আমার মুহাম্মাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (২)

আমার মুহাম্মাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (২)

মুহাম্মাদ শফিকুল ইসলাম


সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক
আমার মুহাম্মাদ রাসূল ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের একনিষ্ঠ সমর্থক। তাঁর শাসনব্যবস্থার মূলকথা ছিলো সত্য এবং ন্যায়। সত্য এবং ন্যায়ে তিনি ছিলেন আপোষহীন। নিন্দুকের নিন্দা, কপটচারীর তিরষ্কার তাকে প্রভাবিত করতো না। ধন-জন, মান-সম্মান, বংশকৌলীন্য আমার মুহাম্মাদ রাসূলকে দুর্বল করতো না। দুর্বলই ছিলো তাঁর কাছে সবল এবং সবলই ছিলো তাঁর কাছে দুর্বল, তিনি দুর্বলের হয়ে সবলের মুখোমুখী হতেন এবং ন্যায্য অধিকার আদায় করে দিতেন। সবল সুযোগ পায়নি যে দায় এড়িয়ে যায়, কিবা গুড়িয়ে উড়িয়ে দেয় দুর্বলের প্রাপ্যতা ন্যায্যতা।

তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক। নিকট থেকে নিকটতম এবং প্রিয় থেকে প্রিয়তম মানুষও তাঁকে সত্য ও ন্যায় থেকে নড়াতে, সরাতে, টলাতে পারেনি। দেখো না, একবার এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরি করে বসলো। নিজ গোত্রে তার কদর ছিলো বলে গোত্রপতিদের আক্কেল গুড়–ম। তারা মেনে নিতেই পারছিলো না যে, ভদ্র মহিলাকে সাজা পেতে হবে। তারা ভাবতে লাগলো, কী করা যায়। শেষমেষ এমন একজন মানুষকে ধরলো যিনি ছিলেন আমার মুহাম্মাদ রাসূলের সবচেয়ে আদরের, সবচেয়ে সোহাগের। তাঁর পালকপুত্র উসামা। গোত্রপতিদের অনেক অনুরোধের পর এই মানুষটি আমার মুহাম্মাদ রাসূলের সামনে গেলেন। কিন্তু তিনিও মুখ পেলেন না। আমার মুহাম্মাদ রাসূল মনঃক্ষুন্ন হলেন। ইসলামের পরিচয় কি সে পায় নি? এরপরও এহেন আবদার? এরপরও এমন অবান্তর কথা?
পাঠক, হযরত আয়েশা বর্ণিত হাদীসটি একবার মন দিয়ে আমার সাথে পড়ো। তোমার সমগ্রসত্তা হোক আমার মুহাম্মাদ রাসূলের প্রতি শ্রদ্ধাবনত, হোক অনুরাগে সমর্পিত। দেখো, হযরত আয়েশা বলেন, মাখযুমিয়া যে মহিলাটি চুরি করেছিলো, তাকে নিয়ে কোরায়েশ নেতারা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। অনেক ভাবনাচিন্তার পর তারা বললো, এ ব্যাপারে কেউ যদি রাসূলের সাথে কথা বলতে পারে, তাহলে কেবল উসামাই।

কোরায়শ-নেতারা উসামাকে ধরলো। তাদের পীড়াপীড়িতে উসামা রাসূলের কাছে গেলেন। রাসূল বেদনাহত হৃদয়ে বললেন, ওহে উসামা, আল্লাহর দ-বিধির বিপরীতে এসেছো সুপারিশ করতে?
লোকজনকে সমবেত করা হলো। রাসূল মিম্বরে দাঁড়ালেন। আল্লাহর হামদ ও ছানার পর মুসলিম উম্মাহকে লক্ষ্য করে বক্তব্য দিলেন। একপর্যায়ে বললেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তীরা ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তারা ন্যায়ের উপর অটল থাকতে পারতো না। যখন কোনো সম্ভ্রান্ত মানুষ কোনো অপরাধ করতো, তখন নানা অজুহাতে তার জন্য ক্ষমা ঘোষণা করাতো; অপরপক্ষে যখন কোনো দুর্বল মানুষ কোনো অপরাধ করতো, তখন তার উপর কষে দ-বিধি কার্যকর করতো।’

সুমহান চরিত্রমাধুরী
আমার মুহাম্মাদ রাসূল। তার সুন্দরতম গুণ-বৈশিষ্ট্য হলো সুউচ্চ সুমহান চরিত্রমাধুরী। এ মাধুরী বিমোহিত করেছে শুধু কাছের নয়, দূরের মানুষকেও। এ স্বর্গসুধা অভিভূত করেছে শুধু মিত্রকে নয়, শত্রুকেও। বন্ধু, একটু নির্মোহ হও, একটু ন্যায় করো, এ সত্য স্বীকার না করে পারবে না।

তুমি যদি আমার মুহাম্মাদ রাসূলের দেখা পেতে তাহলে বুঝতে, কী ছিলেন তিনি! কেমন ছিলেন তিনি! তুমি বুঝতে, মায়ার পৃথিবীতে অমন মানুষ হয় না, হতে পারে না। যে-ই তাঁর দেখা পেয়েছে, সে-ই অভিভূত হয়েছে। হবে না কেন? সে যে মানবমুখে পূর্ণিমার চাঁদ দেখেছে, পূর্ণিমার চাঁদের মধুর হাসিতে বিমোহিত হয়েছে। আহ্! কী মিষ্টি ছিলো তাঁর কথা! কী  স্নিগ্ধ  ছিলো তাঁর হাসি!

