জনপ্রিয় পাজেল রুবিক’স কিউব যেভাবে সমাধান করবেন

রুবিক’স কিউব! একটি জনপ্রিয় খেলা। ধারণা করা হয় ১৯৭৪ সাল থেকেই এর যাত্রা শুরু।

হাঙ্গেরিয়ান প্রকৌশলী ইর্নো রুবিক চেয়েছিলেন এমন একটা ত্রিমাত্রিক ছোট জিনিস বানাতে যেটা স্বাধীনভাবে যেকোনো দিকে ঘোরানো যাবে।

তার বানানোর লক্ষ্য ছিল অন্যদের ত্রিমাত্রিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়া। কিন্তু তিনি ছয়টা রঙ ব্যবহার করে এমন একটা ধাঁধা বানিয়ে ফেললেন যেটার সমাধান করতে তার কয়েক মাস লেগে যায়। রঙগুলো হল- কমলা, নীল, লাল, সবুজ, সাদা, হলুদ।

১৯৭৫ সালে এর পেটেন্ট তৈরি করেন। আর তখনই এটি হাঙেরিতে সর্বোচ্চ বিক্রি হয়।

বৈশ্বিকভাবে পাজেলটির বিক্রি শুরু হয় ১৯৮০ সালে। বলা হয়ে থাকে রুবিক’স কিউব সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া খেলনা।

গেল ৩৫ বছরে শুধুমাত্র হাঙেরিতেই ৩৫০ মিলিয়ন কিউব বিক্রি হয়েছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এটি সমাধান করতে চেষ্টা করেন।

রুবিক যে কিউবটি আবিষ্কার করেছিলেন তার তল ছিল ছয়টি এবং সেটা ছিল ৩x৩ কিউব।

এরপর প্রায় প্রতিবছর ই বিভিন্ন ধরন, বিভিন্ন আকারের কিউব আবিষ্কার হচ্ছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এই ৩x3 কিউবটিই প্রায় ৪৩২৫২০০৩২৭৪৪৮৯৮৫৬০০০ পদ্ধতিতে মেলানো যায়। যদি কেউপ্রতি সেকেন্ডে একটি ঘুর্ণন করেও মেলাতে চেষ্টা করে তবুও কোটি কোটি বছর লেগে যাবে। একবার এক পদ্ধতিতে এটি মেলানো শিখলে পরের পদ্ধতি গুলো সহজ মনে হবে। একটি তলে তিনটি লেয়ার থাকে। উপর-নিচ তিনটি এবং লম্বা-লম্বি তিনটি।

এটি মেলাতে গিয়ে যাদের ঘাম ছুটেছে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন তাদের জন্যই একটি সহজ এলগরিথম দেয়া হলোঃ

সাধারণ নিয়ম

একটি ৩x৩ কিউবএর কোনার টুকরোগুলো শুধু এক কোনা থেকে অন্য কোনায় নেয়া যাবে। আর মাঝের টুকরোগুলো সবসময়মাঝখানেই নেয়া যাবে। আর একদম মাঝখানের রঙটিকে বেস বা ভিত্তি ধরে নিতে হবে। এটি কখনো পরিবর্তন করা যায় নাহ। আরেকটি সব এলগরিথমতেই কাজে লাগে লক মেথড। বাম পাশের বা ডান পাশের কোনায় পরপর দুটি সাদা আছে। আর ঠিক ঐ লাইনের নিচেই শেষ কোনায় আরেকটি সাদা। এখন তিনটি রঙ একত্রিত করতে হলে প্রথমে দুটি সাদা যেখানে আছে তাকে উপর দিকে রেখে নিচের সাদা টিকে যদি লাইনটি বাম পাশে হয় তবে ডান পাশে এবং ডানে হলে বাম পার্শে একবার ঘুরাতে হবে যেন তা লক হয়ে যায়। উপরের সাদাটিকে নিচে নামাতে হবে। এরপর সাদা অংশটিকে আবার আগের যায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। আপনি পেয়ে যাবেন তিনটি সাদা।

ক্রস মেথড

এটি হলো সবচেয়ে সহজ একটি পদ্ধতি। খুব সহজেই এর মাধ্যমে মেলানো যায় রুবিক্স কিউব । তবে স্পিড কিউবিং বা দ্রুত সমাধানে এটা সাধারনত ব্যবহার করা হয় নাহ। (মনে রাখতে হবে যে ঘর নিয়ে কথা হচ্ছে তা থাকবে আমাদের দিকে ঘোরানো। আশেপাশে লেয়ার ঘোরানোর কথা বললেও শুরুর দিক যেন আমাদের দিকেই থাকে।

