সীরাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, পাশ্চাত্য ও বিশ্বায়ন

সীরাতে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, পাশ্চাত্য ও বিশ্বায়ন

মুহাম্মাদ গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী  |  গবেষক ও কবি


‘সীরাত’ ও প্রসঙ্গকথা

‘সীরাত’ যা ইংরেজি ভাষ্যে (Biography) হিসাবে পরিচিত। বাংলা-ভাষায় এটা ‘জীবনী’ নামে অনূদিত হয়ে এসেছে। যদিও সীরাত আভিধানিকভাবে ‘জীবনী’কে অর্থায়ন করে (السِّيرَةُ : الحالةُ التي يكون عليها الإنسانُ وغيرُه) কিন্তু ‘সীরাতে রসূল’ পরিভাষাটি ব্যাপকার্থে জীবনের বর্ণনা, ঘটনা, পর্যালোচনা ইত্যাদি যাবতীয় পার্থিব ও আধ্যাত্মিক বিষয়ের আলোচনা করে এবং তা অনুসরণের নিমিত্তে মাপকাঠি হিসাবে প্রদর্শিত হয়।

সীরাতুন্নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘটনার পরম্পরা হিসাবে একটি সরল পরিক্রমা যেমন, তেমনি ঘটনার পর্যালোচনা, চলমান ও ভবিষ্যৎ নির্দেশনা, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, সামাজিক স্তরভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, সমাস্যার সমাধান, পারিবারিক কাঠামোর সঙ্কট-সমাধান, ব্যক্তিক ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত চরিত্রের পর্যালোচনা, ভৌগলিক কৌশল নিরিখে ভূ-রাষ্ট্রিক ও ভূ-রাজনীতিক ব্যবস্থাপনা, মানবিক সমস্যা-সঙ্কটের উচ্চ-চৈন্তিক বিশ্লেষণ ও নির্দেশনা, মানবসম্পদ উন্নয়নের নৈতিক ধারা সৃষ্টি, সামরিক প্রকৌশলের কালনির্ভর উন্নয়ন-নির্দেশনা, আধ্যাত্মিক সংস্কারের উপাদান সরবরাহ ইত্যাদি বিষয় নিরিখে সীরাতুন্নাবী সা.-র উপস্থাপনা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল কর্মকাণ্ড বলে স্বীকৃত হবার দাবিদার। তাই একটি আদর্শ সীরাতগ্রন্থ ‘নবীয়ে রহমত’ (السيرة النبوية) রচনা করতে গিয়ে বর্তমান শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম লেখক, গবেষক ও আলিমে দ্বীন আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. লিখেছেন–” এ সকল কথা চিন্তা করেই আমি সীরাতের এ জটিল বিষয়ের ওপর নতুন করে কলম ধারণ করতে সাহস পাচ্ছিলাম না। আমি এ মহান কাজকে নিজের যোগ্যতার অনেক উর্দ্ধে মনে করি। কিন্তু আমার অনেক গণ্যমান্য বন্ধু আমাকে এ কথা বলে অনুপ্রাণিত করেন যে, আরবী ভাষায় এমন একটি সীরাতগ্রন্থ রচনা করি যেটাতে রুচি ও চাহিদার দিক দিয়ে নতুন প্রজন্মের মন-মানসিকতা ও বুদ্ধি-বিবেচনার প্রতি সচেতনভাবে লক্ষ্য রাখা হয়েছে যা সমকালীন জিজ্ঞাসার দাবি ও চাহিদা পূরণ করতে পারে যাতে লেখা ও গবেষণা রীতি অবলম্বনের ক্ষেত্রে আধুনিক যুগের প্রচলিত পদ্ধতির অনুসরণ করা হবে” ( নবীয়ে রহমত, পূর্বকথা, বাংলা সংস্করণ)।

