রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সমর নীতি

রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সমর নীতি

মুনির আহমদ | লেখক : সম্পাদক, উম্মাহ ২৪ডটকম | সাবেক নির্বাহী সম্পাদক- মাসিক মুঈনুল ইসলাম


মানুষের জীবনে অনেকগুলো দিক থাকে। কোন দু’একটি দিকে কেউ সাফল্য অর্জন করলেও সকল ক্ষেত্রে অনেকেই সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয় না। সে জন্য দেখা যায় যে পেশায় সাফল্য লাভ করে সে পারিবারিক ক্ষেত্রে তেমন সফল হয় না। আবার পেশা বা পারিবারিক ক্ষেত্রে কৃতকার্য হলেও সামাজিক ক্ষেত্রে অনেককে অকৃতকার্য থাকতে হয়। মানবতার মুক্তিদূত সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন তার ব্যতিক্রম।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) এমন এক যুগ সন্ধিক্ষণে আরবের বুকে আবির্ভুত হয়েছিলেন যখন কুসংস্কারের অন্ধকার সমগ্র পৃথিবীকে গ্রাস করেছিল। বিশেষ করে জাযিরাতুল আরব তথা আরব উপদ্বীপের অবস্থা ছিল বড়ই শোচনীয়। গোত্রে গোত্রে কলহ-বিবাদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, হত্যা-রাহাজানি, লুটতরাজ, জুলুম-নিপীড়ন এবং অনাচার ও ব্যভিচারে আরব সমাজের মেরুদন্ড ভেঙ্গে গিয়েছিল। এহেন যুগ সন্ধিক্ষণে আবির্ভুত হয়েও মহানবী (সা.) বিশ্ববাসিকে উপহার দিয়েছিলেন এক মহোত্তম জীবনাদর্শ এবং মাত্র তেইশ বছরেই সেই আদর্শ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করে দেখিয়ে দিয়ে দুনিয়ার মানুষের সামনে রেখে গেছেন এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাবৎ বিশ্ব জগতের বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। তিনি হচ্ছেন বিশ্ব মানবতার একমাত্র শিক্ষাগুরু, একমাত্র আদর্শ। তাই ব্যক্তিগত জীবন থেকে আরম্ভ করে সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, রাজনৈতিক জীবন, এককথায় মানব জীবনের এমন কোন দিক নেই যেখানে তিনি শ্রেষ্ঠত্বের স্বাক্ষর রাখেননি। তিনি যেমন ছিলেন একজন সফল পথপ্রদর্শক তেমনি ছিলেন এক মহান বিপ্লবী, আদর্শ রাষ্ট্র নায়ক, আদর্শ সমর নায়ক, আদর্শ রাজনীতিবিদ, আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ পিতা, আদর্শ স্বামী, আদর্শ বন্ধু প্রভৃতি।

তিনি পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের ন্যায় কোন বিশেষ এলাকা বা জাতির জন্য অবতীর্ণ হননি। তাঁকে পাঠানো হয়েছিল সমগ্র উম্মতের জন্য সাক্ষী, সতর্ককারী, সংবাদদাতা হিসেবে। আর তাই সত্য ও সুন্দরের মশালবাহী মহানবী (সা.) মানুষকেআল্লাহর দিকে আহ্বান করেছিলেন। সঠিক পথ-নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু আরবের সংখ্যাগরিষ্ঠরাই তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। মানতে চায়নি তাঁর কোন কথাই, বরং তারা তাঁর প্রতি কঠোর আচরণ করেছিল এমনকি তারা তাঁকে নিঃশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল দুনিয়ার বুক থেকে। এমতাবস্থায়আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নির্দেশে তিনি মদীনায় হিজরত করেছিলেন এবং সেখানে তিনি একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ইসলাম একটি শান্তির ধর্ম। কিন্তু তবুও ইসলাম যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছে। তবে মানুষ নিধনের জন্য নয়। বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছে। ইসলাম যেসব কারণে যুদ্ধের অনুমতি দিয়েছে তা হল, স্বৈরাচার দমন, ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় নির্যাতন দমন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা প্রভৃতি।

আমরা যদি একটু সূক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করি, তবে তা আমাদের কাছে দিবালোকের মত পরিস্কার হয়ে যাবে। আসলে ইসলামের যুদ্ধ আক্রমণাত্মক নয়, বরং আত্মরক্ষামূলক। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে- “তোমরাও মুশরিকদের সাথে ব্যাপকভাবে লড়াই কর ঠিক তারা যেমন তোমাদের সাথে সর্বাত্মক লড়াই করছে। তোমরা জেনে রেখো,আল্লাহ তাআলা পরহেযগারদের সাথেই রয়েছেন। (সূরা তাওবাহ- ২৬)।

