মুসলমানদের পতন কেন (পর্ব-২)

মুসলমানদের পতন কেন (পর্ব-২)

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

মুহাম্মাদ আবু আখতার


প্রথম পর্বে প্রাথমিক যুগের মুসলমান অর্থাৎ সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর ক্রমবর্ধমান উন্নতি ও বর্তমান যুগের মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান অবনতির প্রথম ও প্রধান কারণ হিসেবে তাদের ঈমান ও আমলের ব্যবধানের কথা কুরআনের দলীলসহ সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে৷ এখন এ বিষয়টি আরো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে একটু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন৷ তাই দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর মজবুত ঈমান ও নেক আমলের কিছু দৃষ্টান্ত এবং আল্লাহর হুকুম পালনের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা ও শান্তিপুর্ণ জীবন লাভ সম্পর্কে কিছু তথ্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি৷ ইনশাআল্লাহ তৃতীয় পর্বে আধুনিক যুগের মুসলমানদের ঈমান ও আমলের অবস্থা এবং আল্লাহর হুকুম পরিপুর্ণভাবে পালন না করার কফলস্বরূপ তাদের পতনের কিছু করুণ চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করব৷

সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর ঈমান ও আমলঃ
সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর ঈমান ছিল পাহাড়ের চেয়েও অটল৷ তাদের কাছে ঈমানের চেয়ে মহামুল্যমান আর কিছুই ছিল না৷ ঈমান রক্ষার জন্য তারা যেকোন ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রস্তুত ছিলেন৷ হজরত বিলাল (রা), হজরত আবু জানদাল (রা) ও হজরত খাব্বাব (রা) সহ আরো অসংখ্য সাহাবী ঈমানের উপর টিকে থাকার জন্য অবর্ণনীয় জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছেন৷ হজরত আম্মার (রা) এর পিতা ইয়াসার (রা) এবং মাতা হজরত সুমাইয়া (রা) শত নির্যাতন ও ভয়ভীতি দেখানোর পরও ঈমানের ওপর অটল ছিলেন৷ এ অপরাধে মক্কার কাফির মুশরিকরা তাদেরকে নির্মমভাবে শহীদ করে৷ অনেক সাহাবী ঈমান রক্ষার জন্যই তাদের পিতামাতা, ভাইবোন ও আত্মীয় স্বজনদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন৷ হজরত আব্দুল্লাহ জুল বাজদাইন (রা) ছিলেন তাদের অন্যতম৷ তিনি নিজ চাচার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে সব ধন-সম্পদ এমনকি পরণের লুঙ্গি পর্যন্ত চাচাকে ফিরিয়ে দেন৷ পরে তার মায়ের দেয়া একটি চাদর দু টুকরো করে একটুকরো গায়ে দিয়ে আরেক টুকরো পরিধান করে রাসুলুল্লাহ (সা) এর দরবারে উপস্থিত হন৷ ঈমানের উপর টিকে থাকার জন্য মুহাজির সাহাবীগণ নিজের বাড়িঘর, ধনসম্পদ ও আত্মীয় স্বজনের মায়া ত্যাগ করে প্রথমে আবিসিনিয়া এবং পরে মদীনায় হিজরত করেন৷ মদীনার আনসার সাহাবীগণ ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মক্কার নির্যাতিত মুহাজিরদেরকে আশ্রয় দিয়ে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করেন৷ ঈমানের জন্য মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের সর্বোচ্চ ত্যাগের ফলস্বরুপ মদীনায় শান্তিপুর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় যার সীমানা খুব অল্প সময়ে অর্ধেক পৃথিবী জুড়ে বিস্তার লাভ করে৷ সংখ্যায় প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক কম থাকা সত্ত্বেও তারা ঈমানী শক্তিতে এমন বলীয়ান হয়ে উঠেছিলেন তৎকালীন পরাশক্তি পারস্য ও রোম সম্রাটসহ পৃথিবীর কোন শক্তি তাদের মোকাবেলায় টিকে থাকতে পারে নি৷

