ফের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিভিন্ন ক্যাম্পে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ত্রাণ বিতরণ ও সেবামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করতে কক্সবাজার সফর করেছেন দলটির মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী।

গত ২৯ অক্টোবর রবিবার এই উদ্দেশ্যে তিনি কক্সবাজার সফর করেন। সফর সঙ্গী হিসেবে তার সাথে ছিলেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্মমহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, ঢাকা মহানগর জমিয়তের নায়েবে আমীর মুফতী জাকির হোসাইন, জমিয়ত নেতা মাওলানা আব্দুস সালাম, মাওলানা তোফায়েল আহমদ ও মাওলানা আব্দুল্লাহ কাফী প্রমুখ।
প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ঢাকা মহানগর জমিয়তের নায়েবে আমীর মুফতী জাকির হোসাইন বলেন, মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীর নেতৃত্বে জমিয়তের প্রতিনিধি দলটি প্রথমে থ্যেইংখ্যালীর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।

জমিয়ত মহাসচিব অনেক কষ্ট স্বীকার করে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে গিয়ে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ঝুপড়ি ঘর পরিদর্শন করে শরণার্থীদের জীবন-যাপন সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় জমিয়ত মহাসচিব ক্যাম্পে থাকা বিভিন্ন বয়সের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সাথে কথা বলে তাদের বিভিন্ন সংকট এবং ত্রাণ চাহিদার ধরণ চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। এরপর আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী থ্যেইংখালী ক্যাম্পে জমিয়তের সেবা টিম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদানী জামে মসজিদ এবং কাসেমী মক্তব উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষ্যে জমায়েত হওয়া শত শত রোহিঙ্গার মাঝে জমিয়ত প্রতিনিধি দলের তরফ থেকে নগদ অর্থ ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়।

মুফতী জাকির হোসাইন আরো বলেন, থ্যেইংখালী ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে জমিয়ত প্রতিনিধি দলটি বালুখালী ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। এই ক্যাম্পে জমিয়ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাআহাদে উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) মাদ্রাসায় শ্রেণী পাঠদান পরিচালনার জন্য নতুন নির্মিত সুপরিসর একটি ঘরের উদ্বোধন করেন আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী। এরপর বালুখালী ক্যাম্পের উত্তর-পশ্চিমে জমিয়ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাআহাদে আলী (রাযি.) মাদ্রাসায় নির্মিত নতুন আরেকটি শ্রেণী পাঠদান পরিচালনার এবং দারুল হাদীস ঘর উদ্বোধন করেন তিনি।

এই উপলক্ষ্যে সমবেত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উদ্দেশ্যে করে জমিয়ত মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ যথাসাধ্য আপনাদের কষ্ট লাঘবের জন্য সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আপনারা বিপদগ্রস্ত মুহাজির। আপনাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করবেন বলে আশা করা যায়। আপনারা পুর্ণ নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে যেন দ্রুত নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে স্বাভাবিক জীবন লাভ করতে পারেন, সেই জন্য মহান আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে দোয়া করবেন। আপনাদের সন্তানদেরকে ক্যাম্পের মাদ্রাসা, মক্তবে পাঠাবেন। সকলে আদব-কায়দা ও শৃঙ্খলা মেনে চলবেন। কোন ধরণের বিশৃঙ্খলা ও আইনবিরোধী কাজে জড়াবেন না। নিজ নিজ পরিবারের নারী সদস্যদেরকে পর্দা ও পূর্ণ শরীয়ত মেনে চলতে বলবেন। সাহায্য সহযোগিতার নামে কোন এনজিও যেন আপনাদের মূল্যবান ঈমান-আক্বীদা ও আমলের ক্ষতি করতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকবেন।