১) ধরে নেই সাদা হলো ভিত্তি। এবার মধ্য টুকরো সাদা এর আশেপাশে একটি প্লাস বা + তৈরি করতে হবে। কিছুক্ষন চেষ্টা করলেই এটি খুব সহজেই করা যাবে। এরপর দেখা যাবে যেকোন সাদার নিচের দুটি রঙ (মিডিল লেয়ার এবং মিডিল আপ লেয়ার) মিলে গেছে। না মিললে উপরের লেয়ার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে হবে কখন দুটি মিলে যায়।

২) সাদা উপরে রেখেঃ যদি পাশাপাশি তলের দুটি মিলে। (৯০%ক্ষেত্রে মিলবে) তবে বাকি দুই ঘরের মিডিল এবং আপ মিডিল টুকরো মেলাতে হবে। যে দুটি তলে মিলেছে সে দুটির একটিকে বাম পাশে আর ডান পাশের ঘরে উপরের ডানের সর্বশেষ লেয়ার এর মাঝখানের সাদাকে নিচে নামাতে হবে এবং উপরের লেয়ারকে ডানে একবার ঘোরাতে হবে। সাদা অংশটিকে আবার উপরে তুলতে হবে। ফলে নিচে নেমে আসা সাদা টিকে উপরে খালি হয়া যায়গায় পুনঃস্থাপিত করতে হবে। আপনার কিউবের সাদার নিচের প্রথম দুই লেয়ার এর মিডিল মিলে গেছে।

৩) প্রথম লেয়ার মেলানোঃ সাদাকে উপরে রেখে সবচেয়ে নিচের লেয়ারে যে সাদা টুকরো রয়েছে তার নিচে যে রঙ থাকবে তাকে সেই ঘরে নিয়ে লক মেথড ব্যবহার করতে হবে। এভাবে সাদা মিলে যাবে এবং সব ঘরের প্রথম লেয়ার মিলে যাবে।

৪) দ্বিতীয় লেয়ার মেলানোঃ এবার হলুদকে উপরে রাখতে হবে। উপরের লেয়ারের মাঝখানের টুকরোটিকে তলের মাঝখানের ঘরের সাথে মেলাতে হবে। এরপর উপরের লেয়ারের মাঝখানের টুকরোটির উপরে যে রঙের টুকরো আছে সেই রঙ যে দিকে থাকবে তার বিপরীতে উপরের লেয়ার একবার ঘুরাতে হবে। এরপর যে পাশে ঘোরানো হয়েছে শুরুর ঘরের তার বিপরীত পাশের লেয়ারকে একবার উপরে তুলতে হবে। যে পার্শের লেয়ার তোলা হয়েছে সে দিকে উপরের লেয়ার একবার ঘোরাতে হবে। যে লেয়ার নিয়ে কাজ হচ্ছিল(সাদা)সেটিকে নিচে নামিয়ে দিতে হবে। লক মেথড ব্যবহার করে সাদা মিলিয়ে ফেলতে হবে। একই পদ্ধতিতে আগাতে থাকলে দ্বিতীয় লেয়ার মিলে যাবে। যদি কখোন উপরে হলুদ চলে আসে। তবেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে আগাতে হবে।

৫) হলুদ মেলানোঃ যদি মিডিলে পরপর তিনটি হলুদ থাকে তাহলে হলুদএর লাইনটিকে আমাদের দিকে রেখে যেকোন এক পাশকে আমাদের দিকে রেখে বাম লেয়ার বা ডান লেয়ার একবার উপরে তুলতে হবে। যে লেয়ার তোলা হবে তার বিপরীত দিকে উপরের লেয়ারকে ঘোরাতে হবে। উপরে তোলা লেয়ারটিকে(সাদা) নিচে নামিয়ে দিতে হবে। উপরের লেয়ারটিকে আরেকবার ঘোরাতে হবে(যেদিকে প্রথমবার ঘোরানো হয়েছিল। যেই লেয়ার প্রথমবার উপরে তোলা হয়েছিলঅর্থাৎ নিচে থাকা দুটি সাদাকে একবার উপরে তুলতে হবে।

দল বিচ্ছিন্ন সাদা টুকরোটিকে দুবার যেদিকে ঘোরানো হচ্ছিল সেদিকে ঘোরালে তা আবার সাদার সাথে মিলে যাবে। সাদাকে নিচে নামিয়ে দিতে হবে। এবার মিডিল, মিডিল আপ এবং পাশের হলুদ টুকরো মিলে যাবে L। আমাদের দিকে উলটো L রেখে তার বাম পাশে (সাদা) একবার উপরে তুলতে হবে। উপরে তোলা সাদার দিককে আমাদের দিকে রেখে যে লেয়ারে সাদা তোলা হয়েছে তার বিপরীত দিকে উপরের লেয়ারকে ঘোরাতে হবে। যেদিকের সাদা তোলা হয়েছিল ওই অংশের (ডান পাশের তলের) সাদা একবার উপরে তুলতে হবে। উপরের লেয়ারের সাদা আবার তার লাইনে এনে ঘুরিয়ে নামিয়ে দিতে হবে। হলুদের ক্রস পাওয়া যাবে।