সাহাবায়ে কিরাম (রা) ঈমানী শক্তিতে যেমনিভাবে মজবুত ছিলেন তেমনিভাবে নেক আমলের প্রতিও ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী৷ নেক আমলের ক্ষেত্রে তারা পরস্পর প্রতিযোগিতামুলক মনোভাব পোষণ করতেন৷ সবার চিন্তা ছিল কে কার চেয়ে বেশি নেক আমল করতে পারবে৷ বিশেষ কারণে কোন নেক আমল ছুটে গেলে তারা এজন্য আফসোস প্রকাশ করতেন৷ বিভিন্ন হাদীসে তাদের ব্যাপারে অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে৷

ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ নেক আমল হচ্ছে নামায৷ রাসুলুল্লাহ (সা) এর যুগে সাহাবীগণ নামাযের সময় হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও দুনিয়াবী সব কাজের ব্যস্ততা পরিত্যাগ করে মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে নামায আদায় করতেন৷ তাদের ব্যাপারেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

“তারা এমন লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামায কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে।”
(সুরা নুরঃ ৩৭)

সাহাবায়ে কিরাম (রা) অত্যন্ত মনোযোগের সাথে নামায আদায় করতেন৷ শত্রুর নিক্ষিপ্ত তীরও তাদের নামাযে মনোযোগের ক্ষেত্রে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারত না৷ হজরত জাবের (রাঃ) বলেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সঙ্গে জাতুর-রিক্বা যুদ্ধাভিযানে বের হলাম। তখন এক ব্যক্তি মুশরিকদের এক লোকের সঙ্গীকে হত্যা করে। ফলে ঐ মুশরিক এ মর্মে শপথ করে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত মুহাম্মাদ (সা) এর কোন সাথীর রক্তপাত না করব, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না। অতএব সে নবী (সা) এর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। নবী (সা) এক জায়গায় অবতরণ করে বললেনঃ এমন কে আছো, যে আমাদের পাহারা দিবে? তখন মুহাজিরদের থেকে একজন এবং আনসারদের থেকে একজন তৈরি হয়ে গেলেন। তিনি বললেনঃ তোমরা দু’জনে গিরিপথের চূড়ায় মোতায়েন থাক। উভয়ে গিরিমুখে পৌছলে মুহাজির লোকটি ঘুমিয়ে পড়েন। আর আনসারী লোকটি দাঁড়িয়ে সালাত আদায়ে মশগুল হন। এমন সময় ঐ লোকটি এসে আনসারী লোকটিকে দেখেই চিনে ফেলল৷ সে বুঝতে পারল তিনি (প্রতিপক্ষের) নিরাপত্তা প্রহরী। অতএব সে তাঁর প্রতি একটি তীর নিক্ষেপ করল, যা তার দেহে বিঁধে গেল। তিনি তা বের করে নিলেন। সে একে একে তিনটি তীর নিক্ষেপ করল। তিনি রুকু সিজদা করে (যথারীতি সালাত শেষ করে) সাথীকে জাগালেন। সাহাবীগণ সতর্ক হয়ে গিয়েছেন, এটা টের পেয়ে মুশরিক লোকটি পালিয়ে গেল। মুহাজির সাহাবী আনসার সাহাবীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে বললেন, সুবহানাল্লাহ! প্রথম তীর নিক্ষেপের পরই আমাকে সতর্ক করেননি কেন? তিনি বললেন, আমি (সালাতে) এমন একটি সুরা তিলাওয়াত করছিলাম যা ছাড়তে আমি পছন্দ করিনি।
(সুনানে আবু দাউদঃ ১৯৮)

হজরত তালহা (রা) নামক একজন বিখ্যাত সাহাবী নামাযের প্রতি মনোযোগে ঘাটতি হওয়ায় তার প্রিয় বাগান আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেন৷ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রা) বলেন, হজরত আবু তালহা আনসারী (রাঃ) একবার তাঁর এক বাগানে নামায আদায় করতেছিলেন। ইতিমধ্যে একটি ছোট পাখি উড়তে শুরু করল, (বাগান এত ঘন ছিল যে এই ক্ষুদ্র পাখিটি পথ খুঁজে পাচ্ছিল না), তাই পাখিটি এদিক-সেদিক বের হওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করল। এই দৃশ্য তার খুব ভাল লাগল। ফলে তিনি কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নামাযের দিকে মনোযোগ দিলেন। কিন্তু (অবস্থা এই দাঁড়াল) তিনি (তখন) স্মরণ করতে পারলেন না যে, নামায কত রাক’আত আদায় করেছেন। তিনি বললেন, এই মাল আমাকে পরীক্ষায় ফেলেছে। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা) এর খেদমতে উপস্থিত হলেন এবং বাগানে তাঁর সম্মুখে যে পরীক্ষা উপস্থিত হয়েছিল তা বর্ণনা করলেন। তারপর বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! এই মাল আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করছি। আপনি যেখানে পছন্দ করেন উহা সেখানে ব্যয় করুন।
(মুয়াত্তা ইমাম মালিকঃ ২১৪)

