মুসলমানদের পতন কেন (তৃতীয় পর্ব)

মুসলমানদের পতন কেন (তৃতীয় পর্ব)

মুহাম্মাদ আবু আখতার


আধুনিক মুসলমানদের ঈমান-আমলের করুণ অবস্থা এবং এর পরিণতি


পূর্ব প্রকাশের পর।
দ্বিতীয় পর্বে সাহাবায়ে কিরাম (রা) এর ঈমান-আমলের সামান্য কিছু নমুনা এবং আল্লাহর হুকুম পালনের মাধ্যমে তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম৷ তৃতীয় পর্বে আধুনিক মুসলমানদের ঈমান ও আমলের করুণ অবস্থা এবং এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ৷

আধুনিক মুসলমানদের ঈমান ও আমলঃ
বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলমান ঈমানী শক্তির দিক দিয়ে যেমন অত্যন্ত দুর্বল তেমনি নেক আমলের ব্যাপারেও অত্যন্ত গাফেল ও উদাসীন৷ আধুনিক মুসলমানদের মাঝে অসংখ্য ঈমানবিরোধী মতবাদ ও কুসংস্কার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে৷ এর ফলে তাদের মহামুল্যবান ঈমান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷ আর তারা দুনিয়ার মোহে এমনভাবে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে আল্লাহর হুকুম পালনের ব্যাপারে চরম অবহেলা করছে৷ এসব বিষয়ে সামান্য কিছু দৃষ্টান্ত বর্ণনা করছি৷

ঈমানবিরোধী মতবাদ ও কুসংস্কারঃ
বর্তমান মুসলিম সমাজে সাধারণত তিন ধরণের লোক বাস করে৷ একদল আধুনিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত, একদল ধর্মীয় শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত এবং আরেক দল সাধারণ জনগণ৷ প্রত্যেক শ্রেণীর মুসলমানদের ঈমান ধ্বংসের জন্য আলাদা আলাদা ভয়ংকর ফাঁদ পাতানো রয়েছে৷ আধুনিক শিক্ষিতদের ঈমান নষ্টের জন্য রয়েছে বিভিন্ন চটকদার কুযুক্তিপুর্ণ ঈমানবিরোধী মতবাদের ফাঁদ৷ ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিতদের ঈমান নষ্টের জন্য রয়েছে দুনিয়াবী স্বার্থের ফাঁদ৷ আর সাধারণ মুসলমানদের ঈমান নষ্টের জন্য রয়েছে ধর্মের নামে নানা ধরণের কুসংস্কার এবং ভন্ডপীরের ফাঁদ৷ এসব ফাঁদে পড়ে অনেক মুসলমান তাদের মহামুল্যবান ঈমান নষ্ট করছে৷ কিন্তু এ সম্পর্কে তাদের অনেকে তেমন কোন ধারণাই রাখে না৷

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদঃ
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এর আভিধানিক অর্থ সকল ধর্মের ব্যাপারে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করার মতবাদ৷ কিন্তু ব্যবহারিক অর্থে ধর্মকে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রেখে জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে এর প্রভাবমুক্ত রাখার নামই হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ৷ কিন্তু ইসলাম তো শুধুমাত্র মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়৷ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম দিকনির্দেশনা দিয়েছে৷ অথচ ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবন ছাড়া জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামকে সম্পুর্ণভাবে অস্বীকার করা হয় যা সুস্পষ্ট কুফরী৷ বর্তমান মুসলিম বিশ্বের বেশ কিছু দেশ এ কুফরী মতবাদ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক৷

গণতন্ত্রঃ
গণতন্ত্র হচ্ছে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা৷ বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্র অত্যন্ত জনপ্রিয় মতবাদ৷ অথচ এ মতবাদ স্বীকার করলে আল্লাহর সর্বময় কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা তথা সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানা হয়। ইসলাম বলে সকল ক্ষমতার মালিক আল্লাহ তায়ালা৷ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছেঃ
অর্থঃ “বরকতময় তিনি যার হাতে সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব । আর তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান । (সূরা মূলক : আয়াত নং ১)।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেনঃ অর্থঃ “বল,’হে সকল ক্ষমতার মালিক আল্লাহ ! আপনি যাকে চান তাকে ক্ষমতা দান করেন, আর যার থেকে চান ক্ষমতা কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন আর যাকে চান অপমানিত করেন,আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।”
(সুরা আলে ইমরানঃ ২৬)

গণতন্ত্রের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার পরিবর্তে জনগণকে সার্বভৌম ক্ষমতারী মনে করা হয়৷ যেমন বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ নং অনুচ্ছেদ এর ১ নং ধারায় বলা হয়েছেঃ ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। আল্লাহ ব্যতিত অন্য কাউকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মনে করা সুস্পষ্ট শিরক৷

