সমকামিতা: একটি বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক অনুসন্ধান-১ম পর্ব

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

জাকারিয়া মাসুদ


প্রথম পর্ব


আজ নির্ধারিত সময়ের কিছুটা আগেই স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। অবশ্যি তারও একটা কারণ আছে। নয়তো যে স্যার একেবারে কাঁটায় কাঁটায় ক্লাসে আসেন, আর এক্স্যাক্ট টাইমে ক্লাস থেকে বের হয়ে যান, তিনিই কি-না আধাঘণ্টা আগে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাবেন – তা কি হয়? কেউ একজন কাগজ পেঁচিয়ে অপরজনকে ঢিল মারতে চেয়েছিলো। কিন্তু ভুলবশত ঢিলটা স্যারের গায়ে লেগেছে। যে ঢিল মেরেছিলো, স্যার তাকে বারবার দাঁড়াতে বলছিলেন – কিন্তু কেউ দাঁড়ায়নি। তাই স্যার রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। অনেক রিকুয়েস্ট করেও স্যারকে আর ক্লাসে আনা গেলো না। এক ঘণ্টা বিরতি পেয়ে যে যার মতো ঘুরতে চলে গেলো। অনেকে আবার ক্লাসেই নিজেদের মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত রইলো।

ফারিসের ইচ্ছা ছিলো লাইব্রেরীতে যাওয়ার। আমিই ওকে জোর করে ধরে ক্যান্টিনে নিয়ে গেলাম – খুব চা খেতে ইচ্ছা করছিলো তাই। ক্যান্টিনে পৌঁছে আমরা দক্ষিণ পার্শ্বের ছোট টেবিলটিতে বসলাম। খাবারের অর্ডার ফারিসই দিলো। তবে চা নয় – কফি। চকলেট ফ্লেভারের কফি। আমরা কফি খাচ্ছিলাম আর গল্প করছিলাম। মিনিট দশেক পর রফিক ভাই এলেন। ভাইকে দেখে আমার বেশ আশ্চর্য লাগলো। লাগবে না কেন বলুন। রফিক ভাইয়ের সাথে আমাদের সবচে’ বেশি দেখা হয় ক্যান্টিনে। যতদিন ক্যান্টিনে এসেছি, প্রায় সময়ই তাঁর সাথে দেখা হয়েছে। কেন জানি রফিক ভাই আর আমাদের ক্যান্টিনে আসার সময়টা কাকতালীয়ভাবে মিলে যায়।

ফারিসকে দেখে তিনি আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। কফি খাচ্ছি দেখে একটু ঠাট্টা করেই বললেন, ‘কী রে মোল্লার দল? তোরা দেহি ক্যান্টিনে বইয়া বইয়া কফি খাইতাছস। কাম কাজ নাই?’

ফারিস বললো, ‘থাকবে না কেন ভাই? অবশ্যই আছে। কাজের মাঝে একটু বিরতি নিলাম। যাতে শরীরটা চাঙা হয়। এই আর কি।’

‘ভালো-ভালো।’

‘কফি খাবেন ভাই?’

‘কফি! হ খাওয়া যায়। দিতে ক।’

ক্যান্টিনের আসাদ মামাকে ডেকে আরও একটা কফি দিতে বললাম। রফিক ভাই একটা সিগারেট ধরালেন। তবে একটান দিয়েই নিভিয়ে ফেললেন। নেভানোর কারণটা অবশ্যি ফারিস। রফিক ভাই জানেন, সিগারেটের গন্ধ ফারিস একদম সহ্য করতে পারে না। তাই নিভিয়ে ফেললেন। মিনিট পাঁচেক পর কফি এ্লো। কফির কাপটা ফারিস রফিক ভাইয়ের দিগে এগিয়ে দিলো। কাপটা হাতে নিয়ে রফিক ভাই বললেন, ‘ঈদের অনুষ্ঠানে আরটিভি সমকামিতা নিয়া একটা নাটক প্রচার করলো। সেইখানে না খারাপ কিছু দেহানো অইলো, আর না খারাপ কোনো কতা প্রচার করা অইলো। তারপরেও হুজুররা এইডা নিয়া লাফালাফি শুরু করলো। অনলাইন অফলাইনে এক্কেবারে ঝড় তুইলা ফেললো। এই কামডা কি ঠিক অইলো? তুই ক।’