বিশ্বাস করো, প্রতিদান দানে তাঁর মতো ভালো মানুষ এ জগৎ দ্বিতীয়টি দেখেনি। মন্দাচারের বিপরীতে শুধু সহনশীলতা নয়, নয় শুধু মার্জনা; বরং সদাচারও; বলো, এও কি হয়? বন্ধু, আমার মুহাম্মাদ রাসূল তা দেখিয়ে গেছেন। আমার মুহাম্মাদ রাসূল তা শিখিয়ে গেছেন। ঐশী পরিচর্যায় তিনি যে সকল ক্ষুদ্রতার উর্ধ্বে উঠে গিয়েছিলেন। স্বর্গোদ্যানের লাল, সাদা, গোলাপি, যাই বলো, সবচে সুন্দর গোলাপটি যে শাশ্বত সুন্দরেরই প্রতীক হয়ে ফুটেছিলো।
জানো? তিনি তাঁর অনুসারীদের কী শিখিয়েছিলেন? তিনি শিখিয়েছিলেন, সেই শ্রেষ্ঠ মানুষ যার ব্যবহার ভালো, যার চরিত্র সুন্দর। তিনি বলেছিলেন,
“তোমাদের মধ্যে সেই সবচে ভালো, যার ব্যবহার সবচে ভালো, যার চরিত্র সবচে সুন্দর।”
বরং তিনি এও বলে গেছেন যে, এমন মানুষই জান্নাতে তাঁর সবচে কাছে থাকবে। তিনি বলেছেন,
“কেয়ামতের দিন তোমাদের মধ্যে আমার সবচে ভালোবাসার এবং সবচে কাছের মানুষটি হবে সে, যার ব্যবহার তোমাদের মধ্যে সবচে ভালো ছিলো, যার চরিত্র তোমাদের মধ্যে সবচে সুন্দর ছিলো।”
তিনি মানুষকে এমনভাবে কাছে টেনে নিতেন যে, প্রত্যেকেই মনে করতো আমিই তার সবচেয়ে প্রিয়। তিনি আমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।
আমার মুহাম্মাদ রাসূলের চরিত্রমাধুরী ও অনুপম ব্যবহার শুধু তাঁর অনুসারীদের প্রতিই সীমাবদ্ধ ছিলো না; বরং তাঁর প্রশস্ত হৃদয়ের বিশালতা শত্রুমিত্র সকলকেই ধারণ করেছিলো অপূর্ব মহিমায়। দেখো না, তাঁকে যখন চরম ধৃষ্টতাপ্রকাশকারী পৌত্তলিকদেরও অভিশাপ করতে বলা হলো, তখনও তিনি কী অনুপমতায় আবেদনকারীকে তাক লাগিয়ে দিলেন! ক্লান্ত শ্রান্ত বেদনাভারাক্রান্ত কোনও মাটির মানুষের মুখে তখনও ঔদার্য আভা ছড়ালো। তাঁর পবিত্র জবানে তখনও উৎসারিত হলো,
‘আমি তো অভিশাপকারী হয়ে আসিনি; আমি তো এসেছি জগতের প্রতি করুণা হয়ে।’

সহনশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত
আমার মুহাম্মাদ রাসূলের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু মিথ্যে, কিছু প্রোপাগান্ডা, কিছু তথ্যবিকৃতি অনেক নাদান নির্বোধকেই রেখেছে অন্ধকারে। যেগুলোর ন্যূনতম তথ্যগত নির্ভরযোগ্যতা নেই। যেগুলো শুধুই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নষ্টরা— নষ্ট রঙ তুলি আর নষ্ট ক্যানভাসে এই মহান মানুষটির অসহিষ্ণু চেহারা আঁকে। অসহনশীল অবয়ব তুলে ধরে।
কিন্তু হৃদয়ের চোখদুটো মেলে ধরো, সত্য ও সুন্দরের পরতে পরতে তুমি দেখবে, আমার মুহাম্মাদ রাসূল ছিলেন জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক। মহানুভবতার জীবন্ত আদর্শ। তিনি সহনশীলতার দীক্ষা দিতেন দিন রাত। তিনি মহানুভবতার বাস্তব অনুশীলন করেছেন করিয়েছেন অষ্টপ্রহর। তাই তো, আজন্ম রুক্ষ্ম মরু পাহাড়ি পাথুরে আরবই তাঁর পরশে হয়েছিল মাটির মানুষ। যে মাটি খাঁটি— খাঁটি সোনার চেয়ে। যে মাটির মূল্য হয় না হীরে জহরতে।