আল্লাহর রাস্তায় দান সাদকার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কিরাম (রা) পরস্পর প্রতিযোগিতা করতেন৷
জায়েদ ইবনে আসলাম (রহঃ) কর্তৃক তাঁর পিতা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে আমি বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (সা) (তাবূক যুদ্ধের প্রাক্কালে) আমাদেরকে দান-খাইরাত করার হুকুম করেন। সৌভাগ্যক্রমে ঐ সময় আমার সম্পদও ছিল। আমি (মনে মনে) বললাম, যদি আমি কোন দিন আবু বকর (রাঃ)-কে ডিঙ্গাতে পারি তাহলে আজই সেই সুযোগ। উমর (রাঃ) বলেন, আমি আমার অর্ধেক সম্পদ নিয়ে এলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ তোমার পরিবার-পরিজনদের জন্য তুমি কি বাকি রেখে এসেছ? আমি বললাম, এর সমপরিমাণ। আর আবু বকর (রাঃ) তার সমস্ত মাল নিয়ে আসলেন। তিনি বললেনঃ হে আবু বকর! তোমার পরিবার-পরিজনদের জন্য তুমি কি বাকি রেখে এসেছ? তিনি বললেন, তাদের জন্য আল্লাহ ও তার রাসূলকেই রেখে এসেছি। আমি (মনে মনে) বললাম, কখনও আমি কোন প্রসঙ্গে আবু বকর (রাঃ)-কে ডিঙ্গাতে পারব না।
(মুয়াত্তা ইমাম মালিকঃ৩৬৭৫)

সাহাবায়ে কিরাম (রা) দানের ফযীলত শুনে স্বতস্ফুর্তভাবে আল্লাহর রাস্তায় দান করতেন৷
আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, মদীনায় আনসারদের মধ্যে আবূ তালহাই সবচেয়ে বেশী ধনী ছিলেন এবং তাঁর সম্পদের মধ্যে বায়রুহা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ছিল, এটা মসজিদের (নববীর) সম্মুখে অবস্থিত ছিল। আল্লাহ্‌র রসূল (সা) তথায় যেতেন এবং এতে যে উৎকৃষ্ট পানি ছিল তা পান করতেন। যখন এ আয়াত নাযিল হলোঃ “তোমরা যা ভালবাস, তা হতে ব্যয় না করা পর্যন্ত তোমরা কখনো পুণ্য লাভ করবে না”— (আল্‌ ইমরানঃ ৯২)। তখন আবূ তালহা (রাঃ) আল্লাহ্‌র রসূল (সা)-এর সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেনঃ “তোমরা যা ভালবাস, তা হতে যে পর্যন্ত দান না করবে, সে পর্যন্ত তোমরা প্রকৃত পুণ্য লাভ করবে না” – (আল্‌ ইমরানঃ৯২)। আর আমার সম্পদের মধ্যে বায়রুহা আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। আমি ওটা আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য দান করে দিলাম। এর সওয়াব ও প্রতিদান আমি আল্লাহ্‌র নিকট প্রত্যাশা করছি। কাজেই হে আল্লাহ্‌র রসূল! আপনি ওটাকে যেখানে ভাল মনে করেন, খরচ করেন। নবী (সা) বললেন, বেশ। এ সম্পদ তো প্রস্থানকারী, এ সম্পদ তো চলে যাওয়ার। তুমি এ ব্যাপারে যা বললে, তা আমি শুনলাম এবং এটাই সঙ্গত মনে করি যে, এটা তুমি তোমার আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে বণ্টন করে দিবে। হজরত আবূ তালহা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহ্‌র রসূল! আমি তাই করব। তারপর আবূ তালহা (রাঃ) তার নিকটাত্মীয় ও চাচাত ভাইদের মধ্যে তা বণ্টন করে দিলেন।
(সহিহ বুখারীঃ ২৩১৮)

