স্মরণ : হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

স্মরণ : হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | মাহিরজান


উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ৫৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে জন্মগ্রহণ করে বিংশ শতাব্দীর ষাট দশকের প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনসহ ভারতীয় মুসলিম জাতির প্রতিটি ইস্যুতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে যারা জাতীয় জীবনে অমর হয়ে আছেন গণতন্ত্রের মানষপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাদের অগ্রগামীদের একজন।

১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তিনি ছিলেন বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দীর কনিষ্ঠ সন্তান। জাহিদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতা হাইকোর্টের একজন খ্যাতনামা বিচারক ছিলেন।

তার মা খুজিস্তা আখতার বানু ছিলেন অত্যন্ত বিদূষী- ভদ্র মহিলা। তিনিই ভারতীয় প্রথম মুসলিম মহিলা যিনি সিনিয়র কেমব্রিজ পাস করেছিলেন এবং তিনিই প্রথম ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উর্দু সাহিত্যের পরীক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন।

শিশুকালে বিদূষী মায়ের কাছেই সোহরাওয়ার্দীর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়। মার সাথেই বাস করতেন নিঃসন্তান মামা স্যার আব্দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী। বিদূষী মা ও বিধ্বান মামা দুজনে ভাবীকালের মহাপুরুষ সোহরাওয়ার্দীকে গড়ে তুলতে লাগলেন।

হাতেখড়ি পালা শেষ হলে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে কলিকাতার বিখ্যাত আওলিয়া মাদরাসায় ভর্তি করানো হয়। সেখানে তিনি শিখতে থাকেন আরবী, উর্দু, ফার্সি আর বাড়িতে মা ও মামার কাছে শিখেন ইংরেজি ও বাংলা।

মাদরাসার পড়া শেষ করে ইংরেজ চালিত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে কৃতিত্বের সাথে অনার্সসহ বিএসসি পাস করে ভর্তি হলেন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে আরবী সাহিত্যে এমএ পাস করেন।

এরপর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিলাতে গমন করেন। বিলাতে ১৯১১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের উপর সর্বোচ্চ ডিগ্রি বিসিএল পাস করেন। এরপর উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হতে রাষ্ট্র বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন।

বিলাতে শিক্ষা শেষ করে ১৯২০ সালে দেশে ফিরে এসে কলিকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। একইসাথে রাজনীতি ও সমাজসেবার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তার মামা আব্দুল্লাহ আল মামুন সোহরাওয়ার্দীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি পুরোপুরি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ১৯২১ সালে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচনে পদপ্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হন। শুরু হলো এই মহান নেতার রাজনৈতিক জীবন।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছিল চারিদিকে। সকলেই এই ধারণা উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছিলেন যে, বৃটিশ ভারত ছেড়ে চলে যাবে। ভারত স্বাধীন হবে। তখন আর একটি ধ্যান ধারণা আবির্ভূত হলো যে, বৃটিশ ভারত ছেড়ে চলে গেলেও মুসলমানগণ ব্রাহ্মণবাদের নাগপাশে আবদ্ধ হবে। তাই মুসলমানদের পৃথক বাসভূমি কায়েমের প্রচেষ্টা শুরু হয়। সমগ্র ভারবর্ষে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি কায়েমের প্রচেষ্টা চলছিল। ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ মুসলিম অঞ্চল অবিভক্ত বাংলায় এই মহান নেতাই মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।