তাঁর কর্মমুখর জীবন যে সহনশীলতার উদাহরণে ভরপুর।
এসো, তাঁর সহনশীলতার একটি উদাহরণ দিই।
মুসলমানদের পারস্পরিক অভিবাদন হিসেবে তিনি শিখিয়েছিলেন— আসসালামু আলাইকুম। কত চমৎকার ও অর্থপূর্ণ কথা— শান্তি অবতীর্ণ হোক তোমাদের প্রতি। এই একটি কথায়ই লুকিয়ে আছে ইসলামের পরিচয়। শান্তির অনাবিল ঝরনাধারা।
কপটচারী ইহুদিদের এমনিতেই গা জ্বালা ছিলো। এবার আরও গা জ্বালা হল। শান্তির কথায় অশান্তিকামীদের যা হয়। তারা এই সৌজন্যবাক্যটির প্রতিও ন্যূনতম সৌজন্য দেখাতে ব্যর্থ হলো। তারা এই অনিন্দ্যসুন্দর বাক্যটিকে বিকৃত করল। এখানে ওখানে হয়ত ব্যঙ্গও করল। কিন্তু মনের ঝাল কি এটুকুতেই মিটে? মিটলো না। তাই স্বয়ং রাসূলকেও বিদ্রুপ করতে চাইল। তারা তার সামনে এসে তাকে অভিবাদন জানানোর ভান করে সেই বিকৃত বাক্যটি উচ্চারণ করে বলল আসসামু আলাইকুম। এর অর্থ ধ্বংস নেমে আসুক তোমাদের উপর। কী নিকৃষ্ট ওরা! কত নিকৃষ্ট ওদের শব্দছল! কত সুন্দর কথাটিকে কত অসুন্দর করে ফেলেছে!
এই জায়গায় তুমি একটু নিজেকে কল্পনা কর!
কল্পনা কর, তুমি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। এক অজেয় অরুদ্ধ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক তুমি। তোমার অনুসারীরা তোমার জন্য মাতা পিতা সন্তান সম্পদ এমনকি জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। আবার তুমি খুবই আত্মসম্মানি। এ অবস্থায় কোনও শঠ-কপট, ধূর্ত-ধোঁকাবাজ, নিচ-ইতর—সমাজে যার কোনও অবস্থান নেই, যে শুধুই একজন চাটুকার, তোমাকে উপহাস করল। তোমার সামনে দাঁড়িয়ে। তোমারই আনীত অভিবাদন বাক্যটিকে বিকৃত করে।
কল্পনা কর, তুমি কী করতে?
আমার মুহাম্মদ রাসূল কিন্তু কিছুই করেন নি। তার সাথে বসে ছিলেন মা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা। কল্পনা করো, স্ত্রীর সামনে এরকম একজন মানুষকে এরকম একটি বিদ্রুপ কীভাবে সহ্য করা যায়? কিন্তু তিনি সহ্য করলেন। যদিও মা আয়েশা সহ্য করতে পারলেন না। সঙ্গে সঙ্গে সমুচিত জবাব দিয়ে দিলেন ইহুদিদের কটূক্তির। তিনি বলে দিলেন—ওয়া আলাইকুমুস সাম ওয়াল লা’নাহ। তোমাদের উপর নেমে আসুক ধ্বংস ও অভিশাপ।
ভাবছো, আমার মুহাম্মাদ রাসূল খুশি হয়েছেন! না, না, তিনি তো খুশি হলেনই না; উল্টো হযরত আয়েশার আচরণের সংশোধন করলেন। তিনি তাকে নম্রতা ও কোমলতা অবলম্বন করার এবং রূঢ়তা ও রূক্ষ্মতা পরিহার করার উপদেশ দিলেন। তিনি বললেন, শান্ত হও আয়েশা, আল্লাহ সবকিছুতে নম্রতা পছন্দ করেন!
