মুহাম্মাদ (ﷺ) কি ক্ষমতালোভী ছিলেন?

মুহাম্মাদ (ﷺ) কি ক্ষমতালোভী ছিলেন?

জাকারিয়া মাসুদ


একজন মহাপুরুষের কথা বলি।যার জন্ম হয়েছিল আজ থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে। আল্লাহ তায়ালা যাকে জাজিরাতুল আরবের কর্তৃত্ব দান করেছিলেন। যিনি আর আট-দশটা রাজা বাদশাহ’র মত ছিলেন না। যারা সর্বদাই ক্ষমতার মসনদ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকে। ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে যারা সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটায়। তিনি তাদের মত ছিলেন না। তাকেও ক্ষমতার দিকে আহ্বান করা হয়েছিলো। আর বলা হয়েছিলো, “যদি ধন সম্পদ চাও তবে বল, আমাদের সকলের চাইতে তোমাকে অধিক সম্পদশালী করে দেব। যদি রাজত্ব চাও বল, আমরা তোমাকে আমাদের নেতা করে দেব। শুধু একটা শর্ত মেনে নাও। কেবল একটি শর্ত। তুমি যা প্রচার করছো তা থেকে বিরত থাক। তাহলে গোটা মক্কা তোমার পদতলে এনে হাজির করবো”। কিন্তু সত্যের দিশারী যিনি, তিনি কীভাবে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হতে পারেন? কীভাবে সত্যের দাওয়াত তিনি বন্ধ করে দিতে পারেন? কীভাবে ক্ষমতার লোভে নিজেকে বিক্রি করে দিতে পারেন?

তাইতো বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, “তোমরা যা বলেছো তার কোনটিই আমার ক্ষেত্রে প্রয়োজ্য নয়। আমি যে বিষয়টি নিয়ে এসেছি তা দ্বারা তোমাদের ধন-সম্পদ হস্তগত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তোমাদের মাঝে সম্মানজনক স্থান লাভ করাও আমার উদ্দেশ্য নয়। রাজত্বও আমি চাই না। আমার এক হাতে চন্দ্র আর এক হাতে সূর্য এনে দিলেও আমি এ সত্য প্রচার থেকে বিরত হব না”। (১)

সত্যের দাওয়াত নিয়ে তিনি তায়েফে গেলেন। ভাবলেন কেউ না নিশ্চয়ই তার দাওয়াত কবুল করবে। কিন্তু কেউ তাকে পাত্তা দিল না। উল্টো তাকে অপমান করতে লাগলো। তাকে পাগল বলে উপহাস করতে লাগলো। গালাগাল করতে লাগলো। দুষ্ট ছেলেরা পাথর হাতে রাস্তার দুপাশে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে গেলো। তার উপর পাথর বৃষ্টি বর্ষিত হতে শুরু করলো। পবিত্র দেহ ক্ষতবিক্ষত হলো। মাথার কয়েক জায়গায় কেটে গেলো। দু’পা রক্তাক্ত হয়ে জুতার সাথে আটকে গেলো। অসহায় অবস্থায় একটি বাগানে তিনি আশ্রয় নিলেন। এরপর দুর্বৃত্তরা ফিরে গেলো। কিছুক্ষণ পর জিবরাঈল (আ) এলেন। তবে আজ আর তিনি একা নন। পাহাড়ের ফেরেশতারাও এসেছে তাঁর সাথে। পাহাড়ের ফেরেশতারা মহাপুরুষকে সালাম জানালেন এবং বললেন, “আপনি যদি চান তবে আমরা ওদেরকে (তায়েফবাসীকে) দুই পাহাড়ের মধ্যে পিষে ফেলবো”।

যিনি মানবতার মুক্তির দূত তিনি কীভাবে এত সহজে হাল ছেঁড়ে দিতে পারেন? সব কষ্ট ভুলে গেলেন। ফিরেশতাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। যারা তাকে রক্তাক্ত করেছিল তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন। এরপর বললেন, “আমি আশা করি আল্লাহ তায়ালা ওদের বংশধরদের মধ্যে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন, যারা শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না”।(২)