যা ভেবেছিলাম তাই। আজও তিনি ফারিসের সাথে তর্ক করতে এসেছেন। তর্কের বিষয়টাও তিনি মনে হয় বেছে বেছে নির্ধারণ করেছেন – সমকামিতা। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Homosexuality’। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন এদেশে সমকামিতা নিয়ে তেমন কথাবার্তা শুনিনি। আজকাল অবশ্যি শব্দটা সমাজে বেশিবেশি উচ্চারিত হচ্ছে। সমকামিতা একটি অপ্রাকৃতিক যৌনকর্ম। যার দ্বারা সমলিঙ্গের মধ্যে যৌন সম্পর্ক বোঝায়। ‘Homosexual’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন কার্ল মারিয়া কার্টবেরি, ১৮৬৯সালে। পরে জীববিজ্ঞানী গুস্তভ জেগার এবং রিচার্ড ফ্রেইহার ভন ক্রাফট ইবিং ১৮৮০’র দশকে শব্দটিকে জনসাধারণের মাঝে জনপ্রিয় করে তুলেন। তবে ‘Homosexual’ শব্দটা সমকামীদের পছন্দ নয়। তাই বিশ্বজুড়ে তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘গে’ এবং ‘লেসবিয়ান’ শব্দ দুটি অধিক হারে অধুনা সমাজে ব্যবহৃত হয়।

‘হুজুররা কেন সমকামিতার বিরোধিতা করে – জানেন ভাই?’ ফারিস রফিক ভাইকে প্রশ্ন করলো।

‘কেন আবার? তারা মানুষের কাজ কামের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তাই।’

‘আপনার ধারণা সম্পুর্ণ ভুল।’

‘ভুল?’

‘হ্যাঁ, ভুল।’

‘কেন?’

‘কারণ, হুজুরদের সমকামিতাকে বিরোধিতা করার আসল কারণটা আপনি জানেন না।’

‘জানি জানি, খুব জানি। হুজুরগো আমার চিনা আছে। খালি মসজিদ মাদ্রাসা লইয়া পইড়া থাকে। আর মানুষের কাজে-কামে নাক গলায়। মানুষরে দাস বানাইয়্যা রাখবার চায়। এইডাই মেন কারণ।’

‘রফিক ভাই, আপনি আবারো ভুল বলছেন।’

‘ভুল কইতাছি? তাইলে ঠিকটা কী, ক দেহি।’

‘হুজুরদের সমকামিতাকে সাপোর্ট না করা, কিংবা সমকামীদের বিরোধিতা করার কারণ হলো – সমকামিতা একটি গর্হিত কাজ।’

‘গর্হিত কাম? হা হা হা। হাসাইলি ফারিস, হাসাইলি। সমকামিতা খারাপ কাম অইবো কেন? এইডা মানুষের জেনেটিক বিষয়। মানুষ জন্মগতভাবেই সমকামী অইতে পারে। হেইডা কি তোর জানা নাই?’

‘একটা মস্তবড় ভুল ইনফরমেশন দিলেন, ভাই।’

‘ভুল ইনফরমেশন দিছি?’

‘হুম। এই তো, এইমাত্র দিলেন।’

‘তাইলে ঠিকটা তুই-ই ক।’

রফিক ভাইয়ের কথা শেষ হলে ফারিস আমাকে লক্ষ্য করে বললো, ‘তুই তো হিস্টোলজি আমার থেকে ভালো করে পড়েছিস। রফিক ভাইকে একটু পায়ু ও যোনীর গাঠনিক পার্থক্যগুলি বল তো।’

ফারিসের কথা শেষ হলে আমি বললাম, ‘আসলে মেয়েদের যোনী যৌনমিলনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি অঙ্গ। যা তিন স্তর বিশিষ্ট পুরু ও স্থিতিস্থাপক মাসল দ্বারা তৈরি। যোনীতে ন্যাচারাল লুব্রিকেন্ট উপস্থিত। যার ফলে লিঙ্গ অতি সহজেই যোনীর ভিতরে ঢুকে যেতে পারে। তিন স্তরবিশিষ্ট লেয়ার, ন্যাচারাল লুব্রিকেন্ট ও স্থিতিস্থাপক মাসল থাকার কারণে যোনীতে লিঙ্গ প্রবেশের ফলে কোনোরকম রক্তপাত কিংবা ঘর্ষণ হয় না। অপরদিকে মলাশয় অত্যন্ত নাজুক অঙ্গ। মলাশয়ে ন্যাচারাল লুব্রিকেন্ট অনুপস্থিত। মলাশয়গাত্র একেবারেই পাতলা। একস্তর বিশিষ্ট আবরণ থাকে। আর মলাশয়ে লিঙ্গ যোনীর মত সহজেই ঢুকতে পারে না – চাপ দিয়ে ঢুকাতে হয়। যেহেতু মলাশয় গাত্র পাতলা ও ন্যাচারাল লুব্রিকেন্ট অনুপস্থিত, তাই লিঙ্গ ঢুকানোর ফলে রক্তপাত হয়। ফলে বীর্য অতি সহজেই রক্তের সাথে মিশে ইনফেকশন তৈরি করতে পারে। বীর্যরস ইমিউনোসাপ্রেসিভ[1]। আর মানুষের অ্যানাল রুটের ইমিউনো সিস্টেম যোনির ইমিউনো সিস্টেমের তুলনায় দুর্বল। বীর্যরস যদি মলাশয়ে নির্গত হয়, তাহলে মলাশয়ের ইমিউনো সিস্টেম আরও দুর্বল হয়ে পরে। ফলে জীবাণু বিনা বাধায় শরীরে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে।’

