ষড়যন্ত্রে যেন আহত না হয় ‘হেফাজতে ইসলাম’

ষড়যন্ত্রে যেন আহত না হয় ‘হেফাজতে ইসলাম’

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী  | লেখক ও গবেষক


বড় দল, বড় গোষ্ঠী অথবা প্রভাব বিস্তারকারী কোন শক্তির জন্য ‘ষড়যন্ত্র'( مؤامرة বা Conspiracy) শব্দটি খুবই অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ। আরবী ব্যাখ্যায় ষড়যন্ত্র অর্থে বলা হয়–مكيدة للقيام بعملٍ معادٍ إزاء حكم أو بلد أو شخص ، ما يدبِّره أشخاص خفيةً ويصمِّمون على تنفيذه ضدّ شخصٍ أو مؤسّسةٍ أو أمن دولة-(অর্থাৎ, একটি রাষ্ট্র, একটি প্রতিষ্ঠান বা একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিকূল পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পিত পরিকল্পনা, যা একজন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে গোপন এবং পরিকল্পিত ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়)।
অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যমে ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দের দু’টি ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়:
১. Conspiracy is the secret planning by a group of people to do something illegal.
২. A conspiracy is an agreement between a group of people which other people think is wrong or is likely to be harmful.

লক্ষ করবেন, উপরোক্ত ইংরেজি ভাষ্যমতে ‘ষড়যন্ত্র’ অর্থে দু’টি বিষয়কে তুলে আনা হয়েছে। বিষয় দু’টি হলো, অন্যায় কিছু সংঘটন করতে একটি দল বা গোষ্ঠীর গোপন পরিকল্পনা অথবা একটি দল বা গোষ্ঠীর মধ্যকার চুক্তি যা অন্য একটি পক্ষের কাছে ভুল বা ক্ষতিকর বলে প্রতীয়মান হয়। উভয় ভাষ্যের তূলনামূলক বিচারে আরবী ভাষ্যের বক্তব্যকে অধিকতর ব্যাপক ও অর্থবহ মনে হয়েছে। তাই ‘ষড়যন্ত্র’ অর্থে আরবী ভাষ্যের ভাবকে সামনে রেখে সামনের পথ চলবো।