সমাজতন্ত্রঃ
সমাজতন্ত্র এমন একটি মতবাদ যে মতবাদে ধর্মকে সম্পুর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়৷ এ মতবাদের প্রবর্তক কালমার্কস ধর্মকে আফিমের সাথে তুলনা করেছেন৷ তাই যারা এ মতবাদে বিশ্বাস করে তারা সাধারণত ধর্মবিদ্বেষী হয়ে থাকে৷ তারা ধর্মের নির্দেশ মেনে চলতে অস্বীকার করে৷ তাই কালমার্কস প্রবর্তিত সমাজতন্ত্র একটি কুফরী মতবাদ৷ কারণ এ মতবাদে ধর্মকে সম্পুর্ণরূপে অস্বীকার করা হয়৷

আল্লাহর বিভিন্ন আহকামের বিরুদ্ধে যুক্তি উত্থাপনঃ বর্তমানে অনেক নামধারী মুসলমান আল্লাহর বিভিন্ন হুকুমের বিরুদ্ধে যুক্তি উত্থাপন করে সেগুলো মানতে অস্বীকার করে তাদের ঈমান নষ্ট করছে৷ অথচ তারা সমাজে মুসলমান হিসেবেই পরিচিত৷ আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে যুক্তি উত্থাপন করা শয়তানের কাজ৷ আল্লাহ তায়ালা যখন ইবলিশ শয়তানকে আদম (আ) কে সিজদা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তখন ইবলিস তার সে হুকুমের বিরুদ্ধে যুক্তি উত্থাপন করে আল্লাহর হুকুম মানতে অস্বীকার করে৷ এর ফলে সে চির অভিশপ্ত কাফির হয়ে যায়৷ বর্তমানে শয়তানরূপী একদল লোক আল্লাহ তায়ালার বিভিন্ন হুকুম আহকামের বিরুদ্ধে যুক্তি উত্থাপন করছে৷ ইসলামের উত্তরাধিকার বিধানকে নারীদের প্রতি অবিচার বলে নারী পুরুষের সমঅধিকার দাবি করছে৷ পর্দাকে অবরোধ এবং নারী অধিকার লঙ্ঘনকারী বলে এ হুকুম মেনে চলতে অস্বীকার করছে৷ কেউ জিহাদকে সন্ত্রাস আখ্যা দিয়ে আল্লাহর ফরয হুকুম জিহাদকে অস্বীকার করছে৷ আবার কেউ সন্ত্রাসী কাজ করে তাকে জিহাদ আখ্যা দিয়ে ইসলামকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা করছে৷ কেউ ফতোয়াকে মানবাধিকার বিরোধী আখ্যা দিয়ে সব ধরনের ইসলামী আইনকে অস্বীকার করছে৷ কেউ ইসলামকে মৌলবাদ এবং খাটি মুসলমানদের মৌলবাদী আখ্যা দিয়ে ইসলামকে বিজ্ঞানবিরোধী ধর্ম হিসেবে প্রমাণের অপচেষ্টা করছে৷ কেউ ইসলামের বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের অনুমতির বিরুদ্ধাচারণ করছে৷ এছাড়া বিভিন্ন খোড়া যুক্তি দিয়ে আল্লাহ তায়ালার আরো অনেক হুকুমকে অস্বীকার করছে৷ আল্লাহর চেয়ে মহাজ্ঞানী অবশ্যই কেউ নেই৷ চিন্তাভাবনা করলে দেখা যাবে, তার প্রতিটি হুকুমের মাঝেই অনেক হিকমত ও রহস্য নিহিত রয়েছে৷

হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল ঘোষণাঃ কোন সুস্পষ্ট হালালকে হারাম বলা এবং কোন সুস্পষ্ট হারামকে হালাল বলা সুস্পষ্ট কুফরী৷ কিন্তু বর্তমানে অনেক নামধারী আলেম দুনিয়ার মোহে পড়ে হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল ঘোষণা দেয়৷ এর দ্বারা তারা তাদের মহামুল্যবান ঈমান নষ্ট করছে৷ যেমনঃ সুদ হারাম হওয়ার সুস্পষ্ট অনেক দলীল থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে অনেক নামধারী আলেম কিছু সুদী লেনদনকে জায়েয প্রমাণের অপচেষ্টা করছে৷ নারীনেতৃত্ব হারাম হওয়ার অনেক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নারীনেতৃত্ব জায়েয প্রমাণের অপচেষ্টা করছে৷ আরেকদল মারিফাতের নামে শরীয়তের হুকুম পালনের আবশ্যকতা অস্বীকার করে কুফরী করছে৷ আবার কেউ ঈদে মীলাদুন্নবী পালনের বিদআতকে ফরয প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে৷ এভাবে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল ঘোষণার মাধ্যমে মুসলমানদের ঈমান আকীদা নষ্ট করছে৷