সীরাতুন্নবী সা. নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে সীরাত-সাহিত্য, গবেষণার সৃষ্টি হয়েছে যা ইনশা আল্লাহ হতে থাকবে সেসবে নবী করীম সা.-এর পবিত্র-জীবনের বিভিন্ন দিকের প্রতিফলন হয়েছে আপন-আপন বৈশিষ্ট্যে। তবে সীরাতুন্নবী সা.নিয়ে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রজি.-এর বক্তব্যটি সীরাতের মূলপ্রাণ হিসাবে জ্ঞানীমহলে গৃহীত হয়েছে সর্বকালে। নবী কারীম সা.-এর চরিত্রের বর্ণনা সম্পর্কিত এক জিজ্ঞাসার জবাবে হযরত উম্মুল মু’মিনীন রজি. বলেন–” كان خلقه القران ” অর্থাৎ, কুরআনই তাঁর(রসূলুল্লাহ সা.)-এর চরিত্র। তা’হলে বুঝে নিতে হবে কুরআনই নবী কারীম সা.-এর জীবন। এটা তাঁর সীরাত। এতে কী বোঝা গেলো? বোঝা যাচ্ছে, রসূলুল্লাহ সা. পবিত্র কুরআনের সর্বোচ্চ ধারক ও বাহক। তাঁর জীবন, জীবনাচার, বক্তব্য, আদেশ-নিষেধ, অনুমোদন প্রকৃতার্থে কুরআনকেই উপস্থাপিত করেছে। এর পরবর্তীতে নবী কারীম সা.-এর সাহাবীবৃন্দের পবিত্র জামাআত সাহচর্যের পরিণতিতে প্রত্যেকে কুরআনের প্রতিনিধি ও প্রতিচ্ছবি হিসাবে স্বীকৃত হয়েছেন। আরবের এক শিক্ষাবিদের এক মন্তব্য পড়েছিলাম বহু আগে। তবে নামটি মনে পড়ছে না। তিনি লিখেছেন, মহানবী সা.-এর সবচেয়ে বড়ো মু’জিযা হলো প্রত্যেক সাহাবী তাঁর সাহচর্যে একেকজন ‘জিন্দা-কুরআন’ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁরা যেখানে গেছেন ভেতরে-বাইরে, বিশ্বাস ও অনুশীলনে, মন-মানসিকতায়, লেনদেনে পবিত্র কুরআনের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করেছেন যা তাঁরা আল্লাহর রসূল কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মান্তরের জন্য সত্যের মাপকাঠি হিসাবে স্বীকৃত ও গৃহীত হয়েছেন।

ইসলাম ও পাশ্চাত্য
—————————
আগেই দেখে এসেছি, কুরআনই রসূলুল্লাহ সা.এর চরিত্র ও জীবন। কুরআনই হযরতের সীরাত। মূলত, বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিজয় প্রকারান্তরে কুরআনের বিজয়, সীরাতের বিজয়। সীরাতের এ বিজয়ে পাশ্চাত্য প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত হলেও তাদের একটি অংশ কখনো ইসলামের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক বিস্তারকে সহজভাবে নিতে পারে নি। তারা সবসময় চেয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেনো সীরাত তথা ইসলামের অন্তর্নিহিত শক্তি ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে না পারে। সে জন্য তারা তাদের শিক্ষা-ব্যবস্থায় ইসলাম সম্পর্কে এমনসব ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছে যেনো উদীয়মান প্রজন্মের কাছে সীরাত তথা ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ সৃষ্টি না হয়। কিন্তু পাশ্চাত্যের বা খৃষ্ট-জগতের এ ধরনের দুর্বল প্রতিরক্ষাব্যুহ বাস্তবতার প্রবাহে টিকে থাকতে অক্ষম হয়েছে নিখুঁতভাবে।