যেসব সাহাবী দান সাদকা করার সামর্থ্য রাখত না তারা এজন্য আফসোস করতেন এবং অন্য যেকোন উপায়ে দান সাদকাকারীদের সমান মার্যাদা লাভের উপায় রাসুলুল্লাহ (সা) এর কাছ হতে জানতে চাইতেন৷ হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কিছু দরিদ্র লোক (একদা) রাসুলুল্লাহ (সা) এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুল্লাল্লাহ! ধনীরাও সালাত আদায় করে থাকে যেমনিভাবে আমরা আদায় করে থাকি আর তারাও সিয়াম পালন করে থাকে যেমনিভাবে আমরা পালন করে থাকি, কিন্তু তাদের জন্য রয়েছে সম্পদ, যা থেকে তারা দান-সদকা করে থাকে এবং গোলাম (কিনে) আযাদ করে থাকে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা) বললেন, যখন তোমরা সালাত আদায় করবে, তখন বলবে, সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার, আল্লাহু আকবর ৩৩ বার এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ১০ বার। কেননা, এর দ্বারা তোমরা তোমাদের অগ্রবর্তীদের সমপর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারবে এবং তোমাদের পরবর্তী থেকে অগ্রগামী হয়ে যেতে পারবে।
(সুনানে আন-নাসায়ীঃ ১৩৫৩)

সাওম বা রোযা পালন করা ইসলামের অন্যতম একটি স্তম্ভ৷ সাওম পালনের ব্যাপারেও সাহাবীগণ অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন৷ হজরত আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আমর ইব্‌নুল ‘আস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ্‌র রসূল (সা) আমাকে বললেনঃ হে আবদুল্লাহ! আমি এ সংবাদ পেয়েছি যে, তুমি প্রতিদিন সাওম পালন কর এবং সারা রাত সালাত আদায় করে থাকো। আমি বললাম, ঠিক (শুনেছেন) হে আল্লাহ্‌র রসূল! তিনি বললেনঃ এরূপ করবে না (বরং মাঝে মাঝে) সাওম পালন করো আবার ছেড়েও দাও। (রাতে) সালাত আদায় কর আবার ঘুমাও। কেননা তোমার উপর তোমার শরীরের হক রয়েছে, তোমার চোখের হক রয়েছে, তোমার উপর তোমার স্ত্রীর হ্ক আছে, তোমার মেহমানের হক আছে। তোমার জন্য যথেষ্ট যে, তুমি প্রত্যেক মাসে তিন দিন সাওম পালন কর। কেননা নেক আমলের বদলে তোমার জন্য রয়েছে দশগুণ নেকী। এভাবে সারা বছরের সাওম হয়ে যায়। আমি (বললাম) আমি এর চেয়েও কঠিন আমল করতে সক্ষম। তখন আমাকে আরও কঠিন আমলের অনুমতি দেয়া হল। আমি বললাম, হে আল্লাহ্‌র রসূল! আমি আরো বেশী শক্তি রাখি। তিনি বললেনঃ তবে আল্লাহর নবী দাউদ (আঃ)-এর সাওম পালন করো, এর হতে বেশী করতে যেয়ো না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ্‌র নবী দাউদ (আঃ)-এর সাওম কেমন? তিনি বললেনঃ অর্ধেক বছর। রাবী বলেনঃ ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বৃদ্ধ বয়সে বলতেন, আহা! আমি যদি নবী (সা) প্রদত্ত রুখসত (সহজতর বিধান) কবুল করে নিতাম !
(সহিহ বুখারীঃ ১৯৭৫)

পর্দা ইসলামের অন্যতম একটি ফরজ হুকুম৷ পর্দার হুকুম নাযিল হওয়ার পর মহিলা সাহাবীগণ গুরুত্বের সাথে এ হুকুম পালন করেন৷ বিপদ আপদেও তারা পর্দা পালনের ব্যাপারে অবহেলা করতেন না৷ হজরত সাবিত ইবনে কায়িস (রা) তার পিতা হতে বর্ণনা করে বলেন, একদা উম্মু খাল্লাদ (রা) নামক এক মহিলা মুখমন্ডল আবৃত অবস্থায় তার নিহত পুত্রের কথা জিজ্ঞেস করতে নবী (সা) এর কাছে এলেন। নবী (সা) এর কতিপয় সাহাবী মহিলাকে বললেন, তুমি মুখমন্ডল আবৃত অবস্থায় তোমার ছেলের কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছো! তিনি বললেন, যদিও আমার ছেলেকে হারিয়েছি, কিন্তু আমার লজ্জা-শরম তো হারাইনি।
(সুনানে আবু দাউদঃ ২৪৮৮)

