মহানবীর ﷺ মহিমান্বিত জীবন

মহানবীর ﷺ মহিমান্বিত জীবন

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী | সম্পাদক : মাসিক আদর্শ নারী


হযরত রাসূলুল্লাহ ﷺ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী ৮ রবিউল আউয়াল মতান্তরে ২, মতান্তরে ৯ বা ১০ এবং প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার প্রাত্যুষে আরবের মক্কা নগরীর কুরাইশ গোত্রের বনী হাশিম বংশে ৫৭০ মতান্তরে ৫৭১ ঈসায়ী সনে মাতা আমেনার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের ৫ মাস পূর্বে পিতা আবদুল্লাহ ইন্তিকাল করেন।

তৎকালীন আরবের রীতি ছিল যে, তারা মরুভূমির মুক্ত আবহাওয়ায় বেড়ে উঠার মাধ্যমে সন্তানদের সুস্থ দেহ এবং সুঠাম গড়ন তৈরির জন্য সন্তানের জন্মের পরপরই তাকে দুধ পান করানোর কাজে নিয়োজিত বেদুইন মহিলাদের কাছে দিয়ে দিতেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর আবার ফেরত নিতেন। এই রীতি অনুসারে শিশু মুহাম্মাদ ﷺ  কেও মা হালীমা বিনতে আবু জুয়াইবের (অপর নাম হালিমা সাদিয়া) নিকট দিয়ে দেয়া হয়।
এই শিশুকে ঘরে আনার পর মা হালীমার সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসে এবং তারা শিশুপুত্রকে সঠিকভাবে লালন-পালন করতে সমর্থ হন। দুই বছর লালন-পালনের পর মা হালীমা শিশু মুহাম্মাদ ﷺ কে মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এর পরপরই মক্কায় মহামারী দেখা দেয় এবং শিশু মুহাম্মাদ (সা.)কে মা হালিমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
মক্কার অবস্থা স্বাভাবিক হলে মা হালিমা মুহাম্মাদ ﷺ কে মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। ছয়বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তিনি মায়ের সাথে জীবন অতিবাহিত করেন।
এ সময় একদিন মা আমিনার ইচ্ছা হয়–ছেলেকে নিয়ে মদীনায় যাবেন। সেই অনুযায়ী মদীনায় গিয়ে একমাস সময় অতিবাহিত করেন। একমাস পর মক্কায় ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে এসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
মায়ের মৃত্যুর পর দাদা আবদুল মুত্তালিবের সাথে শিশু মুহাম্মাদ মক্কায় পৌঁছেন। এরপর থেকে দাদাই শিশু মুহাম্মাদের দেখাশোনা করতে থাকেন। অতঃপর মুহাম্মাদ ﷺ -এর বয়স যখন প্রায় ৮ বছর, তখন তাঁর দাদাও মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি স্বীয় পুত্র আবু তালিবকে মুহাম্মাদ ﷺ -এর দায়িত্ব দিয়ে যান। সে মতে চাচা আবু তালিব তাঁকে লালন-পালন করতে থাকেন।
আবু তালিব ব্যবসায়ী ছিলেন এবং আরবদের নিয়ম অনুযায়ী বছরে একবার সিরিয়া সফরে যেতেন। মুহাম্মাদ ﷺ -এর বয়স যখন ১২ ব্ছর, তখন তিনি চাচার সাথে সিরিয়া গেলেন। যাত্রাপথে বসরা পৌঁছার পর কাফেলাসহ আবু তালিব তাঁবু ফেললেন। শহরটিতে ‘বুহাইরা’ নামে এক খৃস্টান পাদ্রী ছিলেন। তিনি তার গীর্জা হতে বাইরে এসে কাফেলার মুসাফিরদের মেহমানদারী করেন। এ সময় তিনি বালক মুহাম্মাদকে দেখে তাঁকে শেষ নবী হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তারপর মক্কায় হারবুল ফুজ্জার যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর বয়স ১৫ বছর। যুদ্ধের নির্মমতায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন। সে সময় তিনি সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু একটি করার চিন্তা-ভাবনা করেন। ৫৮৪ খৃস্টাব্দে মাত্র ১৪ বছর বয়সে চাচা হযরত যুবাইর (রা.) ও কয়েকজন যুবককে সাথে নিয়ে অসহায় ও দুর্গত মানুষদের সাহায্যার্থে এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার দীপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘হিলফুল ফুজূল’ নামক একটি সমাজসেবামূলক সংগঠন।