এ কথাটাই হাদীস শরীফে এভাবে বলা হয়েছে, হযরত আব্দুর রহ্মান আয়মান বর্ণনা করেন, “মুসলমানদের যখন যুদ্ধ করা ছাড়া আর কোন বিকল্প ছিল না এবং তাদের জন্য যখন যুদ্ধ করার অবস্থা স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছিল তখনই তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল এবং সেই যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শান্তি স্থাপন”।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মাদানী জীবনের সংক্ষিপ্ত পরিসরে স্বশরীরে ২৭টি যুদ্ধ পরিচালনা করেন। কিন্তু কোন দিন স্বহস্তে কাউকে হত্যা করেননি। সে যুদ্ধগুলো এখনকার যুদ্ধের মত ছিল না, ইসলাম পূর্ব আরবদের যুদ্ধের মতও নয়, বরং সেই যুদ্ধ ছিল একটা নীতি মানার উপর যা কি-না ছিল নমনীয় ভ্রাতৃত্ববোধ সুলভ। সংগত কারণে বিশ্বনবী (সা.) বিশ্বের সকল মানুষের কাছে একজন অসীম দূরদর্শী সমরকৌশলী এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বি সমর নায়ক হিসেবে বিবেচিত।

তাঁর যুদ্ধ নীতির অন্যতম নীতি হল, তিনি প্রথমতঃ যুদ্ধকে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করতেন। আর যুদ্ধের প্রারম্ভেই প্রতিপক্ষকে আলোচনার সুযোগ দিতেন। আলোচনায় ব্যর্থ হলেও শত্রুর উপর অতর্কিত আক্রমণ ছিল তাঁর যুদ্ধ নীতি বিরোধী। এমনকি তিনি কখনো শত্রু বাহিনীর উপর আগে আক্রমণ করেননি, বরং আক্রান্ত হলে তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর যুদ্ধনীতির আর একটি অন্যতম নীতি হল, মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী কোন বিদেশী বা শত্রু যদি মুসলিম বাহিনীর কাছে আশ্রয় চায় এবং জান-মালের নিরাপত্তা দাবী করে তাহলে তার জান-মালের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। পবিত্র কুরআনে এরূপ নির্দেশই দেওয়া হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, “মুশরিকদের মধ্যে যদি কেউ তোমাদের কাছে আশ্রয় চায় তাহলে তাকে আশ্রয় দাও। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর কালাম না শুনতে পারবে। তারপর তাকে নিরাপদ শান্তিপূর্ণ স্থানে পৌঁছে দাও। (সূরা তাওবাহ- ৬)।

এক সময় যখন মুসলিম বাহিনী বিশাল এক বাহিনীতে পরিণত হল এবং বিধর্মীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হল, তখন তাদেরকে সুনির্দিষ্ট তিনটি নীতি অবলম্বন করতে হত। (এক) প্রথমে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান, (দুই) তা না হলে জিজিয়া কর প্রদানের আহ্বান, (তিন) তাও না হলে যুদ্ধের আহ্বান। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে- “আল্লাহর নামে এবং আল্লাহর পক্ষে যুদ্ধ কর। প্রতারণা বা বিশ্বাসঘাতকতা করো না। অঙ্গহানী করো না বা শিশুদের হত্যা করো না। যখন তোমরা তোমাদের বহু দেববাদী শত্রু দেখবে, তখন প্রথমে তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে আহ্বান জানাবে। যদি তারা তা মেনে নেয়, তাহলে তাদের গ্রহণ করবে এবং তাদেরকে এক থাকতে দেবে। তারা যদি ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে, তাহলে তাদেরকে জিজিয়া প্রদান করার আহ্বান কর। আর যদি তা করে তবে গ্রহণ কর এবং অব্যাহতি দাও”।

ইসলামপূর্ব সমাজে কোন যুদ্ধে ধৃত শত্রুদের মৃত্যুই ছিল তাদের একমাত্র নির্ধারিত শাস্তি। কাজেই তাদেরকে হত্যা করা হত। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এ নিয়ম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এ সম্পর্কে হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাযি.)এর বর্ণনা হল, “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে এরূপ কাজ নিষিদ্ধ করতে শুনেছি এবং যুদ্ধ বন্দীদের প্রতি যেন কোন অত্যাচার ও কষ্ট না দেওয়া হয় এমনকি তিনি তা তদারক করতেন এবং বলতেন, এদের যেন কোন কষ্ট এবং অনাহারে কোন অসুবিধা না হয়।”

বদর যুদ্ধে তিনি যুদ্ধবন্দীদের উটের পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়ে নিয়েছেন আর নিজেরা পায়ে হেঁটে গেছেন। পথিমধ্যে রাতের বেলা নিজেরা অনাহারে থেকেছেন এবং যুদ্ধবন্দীদের নিজেদের খাবার দিয়েছেন। যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যারা লেখাপড়া জানত তাদের মুক্তিপণ ছিল মদীনার দশ জন শিশুকে বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া।

