ইহুদি সউদি মিতালির তুলনায় রাশিয়া তুর্কি সম্পর্ক মন্দের ভাল

ইহুদি সউদি মিতালির তুলনায় রাশিয়া তুর্কি সম্পর্ক মন্দের ভাল

মুফতী হারুন ইজহার চৌধুরী | লেখক ও গবেষক


গত কয়েক দিনে বিশ্ব মুসলিম নেতাদের মস্কোমুখী প্রবণতা চোখে পড়ার মত ছিল। সিরিয়ার ঘাতক পুতিন, রুহানীর সাথে এরদোয়ানের ‘কূটনৈতিক’ গাঁটটছড়াটি বেশ নজর কেড়েছে আমার।

খেলবে পুতিন, ট্রাম্প নয়- রবার্ট ফিস্কের এ ছোট আধা লাইন কথায় মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকবে এটা আমি বুঝে নিয়ছি আরো অনেক আগে।

কয়েকদিন আগে ফিস্ক লিখেছেন, নির্বোধ সউদীর নানা ব্যর্থতার দিক সম্পর্কে। (বৃটিশ দ্যা ইন্ডিপেন্ডটের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এ সাংবাদিককে তার বস্তুনিষ্ঠতার কারণে দুই দশক ধরে আমি রেফারেন্স হিসেবে গণ্য করি। ইসলামপ্রীতির জন্য নয়, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পশ্চিমা রাজনীতির গোমর ফাঁসে তার জুড়ি নেই-এজন্য)

রাশিয়ায় এখন পুতিনের জামানা। যখন কমিউনজমের জ্বরে রাশিয়া পুরোপুরিভাবে কাবু ছিল – সেই গত শতকের নানা সময়ের বৈশ্বিক রাজনীতিতে মুসলিম জাতির স্বার্থ কমিউনিস্ট রাশিয়ার রাজনীতি দ্বারা কিভাবে লাভবান হয়েছিল তার একটা ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় কবি গোলাম মোস্তাফার ‘ইসলাম ও কমিউনিজম’ নামক পুস্তিকায়।

কমিউনিজমের শতবর্ষ উদযাপনের হাঁকডাকে আমি কিছুটা বিচলিত ছিলাম, কারণ সময়টা ছিল রাশিয়ার ব্যাপক কূটনৈতিক সাফল্য আর পুতিনের দৃঢ়চেতা নেতৃত্বের বিকাশের।

কিন্তু লেনিনের বিরুদ্ধে কড়া কড়া মন্তব্য আর কমিউনিজমের জন্মস্থানে শতবর্ষের প্রতি পুতিনের বিদ্রূপ সারা দুনিয়ার কমিউনিস্টাদেরকে চরমভাবে হতাশ করে।

বাংলাদেশে জাসদের পান্ডা ইনুরা ইসলামি রাজনীতির উপর ফনা তুলে আর অন্যদিকে তাদের কেবলা মস্কো-চায়না পাকিস্তানপ্রীতিতে দারুণভাবে নিমজ্জিত।

মস্কো এখন ঘন ঘন মুসলিম দুনিয়ার নেতাদের পদভারে প্রকম্পিত হচ্ছে। তুরস্ক আর মস্কোর মিতালী বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণে বড়ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছে। ইরানের কাউন্টারে সউদী রাজাও হাজির হয়েছিলেন মস্কোতে।

মস্কোকেন্দ্রিক যে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মুসলিম বলয় গড়ে উঠছে তার ইতিবাচক দিক হলো, তা মার্কিন-ইহুদীপন্থী মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির জন্য একটা চ্যালেঞ্জ খাড়া করতে পারে। এবং অপরিণামদর্শী, আত্মঘাতি সউদী নীতির বিপরীতে কাতার তুরস্ককে শক্তি যোগান দিবে ।

তবে দুঃসংবাদ হলো, এর মাধ্যমে কেবল মার্কিন প্রভাবই খর্ব হচ্ছেনা, বাড়ছে মারাত্মক শিয়া প্রভাব যারা ইতোমধ্যে রাশিয়ার সহায়তায় সিরিয়ায় ব্যাপক সাফল্য পেয়েছ, তারা সফল হচ্ছে ইয়েমেনে, তারো আগে সফল হয়েছিল ইরাকে। বিভক্ত সুন্নি বিশ্বের একাংশ মার্কিন নেতৃত্বে, আরেক অংশ রুশ নেতৃত্বে প্রবেশ করে মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া নীতির বসন্তের জোয়ার এনে দিয়েছে।
ধিক্কার সউদীর জন্য!
ধিক্কার আলে সউদের জন্য!

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের পাহারাদার মার্কিনীদের নিয়ে আসার মাধ্যমে সউদিয়া আরাবিয়ার অপরিণামদর্শী রাজনীতি ইরানের পারেসান শিয়া ইসলামের জন্য পথ নিষ্কন্টক করে দিল মধ্যপ্রাচ্য। সউদিয়ানরা বরাবরই আত্মঘাতি রাজনীতি করে আসছেন।

তুরস্ক,পাকিস্তান,কাতার আর সুদান নিজ নিজ স্বার্থে মস্কোমুখী নীতি গ্রহন করতে বাধ্য হয়েছে, এতে উম্মাহর সামগ্রিক স্বার্থের জন্য সুদূরপ্রসারী কোন সুসংবাদ নেই। কেননা দখলদার ও আধিপত্যবাদী বিরোধি লড়াইয়ের প্রতিরোধকামি যে সামাজিক শক্তি, সে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে উম্মাহ্ কেন্দ্রিক পরিকল্পনা বাদ দিয়ে নিতান্তই জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য এতো কিছু হচ্ছে। অথচ হিযবুল্লাহ প্রতি ইরানের সাপোর্ট রাখঢাক ছাড়া। এরকম কোন প্রকাশ্য সাপোর্ট পাচ্ছেনা মুসলিম প্রতিরোধকামীরা কোন সুন্নী রাষ্ট্র থেকে।

মস্কোকেন্দ্রিক নতুম মুসলিম সমীকরণে তাই আমারা পুরো আশাবাদি নই। আমাদের চুড়ান্ত আশা তুরস্ক, কাতার সুদান, পাকিস্তান কারো সাথে নই। উম্মাহর সামাজিক বলয়ের ভিতর থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিরোধকামীদের মাধ্যমে বিশ্ব মোডলিপনার রাজনীতির যথাযত ভারসাম্যপূর্ণ কাউন্টার হতে পারত। কিন্তু তা হতে দেবেনা এ রাষ্ট্রগুলো তার ঐতিহ্যগত কায়িমী স্বার্থের কাঠামোকে ধরে রাখার জন্য। যদিও আপাতত ইহুদি সউদি মিতালির তুলনায় তাদেরকে দৃশ্যতঃ মন্দের ভাল মনে হতে পারে।
কিন্তু আগামিদিনে কথা বলবে উম্মাহর সামাজিক শক্তিই, বৈশ্বিক ও রাষ্ট্রিক নানা বিশৃঙ্খলতার পটভুমিতে এ শক্তি নতুন সমীকরণ নিয়ে হাজির হবে। প্রতিষ্ঠিত কিছু মুল্যবোধের কারণে আমাদের গতবাঁধা দেমাগে এ ভবিষ্যদ্বাণী এখন বোধগম্য নাও হতে পারে।