Mission of the Virginia Christian Alliance( মিশন অব দি ভার্জিনিয়া খ্রিষ্টিয়ান অ্যালায়েন্স) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান যা ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলছে–The mission of the VIRGINIA CHRISTIAN ALLIANCE is to promote moral, social and scientific issues we face today from a Biblical point of view. In addition we will refute and oppose, not with hate, but with facts and humor, the secular cultural abuses that have overridden laws and standards of conduct of the past.(http://www.vachristian.org/About-Us/)[ভার্জিনিয়া খ্রিষ্টিয়ান অ্যালায়েন্সের মিশন হচ্ছে, নৈতিক, সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোকে প্রচার করা যার মুখোমুখী আমরা প্রতিদিন বাইবেলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হচ্ছি। পাশাপাশি আমরা ঘৃণা নয়, বাস্তবতা ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের জবাব দেব যা অতীতের আচার-অনুশীলনের আইন ও নীতিকে অগ্রাহ্য করেছে।] প্রতিষ্ঠানটি তাদের বিশ্বাসগত বর্ণনা দিতে গিয়ে বলছে–While non-denominational, we believe in the fundamentals of the Christian Faith, the Holy Bible to be the inspired Word of God, One God existent in three persons, the Father, Son and Holy Spirit. We believe in the preeminence of Jesus Christ, His virgin birth, death and resurrection, and the need for each individual to accept Jesus as his personal Savior, the promise of everlasting Life if we do and the promise of eternal Hell if we do not. We believe in the presence of the Holy Spirit to help us live an obedient and godly life and we look forward to the return of the Lord Jesus
We believe Jesus is completely different from the founders of other religions and He cannot be listed with nor compared to the founders of Hinduism, Buddha, Confucius, Muhammad, Joseph Smith, etc. He is above and supreme to all man-led organizations and churches. He is the Way, the Truth and the Life, no one comes to God the Father except through Him. JESUS IS KING.(প্রাগুক্ত)[ অর্থাৎ, সম্প্রদায়গত দৃষ্টিভঙ্গীর সীমানা পেরিয়ে আমরা বিশ্বাস করি: খৃষ্টীয় বিশ্বাসের মৌলনীতিগুলোকে, বিশ্বাস করি পবিত্র বাইবেল যা সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক অনুপ্রাণিত বাণী, তিনসত্ত্বায় এক ইশ্বরের অস্তিত্ব: পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা। আমরা বিশ্বাস করি, যীশুখৃষ্টের সর্বশ্রেষ্ঠত্বের উপর, তাঁর কুমারী জন্মের উপর, তাঁর মৃত্যুর উপর, তাঁর পুনরুত্থানের উপর এবং প্রত্যেকের জন্য যীশুখৃষ্টকে গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার উপর প্রত্যেকের ত্রাণকর্তা হিসাবে; যে চিরস্থায়ী জীবনের ওয়াদা তিনি দিয়েছেন যদি আমরা তা অর্জন করতে পারি আর যদি অর্জন করতে না পারি তবে চিরস্থায়ী নরকের ওয়াদার উপর। আমরা বিশ্বাস করি পবিত্র আত্মার অস্তিত্বের উপর যেনো তিনি আমাদেরকে একটি অনুগত ও ইশ্বর-প্রদত্ত জীবন যাপনে সাহায্য করেন এবং আমরা তাকিয়ে আছি প্রভু যীশুর পুনরাগমনের দিকে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, যীশু অন্যান্য ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং তিনি হিন্দুত্ব, বৌদ্ধ, কনফুসিয়াস, মুহাম্মদ, জোসেফ স্মিথ প্রভৃতির সাথে তুলনীয় নন এবং তাঁদের মধ্যে অন্তর্ভুক্তও নন। তিনি সবার উপরে এবং সমস্ত মানব-নেতৃত্বাধীন সংস্থা ও উপাসনালয় থেকে উর্দ্ধে । তিনিই পথ, সত্য এবং জীবন। তাঁকে ছাড়া কেউ প্রভু পিতার কাছে যেতে পারে না। যীশুই রাজা।]

Mission of the Virginia Christian Alliance– প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে The world before Muhammad শিরোনামে। অর্থাৎ, মুহাম্মাদের আগমনের পূর্বে বিশ্বাবস্থা। নিবন্ধের শুরুতে যা বলা হয়েছে তা প্রত্যেক পাঠকদের জন্য গভীর মনযোগ আকর্ষণের দাবিদার। বলা হচ্ছে–
Before we can evaluate something, we have to first understand it. Much of what we read in the media or see on television about Islam is either very selective in its presentation or simply wrong. The primary goal of these articles is help you understand some of Islam’s basic tenets and their development. Along the way we will also look at some of the significant difference between Islam and Christianity, and the implications of those differences. My objective is not to tell you what to think, but instead to provide you with information and sources you can use to make up your own mind. I am simply going to present the facts, and places where you can find more information if you want it. Where possible the information in these articles will come directly from original sources. These are the best places to use if you truly want to learn about something.