একজন মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে তার স্ত্রীর সামনে একজন হীন চাটুকার এমন বিদ্রুপ করে কোনো রকম হয়রানি ছাড়াই পার পেয়েছে, এমন উদাহরণ পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি?

জ্ঞান ও সভ্যতার স্থপতি
অনেকে আমার মুহাম্মাদ রাসূলের উপর এই অপবাদ আরোপ করে বসেন যে, তিনি জ্ঞান ও সভ্যতার বিরোধী ছিলেন। মূলত, যাদের জ্ঞানের পরিধি সীমিত, যারা অস্বচ্ছ ও অস্পষ্ট ধারনা নিয়েই কথা বলতে ভালোবাসেন; কিংবা, অস্থিরতা ও তাড়াহুড়ো যাদেরকে সুস্থীরভাবে ভাবতে দেয় না; কিংবা, অন্যায় পক্ষপাত—জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে—যাদের মন মগজে বাসা বেধে আছে; তাদের মধ্যেই এমনটা লক্ষ্য করা যায়। হতে পারে, মুসলিম বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিই তাদেরকে আমার মুহাম্মাদ রাসূল এবং তাঁর আনীত ইসলামের প্রতি এমন অবিচারে প্ররোচিত করে। কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে, এটা কখনোই ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত নয়। গবেষণানীতির নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি এটা কখনোই মেনে নেয় না। মেনে নিতে পারে না।
এ বিষয়ে যদি কেউ একটু নির্মোহ ও নিরপেক্ষ মন নিয়ে দৃষ্টি ফেরান, তাহলে তিনি স্বীকার না করে পারবেন না যে, আমার মুহাম্মাদ রাসূল এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি তার অনুসারীদের জন্য জ্ঞান ও সভ্যতার চূড়ান্ত মূলনীতি ও চিরন্তন রূপরেখা দাঁড় করিয়ে গেছেন। এ মূলনীতিমালা ও রূপরেখাকে অবলম্বন করেই মুসলমানরা শতাব্দীর পর শতাব্দী পুরো পৃথিবী জুড়ে মুসলিম সভ্যতা গড়ে তুলেছিলো। মূলত, মুসলিম শাসনামলেই জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অঙ্কুরোদগম ঘটেছে পৃথিবীর আনাচে কানাচে। পুরো পৃথিবী এখান থেকেই আলো গ্রহণ করেছে এবং এই ইসলামী সূর্যকিরণেই আলোঝলমলে হয়ে উঠেছে।
জ্ঞান ও সভ্যতার বিপ্লব সাধনে বিশ্বমানবতা এখনও ইসলামী স্পেনের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে— ইউরোপ তো বটেই, সাড়া পৃথিবীও।
ভাবতেও অবাক লাগে। আমার মুহাম্মাদ রাসূল জ্ঞান ও সভ্যতার বিরোধী হন কেমন করে? অথচ তিনি যে পবিত্র গ্রন্থ পৃথিবীবাসীকে উপহার দিয়েছেন, তাতে অবতারিত প্রথম নির্দেশই হলো— পড়ো। আবার এ গ্রন্থের একটি পুরো চ্যাপ্টারের নাম— কলম, যা জ্ঞান চর্চার প্রথম ও প্রধান মাধ্যম।
আমি তো বলি, আমার মুহাম্মাদ রাসূল ছিলেন জ্ঞান ও সভ্যতার প্রকৃত প্রাণপুরুষ। তিনিই পৃথিবীতে উন্নত ও সংহত সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী।
বলুন তো, একজন মানুষ যত পূর্ণতাপ্রাপ্তই হোন, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার যত উন্নত স্তরেই উপনীত হোন, একটি মূর্খ, বর্বর, বন্য জাতিকে—ছিনতাই লুন্ঠন ও স্বেচ্ছাচারই যাদের জীবনাচার— কি নৈতিকতা ও উন্নত চরিত্রের সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত করতে পারেন? জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সভ্যতা-সংস্কৃতির প্রতিযোগিতায় অগ্রণী বানাতে পারেন? আমার মুহাম্মাদ রাসূল কিন্তু করেছেন। আমার মুহাম্মাদ রাসূল কিন্তু পেরেছেন। তিনি একটি বর্বর, পশ্চাদ্পদ, স্বেচ্ছাচারী জাতিকে জ্ঞান বিজ্ঞান ও উন্নতি অগ্রগতির দিকে বের করে এনেছেন এবং তাদের জন্য এমন একটি সভ্যতা দাঁড় করিয়ে গেছেন যা শরীর ও আত্মার চাহিদার মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে, যা তার অনুসারীদেরকে কয়েক শতাব্দী যাবৎ বিশ্বনেতৃত্বে করেছিলো সামর্থবান যখন তারা তার শিক্ষাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো।
