একটি ‘অরাজনৈতিক’ হেফাজতে ইসলাম এবং গণমানুষের প্রত্যাশা

একটি ‘অরাজনৈতিক’ হেফাজতে ইসলাম এবং গণমানুষের প্রত্যাশা

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

‘হেফাজতে ইসলাম’ বাংলাদেশের একটি সুপরিচিত ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন যা এখন দেশের বাইরেও অনন্য পরিচয়ে পরিচিত। ২০১০ সালের ১৯তম জানুয়ারীতে চট্টগ্রামে দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর সম্মানীত পরিচালক আল্লামা আহমদ শফী সাহেব দা.বা.-এর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলামের জন্ম। সে হিসাবে সংগঠনটির বয়স এখন আট বছর পেরিয়ে ন’তে পা দিতে চলেছে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামই একমাত্র সংগঠন যা অত্যন্ত স্বল্প-সময়ে দেশব্যাপী প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছে।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটি বিশাল জনগোষ্ঠীতে কাজ করতে গেলে একেবারে ফরিশতাদের মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে যেমন কাজ করা সম্ভব নয় আবার নিরঙ্কুশ অবিতর্কিত চরিত্র নিয়ে পথ চলাও সম্ভব নয়। বিষয়টি বুঝতে বিভিন্ন চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যসম্বলিত মানবগোষ্ঠীর মনোভাব, কোন আদর্শ গ্রহণের সক্ষমতা, উপলব্ধি, পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি বিবেচনায় নিতে হবে। সেদিক থেকে বলা যায় বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলাম খুব অল্প সময়ে অরাজনৈতিক পরিচয়ে প্রচলিত সময়ের চেয়ে অনেক দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। এই জনপ্রিয়তার মূলকারণ ছিলো হেফাজতের ‘অরাজনৈতিক’ পরিচয় এবং সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত নাস্তিক ব্লগারদের ইসলাম-বিদ্বেষী তৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠী যেভাবে হেফাজতে ইসলামের ডাকে সাড়া দিয়েছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে ২০১৩ সালের ৫ম মে রাতে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বিজিবি, র্যাব ও পুলিশবাহিনী কর্তৃক হেফাজত সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নির্মম ও বর্বর গণহত্যা চালানোর পর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের গণমানুষের অন্তরে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয় যা আজও দৃশ্যমান।

বলেছি, হেফাজতে ইসলামের ‘অরাজনৈতিক’ পরিচয় দেশব্যাপী জনপ্রিয়তার একটি মূল-নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক চরিত্রের সাথে মানুষের পরিচিত হওয়ার একটি ইতিহাস আছে। কিন্তু সেই তুলনায় অরাজনৈতিক চরিত্রের সাথে গণমানুষের পরিচয় নেই বললেই চলে। এখানে কোন অরাজনৈতিক উপাদানে পরিচিত হবার দৃষ্টান্ত নেই। সে কারণে দেখা যায়, একেবারে নামসর্বস্ব হলেও দু’চারজনে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে পত্রিকার পাতায় জায়গা করে নেয়। অথচ সেই জায়গা কোন অরাজনৈতিক সংগঠনের পাওয়া মুশকিল। যারা রাজনৈতিক দল গঠন করেন তারা মনে করেন রাজনৈতিক চরিত্র বিনা এদেশে স্থান নেয়া দায়। এই যুক্তির নিরিখে একটি অরাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে হেফাজতে ইসলাম যে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে তা দেশে তো বটেই বহির্বিশ্বেও অবাক করেছে। এর কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনীতি চলছে তা এতোটাই কলুষিত আর কদর্য যে মানুষ এসবকে এখন ঘৃণার চোখে দেখছে। মানুষ এসব থেকে এখন মুক্তি চায়, বাঁচতে চায়। হেফাজতে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতার আরেকটি বড়ো কারণ হলো এই অরাজনৈতিক সংগঠনটি মূলত দেশের কেন্দ্র থেকে প্রত্যন্ত-অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কওমী মাদরাসানির্ভর। আর কওমী-জগৎ হলো দেশের একমাত্র সম্মিলিত সামাজিক শক্তি যেখানে জড়িয়ে আছে দলমত নির্বিশেষে সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিম-জনতা। আন্দোলনের দিক থেকে বলতে হয়, যে বিষয়কে সামনে রেখে হেফাজত মাঠে নামে তা ছিলো সচেতন মুসলিম সমাজে সর্বজনগ্রাহ্য একটি সংবেদনশীল বিষয়। অভিশপ্ত নাস্তিক রাজিবের নেতৃত্বে ইসলাম-বিদ্বেষী ব্লগাররা যখন সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন, কুরআন, মহানবী রসূলুল্লাহ সা. এবং সর্বোপরি ইসলামী অনুশাসন নিয়ে কটুক্তি অনলাইনে ছড়িয়ে দেয় তখনি সেসবের প্রতিবাদ জানাতে এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে হেফাজতে ইসলাম মাঠে নামে। এখানে কস্মিনকালে কোন রাজনীতি বা পার্থিব স্বার্থের বিষয় জড়িত ছিলো না। ফলে দেশের সর্বস্তরের মুসলিম জনতার স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলাম দেশ ও বহির্বিশ্বে মনযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়।