উঠতি বয়সে মুহাম্মাদ ﷺ বকরী চরাতেন। এরপর তিনি ব্যবসা শুরু করেন। মুহাম্মাদ ﷺ অল্প সময়ের মধ্যেই এ কাজে ব্যাপক সফলতা লাভ করেন। তিনি সত্যবাদিতা, সততা ও আমানতদারীতে এতই খ্যাতি লাভ করেন যে, সমাজের লোকেরা তাঁকে ‘আল-আমীন’ (সত্যবাদী) উপাধিতে ভূষিত করেন।
ব্যবসা উপলক্ষে যুবক মুহাম্মদ ﷺ সিরিয়া, বসরা, বাহরাইন ও ইয়েমেনে বেশ কয়েকবার সফর করেন। তাঁর সুখ্যাতি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ তা অবহিত হয়ে তাঁকে নিজের ব্যবসার কাজে নিয়োজিত হওয়ার প্রস্তাব দেন এবং তাঁকে তার পক্ষ থেকে ব্যবসায় কাজে সফরে যাবার অনুরোধ জানান। মুহাম্মাদ (সা.) এ প্রস্তাব প্রহণ করেন এবং খাদীজা (রা.)-এর পণ্য নিয়ে বসরায় যান।
খাদীজা (রা.) সফরসঙ্গী মাইসারার মুখে মুহাম্মাদ ﷺ -এর সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভূয়সী প্রশংসা শুনে অভিভূত হন। এছাড়া ব্যবসায়ের সফলতা দেখে তিনি তাঁর যোগ্যতা সম্বন্ধেও অবহিত হন। এক পর্যায়ে তিনি মুহাম্মাদ ﷺ কে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
অতঃপর অভিভাবকগণের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর সাথে হযরত খাদীজা (রা.)-এর মুবারক বিবাহ সম্পন্ন হয়। এ সময় খাদীজা (রা.)-এর বয়স ছিল ৪০ বছর এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর বয়স ছিল ২৫ বছর।
ত্রিশ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রায়ই মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটাতেন। এমনি এক ধ্যানের সময় ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.) তাঁর কাছে আল্লাহর ওহী নিয়ে আগমন করেন। তখন চল্লিশ বছর বয়সে ইসলামের নবী মুহাম্মাদ ﷺ নবুওয়্যাত প্রাপ্ত হন। এ সময় সূরাহ আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত অবতীর্ণ হয়।
প্রথম ওহী অবতরণের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ  এতই ভীত হয়ে পড়েন যে, কাঁপতে কাঁপতে নিজ ঘরে প্রবেশ করেই খাদীজা (রা.)কে কম্বল দিয়ে নিজের গা জড়িয়ে দেয়ার জন্য বলেন। খাদীজা (রা.) তখন তাঁকে সান্ত¦না দেন এবং বিভিন্নভাবে সাহস প্রদান করেন।
অতঃপর খাদীজা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর মুখে সকল কথা শুনে তা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। অতঃপর এ ব্যাপারে পরামর্শের জন্য তাঁকে নিয়ে নিজ চাচাতো ভাই তাওরাতের অভিজ্ঞ পণ্ডিত ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের কাছে যান। সব শুনে নাওফেল মুহাম্মাদ ﷺ কে শেষ নবী হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
অতঃপর সূরাহ মুদ্দাসসির-এর শুরুর কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হয়। উক্ত আয়াতের নির্দেশ পালনে রাসূলুল্লাহ ﷺ ) ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
প্রথমে রাসূলুল্লাহ (সা:) নিজ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝে গোপনে ইসলামের বাণী প্রচার শুরু করেন। তাঁর আহ্বানে প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেন হযরত খাদীজা (রা.)। ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ  তখন নিজ বংশীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা করেন। এই সভায় কেউই তাঁর আদর্শ মেনে নেননি শুধু একজন ব্যতীত। তিনি হলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচাতো ভাই এবং তাঁর ঘরেই প্রতিপালিত কিশোর আলী (রা.)। ইসলাম গ্রহণের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। অতঃপর ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি হলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু আবু বকর (রা.)।