মানব-ইতিহাসে যখন-ই কোন সম্মিলিত প্রয়াসের কথা বা কর্মকাণ্ডের কথা এসেছে তখনি ‘ষড়যন্ত্র’ হাযির হয়েছে একই গাড়িতে করে। পবিত্র নগরী মক্কা থেকে হিজরতের পর মদীনা যখন হয়ে ওঠে মু’মিনদের নিজস্ব বিচরণভূমি এবং আত্মরক্ষার ও প্রতিরক্ষার কেন্দ্রস্থল তখন-ই মক্কার মুশরিকরা বাইরে থেকে আর মদীনার ইহুদীরা ভেতর থেকে ষড়যন্ত্রের সূচনা করে। সীরাতের প্রামাণ্যসূত্রগুলো ঘেটে দেখলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কঠিন কিছু নয় যে, সকল সম্মিলিত ইতিবাচক প্রয়াসের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের সুতা বাঁধা থাকে একপ্রান্ত বাইরের আর আরেকপ্রান্ত ভেতরের অপশক্তির হাতে। এককভাবে বাইরের বা ভেতরের শক্তি কিছু করতে পারে না। ঠিক তেমনিভাবে মক্কার মুশরিকরা বাইরে থেকে আর মদীনার ইহুদী-মুনাফিকরা ভেতর থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরস্পর সম্পর্ক বজায় রেখে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। এর সাথে আরেকটি বিষয়ও জড়িত ছিলো গুরুত্বের সাথে। তা হলো, নেতৃত্বলোভী বা পদলোভী শক্তির দুরভিসন্ধি। উল্লেখ্য, মক্কায় অনেক জোর-জুলুম ছিলো কিন্তু নিফাক ছিলো না। কারণ, সেখানে মু’মিনদের কোন শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয় নি বরঞ্চ সেখানে মু’মিনরা ছিলেন অসহায় এবং অত্যাচারিত। সম্মিলিত শক্তি বা প্রভাব বিস্তারের কোন সুযোগ মু’মিনদের সেখানে ছিলো না। সঙ্গতকারণে, পরস্পর প্রভাব বিস্তারকারী দু’টি দল বা গোষ্ঠীর দ্বান্দ্বিক কোন চরিত্রও দেখা যায় নি। পবিত্র কুরআন এ বিষয়টিকে বর্ণনা করছে এভাবে:–” আর স্মরণ কর যখন তোমরা ছিলে অল্প আর দুর্বল ছিলে দেশে, আর ছিলে ভীত-সন্ত্রস্ত যে, না জানি তোমাদেরকে লোকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায়”( আনফাল-২৬)। পক্ষান্তরে, মদীনায় যখন ইসলাম তার স্বরূপে প্রকাশিত হতে লাগলো, আপন গূণাবলী ও আদর্শের ছোঁয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করলো তখন-ই স্বার্থান্বেষী ইহুদীদের নেতৃত্বে শুরু হয় ভেতরের ষড়যন্ত্র এবং নিফাকের পথচলা। বাইরে থেকে মক্কার মুশরিকগোষ্ঠীর চক্রান্ত তো ছিলোই। ইহুদীদের চক্রান্ত শুরু হয় মূলত মদীনায় নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে। এ প্রসঙ্গে আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. সীরাত ইবনে হিশামের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন এভাবে–
” রসূলুল্লাহ সা. যে মুহূর্তে মদীনায় তাশরিফ নেন সে সময় আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সলূল ছিল মদিনাবাসীর সরদার। আওয ও খাযরাজ গোত্র ইসলাম আগমনের পূর্বে তাকে( ইবনে উবাই) ব্যতিরেকে আর কারো নেতৃত্বের ব্যাপারে একমত হতে পারছিল না। এই দুই গোত্রের আর কাউকেই তারা তাদের নেতা বানাতে রাজি ছিল না। তার সম্প্রদায় রাজমুকুট হিসেবে শিরে ধারণের জন্য একটি মুকুটও বানিয়ে রেখেছিল যা সে তাদের সম্রাট হিসেবে পরিধান করবে। এরকম একটি অবস্থায় আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এখানে পাঠালেন। এরপর তার জাতি ও সম্প্রদায় তাকে পরিত্যাগপূর্বক যখন মুসলমান হয়ে গেলো তখন তার দিলে কঠিন হিংসা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হলো। সে অনুভব করল যে, রসূলুল্লাহ সা. তাকে তার সর্দারি ও সম্মান থেকে বঞ্চিত করলেন। কিন্তু যখন সে এও দেখতে পেলো যে তার জাতিগোষ্ঠী কোন অবস্থাতেই ইসলাম পরিত্যাগ করতে রাজি নয় তখন সেও নেহায়েত অনিচ্ছাসত্ত্বেও ইসলামে প্রবেশ করলো বটে কিন্তু মুনাফিকী,অন্তর্জ্বালা ও হিংসা-বিদ্বেষকে আগাগোড়াই অন্তরের মাঝে লুকিয়ে রাখল” ( নবীয়ে রহমত)। সেই নিফাক ও ষড়যন্ত্রের ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে অহুদের জিহাদের মতো ঘটনায়। যদিও আল্লাহ তাআলা মু’মিনদের চূড়ান্ত বিজয় দান করেছেন কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা নিতে নিফাক ও ষড়যন্ত্রের সেই অধ্যায় এখনো আমাদেরকে শিক্ষা দেয়।

উপরের প্রেক্ষাপট থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মদীনায় নিফাক বা ষড়যন্ত্র শুরু হয় প্রধানত ইবনে উবাই’র নেতৃত্বলোভী বা পদলোভী একটি অবস্থান থেকে। এবং সেটা ছিলো অত্যন্ত গোপনে লালিত। এখানেই রোপিত হয় মদীনায় মক্কার মুশরিকদের বন্ধুমহলের বীজ। ইবনে উবাই’র হৃদয়ে লালিত এই নেতৃত্ব লাভের অপবিত্র আকাঙ্খা এবং মাদীনাতুল মুনাওয়ারায় রসূলুল্লাহ সা.এর হিজরতের কারণে নেতৃত্ববঞ্চিত হবার বেদনা থেকে সৃষ্টি হয় নিফাক যা মুনাফিকগোষ্ঠীর প্রধান সম্বল। শুরু হলো বিশ্বাসঘাতকতার ঐতিহাসিক পদযাত্রা। উপরে মু’মিনের ছদ্মবেশ নিয়ে ইসলামের অনুশীলনের প্রদর্শনী আর গোপনে মক্কার মুশরিক শাসকগোষ্ঠীর সাথে পদবঞ্চিত হবার বেদনায় প্রতিশোধরূপে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা ছিলো মদীনার মুনাফিক আর ষড়যন্ত্রকারীদের দৈনন্দিন কাজ।

