আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়

আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়

জাকারিয়া মাসুদ


মডেল সিনহা রাজ। পুরো নাম মাহাতারা রহমান শৈলী। মা-বাবার একমাত্র সন্তান। বিয়েও দিয়েছিলেন তাদের পছন্দে। সেই সংসার ভেঙে নতুন সংসার গড়েছিলেন অভিজিতের সঙ্গে। আগের সংসারে একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তানও রয়েছে। নতুন সংসার গড়ার পর স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজ করতেন মিডিয়ায়। স্বামী অভিজিৎ অভিনয় করেন বিভিন্ন নাটকে। পরিচালনাও করেন। ওই জগতে তার নাম অভিজিৎ অভি। মঙ্গলবার রাত ১২টার পরে মহাখালীর দক্ষিণপাড়ার ভাড়া বাসায় ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায় সিনহাকে। দেখতে পেয়ে অভিজিৎ ও প্রতিবেশীরা উদ্ধার করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে মহাখালী মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

২১ বছর বয়সী রাউধা আতিফ মালদ্বীপের একজন উঠতি মডেল। তার ছবি ইতোমধ্যে ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে প্রকাশিত হয়েছে। ভোগ ইন্ডিয়া ম্যাগাজিনের ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসের প্রচ্ছদে রাউধা আতিফের ছবি প্রকাশ হয়েছিল। সেই সময় মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ নাশীদ তাকে টুইটারে অভিনন্দন জানান। সমুদ্রের পানির মতো নীল চোখের অধিকারী হওয়ায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন আতিফ। ইন্সটাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা ত্রিশ হাজারের মতো। মালদ্বীপের নীলনয়না রাজশাহীর ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের মহিলা হোস্টেলে আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে।

গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন মডেল সাবিরা হোসাইন। মঙ্গলবার ২৪ মে ভোর ৫টা নাগাদ মিরপুরের রূপনগরে সাবলেটে বাসা থেকে, ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই বাসায় সাবিরা একাই থাকতেন। ফেসবুকে নিজের আত্মহত্যার বিষয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন তিনি। আত্মহত্যার আগে ফেসবুক দেওয়া স্ট্যাটাস থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রেমঘটিত কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। সাবিরা হোসাইন বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজের মডেলিং এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একই সাথে মোহনা টেলিভিশন এবং পরবর্তীতে গান বাংলা টেলিভিশনের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বেশ কয়েক দিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন সাবিরা। পারিবারিক ও প্রেমঘটিত কারণে সাবিরা আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বেনিংটন জনপ্রিয়তা লাভ করেন ২০০০ সালে লিনকিন পার্কের প্রথম অ্যালবাম হাইব্রিড থিওরিতে ভোকাল হিসেবে গান গাওয়ার মাধ্যমে। এই অ্যালবামটি ব্যাপক সফলতা পায়। এরপর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। লক্ষ জনতার মনজয়কারী এ গায়ক লস অ্যাঞ্জেলসের পালোস ভার্দোস স্টেটে নিজ বাসভবনে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

২০১২ সালে লাক্স তারকা সুমাইয়া আজগর রাহা আত্মহত্যা করেন। মোহাম্মদপুরের বাসায় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ডলি আনোয়ার। ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে ডলি আনোয়ার বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। অনেকের মতোই ডলি আনোয়ারের এই মৃত্যু রহস্য থেকে গেছে।

গত কয়েক বছরে তারকাদের আত্মহত্যার তালিকায় রয়েছেন— মডেল-অভিনেত্রী মিতা নূর, লাক্স তারকা রাহা, মডেল-অভিনেতা মঈনুল হক অলি, সিনহা, নায়লা, লোপা, সাবিরা, পিয়াসসহ অনেকেই। অন্যদিকে আত্মহত্যার চেষ্টা করেও বেঁচে গেছেন লাক্স তারকা জাকিয়া বারী মম, কণ্ঠশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যানসি, মডেল-অভিনেত্রী প্রভা ও সারিকা।

যাদের নাম উল্লেখ করা হল, তাদের কোন কিছুরই অভাব ছিলো না। অর্থ, বিত্ত, বৈভব কোনটাই তাদের কম ছিলো না। তরুণ প্রজন্মের মাঝে জনপ্রিয়তার কোন ঘাটতি ছিলো না। যৌবনকে উপভোগ করার মত উপকরণেরও কোন অভাব ছিলো না। তবুও একটা সময়ে এসে এরা আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচতে গিয়ে একেবারে নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছে।
কেন তাদের এমন করুণ পরিণতি হলো?
রাসূল (ﷺ) বলেছেন, أَلاَ وَإِنَّ فِي الْجَسَدِ مُضْغَةً إِذَا صَلَحَتْ صَلَحَ الْجَسَدُ كُلُّهُ، وَإِذَا فَسَدَتْ فَسَدَ الْجَسَدُ كُلُّهُ‏.‏ أَلاَ وَهِيَ الْقَلْبُ
“জেনে রাখ, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীরই তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখ– সে গোশতের টুকরোটি হল কলব।”
(বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহীহ, কিতাবুল ইমান, ১/৫০)
অন্তর হলো মানুষের মূল চালিকাশক্তি। যখন অন্তর ভালো থাকে তখন জীবনটা সতেজতায় ভরে যায়। দেহে কর্মচাঞ্চল্যতা আসে। আর যখন অন্তর খারাপ থাকে, তখন জীবনটা যেন ক্ষণিকের জন্য থমকে যায়। বিষণ্ণতা আমাদের গ্রাস করে।

অন্তরকে নির্মল করতে মানুষ বিভিন্ন উপকরণের শরনাপন্ন হয়। অর্থ, বিত্ত, বৈভব, জনপ্রিয়তা, গান, মুভি, উপন্যাস, এসবের মধ্যে অন্তর প্রশান্তকারী উপাদান খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু এসব কি আদৌ আমাদের অন্তরকে প্রশান্ত করতে পারে? দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে পারে? ব্যাথাতুর অন্তরকে নির্মল করতে পারে?
পারে না। অবশ্যই পারে না। যদি পারতো তাহলে– অর্থ, বিত্ত, বৈভবের মাঝে বেড়ে উঠা লোকগুলো দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে আত্মহননের পথ বেছে নিতো না। নির্জনে চোখের পানি ফেলতো না। না পাওয়ার বেদনা তাদেরকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেরাতো না। এসব ধোঁকার সামগ্রী আমাদেরকে সাময়িক উত্তেজিত করতে পারে। কিন্তু কলুষিত অন্তরকে প্রশান্ত করতে পারে না। ক্ষতবিক্ষত হৃদয়কে নির্মল করতে পারে না। মানসিক বিষাদের উপশম করতে পারে না।

তাহলে অন্তরের প্রশান্তি কোথায় আছে?
আসুন আমাদের স্রষ্টার কাছ থেকে শুনি– প্রশান্তি কোথায় আছে। সর্বশক্তিমান স্রষ্টা বলছেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ [١٣:٢٨]
“জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।” (সূরা রদ: ২৮)

আমার ভাই! সব বাঁধাকে ছিন্ন করুন। স্রষ্টার এ দাবিকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করুন। চিত্তাকর্ষী নেশাদার জিনিস থেকে নিজেকে মুক্ত করুন। স্রষ্টার দিকে ফিরে আসুন। কলুশিত অন্তরকে প্রশান্ত করুন। জীবনকে উপভোগ করুন।


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74