এ পর্যন্ত সাহাবায়ে কিরামের ঈমান ও নেক আমল সম্পর্কে যা বর্ণনা করা হলো তা খুবই যৎসামান্য পরিমাণ৷ হাদীস ও ইতিহাসের কিতাবে এ সম্পর্কিত অসংখ্য ঘটনা বর্ণিত হয়েছে৷ এগুলো পড়ে তাদের ঈমান আমলের মজবুতির অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়৷

আল্লাহর হুকুম পালনে সাহাবায়ে কিরামের নিরাপত্তা ও শান্তিপুর্ণ জীবন লাভঃ
সাহাবীগণ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর হকুম পালনে সীমাবদ্ধ ছিলেন না৷ বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মেনে চলতেন৷ রাসুলুল্লাহ (সা) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা) মদীনায় হিজরত করার পর সেখানে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়৷ তখন হদ কিসাসসহ আল্লাহর সমস্ত হুকুম রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়৷ ফলে প্রত্যেকের জীবন, ধন-সম্পদ ও ইজ্জত-সম্মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়৷

জীবনের নিরাপত্তাঃ
মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়৷ কেউ অন্যকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলে তার শাস্তি স্বরূপ অবস্থাভেদে মুক্তিপণ ও কিসাসের হুকুম বাস্তবায়ন করা হয়৷ আল্লাহ তায়ালা কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেন,

” আল্লাহ তায়ালা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা কর না। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, আমি তার উত্তরাধিকারীকে ক্ষমতা দান করি। অতএব, সে যেন হত্যার ব্যাপারে সীমা লঙ্ঘন না করে। নিশ্চয় সে সাহায্যপ্রাপ্ত।”
(সুরা বনি ইসরাইলঃ ৩৩)

কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা পৃথিবীর সব মানুষকে হত্যা করার সমতুল্য জঘন্য অপরাধ৷ এ ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করার সমতুল্য অপরাধ করে এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষার মত নেক আমল করে। তাদের কাছে আমার রাসুলগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী নিয়ে এসেছেন। বস্তুতঃ এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমালঙ্ঘন করে।”
(সুরা মায়িদাঃ ৩২)

কাউকে হত্যা কিংবা কোন অঙ্গহানি করার শাস্তি স্বরুপ কিসাসের হুকুম বর্ণনা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখম সমূহের বিনিময়ে সমান যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গোনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।”
(সুরা মায়িদাঃ ৪৫)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে,

“হে ঈমানদারগন! তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীন ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তির বদলায়, দাস দাসের বদলায় এবং নারী নারীর বদলায়। অতঃপর তার ভাইয়ের তরফ থেকে যদি কাউকে কিছুটা মাফ করে দেয়া হয়, তবে প্রচলিত নিয়মের অনুসরণ করবে এবং ভালভাবে তাকে তা প্রদান করতে হবে। এটা তোমাদের পালনকর্তার তরফ থেকে সহজ এবং বিশেষ অনুগ্রহ। এরপরও যে ব্যাক্তি বাড়াবাড়ি করে, তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।”
(সুরা বাকারাঃ ১৭৮)

কোন মুসলমান অন্য মুসলমানকে ভুলক্রমে হত্যা করলে তার জন্য নিহত ব্যক্তির স্বজনকে মুক্তিপণ ও একজন ক্রীতদাস মুক্ত করতে হবে৷ এ হুকুম বর্ণনা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“মুসলমানের কাজ নয় যে, সে অন্য মুসলমানকে হত্যা করে; কিন্তু ভুলক্রমে হলে সেটা ভিন্ন। যে ব্যক্তি মুসলমানকে ভূলক্রমে হত্যা করে, সে একজন মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে এবং রক্তপণ সমর্পন করবে তার স্বজনদেরকে; কিন্তু যদি তারা ক্ষমা করে দেয়। অতঃপর যদি নিহত ব্যক্তি তোমাদের শত্রু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয়, তবে মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে এবং যদি সে তোমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ কোন সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয়, তবে রক্তপণ সমর্পণ করবে তার স্বজনদেরকে এবং একজন মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে। অতঃপর যে ব্যক্তি ক্রীতদাস মুক্ত করতে সক্ষম নয়, সে আল্লাহর কাছ থেকে গোনাহ মাফ করানোর জন্যে একাধারে দুই মাস রোযা রাখবে। আল্লাহ, মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।”
(সুরা নিসাঃ ৯২)