চলুন এবার ইতিহাসের আরেক বাঁকে। ১৮৫৭ সাল–ভারতীয় উপমহাদেশে সঙ্ঘটিত হলো প্রথম আজাদী আন্দোলন। ভারতের মাটি থেকে দখলদার সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজগোষ্ঠীকে উৎখাত করতে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সময়কালে সঙ্ঘটিত এ সংগ্রাম উপমহাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের মূল নিয়ামক হিসাবে আজও স্বীকৃত। সেদিন যদি ভেতরের-বাইরের ষড়যন্ত্রে প্রথম আজাদীর সংগ্রাম ব্যর্থ না হতো তবে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস ভিন্নভাবে রচিত হতো। ১৮৫৭’র সেই বিভীষিকাময় দিনগুলিতে খোদ লালকেল্লার ভেতর থেকে যে ষড়যন্ত্র হয়েছিলো তার বর্ণনা পাওয়া যায় এভাবে–” এদিকে লালকেল্লায় বসে বেঈমানীর ষড়যন্ত্র জাল বিস্তার করেছিলেন বাহাদুর শাহর প্রিয়দর্শিনী পত্নী বেগম জিনাত মহল। সেপাইরা সংবাদ পেল যে বেগম সাহেবা স্বয়ং দিল্লীর পতন (ইংরেজদের পক্ষে) ঘটাতে মনস্থ করেছেন। তার গুপ্তচর মারফত দিল্লির দৈনন্দিন সংবাদ ইংরেজ শিবিরে পাঠাতেন। বেগম সাহেবার একমাত্র লক্ষ্য তার নাবালক পুত্র শাহজাদা জওয়ান বখতকে রাজ্যের ‘ওয়ালী’ নিযুক্ত করবেন। এ ব্যাপারে বেগম জিনাত মহলকে সাহায্য করেছিলেন বাদশার আশ্রিত চিকিৎসক হাকীম আহসান উল্লাহ আর সম্রাট বংশের মীর্জা ইলাহী বক্স। তারা উভয়েই ইংরেজদের সঙ্গে বেগম জিনাত মহলের যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলেন। কোদখানার দারোগা মওলভী রজব আলীও তাদের সঙ্গে একই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন”( আমি স্মৃতি আমি ইতিহাস, পৃ:২২৯-২৩০, মোজহারুল ইসলাম, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৮৭, বুক সোসাইটি, বাংলা বাজার, ঢাকা)। ১৯৫৭’র আজাদী আন্দোলনে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস আরও বিস্তৃত যা এখানে বর্ণনা করা সম্ভব ও সমীচীন নয়। সেই বিশ্বাসঘাতকতা আর অকর্মণ্য নেতৃত্বের পরিণতি কী হয়েছিলো তা ইতিহাসের এক মর্মবিদারী সাক্ষী। ১৮৫৮’র মহান এক সিপাহসালার মাওলানা ফযলে হক খায়রাবাদী শহীদ রহ. তাঁর আন্দামানের কারাজীবনে কাফনের কাপড়ে লেখা অমর সৃষ্টি ‘আসসাওরাতুল হিন্দিয়া’য় সেই মর্মন্তুদ পরিণতির বর্ণনা দিয়েছেন–” ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! যে বেগম বাদশাহের মন্ত্রণাদাত্রী থাকার সময় ইংরেজের সহিত ষড়যন্ত্র-জাল বিস্তার করিয়াছিল এবং স্বীয় পুত্রকে সিংহাসনের ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী করিয়া লওয়ার জন্য সর্বাবস্থায় দেশ ও জাতির শত্রু ইংরেজ সৈন্যদিগকে গোপনে সাহায্য দান করিত, তাহার মিথ্যা আশার সৌধও মুহূর্তের মধ্যেই ধ্বসিয়া পড়িল। সর্বপ্রথম গোরা সেনানায়কগণ তাহার সঞ্চিত সকল ধনসম্পদ কাড়িয়া লইল। তৎপর তাহাকেও বাদশাহের সহিত নির্বাসনে প্রেরণ করা হইল। তিনি ছিলেন ‘জিনাত মহল’ বা মহলের সৌন্দর্য। ইংরেজদের সহিত ষড়যন্ত্রের ফলস্বরূপ তাহাকে কুৎসিততম একটি ঘৃণ্য নারীদের পরিণত হইতে হইল” ( আজাদী আনাদোলন ১৮৫৭, পৃ:২৯, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ., চতুর্থ সংস্করণ- অগ্রহায়ণ ১৩৯৩/ ১৯৮৬, মদীনা পাবলিকেশন্স, ঢাকা)।