পীর ও মাজার পুজাঃ
বর্তমান যুগে ভন্ডপীরদের সংখ্যা খুব বেড়েছে৷ বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে ভন্ডপীরদের সংখ্যা অগণিত৷ এসব ভন্ডপীরের মাধ্যমে সমাজে শিরক বিদআত ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করছে৷ এর ফলে সাধারণ মুসলমানদের ঈমান আকীদা নষ্ট হচ্ছে৷ আমাদের সমাজে যেসব ভন্ডপীর মুসলিম জনসাধারণের ঈমান আকীদা নষ্ট করতে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করছে তাদের মধ্যে আটরশি, দেওয়ানবাগ, রাজারবাগ, মাইজভান্ডার ও কুতুববাগের পীর উল্লেখযোগ্য৷ মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন দাঃ বাঃ রচিত “ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” বেশ কিছু ভ্রান্ত ফেরকা ও ভন্ডপীরদের ভ্রান্ত আকীদা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে৷

ঈমানবিরোধী কুসংস্কারঃ
বর্তমান মুসলিম সমাজে অসংখ্য ঈমানবিরোধী কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ছে৷ এসবের কোনটি শিরক, কোনটি কুফর আর কোনটি ভিত্তিহীন মিথ্যাচার৷ মাওলানা আব্দুল মালেক দাঃ বাঃ এর তত্ত্বধানে রচিত “প্রচলিত ভুল” এবং “এসব হাদীস নয়” নামক দুইটি বইয়ে সমাজে প্রচলিত অনেক কুসংস্কার সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করা হয়েছে৷

আধুনিক মুসলমানদের আমলের করুণ অবস্থাঃ

নামায আদায়ে অবহেলাঃ
বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলমান নেক আমলের প্রতি অত্যন্ত গাফেল৷ বিশেষ করে ঈমানের পর সবচেয় গুরুত্বপুর্ণ আমল দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় আদায়ের ব্যাপারে তাদের অবহেলা অত্যন্ত দুঃখজনক৷ রাসুলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবায়ে কিরামের যুগে মুসলমানদের মধ্যে ১৹৹% নামাযী ছিল৷ তখন মুসলমান ও কাফিরের মাঝে পার্থক্যকারী আমল ছিল নামায৷ কিন্তু বর্তমান যুগে ৯৹% এর অধিক মুসলমান পাঁচওয়াক্ত নামায সঠিকভাবে আদায় করে না৷ আর যারা নামায আদায় করে তাদের মধ্যে অনেকের মাঝেই সাহাবায়ে কিরামদের মত খুশু খুজু থাকে না৷
নামাযের ভিতরেও অধিকাংশ সময় দুনিয়াবী ধ্যান খেয়াল করতে থাকে৷

যাকাত আদায়ে অবহেলাঃ
নামাযের পর অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ নেক আমল হচ্ছে যাকাত৷ যাকাত নেসাবওয়ালা মুসলিম ধনীদের কাছে গরীবদের প্রাপ্য৷ বর্তমান যুগে বিভিন্ন মুসলিম দেশের মুসলমান দারিদ্রসীমার নিচে বসসবাস করছে৷ সঠিকভাবে পরিকল্পিত উপায়ে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব৷ কিন্তু সিংহভাগ ধনী মুসলিম যথাযথভাবে তাদের যাকাত আদায় করছে না৷ ফলে ধনসম্পদ গুটি কয়েক ধনবান লোকের কাছে জমা হয়ে যাচ্ছে৷ অপরদিকে বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে৷

জিহাদের প্রতি উদাসীনতাঃ
জিহাদ ইসলামের অনেক ফযীলতপুর্ণ নেক আমল৷ ইসলামে জিহাদের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম৷ বর্তমান বিশ্বে মায়ানমার, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে মুসলমানগণ বিধর্মীদের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে৷ এ নির্যাতিত মুসলমানদের রক্ষার জন্য জিহাদের কোন বিকল্প নেই৷ অথচ কোন মুসলমান রাষ্ট্রই এসব নির্যাতিত মুসলমানদের রক্ষায় জিহাদে এগিয়ে আসছে না৷ ফলে একের পর এক বিধর্মীরা অসহায় মুসলমানদের ওপর নির্দ্বিধায় নির্যাতনের স্টীম রোলার চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে৷ মুসলমানদের আর্তনাদ ও আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠছে৷ এতে আল্লাহ তায়ালার এ বাণীর বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে৷ আল্লাহ তায়ালা বলেন,

“আর তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহর পথে লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে, অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও৷”
(সুরা নিসাঃ আয়াত ৭৫)

রাসুলুল্লাহ (সা) চৌদ্দশত বছর আগে বিধর্মীদের দ্বারা মুসলমানদের নির্যাতিত হওয়ার কারণ সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী ঘোষণা করে গেছেন৷ আজ তার ভবিষ্যতবাণী অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন হচ্ছে৷ সুনানে আবু দাউদের একটি হাদীসে বর্ণিত আছে,