হেফাজতে ইসলামের কোন রাজনৈতিক অভিলাষ বা নীতি কখনো ছিলো না, এখনো নেই। মুহতারাম মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী একথাটি বারবার বলেছেন। তিনি স্পষ্টভাষায় বলেছেন, হেফাজত কাউকে ক্ষমতায় উঠানো বা কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য গঠন করা হয় নি। হেফাজত ইসলাম রক্ষার জন্য গঠিত হয়েছে। তাঁর এ বক্তব্যে হেফাজতে ইসলামের মৌলিক দর্শনের কথাই উঠে এসেছে। সুতরাং কেউ হেফাজতে ইসলামের নাম বা পদবী ব্যবহার করে কোন রাজনৈতিক ফায়দা লুটে থাকলে বা চেষ্টা করলে সে দায়িত্ব হেফাজতের নয়। তবে এটা সত্য যে, এ ধরনের ব্যক্তি হেফাজতের কোন পদে থাকার যোগ্য নয় নীতিগত কারণে। বলতে দ্বিধা নেই, ‘অরাজনৈতিক’ চরিত্র মূলত হেফাজতে ইসলামের অস্তিত্বের অন্যতম পূর্বশর্ত। যখনি হেফাজতকে কেউ রাজনীতির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহারের অপপ্রয়াস চালাবে তখনি হেফাজতের মান-সম্মান আর অস্তিত্ব বিপদের মুখে পড়বে। এ বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সজাগ থাকতে হবে– সজাগ থাকতে হবে কেউ যেনো আসন্ন ভোটের রাজনীতিতে হেফাজতকে ব্যবহারের সুযোগ না পায়। সরকার হোক আর বিরোধী হোক সবাই চাইবে হেফাজতের কোন অংশের সাথে নৈশ-আলোচনার বীজ বপণ করতে। বিষয়টিতে সবার সতর্ক দৃষ্টি থাকা অনিবার্য। হেফাজতের আরেক দুশমন হলো মিডিয়া। যতোদূর সম্ভব তাদের সাথে কথা না বলাই উচিৎ। কারণ, বর্তমান ভারতসেবী মিডিয়া কখনোই হেফাজতের কথা অবিকৃত প্রচার করবে না। তারা তাদের প্রভুদের স্বার্থে বিকৃত করেই প্রচার করবে। অতীতে এমনই দেখা গেছে।

মোটকথা, হেফাজতে ইসলামের অরাজনৈতিক চরিত্র যে কোন মূল্যে রক্ষা করে যেতে হবে। এটাই গণমানুষের মৌলিক প্রত্যাশা। এর অর্থ কখনো এ নয় যে, হেফাজত তাঁর চিরায়ত প্রতিবাদের পথ থেকে দূরে সরে যাবে। বরঞ্চ হেফাজত তার পথ ও সংগ্রামকে আরও পরিশীলিত করে আল্লাহর সন্তষ্টিকে শিরোধার্য করে গণমানুষের আকাঙ্খা পূরণে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে যেন ইসলাম-বিরোধী কোন বৈরী-শক্তি প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে শেকড় গাড়তে না পারে। এখানেই নিহিত হেফাজতে ইসলামের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।