আশির দশকের প্রারম্ভ। মুজিব আমলে আলিম সমাজের উপর সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর নিষেধাজ্ঞা সমাপ্তি-পরবর্তী পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলো। আমীরে শরীয়াত মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর নেতৃত্বে গঠিত হলো খেলাফত আন্দোলন। আলিম-সমাজ খুঁজে পেলেন তাঁদের কর্মকাণ্ডের নতুন দিগন্ত। দেশব্যাপী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অবিস্মরণীয় সাড়ায় সূচিত হয় আলিম-সমাজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার এক সুযোগ। রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে স্থাপন করলো আলিম-সমাজের নেতৃত্ব প্রদর্শনের মাইল ফলক। এখান থেকে পরবর্তীতে ইসলামী নেতৃত্ব গড়ে উঠার পথ প্রশস্ত হয়। যখন প্রমাণীত হলো, এ দেশের মাটির সাথে, সমাজের সাথে আলিম-সমাজের গভীর সম্পর্ক; আলিম-সমাজের প্রভাব অনস্বীকার্য তখন-ই শুরু হলো ষড়যন্ত্র। ভেতরে-বাইরের ষড়যন্ত্রে হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে গড়ে উঠা খেলাফত আন্দোলন শেষ অবধি কতো ভাগে খণ্ডিত হয় তা আজ ইতিহাসের অংশ। সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি সাধিত হয় ভেতর থেকে। বিভক্তি, নেতৃত্বের দাবি আর ঘনিষ্ঠদের অগ্রাধিকার অর্জনের স্পৃহায় শেষ পর্যন্ত খেলাফত আন্দোলন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়।

উপরের যে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সম্মানীত পাঠকবৃন্দের জন্য উল্লেখ করে এলাম সে সবের উদ্দেশ্য ভবিষ্যতের জন্য অকাট্য শিক্ষার একটি দলীল তৈরি করা যেন আমরা বুঝতে পারি বারেবারে ঘটে যাওয়া আমাদের গলতটা কোথায়। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের শিরোনামের দিকে নিয়ে যাওয়াই এতো তথ্য সমাবেশের কারণ। বোঝা কঠিন নয়, আমাদের প্রাণপ্রিয় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম যেন সকল রাজনৈতিক বিতর্ক আর ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত হয়ে নৈতিক শক্তিসমৃদ্ধ একটি অবস্থানে দাঁড়াতে পারে সেই আবেদনের ফলশ্রুতি আজকের এই লেখা। ২০১০ সালে চট্টগ্রামের দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীতে আল্লামা আহমদ শফী সাহেব দা.বা.-এর নেতৃত্বে গঠিত এ অরাজনৈতিক প্লাটফরম এখন সুস্থ, রুচিশীল, সচেতন ও ধর্মপ্রাণ মুসলিমের আস্থার প্রতীক। যেহেতু এখানে রাজনীতির কোন সুযোগ নেই তাই আস্থার প্রতীক হিসাবে হেফাজতে ইসলাম তার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে সন্দেহ নেই।