‘তোমাদের ওপর এমন একটি সময় আসবে, তোমাদের বিরুদ্ধে সকল জাতি এমনভাবে ডাকবে, যেমনটি খাওয়ার দস্তরখানের দিকে লোকদের ডাকা হয়ে থাকে! এ কথা শোনে একজন লোক দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! সে দিন কি আমাদের মুসলিমদের সংখ্যা কম হবে? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, না, সেদিন তোমরা সংখ্যায় কম হবে না। বরং তোমরা সেদিন আরো অনেক বেশি হবে। তবে তোমরা বন্যার পানির উপরিভাগে ভাসমান খড়কুটার মত হবে। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের দুশমনদের অন্তর থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দেবেন। আর তোমাদের অন্তরে ওহান ঢেলে দেবেন। এক লোক দাড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ওহান জিনিসটি কী? আল্লাহর রাসূল বললেন, দুনিয়ার মহব্বত আর মৃত্যুকে অপছন্দ করা।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪২৯৭)

উল্লেখিত হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা) মুসলমানদের নির্যাতিত ও লাঞ্চিত হওয়ার দু’টি কারণ উল্লেখ করেছেন৷ এ দু’টি কারণ বর্তমান যুগের অধিকাংশ মুসলমানের মাঝে পাওয়া যায়৷ একটি হলো দুনিয়ার মহব্বত, আরেকটি হলো মৃত্যুর ভয়৷ তারা দুনিয়ার মহব্বতে এমনভাবে আক্রান্ত যে, দুনিয়ার ধনসম্পদ ও সম্মান-মর্যাদা অর্জনে সদা ব্যস্ত থাকায় আল্লাহর হুকুম আহকাম পালনের প্রতি চরম উদাসীন৷ আর মৃত্যুর ভয়ে এমন ভীত যে জালিম কাফির মুশরিকদের জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে জিহাদ করার সাহস পাচ্ছে না৷

রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামের হুকুম বাস্তবায়ন না করাঃ
বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৫০ টিরও বেশি মুসলিম রাষ্ট্র রয়েছে৷ কিন্তু কোন রাষ্ট্রই পরিপুর্ণভাবে আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী পরিচালিত হয় না৷ পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর সকল আইন রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত নেই৷ বরং প্রায় সব রাষ্ট্রই বিভিন্ন মানবরচিত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে৷ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ সহ বিশ্বের কোন মুসলিম রাষ্ট্রই পরিপুর্ণভাবে ইসলামী আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয় না৷ এর কয়েকটি নমুনা তুলে ধরছি৷

সুদকে বৈধ করাঃ
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ্ তায়ালা সুদকে হারাম করেছেন।

অর্থঃ “আল্লাহ্ বেচা-কেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন । (.সূরা আল বাকারাঃ২৭৫)

শুধু তাই নয় সুদের কারবারে জড়িত থাকাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার শামিল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে ।
অর্থঃ “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে,তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মুমিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না কর তাহলে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও৷ আর যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে৷ তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের উপর জুলুম করা হবে না । “(সূরা আল বাকারা ২:২৭৮-২৭৯)

বাংলাদেশসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সুদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ করে দেওয়া হয়েছে । আমাদের দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, রূপালি ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, পুপুলার প্যাংক, যমুনা ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক, ব্রাক ব্যাংক সহ সকল ব্যাংকে সুদের কারবার করছে৷ এভাবে আল্লাহর হারামকৃত সুদকে ব্যাংক ব্যবস্থার সুরতে রাষ্ট্রীয়ভাবে হালাল করে দেওয়া হচ্ছে । শুধু কি তাই! মানব সেবার নামে জীবন বীমা, ডিপিএস, সবুজ বাংলা, আশা, বুরো বাংলাদেশ, গ্রামিণ সেবা, পথকলি, প্রয়াস, আস্থা, জীবনের আলো, ডেসটিনি প্রভৃতি এনজিও সংস্থা জনসেবার দোহাই দিয়ে গরিব অসহায় মানুষদের ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে সুদের রমরমা ব্যবসা করছে৷ এ ব্যাপারে সরকারীভাবে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই৷

পর্দার হুকুম পালন না করাঃ
মহান আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কোরআনে নারীদেরকে র্পদা করতে নির্দেশ করেছেন ।

অর্থঃ “আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করো এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না । “(সুরা আহযাবঃ ৩৩)

বর্তমান সমাজে ইভটিজিং একটি বড় সমস্যা৷ এটা বন্ধ করার জন্য সরকারী, বেসরকারী ভাবে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা হচ্ছে৷ কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না৷

অথচ মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন পর্দার বিধান কায়েম করলে কোন প্রকার ইভটিজিং তথা নারী উক্তত্যকরণ থাকবে না । পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছেঃ

অর্থঃ “হে নবী,তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিন নারীদেরকে বল, ‘তারা যেন তাদের জিলবাবের (জিলবাব হচ্ছে এমন পোশাক যা পুরো শরীরকে আচ্ছাদিত করে) কিছু অংশ নিজেদের (মুখমন্ডলের ওপর) উপর ঝুলিয়ে দেয়, তাদেরকে (সম্ভ্রান্ত মুসলিম নারী হিসেবে) চেনার ব্যাপারে এটাই সবচেয়ে সহজতর পন্থা। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না । আর আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু ।”
( সূরা আহযাব ৫৯)