তবু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। তাহলে আজ তার অনুসারীরা জ্ঞান ও সভ্যতার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে কেন? এর মূল কারণ একটাই— ইউরোপ আমেরিকার ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার। মুসলিম বিশ্বে এই ঔপনিবেশিক গোষ্ঠীর পদলেহী দালালরা এখনও সক্রিয়। তিক্ত হলেও সত্য এই যে, বর্তমান মুসলিম বিশ্বের হর্তকর্তা এরাই। এরাই পশ্চিমা প্রভুদের কথায় ওঠে, বসে, শোয়। আমার মুহাম্মাদ রাসূলের রেখে যাওয়া শিক্ষা অনুসারে যেন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব না ঘটে, যেন কোনো সাংস্কৃতিক পরিবর্তন না আসে, এটাই তাদের দিন রাতের একমাত্র প্রহরা।

সেই সর্বোত্তম যে নারীর প্রতি সর্বোত্তম
আমার মুহাম্মাদ রাসূলের আগমনের পূর্বে নারীর অধিকার বলতে কিছু ছিলো না। তখন নারী ছিলো লাঞ্ছিত, অবহেলিত। জ্যান্ত পুঁতে ফেলতেও দ্বিধা করা হতো না তাকে। নারীর প্রতি এই যে পাশবিকতা, তা নতুন নতুন রং আর নতুন নতুন রূপ নিয়েই ফিরে ফিরে আসতো প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ।
আজকের নারী অধিকারের জোর প্রবক্তা যারা, সেই রোম পারস্যই তখন এসব চেয়ে চেয়ে দেখতো। নারীর করুণ দশা না তাদের চোখ ভেজাতে পারতো, না তাদের কানে কড়া নাড়াতে পারতো। আর আজন্ম অন্ধ, মূক, বধির অন্তরে সাড়া জাগানো তো অনেক দূরের কথা। কারণ ওই অন্তরে যে সম্প্রসারণবাদ ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। এরা তখনও এতেই মজে ছিলো, এখনও ওতেই মজে আছে। নারীর প্রতি প্রকৃত কল্যানী চেতনা না তাদের তখন ছিলো, না এখন আছে। যা ছিলো, তা সেই ঔপনিবেশিকতা। যা আছে, তা এই সম্প্রসারণবাদ।
কিন্তু আমার মুহাম্মাদ রাসূল যখন এলেন, তখন মানবতার নবী হয়ে এলেন। দয়ার সাগর হয়ে এলেন। করুণার আধার হয়ে এলেন। মানবতার এই মানবেতর দিকটির প্রতি তিনিই সবার আগে মনোযোগী হলেন। শাব্দিক অর্থেই আমার মুহাম্মাদ রাসূল নারীকে তার জীবন ফিরিয়ে দিলেন এবং মানুষ হয়েও মানুষের দাসত্ব করার যে অন্যায় নীতি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঠেসে রেখেছিলো এতটা কাল, তা থেকে তাকে ছাড়িয়ে নিলেন— আল্লাহর একজন প্রেরিত পুরুষের শান যেমন।
তিনি নারীকে সম্মানের আসনে সমাসীন করলেন। তাকে তার সবটুকু অধিকার ফিরিয়ে দিলেন। তিনি নারীর সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করলেন। তাকে তার প্রকৃত কর্তব্য বুঝিয়ে দিলেন।
