বাংলাবাজার ‘ইসলামী টাওয়ার’ বনাম শাহবাগ ‘পাঠক সমাবেশ’

আরিফ আজাদ | লেখক ও অনলাইন এক্টিভিস্ট


(১)
শাহবাগে মিটিং শেষ করে মন চাইলো একটু পাঠক সমাবেশ থেকে ঘুরে আসতে। আমি জানি পাঠক সমাবেশ বাংলাদেশের সেক্যুলারদের আঁতুড়ঘর। তবুও, মাঝেমধ্যে ঢুঁ মারি। ভালো লাগে। বাংলাদেশের অনেক সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের দেখি সেখানে।

পাঠক সমাবেশে মূলত সেক্যুলারদের বইগুলোই ডিসপ্লে করা হয় খুব বেশি। খুব নগন্য সংখ্যক ইসলামী বই (তাও মূলধারার বাইরে) সেখানে দেখতে পাওয়া যায়।
সেখানে আছে তসলিমা নাসরীনের ‘লজ্জা’, ‘ক’, ‘আমার মেয়েবেলা’, হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’, ‘ফালি ফালি করে কাঁটা চাঁদ’ ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ সহ বিভিন্ন বই।
প্রেম ভালোবাসা, দৈহিক সম্পর্ক, ছেলে মেয়েদের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো বিভিন্ন কৌতুহল জাগানিয়া শিরোনাম সর্বস্ব বইতে ভরপুর।
ম্যানার, আদব-কায়দা, চরিত্র ইত্যাদি শিখতে, জানতে পারার মতোন কোন বই সেখানে পাওয়া যায় না। আমি অন্তত কখনো পাইনি।

আমার এই বই, ওই বইয়ের দিকে তাকানো দেখে এক ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,- ‘আপনি কী কোন বই খুঁজছেন স্যার?’
আমি বললাম, – ‘হ্যাঁ’
– ‘কোনটা?’
– ‘সা……..জি…..দ। পুরো নাম কী যেন! ও হ্যাঁ, প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ। বইটা আছে?’

ছেলেটা আমাকে বললো, – ‘না। এখানে আরিফ আজাদের বই রাখা হয় না।’

আমি আশাহত হবার ভান করে অন্য দিকে মুভ করে আরো কিছু বই উল্টে-পাল্টে দেখে বেরিয়ে আসলাম।
আমি জানতাম সেখানে সাজিদ কোনদিনও রাখা হবে না। কোন ইসলামী বই-ই সেখানে সাধারণত রাখা হয় না। তবে, যে জিনিসটা আমার ভালো লাগলো সেটা হলো, একজন ক্রেতাকে তারা যেভাবে ট্রিট করেছে, সেটা। তাদের এই ম্যানারটা আমার কাছে চমৎকার লেগেছে।
আমি হয়তোবা আরো অনেকবার পাঠক সমাবেশে যাবো। বই কিনবো। আমার আইডিওলোজির সাথে তাদের আইডিওলোজি না মিলুক, অন্তত তারা আমার সাথে ভদ্রভাবে কথা বলেছে। আমার কোন বইটা লাগবে জানতে চেয়েছে। যেটা পাওয়া যাবেনা সেটা আমাকে সরাসরিই জানিয়েছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে।

(২)
মাঝে মাঝে বাংলাবাজারেও যাওয়া হয়। ইসলামী বইয়ের জন্য বাংলাবাজারের ‘ইসলামী টাওয়ার’ কে নাকি ‘বসুন্ধরা সিটি’ বলে ডাকা হয়। আমার মতে, উপাধিটা যথার্থই। প্রায় ৯৬% ইসলামী বই-ই ইসলামী টাওয়ারে পাওয়া যায়।

কিছুদিন আগে একবার গিয়েছিলাম সেখানে। এক দোকানে (প্রকাশনীতে) গিয়ে একটি বই হাতে নিলাম। বইটা হাতে নিয়ে দোকান মালিকের কাছে তিন তিনবার জিজ্ঞেস করলাম বইটার দাম। দুঃখের বিষয়, উনি আমাকে বইয়ের দাম বলেন নি। শেষমেশ বইটা না নিয়েই আমাকে অন্যত্র হাঁটা ধরতে হলো।

আরেকদিনের ঘটনা। আমার এক বন্ধু কিছু বই পাঠাবে ঢাকার বাইরে। পাঠাতে হবে বাংলাবাজার ইসলামী টাওয়ারের এক প্রকাশনীর মাধ্যমে।
আমার বন্ধুটা বইগুলো নিয়ে সেই প্রকাশনীতে গেলো। বইগুলো নিয়ে আমার বন্ধুটা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকবার বলার পরেও বইগুলো তারা রিসিভ করছিলো না। কিছুক্ষণ পরে দোকানের একজন আমার বন্ধুকে বললো,- ‘ওইদিকে যান। উনারে দেন।’
আমার বন্ধুটা সেদিকে গেলো। গিয়ে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলো। এরপর আমার বন্ধুটা বললো,- ‘ভাই, আমার একটু তাঁড়া আছে। যদি বইগুলো একটু রাখতেন….’
দোকানের লোকটা তাকে অত্যন্ত রাগের স্বরে, তীক্ষ্ণ গলায় বললো,- ‘আরে আপনার ঠেকা পড়ছে। আমার কী ঠেকা পড়ছে নি?’

আমার বন্ধুর কাছে সেদিন এই ঘটনা শুনে আমি খুব মর্মাহত হলাম। তাদের কাছ থেকে আমি কখনোই এরকম ব্যবহার আশা করিনি। আমার সমমনা কেউই করবেনা হয়তোবা।
এই ইসলামী টাওয়ারে কিন্তু লজ্জা, আমার মেয়েবেলা, ক, নারী, ফালি ফালি করে কাঁটা চাঁদ, পাক সার জমিন সাদ বাদের মতো বই বিক্রি হয় না। এখানে বিক্রি হয় আল আদাবুল মুফরাদ বা অন্যন্য শিষ্টাচার। চরিত্র গঠনের উপায়। এখানে বিক্রি হয় রাসূল (সাঃ) এর পবিত্র জীবনী, সাহাবা (রাঃ) দের জীবনী, সোনালী যুগের সেসব মানুষদের জীবনী যারা কথায়, কাজে, কর্মে সকল মানুষের জন্য আদর্শ। সবচেয়ে বড় কথা, এখানে বিক্রি হয় আল কোরআনুল কারীম।
সেই জায়গা থেকে যখন এরকম ব্যবহার আমরা পাই, তখন দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে জৈনক মনীষীর সেই বাণীটিই মনে পড়ে-

‘They are the best seller of the worst product & we are the worst seller of the best product…’


ফেসবুক থেকে