১৯২৩ সালে বাংলায় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হয়। এই দাঙ্গায় উভয়পক্ষের অনেক হতাহত হয়, ভবিষ্যতে যাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না হয় সে জন্য তিনি চিত্তরঞ্জন দাসের সাথে হিন্দু মুসলমান চুক্তি করেন। ইহা ইতিহাসে “বঙ্গীয় জাতীয় চুক্তি” হিসেবে পরিচিত। এই চুক্তির মধ্যে হিন্দু ও মুসলমানের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা এবং সরকারি চাকরিতে ৫৬% মুসলমানের নিয়োগের ব্যবস্থা লিপিবদ্ধ হয়। “বঙ্গীয় জাতীয় চুক্তি” অনুসারে মুসলমানগণ সাম্প্রদায়িক বৈষম্য হতে মুক্তি পায় এবং হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই শান্তির মধ্যে বসবাস করতে শুরু করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় অসাম্প্রাদায়িক হিন্দুনেতা চিত্তরঞ্জন দাস ১৯২৫ সালে মৃত্যুবরণ করলে বেঙ্গল প্যাক্টও বন্ধ হয়ে যায়। কারণ অন্য হিন্দু নেতারা বেঙ্গল প্যাক্টের চুক্তিগুলো মেনে চলতে রাজি ছিলেন না।

চিত্তরঞ্জন দাসের মৃত্যুর পর বেঙ্গল প্যাক্টের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি বাংলায় মুসলিম স্বার্থ রক্ষার জন্য সবরকম রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণে সদা তৎপর ছিলেন। তার নিজের উদ্যোগেই ১৯২৮ সালে কলিকাতায় প্রথম নিখিল বঙ্গ মুসলিম কনফারেন্সের আয়োজন করেন। এই সম্মেলনে তিনি লিখিত বক্তব্যে মুসলমানদের স্বার্থের কথা বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন। ১৯২৮ সালের শেষ সপ্তাহে এবং ১৯২৯ সালে প্রথমে দিল্লীতে সর্বদলীয় মুসলিম নেতাদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ঐতিহাসিক ১৪ দফা দাবি পেশ করেন। বাংলার মুসলিম কণ্ঠ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এই সম্মেলনের যোগদানকারীদের মধ্যে অন্যতম নেতা ছিলেন।

১৯৩৬ সালে ভারত শাসন আইন প্রবর্তিত হলে ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে তার তৎপরতায় বাংলাদেশ মুসলিম আসনগুলোতে অধিকাংশ আসনে মুসলিম লীগ বিজয় হয়।

১৯৩৭ সনে মুসলিম লীগ ও শেরেবাংলার কৃষক প্রজা পার্টি কোয়ালিশন করে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৭৫৭ সনের নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের ১৮০ বছর পর বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন একজন মুসলমান। এটা বাংলার মুসলমানদের কাছে তাদের হৃত গৌরব ফিরে পাবার অনুপ্রেরণা আর জাতীয় জীবনে স্থান পাবার আশা-আকাক্সক্ষা আর নবজাগরণের অনুভূতি। ১৯৩৭ সনে শেরেবাংলা প্রধানমন্ত্রী হবার পেছনে নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয় একটি বড় বিষয়। ১৯৩৭ সনের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিজয়ের পেছনে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর অবদান অনস্বীকার্য। বস্তুত সোহ্রাওয়ার্দীর রাজনৈতিক ত্যাগ ও প্রজ্ঞার ফলেই বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয় হয়েছিল। তার ফলশ্রুতিতেই শেরেবাংলা প্রধানমন্ত্রী হতে সক্ষম হয়েছিলেন। শেরেবাংলা প্রধানমন্ত্রী হবার পর বাংলায় মুসলিম রেনেসাঁ দেখা দেয়। বাঙালি মুসলিম জাতির মধ্যে নতুনভাবে আশার সঞ্চার হয়।