নারী এভাবে ফিরে পেলো মনুষ্যত্বের স্বীকৃতি, স্বাধীনতার স্বাদ। তার আছে অগাধ অধিকার, সম্মানজনক দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ কর্তব্য ও অধিকার যেমন সামঞ্জস্যপূর্ণ, তেমনই সমতাপূর্ণ। তবে তিনি আজকের কথিত নারীবাদীদের মতো নারীপ্রকৃতির যৌক্তিক দাবিকে অগ্রাহ্য করেন নি। নারীপ্রকৃতি যে ভিন্নতার দাবিদার, তা তিনি বিবেচনায় রেখেছেন। একে বৈষম্য বলা সত্যের অপলাপ। এ বৈষম্য নয়। এ হলো নারীপুরুষের প্রকৃতিগত যৌক্তিক ভিন্নতা, যা বৃহৎ কল্যাণ তো অবশ্যই; নারীকল্যাণকেও আছে ধারণ করে।
নারীকে হত্যা করা, নারীকে জিন্দা দাফন করা’র মতো কঠিন পাশবিকতাকে আমার মুহাম্মাদ রাসূল শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে দিয়েছেন। অবলা হিসেবে নারীর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের যে দুঃসাহস বার বার মানুষকে অমানুষ বানায়, তাকে আমার মুহাম্মাদ রাসূল জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়েছেন। নারীর মনে আঘাত দেওয়া এবং নারীর প্রতি সর্বোচ্চ সুন্দর ব্যবহার না করার প্রতি তিনি আরোপ করেছেন কঠিন নিষেধাজ্ঞা। এমনকি, তিনি তার উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন এমন মানুষকে, যিনি নারীর প্রতি সর্বোত্তম আচরণকারী।
‘তোমাদের সেই সর্বোত্তম, যে নারীর প্রতি সর্বোত্তম।’
‘পরিপূর্ণ মুমিন সে, যার আচার ব্যবহার সবচেয়ে ভালো। আর মুমিনদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তিনিই, যিনি নারীর প্রতি সর্বোত্তম আচরণ প্রদর্শন করেন।’—
এই যুগান্তকারী ভাষ্যগুলো কার মুখে উচ্চারিত হয়েছে? আর কারও মুখে নয়, আমার মুহাম্মাদ রাসূলের মুখে। এই বৈপ্লবিক সংস্কারটুকু কার হাতে সাধিত হয়েছে? আর কারও হাতে নয়, আমার মুহাম্মাদ রাসূলের হাতে।
আমার মুহাম্মাদ রাসূল নারীর প্রতি কোমল ও সদয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
‘তোমরা নারীর প্রতি সর্বোচ্চ যত্নশীল হও।’
নারীর স্পর্শকাতরতা এবং সংবেদনশীলতা আমার মুহাম্মাদ রাসূল গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। এ কারণে তিনি নারীকে কাঁচের পাত্রের সাথে তুলনা করতেন। তিনি বলতেন,
‘তোমরা কাঁচের পাত্রের প্রতি সর্বোচ্চ যত্নশীল হও।’
যারা নারীর অধিকার লঙ্ঘন করে, যারা নারীর প্রতি অন্যায় অবিচার করে, আমার মুহাম্মাদ রাসূল তাদের প্রতি কঠোর হুশিয়ারি ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলতেন,
‘হে আল্লাহ, আমি এতিম ও নারী— এই দুই দুর্বলের অধিকারের বিষয়ে (কাওকে) ছাড় দেবো না।’
বন্ধু, ভেবে দেখো, আমার মুহাম্মাদ রাসূল নারী অধিকারের বিষয়ে কতটা কঠোর ছিলেন।
আরও বিশাল ব্যাপার, যা পৃথিবীতে আর কখনো কারও ক্ষেত্রে ঘটে নি, এই যে, আমার মুহাম্মাদ রাসূল মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয়েও শেষ অসিয়তটুকু করেছেন— নারীর অধিকারের বিষয়ে। বন্ধু, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কোনো পুণ্যাত্মা মহানুভব মানুষের কথা জানো, যিনি জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসেও, যখন মৃত্যুযন্ত্রণা সমগ্র শক্তি প্রয়োগ করে একজন দুর্বল মানুষকে চিবিয়ে চিবিয়ে গ্রাস করতে থাকে, এরকম কঠিন মুহূর্তেও নারী অধিকারের কথা ভেবে বেচাইন ছিলেন? না, তুমি এমনটি কখনোই পাবে না। কারন এ সময় মানুষ মৃত্যু কষ্টে কাতর থাকে। মানুষ তখন নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