Islam is usually presented solely as a religion, but is it that simple? Yes, it is a religion, but we will see that it is also much more. Islam is not only a religion, but also both politics and governance. In addition, it is law. The military aspects of society are also included within its tenets, as are civics and culture. In short, all within society is Islam. Everything from when and how you worship to the way one should get dressed is all prescribed for you within Islam. (http://www.vachristian.org/About-Islam/The-World-Before-Muhammad.html) [ অর্থাৎ,আমরা কিছু মূল্যায়ন করার আগে, আমাদের প্রথম এটি বুঝতে হবে যে, আমরা যা মিডিয়াতে পড়ি বা ইসলাম সম্পর্কে টেলিভিশনে দেখি সেসবের বেশিরভাগই উপস্থাপনাতে খুব সংক্ষিপ্ত বা সাধারণভাবে ভুল। এই নিবন্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে, আপনাকে ইসলামের মৌলিক নীতি ও সেগুলোর প্রসার সম্পর্কে কিছু বুঝতে সাহায্য করা। এর পাশাপাশি আমরা ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য এবং সেগুলোর প্রভাব পর্যালোচনা করবো। এ নিবন্ধে আমার( লেখক) উদ্দেশ্য আপনাকে কী ভাবতে হবে তা বলে দেয়া নয় বরং এর পরিবর্তে তথ্য ও সূত্রগুলি সরবরাহ করা যেনো নিজের মনকে তৈরি করতে সেসব ব্যবহার করতে পারেন। আমি কেবল বাস্তবতা ও সেটার স্থান উপস্থাপন করতে যাচ্ছি যেখানে আরও তথ্য পেতে পারেন যদি আপনি তা চান। নিবন্ধে তথ্যগুলো যতোদূর সম্ভব মূলসূত্রসহ উল্লেখ করা হবে। এটি হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় যদি আপনি সত্যতার সাথে কিছু জানতে চান।
সাধারণত ইসলামকে শুধুমাত্র একটি ধর্ম হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এটা কি এতোই সাদামাটা? হ্যাঁ, অবশ্যই এটা একটা ধর্ম,। কিন্তু আমরা দেখতে পাব যে এটা আরও অনেক কিছু। ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়। ইসলাম রাজনীতি ও প্রশাসন উভয়ই। উপরন্তু, এটি আইন। সমাজের সামরিক দৃষ্টিভঙ্গী ইসলামের মৌলনীতির অন্তর্ভুক্ত যেমন পৌরবিজ্ঞান ও সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্ত । সংক্ষেপে, সমাজের মধ্যে সবই ইসলাম। কখন এবং কিভাবে আপনি উপাসনা করবেন এবং পোষাক পরিধান করবেন এর সবকিছুই ইসলামের মধ্যে আপনার জন্য নির্দ্ধারিত।]

তথ্য প্রবাহের এই আধুনিক যুগে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পাশ্চাত্যের দুর্বল ব্যুহ এখন ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তথ্যের স্রোতের তোড়ে পাশ্চাত্যের সাধারণ মানুষ জানতে পারছে আসলে ইসলামের মৌলিক কাঠামো ও বিস্তারশীল প্রভাবের কারণ এবং জানতে পারছে ইসলামের মহান শেষ-নবীর(সা.) পবিত্র সীরাত–পবিত্র আদর্শ। পবিত্র সীরাতুন্নবীর(সা.) আলোকচ্ছটায় তীব্রবেগে আলোকিত হচ্ছে পশ্চিমা জগৎ। প্রতিদিন পাওয়া যাচ্ছে দলেদলে ইসলামের ছায়াতলে পরশ নেবার সংবাদ। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিবিসিসহ বিভিন্ন পশ্চিমা সংবাদ-মাধ্যম তৈরি করেছে বেশ কিছু প্রামান্যচিত্র( Documentary)। সেসব প্রামাণ্যচিত্র থেকে যে তথ্যটি অভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে তা হলো, ইসলামের পবিত্র নবীর সীরাত–জীবনাচরণ যা সকল খুশবুকেও পরাজিত করতে সক্ষম। এখানেই ইসলামের বিজয়–মহাসত্যের মহাজয়।