এ আয়াতে বলা হয়েছে, যে সকল নারী পর্দা করবে তাদেরকে কেউ ইভটিজিং তথা উত্যক্ত করতে পারবে না। অথচ আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে রায় দেওয়া হয়েছে “পর্দার জন্য কাউকে বাধ্য করা যাবে না৷ ”

যে র্পযন্ত নারীদের জন্য পর্দা বাধ্যতামুলক না করা হবে সেই র্পযন্ত ইভটিজিং,ধর্ষণ, অপহরণ, পরকিয়া, নারী নির্যাতন ইত্যাদি বন্ধ করা যাবে না । স্রষ্টার আইন কার্যকর করা ব্যতীত সৃষ্টির শান্তি অকল্পনীয় ।

জিনা-ব্যভিচারের শাস্তি প্রদানে শিথিলতাঃ
পবিত্র কোরআনে জিনা-ব্যভিচারকে হারাম করা হয়েছে ।

অর্থঃ “আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।” (সুরা বনী ইসরাইলঃ ৩২)

অপর আয়াতে জিনা-ব্যভিচারের জন্য কঠিন শাস্তির কথা ঘোষণা করা হয়েছে ।

অর্থঃ “ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে একশ’টি করে বেত্রাঘাত কর । আর যদি তোমরা আল্লাহ্ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাক তবে আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে পেয়ে না বসে । “(সুরা নুরঃ ২)

আর যদি ব্যভিচারিণী বা ব্যভিচারী বিবাহিত হয় তাহলে তাদের পাথর নিক্ষেপ করে হত্যার কথা ঘোষণা করা হয়েছে ।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ওমর রা. রাসূলুল্লাহ (সা) এর মিম্বরের উপর বসা অবস্থায় বলেন যে, আল্লাহ তা’আলা মুহাম্মদ (সা) কে সত্য সহ প্রেরণ করেছেন এবং তার উপর কিতাব নাযিল করেছেন আর তার উপর যে সমস্ত আয়াত নাযিল করা হয়েছিল তার মধ্যে রজমের আয়াতও ছিল আমরা তা পড়েছি,মুখস্ত করেছি এবং অনুধাবন করেছি৷ তবে আমি ভয় পাচ্ছি যে, দীর্ঘকাল পরে এমন একটি সময় আসবে যে, লোকেরা বলবে, “আমরা আল্লাহর কিতাবে রজমের বিষয়ে কোন আয়াত পাইনি৷” পরবর্তীতে তারা পথভ্রষ্ট হবে আল্লাহ্ তা’আলার নাযিলকৃত ফরজ বিধান পরিত্যাগ করার কারণে৷ নিশ্চই আল্লাহর কিতাবের বিধান রজম প্রতিষ্ঠিত করা হইবে ঐ সমস্ত পুরুষ এবং মহিলার উপর যারা বিবাহের পর যিনায় লিপ্ত হইবে এবং তাদের এই যিনা চারজন সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমানিত হইবে অথবা মহিলার গর্ভ প্রকাশিত হইবে অথবা তাদের কেউ সেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিবে । “(সহিহ বুখারিঃ ৬৮৩০,সহীহ মুসলিমঃ ৪৫১৩)

কিন্তু ইসলামের এই বিধানকে বর্তমান শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছে ।
লাইসেন্স থাকার শর্তে পতিতাবৃত্তিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা সৃষ্টির মাধ্যমে ধর্ষণের যতটুকু শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে তাও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে । যদি বিচার হয়ও তাহলে ইসলামি বিধান বাতিল করে লোক দেখানো কয়েক দিনের কারা ভোগের বিধান রাখা হয়েছে ।
অথচ ইসলামের বিধান ছিল ধর্ষককে (বিবাহিত হলে) জনসম্মুখে এনে পাথরাঘাতে হত্যা করা হবে অথবা (অবিবাহিত হলে) ১০০ বেত্রাঘাত করতে হবে যাতে অন্যরা এর থেকে শিক্ষা নিয়ে বিরত থাকে। এ ব্যাপারে দয়া ও শিথিলতা প্রদর্শণ বৈধ নয়৷

কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশে জিনা করে ধরা পরলে ছেলেকে কয়েকটা জুতার বাড়ি মারা হয় ও কয়েক হাজার টাকা জরিমানা করা হয় । জরিমানার টাকা থেকে জিনাকারি নারীকে অর্ধেক টাকা দেয়া হয় । আর বাকি অর্ধেক টাকা দিয়ে এলাকার নেতা এবং মাদবররা পান,চা,সিগারেট,গাজা,মদ কিনে খায় এবং গরম গরম বাজার করে।

চোরের শাস্তি প্রদানে শিথিলতাঃ
মহান আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে চোরের শাস্তির সুস্পষ্ট বিধান দিয়েছেন ।