১৯৪০ সনে ২৩ মার্চ লাহোরে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে পাকিস্তান’ পাস হয়। তখন মুসলিম লীগকে শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ করার মধ্যে বাঙালি মুসলিম জাতির কল্যাণ নিহিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৪১ সনে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র সাথে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ফলে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক জিন্নাহ্ও মুসলিম লীগ থেকে সরে পড়েন। বাংলায় মুসলিম রাজনৈতিক এই সঙ্কটকালে মহান নেতা হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মুসলিম লীগকে বাংলায় সুসংগঠিত করেন এবং জিন্নাহ্র হাতকে শক্তিশালী করেন। ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সনে পাকিস্তান ইস্যুতে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বস্তুত মহান নেতা হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অক্লান্ত কঠোর পরিশ্রমে ঐ দুই নির্বাচনে মুসলিম লীগ নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হয়। ফলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়। তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সনের ৯ ও ১০ই এপ্রিল এই নেতার মাধ্যমেই মুসলিম লীগের দিল্লী কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাবের ‘States’ এর স্থলে State উপস্থাপন করে এক পাকিস্তানের প্রস্তাব পাস করা হয়। বস্তুত বাংলায় মুসলিম লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় না হলে পাকিস্তান হতো কিনা সন্দেহ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক যুক্তি হিসাবে বলা যায়, জিন্নাহ্’র পরই সোহ্রাওয়ার্দীর অবদান স্বীকার্য। তার অক্লান্ত চেষ্টায় আজ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে দুইটি মুসলিম রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হয়েছে। আজকের স্বাধীন বাংলার অন্যতম স্থপতি এই মহান নেতা।

১৯৪৭ সনের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ভাগ হলো। ভারতের মুসলমানগণ নির্যাতনের মধ্যে পড়লো। তিনি ভারতীয় মুসলমানদের অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে পাকিস্তানে চলে আসেননি। ভারতীয় মুসলমানদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য তিনি দিবারাত্রি পরিশ্রম করতে লাগলেন। মহাত্মা গান্ধীর সাথে তিনি শান্তি স্থাপনের জন্য বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ালেন। ১৯৪৮ সনে ৩০ জুন মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর হাতে নিহত হলে শান্তি মিশনের কাজ স্থগিত হয়। তিনিও নিরাপত্তাহীনতায় পতিত হন। তিনি পাকিস্তানে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৮ সনের ৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান নাজিমুদ্দিন সরকার পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তিনি ১৯৪৯ সনের মার্চ মাসে করাচী গমন করেন। পাকিস্তানে এসে তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন যে, ততদিনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কায়েমী স্বার্থবাদীদের হাতে চলে গেছে।

পাকিস্তানে তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিরোধীদলীয় আন্দোলন শুরু করেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ, যুক্তফ্রন্ট, নেজামে ইসলামী সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সনে প্রাদেশিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী হয়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে প্রাদেশিক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু কাক্সিক্ষত গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাবে স্বল্পকালের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পত্তন ঘটে। ১৯৫৬ সনের ১২ই সেপ্টেম্বর রিপাবলিকান দলের সমর্থনে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেন। তবু প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের ১৪ মাসের মাথায় প্রেসিডেন্ট হলেন ইস্কান্দার মির্জা। এরপর ১৯৫৮ সনের ২৭ অক্টোবর সামরিক আইন জারি করে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। চলতে থাকে দেশে সামরিক শাসন। সার্বজনীন ভোটাধিকারের পরিবর্তে আইয়ুব খান প্রচলন করেন কাল ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ প্রথা।

গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী নিয়মতান্ত্রিকভাবে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য সদা ব্রত ছিলেন। সামরিক স্বৈরাচার আইয়ুব খান ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করেন। সাত মাস জেলে থাকার পর ১৯ আগস্ট (১৯৬২) মুক্তি পান। ১৯৬২ সনে ৫ অক্টোবর সর্বদলীয় নেতৃবৃন্দের সমর্থনে একটি জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। এই ফ্রন্ট নিয়ে দিবারাত্র হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার ফলে তার শরীর ভেঙে পড়ে। ১৯৬৩ সনে জানুয়ারি মাসে চিকিৎসার জন্য তাকে ভর্তি করানো হয় করাচীর জিন্নাহ্ হাসপাতালে। একটু স্বাস্থ্যের উন্নতি হলে ১৯ মার্চ (১৯৬৩) ভাল চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় বৈরুতে। বৈরুতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ৫ ডিসেম্বর তিনি ইন্তিকাল করেন।