জেনুইন প্রোডাক্টের দাম নেই, পাইরেসি চলছে রমরমা

অনেকদিন ধরে সাফির ডেস্কটপটি চালু হচ্ছিল না। কম্পিউটার সম্পর্কে জানে এমন বন্ধুকে বাসায় ডেকে নিয়ে আসলে তিনি জানান সাফির কম্পিউটারে উইন্ডোজের সমস্যা। কম্পিউটার ঠিক করাতে সাফি চলে যান রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবনে। আইডিবির একটি দোকান থেকে ৫০ টাকা দিয়ে উইন্ডোজের সিডি কেনেন।
কেন আসল উইন্ডোজের সিডি কিনলেন না? -এমন প্রশ্নের উত্তরে সাফির বলেন, ‘এই উইন্ডোজ দিয়েই আমার কাজ হবে। এ ছাড়া আসল উইন্ডোজের সিডির দামও অনেক।’
দেশের বাজারে আসল উইন্ডোজ সিডির দাম কেমন? আইডিবির বিভিন্ন দোকেনে গিয়ে জানা যায়, উইন্ডোজ ৭-এর দাম ১২৫০০, উইন্ডোজ ১০-এর দাম ১৪৫০০। কোনো দোকানে উইন্ডোজ ১০-এর প্রফেশনাল ভার্সনটি পাওয়া যায় ১৩৫০০ টাকায়।
আসল উইন্ডোজের সিডি দিনে কতগুলো বিক্রি হয়? -এমন প্রশ্নের উত্তরে আইডিবি ভবনের বাই অ্যান্ড উইন নামে এক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, মাসে নয়, বছরে ২ থেকে ৩ টি!
আরেক দোকানের কর্মকর্তা বলেন, ‘আসল উইন্ডোজের সিডি বিক্রি নেই বললেই চলে।’ এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘দেশে আসল উইন্ডোজের ব্যবহারের চল এখনো গড়ে ওঠেনি। আর এর মূল কারণ আসল উইন্ডোজের দাম প্রচুর।’
এতো গেল যারা উইন্ডোজের সমস্যায় পড়েন তাদের কথা। এবার গোড়ার দিকে আসা যাক। দেশের আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে নানা প্রতিষ্ঠান যারা ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ বিক্রি করেন।
আর কম্পিউটার বা ল্যাপটপের রাজধানী বলা যেতে পারে আইডিবি ভবনকে। এখানে কয়েকশ’ প্রতিষ্ঠান ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ বিক্রি করেন।
শুধু আইডিবিই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কম্পিউটার বিক্রির দোকনগুলোতে একজন ক্রেতা যখন কোনো কম্পিউটার কিনতে যান, তখন তাকে দেয়া হয় উইন্ডোজের ক্র্যাক ভার্সন বা ট্রায়াল ভার্সন। এই ক্র্যাক বা ট্রায়াল ভার্সনসহ কম্পিউটার ক্রেতার সংখ্যা কত তার নির্দিষ্ট কোনো হিসেব নেই।
ল্যাপটপের জন্য জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান রায়ান্স কম্পিউটারের এক কর্মকর্তা জানান, তাদের মাসিক বিক্রি (ল্যাপটপ) এভারেজে ৫ হাজারের বেশি। যারা তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে ল্যাপটপপ কিনে থাকেন তাদের উইন্ডোজের ট্রায়াল ভার্সনটি দেয়া হয়।
ফারুক হোসেন নামে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মচারী বলেন, তাদের মাসে ২০ থেকে ৩০ টি আসল উইন্ডোজের সিডি বিক্রি হয়ে থাকে।
কম্পিউটার ও ল্যাপটপ বিক্রি করে বিজনেস লিঙ্ক কম্পিউটার লিমিটেড নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের থেকে যারা কম্পিউটার কেনেন তাদের উইন্ডোজের ক্র্যাক ভার্সন দেয়া হয়।
কেন আসল উইন্ডোজ দেয়া হয় না, এর কারণ হিসেবে ওই কর্মকর্তা বলেন, দেশে আসল উইন্ডোজের ব্যবহারের চল এখনো গড়ে ওঠেনি। আর এর মূল কারণ আসল উইন্ডোজের দাম প্রচুর।
এ বিষয়ে তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর সভাপতি মোস্তফা জব্বার বলেন, ‘কারো অনুমতি না নিয়ে লাইসেন্স ছাড়া সফটওয়্যার ব্যবহার করাটাই পাইরেসি। এটি মেধাসত্ত্ব আইনের লঙ্ঘন। আমাদের দেশে এই কালচারটি আগে থেকেই গড়ে উঠেছে। আর এসবের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষকতা করছে যারা কম্পিউটার বিক্রি করে তারা। ক্রেতার চাহিদা থাকুক বা না থাকুক, বিক্রেতারা পাইরেটেড সফটওয়্যারগুলো কম্পিউটারের মধ্যে ইন্সটল করে দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন কোনো দেশে কম্পিউটারের সূচনা হয় তখন প্রথম দিকে এটি হয়ে থাকে। কারণ তখন সফটওয়্যার কেনার সামর্থ্য থাকে না অনেকের। তবে এই স্তর থেকে ইতোমধ্যে পার হয়ে এসেছি। এখন আমরা মধ্য আয়ের দেশ। কিন্তু আমরা আগের চিন্তাচেতনা থেকে এখনো সরে আসতে পারি নাই।’
এর কারণ জানতে চাইলে এই প্রযুক্তিবিদ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। এছাড়া নেই আইনের প্রয়োগ।’
‘এই দুইটি জায়গায় আমরা যদি সামাল দিতে না পারি তা পরবর্তীতে প্রকোট আকার ধারণ করবে’, যোগ করেন মোস্তফা জব্বার।
এদিকে সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে বাংলাদেশ সাইবার হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ক্র্যাক সফটওয়্যার ব্যবহারকে।
ক্রাক পাইরেসিযুক্ত উইন্ডোজ ব্যবহারে সাইবার হামলার ঝুঁকির বিষয়ে ক্রাইম রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা তানভির হাসান জোহা বলেন, উইন্ডোজের এসব ভার্সন ব্যবহারে কিছু কোড ওপেন করে দেয়া হয়। ফলে হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি থেকেই যায়। অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহারেও সেই ঝুঁকি থেকে যায়।
অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারে অপারেটিং সিস্টেম সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলেও মনে করেন জোহা।