকে পাল্টে নিতে পারবেন না।

আপনার যিনি স্থায়ী প্রতিবেশি, আপনাকে বুঝতে হবে যে- তার সাথে ভালো-মন্দ সবদিক যথাসম্ভব মানিয়ে নিয়েই আপনাকে সবসময় চলতে হবে।

আপনার প্রতিবেশি হতে পারেন একেবারেই আপনার মনের মতো। সর্বাবস্থায় আপনার অকৃত্রিম বন্ধু, সহযোগী, সহমর্মী, এমনকি সুহৃদ অভিভাবকও।

অথবা তিনি হতে পারেন আপনার কিছুটা বা অনেকটাই অপছন্দের। তার কোনোকিছু বা অনেক কিছুই হয়তো আপনার ভালো লাগার নয়, আপনার জন্য বিরক্তিকর, অস্বস্তিকর, অশান্তিকর।

আবার তিনি হতে পারেন আপনার খুবই বিপরীত, লোভী, দাম্ভিক, আগ্রাসী ও ভয়ানক। এমনকী আপনার অস্তিত্বের জন্যও হুমকি ও বিপজ্জনক।

সব সত্ত্বেও আপনাকে যখন তার পাশেই বসবাস করতে হবে, তখন তাকে নিয়ে যদ্দুর পারা যায় মিল-মিমাংসার মধ্যেই আপনাকে থাকতে হবে।

একমাত্র নিকট প্রতিবেশির সঙ্গে স্থায়ী বৈরিতা কখনই ভালো নয়, নিরাপদ নয়।

প্রতিবেশি অনেকজন হলে ভালোমন্দ বেছে নেয়ার বিশেষ সুযোগ থাকে। কারো সাথে বেশি মিল বা কারো সাথে কম। একজনকে বাদ দিয়ে আরেকজনের সাথে জোট বাধা যায়। প্রয়োজনে কারো সাথে দীর্ঘসময় সম্পর্কছিন্ন রেখেও চলা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে কাওকে পরিপূর্ণ এড়িয়ে বা ডিঙ্গিয়ে দূরের কোনো প্রভাবশালী শুভাকাঙ্খীর সাহায্য ও আশ্রয়ও নেয়া যায়। কিন্তু কেউ একমাত্র প্রতিবেশি হলে, আর সে প্রতিবেশিও বিপুল প্রভাবশালী হলে নিজেকে একটু বেশিই বুঝে সুঝে ধৈর্য ও শান্তি রক্ষা করে চলতে হয়।

নিজের অস্তিত্ব ও সম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে তার আজ্ঞাবহ হয়ে পড়লে যেমন ক্ষতি হয়; তেমনি চোখ বুঁজে শুধুই তার বৈরিতা ও বিরোধিতা উস্কে ও জিইয়ে রাখাও সেখানে ভালো ফল বয়ে আনে না। সম্পর্কটি সঠিকমাত্রায় নির্ণয় ও অনুসরণ করে চলাটা অত্যন্ত বিচক্ষণতাপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দক্ষতার কাজ। যা রাষ্ট্র ও সরকারকে প্রতিনিয়তই করতে হয়, নাগরিকদেরও বুঝতে হয়।
আমাদের একমাত্র প্রভাবশালী স্থায়ী নিকট প্রতিবেশি ভারতের সঙ্গেও আমাদের নানা সুবিধা অসুবিধার সম্পর্ক আছে, এটাই স্বাভাবিক। ভারতকে যেমন আমাদের নানাকারণে বন্ধুরূপে প্রয়োজন, বাংলাদেশকেও তেমন প্রয়োজন ভারতের। আমরা সীমানা ও শক্তিতে অপেক্ষাকৃত ছোট হলেও আমাদের উপর ভারতের অনেক রকম সুখ-দুঃখই নির্ভর করে। আমরা নীতিগত ও জাতিগতভাবে ভারতের উপকারী প্রতিবেশি হয়ে থাকতে চাই। তেমনি ভারতকেও চাই নির্লোভ সহযোগী, উপকারী প্রতিবেশী ও স্থায়ী বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার জটিল পার্থক্যের অন্যতম একটি মূল উপাদান হলো ধর্ম। কাগজে কলমে যাই থাকুক, বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র আর ভারত হিন্দুপ্রধান। কিন্তু মনে রাখতে হবে- বাংলাদেশেও অনেক হিন্দু ভাইবোন আছেন; যাদের সকল অধিকারসহ সসম্মানে সুরক্ষিত রাখা এই রাষ্ট্র সমাজ ও নাগরিকদের দায়িত্ব।

তেমনি ভারতেও আছেন বাংলাদেশের চেয়েও অধিক সংখ্যক মুসলিম। ভারতেরও দায়িত্ব বিচ্ছিন্ন কুসংস্কার ও সামাজিক দ্বন্দ সংঘাত দমন করে তাদেরকে সসম্মানে নিরাপদে রাখা।

এ ছাড়াও ভারতজুড়ে ইসলামী ও মুসলিম ঐতিহ্যের বিস্তৃত উপস্থিতিও বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য গর্ব ও ভক্তি-ভালোবাসার উপাদান। এ অনুভুতিটুকুও ভারত-বাংলাদেশের সম্প্রীতি ও সুসম্পর্কের জন্য সহায়ক হতে পারে।

মোদ্দাকথা, প্রতিবেশী প্রতিবেশীই, তার বিকল্প দূরের কেউ এসে হতে পারে না। তাকে পারস্পরিক ধৈর্য ও সম্ভাব্য সেক্রিফাইসের মাধ্যমে বন্ধু করে রাখবো, না শত্রু বানিয়ে নিজেকে ঘরে বাইরে অনিরাপদ করে তুলবো, সেটিই রাজনীতি ও কূটনীতির প্রতিপাদ্য বিষয়। নিজেদের আভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক নানা ইস্যু ও সংকট সমাধানের পথ অপেক্ষাকৃত সহজ ও সুগম হয় নিকট প্রতিবেশীকে পাশে পেলেই।

সুতরাং পৃথিবীর নানাদিক থেকে আসা আগ্রাসী ও সুযোগসন্ধানী সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির মোকাবেলায় পারস্পরিক সার্বভৌমত্ব, সংস্কৃতি ও অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে, দ্বিপাক্ষিক সমস্যা ও জটিলতার শান্তি ও সমতাপূর্ণ মিল-মিমাংসা এবং নিরাপদ সহযোগিতার ভিত্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের হওয়া উচিত একে অপরের উপকারী বন্ধু ও স্থায়ী সুপ্রতিবেশি।


ফেসবুক থেকে