আবার ঐ পদ্ধতি ব্যবহার করলেই এক কর্নারে হলুদ টুকরো সহ ক্রস পাওয়া যাবে। যে কর্নারে হলুদ টুকরোটি থাকবে তার সংলগ্ন যেকোন তলের উপর লেয়ারে একটি হলুদ টুকরো থাকবে। টুকরোটি যে লেয়ারে সে লেয়ারকে একবার উপরে তুলতে হবে। যে পার্শে সাদা তিনটি উপরে লেয়ারকে তার বিপরীত দিকে একবার ঘোরাতে হবে এবং সাদা দ্বয়কে নিচে নামিয়ে দিতে হবে। যে পার্শে উপরের লেয়ারকে ঘোরানো হচ্ছিল সেদিকে একবার ঘোরাতে হবে। সাদা দ্বয়কে আবার একবার উপরে তুলতে হবে। উপরের লেয়ারকে ঐ দিকেই দু’বার ঘোরাতে হবে। সাদা নিচে নামিয়ে দিতে হবে। হলুদ সম্পুর্নভাবে মিলে যাবে। ৫০% সলভারের এখানে সমস্যা হতে পারে। আবার নতুন করে শুরু করে ঠান্ডা মাথায় ভালো করে পড়ে মেলান।

৬) সম্পূর্ণ মেলানোঃ যেকোন এক তলের উপরের লেয়ারের দুই কর্নার মেলানো থাকবে। না থাকলে ঘরিয়ে নিতে হবে উপরের লেয়ার টিকে। এখন হলুদকে আমাদের দিকে রেখে ডান পাশের মিলে যাওয়া লেয়ারটিকে একবার উপরে তুলতে হবে। ফলে হলুদের ঘরে ঐ রঙ এর লাইন চলে আসবে। আমাদের দিকের সবচেয়ে কাছের লেয়ারটিকে একবার ডানে ঘোরাতে হবে। কর্নার মেলা ঘরে উঠে আসা সাদার লাইনকে একবার উপরে তুলে হলুদের ঘরে আনতে হবে। আমাদের দিক থেকে সবচেয়ে দূরে থাকা লেয়ারকে ডানে দুবার ঘোরাতে হবে ।

সাদা লাইনটিকে একবার পেছনে নিতে হবে। আমাদের সবচেয়ে কাছের লেয়ারটিকে একবার বামে ঘোরাতে হবে। সাদাকে আবার হলুদের ঘরে আনতে হবে। সবচেয়ে দূরের লেয়ারটিকে ডান পাশে আবার দুইবার ঘোরাতে হবে। সাদার লাইনকে সাদা্র ঘরে নিয়ে যেতে হবে। এখন সবগুলি ঘর বা তলের দুই কর্নার মিলে যাবে এবং ৯৯% ক্ষেত্রে একটি তল সম্পূর্ণ মিলে যাবে। সম্পূর্ণ মিলে যাওয়া তলের বিপরীত পার্শে যে তল থাকবে এখন তা নিয়ে কাজ করতে হবে। বিপরীত পার্শের মিডিল আপ লেয়ার যে কালারের হবে সেই কালার যে পার্শের ঘরে থাকবে উপরের লেয়ারকে সেদিকে ঘোরাতে হবে। ডান লেয়ার উপরে তুলতে হবে। ফলে সাদা লাইন আসবে। উপরের লেয়ারকে বামে একবার ঘোরাতে হবে। সাদা দ্বয়কে নিচে নামিয়ে দিতে হবে। উপরের লেয়ারকে আবারও একবার বামে ঘোরাতে হবে। সাদাদ্বয় আবার উপরে তুলে দিতে হবে। উপর লেয়ারকে কে দুবার বামে ঘোরাতে হবে। সাদা লাইনকে নিচে নামিয়ে দিতে হবে। হলুদ তল নষ্ট হয়ে যাবে। পূর্বের পদ্ধতি অনুসারে মিলিয়ে ফেলতে হবে হলুদকে। ৯০% ক্ষেত্রেই এখানেই মিলে যাবে সব ঘর। আর না মিললে দুই কর্নার মেলা অবস্থায় থাকলে আবার একই পদ্ধতি অনুসরণ করলে মিলে যাবে।

ধৈর্য ধরে প্রতিটি ধাপ ধীরে ধীরে মনে রেখে চেষ্টা করুন। প্রথম অবস্থায় এই পদ্ধতি অবলম্বন করে দেখুন মেলাতে পারেন কি না। এরপর নিজে বুঝে অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন। তাছাড়া ইউটিউবে এই সম্পর্কিত অনেক ভিডিও পাওয়া যায়, এগুলো দেখেও অনুসরণ করতে পারেন।