কিন্তু আমার মুহাম্মাদ রাসূলকে দেখো, নারীর প্রতি তাঁর মর্যাদাবোধ দায়িত্ববোধ ও মমত্ববোধ কত উপরে উঠে গিয়েছিলো যে, এ সময়ও তাঁর মহত্ত্ব ও বড়ত্ব জ্যোতির্ময় হয়ে উঠেছিলো। এ রকম কঠিন মুহূর্তেও তিনি তার চারপাশে থাকা মানুষগুলোকে অসিয়ত করলেন নারীর প্রতি সর্বোচ্চ সুন্দর ব্যবহারের জন্য। বরং তারা যেন একে অপরকে নারীর প্রতি কল্যাণের উপদেশ প্রদান করে, সেই ব্যাপারেও তিনি জারি করে গেলেন নববী ফরমান, যা মুসলিম সমাজে স্মরিত, বরিত, মানিত, পালিত হবে— যতদিন ইসলাম থাকবে, যতদিন মুসলমান থাকবে।
উম্মতের প্রতি আমার মুহাম্মাদ রাসূলের অন্তিম বাণী— ‘তোমরা নারী কল্যাণে উপদেশ গ্রহণ করো।’

হেদায়েতের বৃষ্টিবিন্দু
আমার মুহাম্মাদ রাসূল শুধু তার অনুসারীদের প্রতিই দয়াশীল ছিলেন এমনটা নয়। তার আজন্ম শত্রু ইহুদি নাসারার প্রতিও তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমলহৃদয়। ভাবছো বাড়িয়ে বলছি? তবে শোনো। একটি উদাহরণই কাজে দেবে তোমার অনুভবে।
এক সময় এক ইহুদি প্রতিবেশী ছিলো তাঁর। সে সবসময় তাঁকে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করতো। এক দিন এক কূট বুদ্ধি ভর করলো তার মাথায়। সে আমার মুহাম্মাদ রাসূলের বাড়ির সামনে ময়লা আবর্জনা ফেলে যাওয়া শুরু করলো। একদিন দুদিন নয়, ইহুদির এ দুষ্টুমি পরিণত হলো প্রতিদিনের নিয়মিত রুটিনে।
কিন্তু আমার মুহাম্মাদ রাসূলের ধৈর্য দেখো, তিনি নীরবে ইহুদির এ দুষ্টুমি সহ্য করতে থাকলেন। মন্দের প্রতিদান মন্দ দিয়ে দিতে গেলেন না। অবস্থা এই দাঁড়ালো যে, ইহুদি প্রতিদিন ময়লা আবর্জনা ফেলে যায়, আর আমার মুহাম্মাদ রাসূল প্রতিদিন তা উঠিয়ে দূরে ফেলে দিয়ে আসেন; ইহুদির সাথে বাগবিত-ায় জড়ান না। ইহুদি আশকারা পায়—এ যেন তার রোজকার উপভোগ্য বিষয়।
কিন্তু আমার মুহাম্মাদ রাসূল পৃথিবীতে এসেছিলেন অনেক বড় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে। উন্নত চরিত্র ও মহৎ গুনাবলিকে পূর্ণতা দান করতে। তিনি এসেছিলেন মানবতাকে মুক্তি দিতে। মনুষ্য সম্প্রদায়ের চিরন্তন সৌভাগ্য নিশ্চিত করতে। তাই তিনি ধৈর্য ধরতেন। তাই তিনি ধৈর্য ধরলেন।
একদিন হলো কী! আমার মুহাম্মাদ রাসূলের বাড়ির সামনে কোনো ময়লা আবর্জনা নেই। আজ বুঝি ইহুদি ফেলে যেতে পারে নি। তবে কি সে অসুস্থ? আমার মুহাম্মাদ রাসূল তার খোঁজ নেওয়ার জন্য তার বাড়ির দিকে রওনা হলেন।
বন্ধু, দেখো, আমার মুহাম্মাদ রাসূলের দয়া দেখো। এ দয়া কার প্রতি? সেই ইহুদি লোকটির প্রতি, যে তাঁর বাড়ির সামনে ময়লা ফেলে যায় রোজ— শুধু তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য। আমার মুহাম্মাদ রাসূল সেই ময়লা পরিষ্কার করেন, উঠিয়ে দূরে কোথাও ফেলে আসেন, রোজকার এ দৃশ্য দেখে দেখে যে মজা পায়—এ দয়া আর কারও প্রতি নয়, সেই নিচ ইতরের প্রতি।
আমার মুহাম্মাদ রাসূল ইহুদির বাড়িতে গেলেন। তার সাথে কথা বললেন। তার খোঁজ-খবর নিলেন। তার দুঃখে দুঃখিত হলেন। ভাবে ভাষায় সান্ত¦না জানালেন। সুখকর কথায় তাকে আশ্বস্ত করলেন। যেন কোনো আপন মানুষ কাছে এসেছে। যেন কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু পাশে বসেছে।
ইহুদির মনে কী জাগলো, কে জানে?
কিন্তু এই তো উত্তম চরিত্রমাধুরী! এই তো প্রকৃত মহানুভবতা! এই তো সত্যিকারের মাহাত্ম্য!