যুদ্ধরত বিধর্মীদের হত্যা করা ইসলামে অনুমোদিত। তদসত্ত্বেও মুশরিক শিশু-স্ত্রীলোক হত্যা করা নিন্দনীয়। হযরত মুহাম্মদ বিন হাসান থেকে বর্ণিত, বনু কুরাইযা গোত্রের বিরুদ্ধে আমি আল্লাহর নবীকে বলতে শুনেছি যে, শত্রুদের মধ্যে বয়ঃপ্রাপ্ত ছাড়া অন্যান্যদেরকে মুক্তি দেওয়া উচিত।

একবার এক যুদ্ধে একদল কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে এ কথা জানতে পেরে নবী কারীম (সা.) দুঃখিত হন। একজন তাকে বলল, দুঃখ করছেন কেন? এরা তো সব পৌত্তলিকদের সন্তান। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বেশ বিরক্তিসহ বললেন, “তারা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশী মূল্যবান; কারণ, তারা নির্দোষ। তোমরাও কি পৌত্তলিক সন্তান নও? সাবধান! শিশুকে হত্যা করো না, সাবধান!”

বিশ্বনবী (সা.) মহিলাদের হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। সাহাবী রাবাহ্ বিন রাবীআহ্ (রাযি.) বর্ণনা করেন, একবার প্রিয়নবী (সা.)এর সাথে যুদ্ধে যাওয়ার পথে তিনি একজন মহিলার লাশ দেখে বল্লেন, একে হত্যা করা উচিত হয়নি। শুধু তাই নয়, সে মুহূর্তেই তিনি একজন সাহাবীকে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাযি.)এর নিকট এক ফরমান দিয়ে পাঠান। আর সেই ফরমানটি ছিল, ‘কোন শিশু-স্ত্রীলোক ও মজদুরকে যেন হত্যা করা না হয়’।

মহানবী (সা.) যখন যেখানে যুদ্ধাভিযানের নির্দেশ দিতেন তিনি বারবার মুসলিম সৈন্য বাহিনীকে সাবধান করতেন, কোন শস্যক্ষেত্র ধ্বংস না করার জন্য, বৃক্ষ ছেদন না করার জন্য, কোন প্রাণীকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য, বিনা প্রয়োজনে পশুপাখী হত্যা না করার জন্য।
দূতকে বন্দী ও হত্যা করাকে তিনি গর্হিত কাজ মনে করতেন। তাই দূতকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। মুসাইলামা যখন দূত প্রেরণ করেছিল এবং সেই দূত এসে অভদ্রোচিত আচরণ করেছিল, তখন কেউ কেউ তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চাইলে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বললেন, দূত হত্যা করা সিদ্ধ নয়।

“হযরত আবু রাফেকে দূত করে কুরাইশরা যখন তাঁর দরবারে পাঠাল তখন তিনি মহানবী (সা.)এর আচরণ ও মহত্ব দেখে মুসলমান হয়ে গেলেন এবং কুরাইশদের কাছে তিনি আর ফিরে যেতে চাইলেন না। তখন মহানবী (সা.) বললেন, তুমি হলে দূত। দূতকে আটক রাখা নীতি বিরুদ্ধ কাজ। তাই তোমাকে এখন চলে যেতে হবে। পরে ফিরে এসো”।

যুদ্ধের সন্ধিচুক্তি হুবহু মেনে চলা ছিল মহানবী (সা.)এর অন্যতম নীতি। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় অত্যাচারিত মুসলিম আবু জান্দালকে একমাত্র চুক্তির কারণে মক্কায় ফিরতে হয়েছিল। সকল সাহাবা তাঁকে রাখতে চাইলেও তিনি তা হতে দেননি। অঙ্গীকার ঠিক রাখতে তিনি ৭০ জন সাহাবীকে ‘বীর মাঊনা’ প্রেরণ করেছিলেন কিন্তু তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে কাপুরুষের ন্যায় সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যুদ্ধ অনুমোদন করেছেন দুর্বলের বিরুদ্ধে সবলের অত্যাচার-অবিচার প্রতিহত করার জন্য। মূলতঃ অন্যায়-অবিচার-স্বৈরাচার উৎখাত করে বিশ্বের মাঝে ন্যায় ও সুন্দর প্রতিষ্ঠার জন্য। আর এটাই তাঁর যুদ্ধের উদ্দেশ্য। ইসলাম এই ন্যায় সঙ্গত ইচ্ছা বা দাবী প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এতক্ষণ আমাদের নাতিদীর্ঘ আলোচনায় মহানবী (সা.)এর যুদ্ধের একটা শাশ্বত নীতি সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি শুধু যুদ্ধের পথই খোঁজেননি, বরং তাঁর আগে বিভিন্ন চুক্তি ও সন্ধির মাধ্যমে শান্তির পথ অন্বেষণ করেছেন। তাঁর চুক্তিগুলো অনুসরণ করেই আজ জাতিসংঘ সনদ, লীগ অব নেশনস্ গড়ে উঠেছে; যদিও তা আজ সর্বক্ষেত্রে সমানভাবে মেনে চলা হচ্ছে না। তাঁর কৃত হুদাইবিয়ার সন্ধি ছিল পৃথিবীর প্রথম লিখিত সন্ধিপত্র। ইতিপূর্ব খুজা’দের সাথে হিলফুল ফুযুলে লিখিত যে চুক্তি হয়েছিল উইরোপীয় রাষ্ট্রসমূহে লীগ অব নেশন্সে সেসব কথাই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা চৌদ্দশ’ বছর পূর্বেই ইসলামের নবী সম্পাদন করেছিলেন।