অর্থঃ ” আর পুরুষ চোর ও নারী চোর তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও তাদের অর্জনের প্রতিদান ও আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষণীয় আযাবস্বরূপ৷ আল্লাহ্ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় । ” (সুরা মায়িদাঃ ৩৮)

এ আইন বাস্তবায়ন করলে দেশে চোর থাকবে না ইনশা আল্লাহ৷

সোনার বাংলা ও সোনার মদিনায় এখানেই পার্থক্য । সোনার মদিনায় আযান হয়ে গেলে স্বর্ণের দোকান পর্যন্ত একটি কালো র্পদা ঝুলিয়ে দোকান খোলা রেখে লোকেরা মসজিদে চলে যেত । কোন প্রকার চোরের ভয় থাকতো না । অথচ সোনার বাংলায় ভাল জুতা নিয়ে মসজিদে গেলে সালাতের পরে তা আর খুজে পাওয়া যায় না ।

এ পার্থক্য এ জন্য যে, সোনার মদিনায় চোরের হাত কাটার বিধান কার্যকর ছিল । আর সোনার বাংলায় এ আইনকে বর্বর ও মধ্যযুগীয় আইন বলে বাতিল করা হয়েছে৷ অথচ আল্লাহর আইন বাতিল করার অধিকার কারো নেই । এজন্যই রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে মক্কা বিজয়ের পরে কুরাইশ বংশের শাখা বানু মাখযুম গোত্রের এক মহিলা চুরি করার পর তার হাত না কাটার ব্যাপারে সুপারিশ করা হলে তিনি তা কঠোর ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন৷

এ ব্যাপারে হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, বনু মাখযুম গোত্রের এক মহিলা চুরি করলে বিষয়টি কুরাইশদের অত্যন্ত চিন্তায় ফেলে দিল । তারা বলল, মহিলার ব্যাপারে কে আল্লাহর রাসুল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে সুপারিশ করবে? এরপর তারা বলল, আল্লাহর রাসুল (সা) এর প্রিয় পালক নাতি উসামা বিন যায়েদ ছাড়া অন্য কেউ এই দুঃসাহস করতে পারে না । তখন উসামা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকটে সুপারিশ করলে ট রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তুমি কি আল্লাহ্ তা’আলার নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করছ? অতপর তিনি খুতবা দিতে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতরা ধ্বংস হয়েছে এজন্য যে যখন তাদের কোন সম্মানিত ব্যক্তি চুরি করত, তাকে ছেড়ে দিত আর যখন কোন গরীব দুর্বল ব্যক্তি চুরি করত তখন তার উপর আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়ন করত । আল্লাহর শপথ করে বলছি, যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতেমাও চুরি করত তাহলে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম । “(সহীহ বুখারীঃ ৩৪৭৫)

আমাদের সমাজে চোরের অভাব নাই৷ এক দল চোর আছে তারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছে। আর এক দল চোর আছে তারা নামাজ চুরি করে। আর এক দল চোর আছে তারা হজ্ব করতে গিয়ে কাজ করার জন্য রয়ে যায়। এক দল চোর আছে মসজিদ মাদ্রাসার টাকা পর্যন্ত চুরি করে খাচ্ছে। আর এক দল চেয়ারম্যান মেম্বার চোর আছে তারা গম চুরি করছে। আর এক দল চোর আছে তারা কবর থেকে মরা মানুষের কাফন এর কাপড় চুরি করে । আর এক দল শ্রমিক আছে তারা কাজ চুরি করে।আর এক দল চোর স্ত্রী আছে তারা স্বামীর সম্পদ চুরি করে বাপের বাড়ি পাঠায় এবং পরকিয়া প্রেমিককে দেয় । আর এক দল চোর আছে তারা লেখা পড়া চুরি করে।

মদ,জুয়া,মূর্তি,লটারীকে বৈধ করাঃ
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ্ তায়ালা।মদ,জুয়া,মূর্তি,লটারীকে হারাম বলে ঘোষণা করেছেন।

অর্থঃ “হে মুমিনগণ,নিশ্চয় মদ,জুয়া,প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ নাপাক ও শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর,যাতে তোমরা সফলকাম হও। শয়তান মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে এবম আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে চায়। অতএব,তোমরা কি বিরত হবে না?
(সুরা মায়িদাঃ ৯০ ও ৯১)

এটা হচ্ছে আল্লাহর বিধান৷ অথচ আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মদকে লাইসেন্স দিয়ে হালাল(বৈধ)করে দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট, ফুটবল, কেরাম, দাবা ইত্যাদি খেলার নাম করে জুয়া খেলা হচ্ছে । সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উপলক্ষে লটারি খেলা হচ্ছে । রাস্তার মোড়ে মোড়ে,স্কুল- কলেজের সামনে মূর্তি ও ভাস্কর্য তৈরি করা হচ্ছে । শিখা চিরন্তন ও শিখা অনির্বানের নামে মুসলিম জাতিকে অগ্নিপূজায় অভ্যস্ত করা হচ্ছে।

সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে আল্লাহর আইনকে বাতিল করাঃ
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের সম্পদ বন্টনের ক্ষত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছেন৷ ইসলামের বিধান হলো সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ভাই তার বোনের দ্বিগুণ পাবে। ইরশাদ হচ্ছেঃ আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ ।”(সুরা নিসাঃ১১)

কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে নারী নীতিমালার নামে আল্লাহর এই বিধানকে ইনসাফপরিপন্থি হিসেবে ঘোষণা করা হয়৷ উল্লেখ্য যে, ইসলামী আকীদার একটি মৌলিক বিষয় হলো, আল্লাহ ও তার রাসুলের কোন হুকুম যদি অজ্ঞতা ও স্বল্প জ্ঞানের কারণে যুক্তিহীন বলে মনে হয় তবুও তার বিরোধিতা করা যাবে না৷ ইসলামের প্রতিটি বিধানেই অনেক হিকমাত নিহিত রয়েছে৷

আর সম্পত্তি বন্টনের এই বিধান তো যুক্তির বাইরে নয় । কারণ ইসলাম যদিও ছেলেকে এক ক্ষেত্রে বেশী সম্পদ প্রদান করেছে । কিন্তু মেয়ে মূলত ছেলের থেকে বেশীই পায়। ইসলাম মেয়ের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও নিরাপত্তাসহ যাবতীয় প্রয়োজন মিটানোর দায়িত্ব দিয়েছে ছেলেদের উপর । এ ক্ষেত্রে তার কোন ব্যয় নেই । বরং উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত পুরো সম্পদই তার অবশিষ্ট থেকে যায় । অপর দিকে ছেলেরা যে সম্পদ পায় তার পুরোটাই খরচ হওয়ার উপক্রম হয়ে যায় । কারণ তার উপর তার স্ত্রী, সন্তানাদী, পিতা-মাতা সকলের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব রয়েছে । তাই যদিও বাহ্যিক ভাবে দেখা যায় ছেলেকে সম্পত্তি বেশি দেওয়া হয়েছে কিন্তু বাস্তবে মেয়েদের খরচের খাত ছেলেদের কম হওয়ায় মেয়েরা বেশি সম্পত্তির মালিক হয় ।

ঈমান আমলে দুর্বলতার কারণে মুসলমানদের করুণ পরিণতিঃ

অশান্তি ও অস্থিরতাঃ
ঈমান ও নেক আমল থেকে দূরে সরে আসায় বর্তমান মুসলমানদের মাঝে অশান্তি ও অস্থিরতা ক্রমবর্ধমানহারে বেড়েই চলছে৷ দুনিয়ার মোহে সবাই এমন ব্যাধিগ্রস্থ হয়ে পড়েছে যে কেউ তার ধনসম্পদ নিয়ে পরিতৃপ্ত নয়৷ প্রত্যেকেই একে অপরের চেয়ে বেশি ধন-সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত৷ আর এ ধন সম্পদ অর্জনের জন্যই মানুষ পরস্পরের সাথে হিংসা-বিদ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি, হানাহানি, খুন-হত্যা, চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাস-চাদাবাজি ইত্যাদি জঘন্য কাজ করছে৷ ফলে অশান্তি ও অস্থিরতা বেড়েই চলছে৷

নিরাপত্তাহীনতাঃ
বর্তমান সাধারণ মুসলমানদের জান মাল ও ইজ্জতের তেমন কোন নিরাপত্তা নেই৷ সামান্য দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিলের আশায় যেকেউ অন্য কারো জান, মাল ও ইজ্জতের উপর আঘাত হানে৷ কিন্তু সব অপরাধীর উপযুক্ত বিচার হয় না৷ বরং বিচার চাইতে গেলে অনেক সময় উল্টো হয়রানীর স্বীকার হতে হয়৷ তাই প্রত্যেকে তার জান মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে৷

পারিবারিক কলহবিবাদঃ
ইসলামের হুকুম আহকাম মেনে না চলায় পারিবারিক কলহ বিবাদ ক্রমবর্ধমানহারে বেড়েই চলছে৷ স্বামী অন্যায়ভাবে স্ত্রীর কাছ হতে যৌতুক আদায করছে৷ যৌতুকের টাকা সময়মত দিতে না পারলেই পারিবারিক কলহবিবাদ শুরু হয়৷ যৌতুক না পাওয়ার কারণে অনেক স্বামী তার স্ত্রীর উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন করে৷ এমনকি শেষ পর্যন্ত যৌতুকের টাকা না পেয়ে স্ত্রীকে হত্যা পর্যন্ত করে৷ পত্রিকার পাতা খুললে প্রতিনিয়ত এমন চিত্র দেখা যায়৷ এছাড়া বর্তমান নারী পুরুষ পর্দার হুকুম সঠিকভাবে পালন না করায় পারস্পারিক অবৈধ প্রেম ও পরকিয়া সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে যা পারিবারিক কলহবিবাদ সৃষ্টিতে বিরাট ভুমিকা পালন করছে৷ নারী পুরুষের বেপর্দাভাবে অবাধ মেলামেশায় ব্যভিচার ও ধর্ষণ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ ইসলাম স্বামী স্ত্রীর যেসব দাযিত্ব কর্তব্য নির্ধারণ করে দিয়েছে অনেকে তা পালনের ব্যাপারে উদাসীন৷ এতে তাদেক পরস্পরের প্রতি মহব্বত ভালোবাসা হ্রাস পাচ্ছে এবং পারিবারিক বন্ধন ভেঙ্গ যাচ্ছে৷