সম্পদের নিরাপত্তাঃ
মানুষের ধনসম্পদ যেন চোরের হাত হতে নিরাপদ থাকে এজন্য চোরের জন্য হাতকাটার শাস্তি নির্ধারণ করা হয়৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে হুশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়।”
(সুরা মায়িদাঃ ৩৮)

আর চুরির শাস্তি প্রদানে ধনী ও গরিবের মাঝে কোন ভেদাভেদ নেই৷ আর আল্লাহর নির্ধারিত শরয়ী শাস্তির ক্ষেত্রে কারো সুপারিশ গ্রহণযোগ্য নয়৷

হজরত আয়িশা (রাঃ) বলেন, মাখযূম গোত্রের এক চোর নারীর ঘটনা কুরাইশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন করে তুলল। এ অবস্থায় তারা বলাবলি করতে লাগল এ ব্যাপারে আল্লাহর রসূল (সা)-এর সঙ্গে কে আলাপ করতে পারে? তার বলল, একমাত্র রসূল(সা)–এর প্রিয়তম উসামা বিন যায়িদ (রাঃ) এ ব্যাপারে আলোচনা করার সাহস করতে পারেন। উসামা (রা) নবী (সা)-এর সঙ্গে কথা বললেন। নবী‎ (সা) বললেন, তুমি কি আল্লাহ্‌র নির্ধারিত সীমাঙ্ঘনকারিণীর সাজা মাওকুফের সুপারিশ করছ? অতঃপর নবী‎ (সা) দাঁড়িয়ে খুত্‌বায় বললেন, তোমাদের পূর্বের জাতিসমূহকে এ কাজই ধ্বংস করেছে যে, যখন তাদের মধ্যে কোন বিশিষ্ট লোক চুরি করত, তখন তারা বিনা সাজায় তাকে ছেড়ে দিত। অন্যদিকে যখন কোন অসহায় গরীব সাধারণ লোক চুরি করত, তখন তার উপর হদ্‌ জারি করত। আল্লাহ্‌র কসম, যদি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কন্যা ফাতিমা চুরি করত তাহলে আমি তার অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।
(সহিহ বুখারীঃ ৩৪৭৫)

যারা মানুষ হত্যা করে ধন সম্পদ ছিনতাই করে পৃথিবীতে ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি করে আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিয়েছেন৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হল তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি।”
(সুরা মায়িদাঃ ৩৩)

রাসুলুল্লাহ (সা) আল্লাহ তায়ালার হুকুম অনুযায়ী সন্ত্রাসীদের কঠিন শাস্তি প্রদান করেন৷
হজরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ উরাইনা গোত্রের কিছু লোক (ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে) মদীনায় এলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। নবী (সা) তাদেরকে (সদকার) উটের নিকট যাওয়ার এবং উটের পেশাব ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা সেখানে চলে গেল। অতঃপর তারা সুস্থ হয়ে নবী (সা)-এর রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এ সংবাদ দিনের প্রথম ভাগেই (তাঁর নিকট) এসে পৌঁছল। তিনি তাদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য লোক পাঠালেন। বেলা বাড়লে তাদেরকে পাকড়াও করে আনা হল। অতঃপর তার আদেশে তাদের হাত পা কেটে ফেলা হল। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুটিয়ে দেয়া হল এবং গরম পাথুরে ভূমিতে তাদের নিক্ষেপ করা হল। তারা পানি চাইছিল, কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি। হাদীসের অন্যতম রাবী হজরত আবূ কিলাবাহ (রহঃ) বলেন, এরা চুরি করেছিল, হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল, ঈমান আনার পর কুফরী করেছিল এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল৷
(সহিহ বুখারীঃ২৩৩)