তিনি তখন মদীনার প্রেসিডেন্ট। গোটা মদীনা তার হুকুমের আওতায়। হঠাৎ দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী মদীনায় আক্রমণ করলো। শত্রুপক্ষকে প্রতিরোধ করতে তাঁর সাহাবারা প্রস্তুতি নিলেন। সালমান ফারসী (রা)’র প্রস্তাব অনুযায়ী পরীখা খনন শুরু হলো। কিন্তু তাঁর সাহাবাদের কাছে কোন দাস ছিলো না যারা এ কাজ করে দেবে। তিনি ও তাঁর সাহাবার মিলে পরীখা খন শুরু করলেন। তাদের পেটে ছিলো প্রচণ্ড ক্ষুধা। ভালো খাবার জুটে নি বেশ ক’দিন হলো। সাহাবারা তাঁর কাছে ক্ষুধার যন্ত্রণা তুলে ধরলেন। আবু তালহা (রা) কাপড় খুলে দেখালেন যে, তাঁর পেটে একটি পাথর বাঁধা। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট তখন তাঁর পেট দেখালেন। তাঁর সাহাবারা দেখতে পেলো, তাঁর পেটে দুইটি পাথর বাঁধা। আর এ অবস্থাতেই তিনি নিজে মাটি বহন করেছেন। তাঁর চুলগুলো পর্যন্ত ধূলায় ধূসরিত হয়ে গিয়েছিলো; অথচ তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান।(৩)

তাঁর আরেক সাহাবী সা’দ (রা) বলেন, “আমরা নবী এর সঙ্গে থেকেই লড়াই করেছি। তখন গাছের পাতা ছাড়া আমাদের নিকট কোন খাবার ছিল না। এমনকি আমাদের উট অথবা ছাগলের মত মল ত্যাগ করতে হত”। (৪)

রাষ্ট্রপ্রধান থাকা অবস্থায় তিনি যে বিছানায় ঘুমাতেন তা কোন নরম তোশক কিংবা জাজিমের বিছানা ছিলো না। মাটিই ছিলো তাঁর বিছানা। খেজুর পাতার মাদুর ছিলো তাঁর তোষক। মাদুরে ঘুমানোর ফলে তাঁর শরীরে মাদুরের দাগ লেগে যেত। তাঁর সাহাবীরা সে দাগ দেখে বলতেন, “হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা আপনার জন্য যদি একটা নরম বিছানার ব্যবস্থা করতাম”। সাহাবীদের প্রস্তাব শুনে তিনি বলতেন, “দুনিয়ার সাথে আমার কি সম্পর্ক? দুনিয়াতে আমি একজন মুসাফির ছাড়া আর কিছুই নই”। (৫)

প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁর ঘরের চুলায় আগুন জ্বলতো না। আর সেটা একদিন দুইদিন নয়। বরং মাসের পর মাস। তাঁর জীবনসঙ্গিনী আয়েশা (রা) বলেছেন, “আমরা এক মাস এমনভাবে অতিবাহিত করতাম যে, আমাদের চুলায় আগুন জ্বলতো না। খেজুর ও পানিই হতো আমাদের জীবন ধারণের উপকরণ”। (৬)

তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর ওমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ-(ﷺ)কে দিনের বেলায় ক্ষুধার তাড়নায় পার্শ্ব পরিবর্তন করতে দেখেছি। তিনি তাঁর উদর পুর্তির জন্য রদ্দি খেজুরও পেতেন না”। (৭)

তিনি নিজেই নিজেই অবস্থার কথা বর্ণনা করেছেন এভাবে, “আমাকে আল্লাহর পথে এমনভাবে কষ্ট দেয়া হয়েছে, যা অন্য কাউকে দেয়া হয় নি। আমাদের ৩০টি রাত এমনভাবে অতিবাহিত হয়েছে, যখন বিলালের বগলের নীচে লুকিয়ে রাখা সামান্য খাদ্য ছাড়া আমার ও বিলালের আহারের কিছুই ছিলো না”। (৮)

ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাঁর কয়েক ডজন দাস-দাসী ছিলো না। তাঁর পরিবারে কোন জৌলুশ ছিলো না। দৈনন্দিন কাজগুলো তিনি নিজ হাতেই করতেন। তাঁর সহধর্মিনী আয়েশা (রা) বলেছেন, “তিনি নিজেই পোশাকের মধ্যে উকুন তালাশ করতেন। ছাগল দোহন করতেন। নিজের কাজ নিজেই করতেন”। (৯)

তিনি একবার তাঁর কন্যা ফাতিমাহ (রা)’র ঘরে গেলেন। কিন্তু বাইরে থেকেই চলে এলেন। ভিতরে প্রবেশ করলেন না। তাঁর কাছে যখন এর কারন জানতে চাওয়া হলে তিনি বললেন, “আমি দরজায় নকশা করা পর্দা ঝুলতে দেখেছি। দুনিয়ার চাকচিক্যের সাথে আমার কী-বা সম্পর্ক”? (১০)

রাষ্ট্রপ্রধান হয়েও তিনি চাননি তাঁর সন্তানেরা বিলসিতা করুক। সন্তানদের মধ্যে ফাতিমাহ (রা)’ই ছিল তাঁর বেশি আদরের। রাজকুমারী হয়েও ফাতিমাহ (রা) নিজেই যাতা ঘুরাতেন। ফলে হাতে ফোস্কা পড়ে যে্তো। কলসে করে পানি টানার কারণে কাঁধে দড়ির দাগ পড়ে যেতো। ঝাড়ু দেয়ার কারণে পরনের কাপড় নোংরা হয়ে যেতো। কেননা রাজকুমারীর ঘরে কোন চাকর-চাকরানী ছিলো না। নিজের কাজ তাকে নিজেই করতে হত। (১১)

এই মহান পুরুষ একসময় দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। মৃত্যুর পর তিনি কি রেখে গিয়েছিলেন, জানেন? পরিবার পরিজনের জন্য কাড়ি-কাড়ি টাকা কিংবা অঢেল সম্পদ রেখে যাননি। তাঁর জীবনসঙ্গিনী আয়িশা (রা) বলেন, “যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ওফাত হল, তখন আমার ঘরে এমন কোন বস্তু ছিল না, যা খেয়ে কোন প্রাণী বাঁচতে পারে। শুধুমাত্র তাকের উপর আধা ওয়াসাক আটা পড়ে ছিল”। (১২)

একটু চিন্তা করুন। একজন রাষ্ট্রপ্রধান মারা গেলেন। অথচ তাঁর ঘরে আটা ছাড়া আর কোন খাবার অবশিষ্ট ছিল না। এমনটা আর কারও ক্ষেত্রে কল্পনা করা যায়?

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমি যে মহাপুরুষের কথা বলছি তিনি আর কেউ নন। তিনি আমাদের রাসূল। মানবতার মুক্তির দূত। সত্যের বার্তাবাহক। আমাদের পথ প্রদর্শক। আমাদের আদর্শ। আমাদের ভালোবাসা। প্রেরণার বাতিঘর। মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ।
(আল্লাহুম্মা সল্লি ওয়া সাল্লিম ওয়া বারিক ‘আলা নাবিয়্যিনা ওয়া হাবিবিনা ওয়া মাওলানা মুহাম্মাদ, ওয়া ‘আলা আলিহী ওয়া আসহাবিহী আজমাঈন)।