সামাজিক বিশৃঙ্খলাঃ
তাকওয়ার অভাবে মুসলিম সমাজে অন্যায়-অবিচার ও দুর্ণীতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ এর ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ব্যাপকহারে দেখা যাচ্ছে৷ সমাজের সকল ক্ষেত্রে দুর্ণীতির অনুপ্রবেশ ঘটছে৷ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ব্যভিচার, ধর্ষণ, অপহরণ, হত্যা, খুন, গুম ইত্যাদি বেড়েই চলছে৷ ফলে সামাজিক শান্তি শৃঙ্খলা ব্যহত হচ্ছে৷

অর্থনৈতিক দৈন্যতাঃ
বর্তমানে প্রায় সব মুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুদের লেনদেন হচ্ছে৷ কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় হচ্ছে না৷ ফলে ধনসম্পদ গুটি কয়েক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে৷ অপরদিকে বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে৷ আর অধিক লাভের আশায় অনেকে হালাল খাতে বিনিয়োগ না করে বিভিন্ন অবৈধ খাতে বিনিয়োগ করছে৷ এর ফলে গুটিকয়েক ব্যক্তির অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ঘাটতি হচ্ছে৷

শাসনের নামে শোষণঃ
রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামের হুকুম কোন মুসলিম দেশে প্রতিষ্ঠিত না থাকায় শাসকরা শাসনের নামে জনগণের সেবক হওয়ার পরিবর্তে তাদের ওপর বিভিন্ন উপায়ে শোষণ করে যাচ্ছে৷ এখন যার যত বেশি ক্ষমতা আল্লাহর ভয় না থাকায় সে ততবেশি দুর্নীতি করে জনগণকে শোষণ করে চলছে৷ দুর্নীতিতে কিছু মুসলিম দেশসমুহের শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থানের প্রধান কারণ হলো তাদের অন্তরে আল্লাহর নিকট জবাবদিহীর ভয় না থাকা৷ যার অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকবে সে কখনো দুর্নীতি করতে পারে না৷

জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায় পিছিয়েঃ
ইসলাম জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছে৷ কিন্তু আল্লাহ তায়ালার হুকুম অমান্য করায় বর্তমান মুসলমানগণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে৷ ইউরোপ যখন জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার দিক হতে পিছিয়ে ছিল তখন কিন্তু মুসলমানরাই জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার পথ উন্মুক্ত করেছিলেন৷ কিন্তু পরবর্তী মুসলমানগণ জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায় অবহেলার কারণে ইউরোপীয়দের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ে৷

বিধর্মীদের দ্বারা নির্যাতনঃ
বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশের মুসলমানগণ বৌদ্ধ, হিন্দু, ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান ধর্মালম্বী কর্তৃক বিভিন্নভাবে নির্যাতিত৷ মায়ানমারের আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমাণগণ বৌদ্ধ সন্ত্রাসী কর্তৃক, ফিলিস্তিনের গাজায় অসহায় ফিলিস্তিনি মুসলমানগণ ইয়াহুদী সন্ত্রাসী কর্তৃক, ভারতের কাশ্মিরের মুসলমানগণ হিন্দু সন্ত্রাসী কর্তৃক এবং ইরাক ও আফগানিস্তানের মুসলমানগণ আমেরিকান খ্রিস্টান সন্ত্রাসী কর্তৃক নিদারুণভাবে নির্যাতিত হচ্ছে৷ বিভিন্ন বই-পত্রিকায় তাদের নির্যাতনের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে৷ এসব জালিম সন্ত্রীসীদের মোকাবেলা করতে জিহাদের কোন বিকল্প নেই৷ কিন্তু মুসলমানগণ নির্যাতিত মুসলমানদের রক্ষার জন্য জিহাদের ব্যাপারে উদাসীন৷ ফলে বিধর্মীরা নির্দ্বিধায় একের পর এক বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের উপর নির্যাতনের স্টীম রোলার চালানোর সাহস পাচ্ছে৷ আর এভাবেই আধুনিক যুগের মুসলমানগণ ঈমান ও আমলের ব্যাপারে দুর্বলতার কারণে বিভিন্ন উপায় লাঞ্চিত ও অপমানিত হচ্ছে৷


চলবে..


মুসলমানদের পতন কেন (পর্ব-১)

মুসলমানদের পতন কেন (পর্ব-২)