আমার উস্তায শায়খুল হাদীস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারূক

ড. মুশতাক আহমদ


আমাদের উস্তায হযরতুল আল্লাম শায়খুল হাদীস মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারূক; — উস্তায, আযীম উস্তায, শফীক উস্তায, বড় মেহেরবান উস্তায, কারীম ইবনুল কারীম ইবনুল কারীম উস্তায।

আমরা ছিলাম নবীন শিক্ষার্থী। মরহুম মাওলানা ইসহাক ফরীদী, মরহূম মাওলানা আবুল ফাতাহ, মাওলানা আবূ সুফয়ান ও এই অধম – – আমরা সেকালে ‘ইসলামী ছাত্র ঐক্য’ প্রতিষ্ঠা করি। (যা পরবর্তী কালে ‘লাজনাতুত তালাবা’ নামে কাজ করে) সঙ্গত কারণে আমরা আকাবিরকে জানার একটা ব্যাপক অনুসন্ধিৎসা লালন করতাম। কিন্তু হাতের নাগালে কোন কিতাব কিংবা ইতিহাসের বিদগ্ধ কোন রাহনুমা আমাদের ছিল না।

হযরত ফারূক সাহেব হুজুর তখন সবেমাত্র দেওবন্দ থেকে আসেন। ফরিদাবাদ মাদ্রাসার নতুন উস্তায। সর্বদা প্রফুল্ল বদন, মুখে স্মীত হাসি। পোশাক আশাকে আভিজাত্যের ছাপ। ছাত্রদের প্রতি আদর আপ্যায়নে উদারহস্ত। রূমে স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখছেন কয়েক আলমিরা নতুন নতুন রিসালা। আমরা তো দেখেই ব্যাকুল। তিনি কিভাবে যেন আমাদের মনের অবস্থা বুঝে নিলেন। তাঁর কক্ষটি আমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন। আমরা বাধাহীন অধ্যয়নের এক বিশাল সমুদ্র পেয়ে গেলাম।

সেবছর তিনি আমাদের ‘শরহে বেকায়া’ পড়াতেন। অথচ তাকরীরের ফাঁকে ফাঁকে এই কিশোর মনের অতি গহীনে প্রবিষ্ট করিয়ে দিতেন আকাবিরে দেওবন্দের ভালবাসা, তাঁদের চিন্তাচেতনা, সমুন্নত আখলাকী বৈশিষ্ট্য, তাঁদের দিগন্ত বিজয়ী অবদানের সোনালী ইতিহাস।

বিশ্ব ইতিহাসের আগাগোড়া ছিল তাঁর হাতের মুঠে। শৈল্পিক গুণও ছিল অপরিসীম। নিজে রাত জেগে জেগে আমাদের জন্য ম্যাপ আঁকতেন।তিনি আমাদের প্রতিভা, মননশীলতা, চিন্তাচেতনাকে আরো
শানিত, উজ্জীবিত ও কর্মক্ষম করার অভিপ্রায়ে বিভিন্ন রকমের চার্ট তৈরী করে শতাব্দী অনুসারে আসমাউর রিজাল -এর কে কোথায় কখন কিভাবে ঘুমন্ত পৃথিবীটাকে ঝাকুনি দিয়েছিলেন- এগুলির সার সংক্ষেপ বানাতেন। আমরা চার্টগুলো কপি করতাম আবার লাজনাতুত তালাবার তারবিয়্যাতী ইজতিমায় প্রদর্শনী করতাম।

অপরিসীম মায়াময়তা ছিল তাঁর কথায়, কাজে ও আচরনে। নামাযের রুকু সেজদা ছিল দারুন আকর্ষনীয়। অমায়িক ব্যবহার, অতিথি পরায়ন, চৌকস ও বড়মাপের আমানতদার। অতি শৈশবে হযরতুল উস্তাযের এই মায়াবী পরশ আমাদের মানুষ হওয়ার পথ দেখিয়েছে; আমাদের আজকের এই আসন পর্যন্ত পৌঁছার পথ তৈরী করে দিয়েছে —

আল্লাহু আকবার, না না না। এই মহান উস্তাযের এত সব অবদান ভুলে গেলে আমি বড় নাদান হবো; আমি বড় অকৃতজ্ঞ হয়ে যাবো। আল্লাহ আমাকে মাফ করে দাও।


ফেসবুক থেকে