কিছুদিন ধরে হেফাজতে ইসলাম নিয়ে একশ্রেণীর সেক্যুলার ও বামপন্থী মিডিয়া নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আসছে। বলা হচ্ছে, হেফাজতে ইসলামের সাথে সরকারের একটি আসন্ন নির্বাচনের আসনভিত্তিক সমঝোতা হয়েছে। ইতোমধ্যে হেফাজত মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এর বারকয়েক প্রতিবাদ করে হেফাজতের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরেছেন। আসলে আমরা জানি না কেউ আদৌ হেফাজতের নাম ভাঙ্গিয়ে কিছু করছেন কিনা বা এসব নিছক অপপ্রচার। যেহেতু ষড়যন্ত্র ইতিহাসের একটা অংশ তাই স্বভাবতই আতঙ্কিত ও আশঙ্কিত হওয়া অবাস্তব হবে না। আমাদের উদ্বেগের জায়গাটা নিছক নয়। কারণ, শাপলার ঘটনার পূর্বাপর কয়েকদিনের রোজনামচা পর্যালোচনা করলে হেফাজতে ইসলামের ভেতরে সম্ভাব্য ঘাপটি মেরে থাকা কোন চক্রের অস্তিত্বের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হতেই হয়। সেদিক থেকে হেফাজতে ইসলাম ভেতর থেকে আক্রান্ত হওয়া কঠিন কিছু নয়। স্বার্থান্বেষীমহল মহল অতীতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব হিসাবে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী যতো কঠোরভাবে অরাজনৈতিক অবস্থানের কথা বারবার উল্লেখ করেন হেফাজতের অন্য ফোরাম যেমন চট্টগ্রাম মহানগর কমিটি, ঢাকা মহানগর কমিটি এবং অন্যান্য মহানগর কমিটি থেকে সেভাবে উচ্চারিত হয় না। বিষয়টি ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া উচিৎ। তবেই সমন্বয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হবে। এতে করে ষড়যন্ত্রের পথ ক্রমেই সঙ্কোচিত হবে।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার। বিষয়টি হলো, যারা হেফাজতে ইসলামের ভেতরে দায়িত্ব পালন করছেন আবার রাজনীতিকভাবেও সক্রিয় তাদের বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। এর কারণ হলো, হেফাজত ইসলাম যেহেতু মৌলিকভাবে একটি অরাজনীতিক প্রতিষ্ঠান তাই অভ্যন্তরে থেকেও যারা রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট তাদের কোন্ চরিত্র রাজনীতিক আর কোন্ চরিত্র অরাজনীতিক তার নির্দ্ধারণ সমূহ কঠিন। এটা একদম দ্বৈত নাগরিকত্বের( Dual citizenship) মতো একটি বিষয়। বিশ্বের সকল দেশের নিয়ম হলো, প্রতিরক্ষা বা অন্য কোন সংবেদনশীল বিভাগে দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে এমন ব্যক্তিকে পদন্নোতি দেয়া হয় না বা অন্তর্ভুক্ত করা হয় না নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে। যেহেতু একজন ব্যক্তি একই সাথে রাজনীতিক এবং অরাজনীতিক প্রতিষ্ঠানে জড়িত তিনি নিজের অবস্থানগত কারণে বিশেষত অরাজনীতিক কোন প্রতিষ্ঠানের উর্দ্ধতন পদসমূহে আসীন হওয়া নীতিগত নিরাপত্তার কারণে যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন না। এসব ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকলে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বা ব্যাখ্যার সুযোগ না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। বরঞ্চ এ সম্পর্কিত সুস্পষ্ট নীতিমালা হেফাজতে ইসলামকে আরও গঠনমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।

রাষ্ট্রশক্তির পক্ষ থেকেও হেফাজত ইসলামে ষড়যন্ত্র হবার সম্ভাবনা থাকাই অধিকতর সম্ভব। কারণ, সেক্যুলার রাষ্ট্রশক্তি সর্বক্ষণ চাইবে হেফাজত বিতর্কিত হোক। বিতর্কিত হলে হেফাজত দুর্বল হয়ে যাবে। তাই হেফাজত ইসলামের ‘অরাজনীতিক’ চরিত্র খর্ব করে রাজনীতিক বর্ণায়ন সম্ভব হলে হেফাজত ইসলাম এ দেশের জনমানসের আস্থা হারাবে। এ বিষয়ে সকলের সতর্ক দৃষ্টি থাকা অনিবার্য।

পরিশেষে, এটুকুই আবেদন রাখবো যেনো কোন ষড়যন্ত্র বা নিফাকের আক্রমণে হেফাজত ইসলাম আহত না হয়, ক্ষত-বিক্ষত না হয়। মনে রাখতে হবে, যতোই হেফাজত ইসলামের প্রভাব বাড়বে ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাও ততোই বাড়বে। আল্লাহ হিফাজত করুন।