আমার কথা শুনে রফিক ভাই সন্তুষ্ট হতে পেরেছে বলে মনে হলো না। তিনি এবার বললেন, ‘সবই বুঝলাম। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যে গে জীন আবিষ্কার করছে। গে জীনডাই যথেষ্ট সমকামিতারে জেনেটিক্যালি প্রোভ করবার লাইগ্যা।’

রফিক ভাইয়ের কথা শুনে ফারিস হাসতে শুরু করলো। হাসি থামিয়ে রফিক ভাইকে বললো, ‘ভাই, একটা প্রশ্ন করি?’

‘আর কী প্রশ্ন করবি? এইবার তো তুই আমার কাছে হাইরা গেলি। হো হো হো।’

‘সে না হয় পরে দেখা যাবে। আগে বলেন তো, আপনি গে জীনের কথা কোথা থেকে শুনেছেন।’

‘হেইডা তোরে কওয়া যাইবো না। সিক্রেট ব্যাপার।’

‘আমি বলি?’

‘ক দেহি। দেহি তোর আইডিয়া কেমন।’

‘অভিজিৎ রায়ের বই থেকে। তাই না?’

রফিক ভাই কোনো জবাব দিলেন না। রফিক ভাইয়ের চুপ থাকাটাই তাঁর মৌন সম্মতি নির্দেশ করে। ফারিসের সন্দেহটা ঠিক। অভিজিৎ বাবু পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। নাস্তিকদের বহুল প্রচারিত একটি ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা। লোকটার বায়োলজির জ্ঞানের কমতির অভাব নেই। আর কপি পেস্ট লেখক হিসেবেও তার জুড়ি মেলা ভার। জোড়া তালি দিয়ে সমকামিতার পক্ষে একটা বইও তিনি রচনা করেছেন। তাই নিয়ে বাংলার নাস্তিকদের অহমিকার শেষ নেই। রফিক ভাইদের মতো লোকেরা তার লিখনীগুলো গসপেলের মত মনে করে। আর মনে মনে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে।

রফিক ভাই চুপ করে আছেন দেখে ফারিস তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘আচ্ছা রফিক ভাই, আমি যদি গণিতবিদের কাছে অর্থনীতি বুঝতে যাই – সেটা কেমন হবে?’

‘পাগলে কয় কী? গণিতের লোকগো কাছে তুই অর্থনীতির কী পাইবি? অর্থনীতি বুঝতে চাইলে অর্থনীতিবিদদের কাছে যাইতে অইবো।’

‘তাহলে আপনি যদি ইঞ্জিনিয়ারের বই পড়ে মেডিক্যাল সাইন্স বুঝতে চান – সেটা কেমন হবে?’

‘তার মানে তুই কইবার চাস, মেডিক্যাল সাইন্সের বিষয়গুলা নিয়া আমাগোর ঘাঁটাঘাঁটি করবার অধিকার নাই?’

‘অবশ্যই আছে। থাকবে না কেন? সবারই অধিকার আছে। কিন্তু মিথ্যাচার করার অধিকার কারো নেই।’

‘তার মানে তুই কইবার চাস অভিজিৎ দাদা মিসা কতা লিখছে তার বইডার মধ্যে?’

‘শুধুই কি মিথ্যা? তার গোটা বইটাই তো মিথ্যার ফুলঝুরি দিয়ে সাজানো।’

‘দাদা তো বইডার মধ্যে রেফারেন্স দিয়াই লিখছে, না-কি?’

‘রেফারেন্স দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভুল গবেষণার।’

‘ভুল?’

‘জ্বি, ভাই। ভুল।’

‘যেমন?’


সমকামিতা: একটি বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক অনুসন্ধান-২য় পর্ব