যেসব লেনদেনের মাধ্যমে কারো সম্পদ ক্ষতি হওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকে যেমন সুদ, ঘুষ, জুয়া, লটারী ইত্যাদি ইসলামে কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ৷

সুদ গ্রহণ করা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মত জঘণ্য অপরাধ৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক। অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও। কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে তোমরা নিজের মূলধন পেয়ে যাবে। তোমরা কারও প্রতি অত্যাচার করো না এবং কেউ তোমাদের প্রতি অত্যাচার করবে না।”
(সুরা বাকারাঃ ২৭৮-২৭৯)

জুয়া ও লটারীকে শয়তানী কাজ আখ্যা দিয়ে এ কাজ থেকে ঈমানদারগণকে নিষেধ করা হয়েছে৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং লটারী এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।”
(সুরা মায়িদাঃ ৯০)

ঘুষের বিনিময়ে হোক বা অন্য যেকোনভাবেই হোক অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ ভোগ করার ব্যাপারে নিষেজ্ঞারোপ করা হয়েছে৷

“তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না। এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্নসাৎ করার উদ্দেশে শাসন কতৃপক্ষের হাতে তুলে দিও না।” (সুরা বাকারাঃ ১৮৮)

বংশের নিরাপত্তা
মানুষের নাসাব বা বংশধারা যেন ঠিক থাকে এজন্য জেনা ব্যভিচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়৷ কেউ জেনায় লিপ্ত হলে অবিবাহিতদের জন্য একশত বেত্রাঘাত এবং বিবাহিতদের জন্য পাথর নিক্ষেপে হত্যার শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করতে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।”
(সুরা নুরঃ ২)

রাসুলুল্লাহ (সা) আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী ব্যভিচারী পুরুষ ও মহিলাকে শাস্তি প্রদান করতেন৷ হজরত বুরাইদা (রাঃ)-এর বরাতে তার পিতা বর্ণনা করেন, মা’ইয ইবনে মালিক আসলামী নবী (সা)-এর নিকট এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয়ই আমি আমার আত্মার উপর জুলুম করেছি, অর্থাৎ ব্যভিচার করেছি। আমি চাই যে, আপনি আমাকে পবিত্র করবেন। তখন তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। পরের দিন সে আবার তাঁর নবী কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি ব্যভিচার করেছি। এবারও তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। এরপর রসূলুল্লাহ (সা) কোন এক ব্যক্তিকে তার সম্প্রদায়ের লোকের কাছে পাঠালেন। লোক সেখানে গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কি মনে করেন যে, তার মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটেছে এবং সে মন্দ কাজে লিপ্ত হয়েছে? তারা প্রতি উত্তরে বললেন, আমরা তো তার মস্তিষ্কের বিকৃতি সম্পর্কে কোন কিছু জানি না। আমরা তো জানি যে, সে সম্পূর্ণ সুস্থ প্রকৃতির। এরপর মা’ইয তৃতীয়বার রসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে আগমন করলো। তখন তিনি আবারও একজন লোককে তার গোত্রের কাছে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রেরণ করলেন। তখনও তারা তাঁকে জানালো যে, আমরা তার সম্পর্কে খারাপ কোন কিছু জানি না এবং তার মস্তিষ্কেরও কোন বিকৃতি ঘটেনি। এরপর যখন চতুর্থবার সে আগমন করলো, তখন তার জন্য একটি গর্ত খনন করা হলো এবং তিনি (সা) তার প্রতি (ব্যভিচারের শাস্তি প্রদানের) নির্দেশ প্রদান করলেন। সুতরাং তাকে পাথর নিক্ষেপ করা হলো।
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর গামিদী এক মহিলা এসে বলল, হে আল্লাহর রসূল! আমি ব্যভিচার করেছি। সুতরাং আপনি আমাকে পবিত্র করুন। তখন তিনি (সা) তাকে ফিরিয়ে দিলেন। পরবর্তী দিন আবার ঐ মহিলা আগমন করলো এবং বলল, হে আল্লাহর রসূল (সা)! আপনি কেন আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। আপনি সম্ভবত আমাকে ঐভাবে ফিরিয়ে দিতে চান, যেমনভাবে আপনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মা’ইযকে? আল্লাহর শপথ করে বলছি, ‘নিশ্চয়ই আমি গর্ভবতী’। তখন তিনি বললেন, তুমি যদি ফিরে যেতে না চাও, তবে আপাততঃ এখনকার মত চলে যাও এবং প্রসবকাল পর্যন্ত অপেক্ষা কর। রাবী বলেন, এরপর যখন সে সন্তান প্রসব করলো- তখন ভূমিষ্ঠ সন্তানকে এক টুকরা কাপড়ের মধ্যে নিয়ে তাঁর কাছে আগমন করলো এবং বলল, এ সন্তান আমি প্রসব করেছি। তখন রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, যাও তাকে (সন্তানকে) দুধপান করাও। দুধপান করানোর সময় পার হলে পরে এসো। এরপর যখন তার দুধপান করানোর সময় শেষ হলো তখন ঐ মহিলা শিশু সন্তানটিকে নিয়ে তাঁর কাছে মহিলাটি আবার আগমন করলো-এমন অবস্থায় যে, শিশুটির হাতে এক টুকরা রুটি ছিল। এরপর বলল, হে আল্লাহর নবী! এইতো সেই শিশু, যাকে আমি দুধপান করানোর কাজ শেষ করেছি। সে এখন খাদ্য খায়। তখন শিশু সন্তানটিকে তিনি কোন একজন মুসলিমকে প্রদান করলেন। এরপর তার প্রতি (ব্যভিচারের শাস্তি) প্রদানের নির্দেশ দিলেন। মহিলার বক্ষ পর্যন্ত গর্ত খনন করানো হলো এরপর জনগণকে (তার প্রতি পাথর নিক্ষেপের) নির্দেশ দিলেন। তারা তাকে পাথর মারতে শুরু করলো। খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ) একটি পাথর নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং মহিলার মাথায় নিক্ষেপ করলেন, তাতে রক্ত ছিটকে পড়লো খালিদ (ইবনু ওয়ালীদ) (রাঃ)-এর মুখমন্ডলে। তখন তিনি মহিলাকে গালি দিলেন। নবী (সা) তার গালি শুনতে পেলেন। তিনি বললেন, সাবধান! হে খালিদ! সে মহান আল্লাহর শপথ, যাঁর হস্তে আমার জীবন, জেনে রেখো! নিশ্চয়ই সে এমন তাওবা করেছে, যদি কোন “হক্কুল ইবাদ” বিনষ্টকারী ব্যক্তিও এমন তাওবা করতো, তবে তারও ক্ষমা হয়ে যেত। এরপর তার জানাযার সালাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন। তিনি তার জানাযায় সালাত আদায় করলেন। এরপর তাকে দাফন করা হলো।
(সহিহ বুখারীঃ ৪৩২৪)