নাস্তিকরা প্রায়ই তাকে ক্ষমতালোভী আখ্যা দিয়ে থাকে। উপরের যে হাদিসগুলো আমরা দেখলাম তা থেকে কি প্রমাণিত হয় যে, তিনি ক্ষমতালোভী ছিলেন?
ওহে নির্বোধের দল!
তিনি যদি ক্ষমতা লোভীই হতেন, তাহলে তো মক্কার শাসন ক্ষমতা পাওয়ার পরেও তা ছেঁড়ে দেয়ার কথা ছিলো না। মক্কার সম্পদ হস্তগত হওয়ার প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দেয়ার কথা ছিলো না। তিনি যদি ক্ষমতা লোভীই হতেন, তাহলে তো তায়েফে সবাইকে ধ্বংস করে দিতে বলতেন। তিনি তো তাঁর করলেন না। তিনি যদি ক্ষমতা লোভীই হতেন, তাহলে তো তাঁর এমন দারিদ্রতার মধ্যে দিনানিপাত করার কথা ছিল না। না খেতে পেয়ে পেটে তো পাথর থাকার কথা ছিলো না। রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পরেও তাঁর শরীর তো ধূলায় ধূসরিত হওয়ার কথা ছিলো না। তিনি যদি ক্ষমতা লোভীই হতেন, তাহলে তো তাঁর বিছানা এমন থাকার কথা ছিলো না। তাঁর গায়ে তো মাদুরের দাগ পড়ার কথা ছিলো না। তিনি যদি ক্ষমতা লোভীই হতেন, তাঁর পরিবার পরিজনের তো না খেয়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন যাপন করার কথা ছিলো না। তাঁর প্রিয়তম কন্যার হাতে ফোস্কা, গলায় দড়ির দাগ, কাপড়ে ধূলো লাগার কথা ছিলো না। তিনি যদি ক্ষমতা লোভীই হতেন, তাহলে তাঁর পরিবার পরিজনের জন্য তো অঢেল ধন-সম্পদ রেখে যেতেন। তিনি কি তা করেছেন?
ওহে বানরের বংশধরেরা!

“সত্যের যে কাফেলা এগিয়ে যাচ্ছে তা এগিয়েই যাবে, কুকুরের ঘেও ঘেও তাঁর কি-ই বা ক্ষতি করতে পারে?
মুহাম্মাদের (ﷺ) পবিত্র সীরাত আমাদের সামনে রয়েছে, তোমাদের মিথ্যাচার তাহলে কীভাবে সফল হতে পারে?”
__________________________
তথ্যসূত্রঃ
১) ইবনু কাসীর, ইসমাঈল ইবনু ওমার, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৯৭
২) ইবনুল কাইয়্যিম, যাদুল মাআদ, ২/১৫৬; মুবারকপুরী, শফিউর রহমান, আর রাহীকুল মাখতুম, পৃষ্ঠাঃ ১৪৫-১৪৬।
৩) মুবারকপুরী, শফিউর রহমান, আর রাহীকুল মাখতুম, পৃষ্ঠাঃ ৩০৯, বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহীহ, হাদীসঃ ২৮৩৪, ৩০৩৪.
৪) বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহীহ, হাদীসঃ ৩৭২৮।
৫) তিরমিযী, মুহাম্মাদ ইবনু ঈসা, আস-সুনান, হাদীসঃ ২৩৭৭।
৬) ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযিদ, আস-সুনান‌, হাদীসঃ ৪১৪৪, তিরমিযী, হাদীসঃ ২৪৭১।
৭) মুসলিম, আবুল হোসাইন ইবনুল হাজ্জাজ , আস-সহীহ, হাদীসঃ ২৯৭৮, তিরমিযী, হাদীসঃ ২৩৭২।
৮) আলবানী, মুহাম্মাদ নাসীরুদ্দীন, সহীহ শামায়েলে তিরমিযী, পৃষ্ঠাঃ ১৪১।
৯) সহীহ শামায়েলে তিরমিযী, পৃষ্ঠাঃ ১২৭।
১০) বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহীহ, হাদীসঃ ২৬১৩।
১১) আবু দাউদ, সুলাইমান ইবনু আশআস, আস-সুনান, হাদীসঃ ২৯৮৮।
১২) বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল, আস-সহীহ, হাদীসঃ ৩০৯৭।