অথচ আজ আমরা সমগ্র পৃথিবীতে কি দেখছি? এখনকার ছোট বড় প্রায় সকল যুদ্ধেরই উদ্দেশ্য হল স্বার্থ হাসিল। কিংবা হিংসাত্মক ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক। সকল যুদ্ধেই বর্বরতা ও ধ্বংস লীলার চিহ্ন পরিদৃষ্ট হয়। বিমান, সাঁজোয়া ট্যাংক, অত্যাধুনিক বিভিন্ন ধরনের ক্ষমতা সম্পন্ন অস্ত্রের হামলায় পাইকারী হারে বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়। নিরীহ মানুষের বাড়ী-ঘর, স্থাপনা বিধ্বস্ত হয়, যা জাতিসংঘ সনদ বহির্ভুত। ইসলাম পরিপন্থী তো বটেই। সৈন্যবাহিনী পশ্চাদাপসরণের সময় পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করা হয়। নিরীহ জনগণ বাস্তুহারা হয় এবং তাদের জীবনে নেমে আসে অসহনীয় দুর্যোগ। আজ তা আরো বেশী করে পরিলক্ষিত হচ্ছে সাম্প্রতিক ইরাকের উপর ইঙ্গ-মার্কিন হামলায়। জাতিসংঘের সকল নীতি ও বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে অন্যায়ভাবে ইরাকের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সকল যুদ্ধনীতি লংঘন করে নিরীহ বেসামরিক জনগণকে হত্যা করা হচ্ছে, যা থেকে শিশু-বৃদ্ধ ও নারীরাও রক্ষা পাচ্ছে না। অর্থ-সম্পদ, ঘর-বাড়ী বিনষ্ট করা হচ্ছে।

প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করে পরিশেষে যা বলতে চাই তাহল, অস্থিরতা ও অশান্তির দাবানলে প্রজ্জ্বলিত এই বিশ্ব চরাচরে স্থিরতা আর শান্তি অন্বেষায় আল্লাহর প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)এর অনুসরণ-অনুকরণ ছাড়া বিকল্প নেই।

স্মর্তব্য, মহানবী (সা.) মানুষকে সত্য ও শান্তির বাণী শুনিয়েছিলেন। মানুষ তাঁর বাণীতে আস্থা স্থাপন করেও কালের আবর্তে তা থেকে ক্রমশঃ দূরে সরে যাচ্ছে বলেই বর্তমান বিশ্বে অশান্তির দাবানল ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। বিজাতীয় আদর্শ গ্রহণ ও আল্লাহর দুশমনদের পথ ও পন্থা অনুসরণের ফলে মুসলমানদের জীবনে নেমে এসেছে সীমাহীন পতন ও বিপর্যয়। অথচ মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদ (সা.)ই হলেন আমাদের একমাত্র আদর্শ।

এ মর্মে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন- “তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ”। (সূরা আহযাব- ২১)।

মুসলিম উম্মাহ সকল পতন ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারে একমাত্র মহানবী (সা.)এর অনুপম আদর্শ অনুসরণ-অনুকরণ করে। একথা বহু অমুসলিম মনীষীও অকপটে স্বীকার করেছেন। জর্জ বার্নাড শ’ বলেছেন- “আজকের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পৃথিবীকে শান্তি ও সুখের পৃথিবী বানাতে হলে হযরত মুহাম্মদ (সা.)এর নেতৃত্ব প্রয়োজন”। কাজেই আসুন, আমরা তাঁর অনুসৃত যুদ্ধনীতিসহ তাঁর সকল আদর্শ আঁকড়ে ধরি। একমাত্র তাঁর জীবনাদর্শই আমাদেরকে সামগ্রিক মুক্তি দিতে পারবে।