ইসলাম ও বিশ্বায়ন
————————–
‘বিশ্বায়ন’ বা Globalization. পাশ্চাত্যের সৃষ্ট বিভিন্ন কৌশলগত পরিভাষার মধ্যে এটিও একটি। পাশ্চাত্যের সৃষ্ট পরিভাষা ‘আন্তর্জাতিকতাবাদ’ (Internationalism)-এর বিষয়টাও খতিয়ে দেখতে হয়েছে সংজ্ঞাগত কারণে। দু’টোর মধ্যকার আংশিক ভিন্নতা দৃষ্ট হলেও প্রভাব বিস্তারের পাল্লায় বিশ্বায়ন আর আন্তর্জাতিকতাবাদ অনেক কাছাকাছি দু’টো এক বংশীয় পরিভাষা। অবশ্য প্রচলন, অর্থ ও উদ্দেশ্যের ধারণা নেয়ার তূলনামূলক সহজতার জন্য ‘বিশ্বায়ন’কেই গ্রহণ করা হলো। ‘বিশ্বায়ন’ প্রাথমিকভাবে
(This term is used to describe the relationships between communities and states and how they were created by the geographical spread of ideas and social norms at both local and regional levels.(36] Martell, Luke (2010):The Sociology of Globalization. Policy Press.):https://en.m.wikipedia.org/wiki/Globalization) অার্থনীতিক বিস্তারকেন্দ্রিক হলেও পরবর্তীতে সমাজ ও সংস্কৃতিকেও প্রভাব বিস্তারের আওতায় নিয়ে আসা হয়। তাই, বিশ্বায়ন এখন মুমলিম-বিশ্বের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য উপাদান। পবিত্র কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা–هو الذي أرسل رسوله بالهدى ودين الحق ليظهره على الدين كله وكفى بالله شهيدا-এর পথ ধরে ইসলামের বিশ্বায়ন এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরব-অনারব সবার কাছেই ইসলামের বিশ্বায়ন বা বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার একদিকে যেমন চ্যালেন্জ অন্যদিকে ইসলামের শাশ্বত দা’ওয়াতী মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার সীরাতে রসূল সা.-এর আদর্শিক পয়গাম পৌঁছানোর গুরুদায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, মুসলিমমাত্রেই বিশ্বায়নের আবহে সহাবস্থানে সম্মত হবেন কিন্তু নেতৃত্ব স্থাপনের জায়গাটা কেবল ইসলামের জন্য ধরে রাখার প্রত্যয়ে কাজ করে যাবেন। এটা তাঁর শ্রেষ্ঠতম ইবাদাত।

আজকের দিনে পবিত্র সীরাতে রসূল সা. আমাদেরকে সেই শিক্ষাই দিচ্ছে। আগেই বলেছি, এখন তথ্য-প্রবাহ আর প্রযুক্তির যুগ। আধুনিকযুগের এই দুই তলোয়ার ব্যবহার করে ইসলামের বিশ্বায়নে যে বিস্ময়কর অগ্রযাত্রা সম্ভব তা উপলব্ধি করতে আমাদের যেনো ভুল না হয়। বিশ্বায়ন বা Globalization-এর পথ ধরে আগামী প্রজন্মের জন্য যে অনুসরণযোগ্য পথের গোড়াপত্তন করতে হবে তার মূল প্রাণ হবে–সীরাতে রসূ্ল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এখানেই হোক আমাদের গবেষণা আর অগ্রযাত্রা। হযরাত সাহাবায়ে কেরাম রজি.-এর মতো জিন্দা কুরআন হবার দৃপ্ত প্রতিজ্ঞাই হোক আমাদের সীরাতুন্নবী অনুশীলনের অমূল্য মাকসাদ।