ইজ্জতের নিরাপত্তাঃ
মানুষের ইজ্জতের নিরাপত্তার জন্য কুধারণা, পরের দোষ অন্বেষণ, গীবত ও মিথ্যা অপবাদ ইত্যাদি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“হে মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
(সুরা হুজুরাতঃ ১২)

কেউ যেন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অন্যের ইজ্জতের উপর আঘাত হানতে না পারে এজন্য আল্লাহ তায়ালা মিথ্যা অপবাদকারীর উপর ৮৹ টি বেত্রাঘাতের নির্দেশ দিয়েছেন৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অতঃপর স্বপক্ষে চার জন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই না’ফারমান।”
(সুরা নুরঃ ৪)

নারীর ইজ্জতের নিরাপত্তার জন্য পরপুরুষদের থেকে পর্দা করার হুকুম দেয়া হয়েছে এবং পুরুষদেরকে নারীদের প্রতি কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়েছে৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আপনি মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গর হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক অধিকারভুক্ত বাঁদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ, ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো আছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে। মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর সামনে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।
(সুরা নুরঃ ৩৹-৩১)

অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা পর্দার হিকমাত ও উপকারিতা বর্ণনা করে বলেন,

“হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।”
(সুরা আহযাবঃ ৫৯)

সাহাবায়ে কিরাম (রা) আল্লাহ তায়ার হুকুম মেনে পরিপুর্ণভাবে ইসলাম অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার ফলে সর্বক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও শান্তি লাভ করেছেন৷ আর আল্লাহ তায়ালার হুকুম পালনের মাঝেই যে প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা নিহিত রয়েছে সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর জীবন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত৷


(চলবে)