ইসলাম ও মুসলমানের চিরশত্রু ইহুদি লোকটি হয়তো নিজের বিস্ময়বোধ চেপে রাখার চেষ্টা করছিলো। কিন্ত যতই সময় গড়ালো, ততই তার দম খড়ালো। নিজের কোমল অনুভূতিকে চেপে রাখতে রাখতে এক সময় চূড়ান্ত হলো তার। সে আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। পারবেই বা কেমন করে? এ তো সেই মুহাম্মদ। যাকে সে দিনের পর দিন কষ্ট দিয়েছে। যার কষ্ট দেখে প্রতিদিন আনন্দের অট্ট হাসিতে ফেটে পড়েছে। অথচ আজ তার দুখের দিনে সেই তার পাশে দাঁড়ালো।
ইহুদির হৃদয় উন্মুখ হলো। হেদায়েতের বৃষ্টিবিন্দু ঈমানের মুক্তোদানা হয়ে পুলকিত করলো তাকে। তার সমগ্র সত্তা তাকে জানিয়ে দিল একটি ধ্রুব সত্য। যার আলিঙ্গনকে উপেক্ষা করে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলো সে। আজ সেই অপেক্ষার পালা শেষ হলো। আজ তার ভাগ্যাকাশে সত্যোপলব্ধির সূর্যোদয় হলো। আজ তার সমগ্র ভেতরটা তাকে জানিয়ে দিলো—
মুহাম্মাদ সত্যিই আল্লাহর রাসূল।
মুহাম্মাদ সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ।
বন্ধু, আর এক মুহূর্তও বিলম্ব নয়। আমার মুহাম্মাদ রাসূলের আনীত পয়গামে বিশ্বাস স্থাপন করে দীনে ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করো। ইহুদির হৃদয় থেকে উৎসারিত হলো, তার সুরে সুর মিলিয়ে তুমিও উচ্চারণ করো—
আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহূ ওয়া রাসূলুহূ।
তুমি বলো—
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। (মহান মহীয়ান রাব্বে কারীমের চির করুণাধারা সদা সিক্ত করুক তাঁকে ও তাঁর তাবৎ অনুসারীকে চিরকাল।)

বুক ফেটে যায়
আমার মুহাম্মাদ রাসূল কাছের দূরের আপন-পর, শত্রু-মিত্র সবাইকেই ভালোবাসতেন। তাঁর বুকের মধ্যে হৃদয় একটিই ছিলো। কিন্তু সেই হৃদয় জুড়ে ছিলো দয়া, মায়া, মমতা, স্নেহ, ভালোবাসা। এই হৃদয় রুক্ষ্মতা কী জানতো না। এই হৃদয় রুঢ়তা কেমন বুঝতো না। তবে সত্যের পক্ষাবলম্বনে তিনি ছিলেন আপোষহীন। আল্লাহর রাহে ছিলেন দুর্বিনীত, দুর্জয়।
মক্কার মুশরিকরা তাঁকে সর্ব উপায়ে কষ্ট দিতো। কষ্ট কাকে বলে, কষ্ট কত প্রকার ও কী কী, কষ্ট কতভাবে দেওয়া যায়—আমার মুহাম্মাদ রাসূলের কোমল হৃদয়ের পুণ্য ভূমিতে, হিংস্র নখরে, আঁচড়ে আঁচড়ে সবই এঁকে দিতো তারা প্রতিদিন। দয়ার নবীর দয়া ও কোমলতাকে এরা বুঝি নিরীহতাই ধরে নিয়েছিলো। মায়া, মমতা ও ভালোবাসার স্নিগ্ধতা অন্ধ বধিররা যেমন দুর্বলতাই বুঝে নেয়।
কিন্তু আমার মুহাম্মাদ রাসূল তাদের মন্দাচারের বিনিময়ে দিতেন সদাচার। কঠোরতার বিপরীতে দিতেন কোমলতা। তাদের ছুঁড়ে দেওয়া পাথড়কে বরণ করতেন অম্লান বদনে। আর ফিরিয়ে দিতেন গোলাপের পাপড়ি।
তাঁর হৃদয়ের একমাত্র চাওয়া যে আর কিছুই ছিলো না। তাঁর মনের আকুতি যে ছিলো কেবলই তাদের কল্যাণ।
তারা হেদায়েত পাক, সত্যের আলো পাক, সুন্দরের ছোয়া পাক— এ জন্য তিনি এতটাই ব্যাকুল ছিলেন যে, তার হৃদয় ফেটে যেতে চাইতো। মুশরিকদের প্রতি আমার মুহাম্মাদ রাসূলের ব্যাকুলতা ও কল্যাণকামিতা আল্লাহর কাছেও বেশি মনে হয়। এক পর্যায়ে আল্লাহই নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন তাদের হেদায়েতের জন্য এতটা ব্যাকুল না হন। তাদের প্রতি তার মায়া-মমতা ও উৎকণ্ঠা যেন সীমা ছাড়িয়ে না যায়। এভাবে চলতে থাকলে যে তিনি মারা পড়বেন।
পবিত্র কুরআনে বলা হলো— ‘ফালা তাযহাব নাফসুকা আলাইহিম হাসারাত।’ তাদের প্রতি আক্ষেপ করতে করতে যেন আপনার প্রাণবায়ু বেরিয়ে না যায়।