এরপর আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী মাআহাদে আলী (রাযি.) মাদ্রাসার পার্শ্বে রোহিঙ্গা কিশোরী ও বালিকাদের জন্য নতুন একটি মহিলা মাদ্রাসার ভিত্তি স্থাপন করে সকলকে নিয়ে মুনাজাত করেন। জমিয়ত মহাসচিব রোহিঙ্গা শিবিরে সেবামূলক কাজে অবস্থান করা যুগ্মমহাসচিব মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমীকে অল্প সময়ের মধ্যে মহিলা মাদ্রাসাটির নির্মাণ কাজ শেষ করার জন্য কাজের রূপরেখা ও প্রয়োজনী নির্দেশনা দেন। দিনভর থ্যেইংখালী ও বালুখালী ক্যাম্পের পাহাড়ি এলাকায় স্থাপিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন জমিয়ত প্রতিনিধি দল। এছাড়াও তারা এই দুই ক্যাম্পে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় শরণার্থীদের মাঝে নগদ অর্থ, লুঙ্গি, হিজাব ও সাবান বিতরণ করেন। দুই ক্যাম্পে জমিয়ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মসজিদ, মক্তব ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিদর্শন করে সার্বিক খোঁজ-খবর নেন এবং ইমাম ও শিক্ষকদের মাঝে ভাতা হিসেবে ২ ও ৩ হাজার টাকা হারে নগদ অর্থ বিতরণ করেন।

এ সময় জমিয়ত মহাসচিব ইমাম ও শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে বলেন, মসজিদ, মক্তব ও দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সুচারুরূপে পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায় রোহিঙ্গারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া বিভিন্ন এনজিওর ঈমান-আক্বীদা বিরোধী অপতৎপরতা রোধে বেশি বেশি মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দিন শেষে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েন জমিয়ত মহাসচিব। এরপর তিনি কক্সবাজারেরে হোটেলে গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন।

রাতে কক্সবাজারের হোটেলে জমিয়ত মহাসচিবের সাথে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে সেবামূলক কাজ পরিচালনাকারী বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। এ সময় আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী বিভিন্ন ত্রাণ টিমের কার্যক্রমের খোঁজ-খবর নেন এবং নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্যে উপদেশমূলক বক্তব্য দেন। তিনি ত্রাণ ও সেবামূলক কাজ পরিচালনায় টিমগুলোকে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রতিটি টিম থেকে এক-দুই জন সদস্য নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি করুন। তারপর সমন্বয় টিমকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহের একটা ম্যাপ তৈরি করে ইতিমধ্যেই স্থাপিত মসজিদ, মক্তব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নলকূপ সমূহের স্থান চিহ্নিত করতে হবে। এরপর কোথায় কোথায় এ ধরণের প্রতিষ্ঠান ও নলকূপ স্থাপন করার প্রয়োজন আছে, পর্যালোচনা করে স্থান চিহ্নিত করুন। এরপর ত্রাণ টিমসমূহের সাথে আলোচনা করে যার যার সুবিধামতো কাজগুলো বণ্টন করে দিন এবং কাজের তদারকি করুন।

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী আরো বলেন, আমি দু’টি বড় রোহিঙ্গা ত্রাণ শিবির পরিদর্শন শেষে অনুভব করেছি, প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারের সাথে ২/৪ জন শিশু রয়েছে। পরিবারগুলোতে শিশুখাদ্য ও শিশু পোষাকের সংকট প্রকট। তাছাড়া শীত মৌসুমও চলে এসেছে প্রায়। সুতরাং ত্রাণ বিতরণের সময় শিশুদের উপযোগী খাবার, শিশুদের পোষাক এবং শীত বস্ত্রের দিকটা খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশ মিয়ানমারে পূর্ণ নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে ফিরে যেতে পারে, সেই জন্য নানা পর্যায়ে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক যোগাযোগ ও চাপ তৈরির জন্য আমরা সরকারের প্রতি জোর আহবান জানাই। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের প্রতি মানবিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার জন্যও আমরা সকলের প্রতি আহবান জানাই। পর দিন ৩০ অক্টোবর সকালে জমিয়ত মহাসচিব সফর সঙ্গীদের নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর জমিয়ত মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী কক্স বাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করে এসেছিলেন। সেই থেকে জমিয়তের একটি ত্রাণ ও সেবা টিম কক্সবাজারে অবস্থান করে মসজিদ, মাদ্রাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা, টিউবওয়েল স্থাপন এবং পর্যাপ্ত টয়লেট নির্মাণসহ রোহিঙ্গাদের মাঝে বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম ও ত্রাণ বিতরণ করে আসছেন।