তিনবছর গোপনে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার পর মহান আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার শুরু করেন। তিনি সাফা পর্বতের ওপরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সকলকে সমবেত করেন। এরপর প্রকাশ্যে বলেন যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল।
কিন্তু এতে সকলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ডভাবে খেপে যায় এবং এই সময় থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অত্যাচার শুরু করে। তখন কাফির-বেদ্বীনরা বিভিন্নভাবে তাঁকে নির্যাতন করে। তারা তাঁকে নানাভাবে আঘাত করে এবং তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে। আবার এক পর্যায়ে তাঁকে দ্বীন প্রচারে নিরস্ত করতে ব্যর্থ হয়ে তারা তাঁর সাথে আপোষেরও প্রচেষ্টা চালায় ।
কুরাইশরা বিভিন্ন সময়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে বিভিন্ন ভয়-ভীতি, হুমকি-ধমকি, এমনকি দ্বীন প্রচার পরিত্যাগের বিনিময়ে ধনদৌলত ও আরবের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী যুবতী নারীদের দেয়ার লোভ দেখাতে শুরু করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) কাফিরদের শত ষড়যন্ত্র ও ভয়-ভীতির মধ্যেও ঘোষণা করেন, “আমার ডান হাতে যদি সূর্য আর বাম হাতে চাঁদও দেয়া হয়, তবুও আমি সত্য ইসলামের প্রচার থেকে বিরত থাকবো না।”
তখন কুরাইশ কাফির-বেদ্বীনরা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর ইসলাম গ্রহণকারী সাথী-সঙ্গীগণের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন শুরু করে। ধীরে ধীরে যখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চরম রূপ ধারণ করে, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু সংখ্যক মুসলিমকে হিজরত করিয়ে আবিসিনিয়ায় পাঠান। সেখান থেকেও কুরাইশরা মুসলিমদের ফেরত আনার চেষ্টা করে, যদিও তৎকালীন আবিসিনিয়ার স¤্রাট নাজ্জাশীর কারণে তা সফল হয়নি।
এরপর উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে ইসলাম অনেকটা শক্তি সঞ্চার করে। এরপর একসময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চাচা হামযা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণে আরবে মুসলিমদের কিছুটা আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
এভাবে ইসলাম যখন বিস্তার লাভ করে চলেছে, তখন মক্কার কুরাইশরা হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর অনুসারী সহ গোটা বনু হাশেম গোত্রকে বয়কট করে শি‘আবে আবি তালিবে একঘরে করে রাখে। দীর্ঘ তিন বছর এভাবে আটক থেকে চরম নির্যাতন ভোগের পর কুদরতীভাবে তাদের মুক্তির ব্যবস্থা হয়।
কিন্তু এ মুক্তির পরের বছরটি ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য দুঃখের বছর। কারণ, এই বছরে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তাঁর জীবনের পরম সাথী সহধর্মিণী খাদীজা (রা.) ও চাচা আবু তালিব মারা যান।
খাদীজা (রা.)-এর গর্ভে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ৬জন সন্তান জন্মগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে ৪জন মেয়ে এবং ২জন ছেলে ছিলেন। তাদের নাম যথাক্রমে কাসিম, যাইনাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা ও আবদুল্লাহ। ছেলে দু’জনের নাম যথাক্রমে তাইয়্যিব ও তাহির প্রসিদ্ধ ছিলো। ছেলেসন্তান দু’জনই শৈশবে মৃত্যুবরণ করেন। মেয়েদের মধ্যে সবাই ইসলামী যুগ পান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর একমাত্র ফাতিমা (রা.) ব্যতীত সবাই নবীজীর জীবদ্দশাতেই ওফাতপ্রাপ্ত হন। এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিসরীয় স্ত্রী মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে এক পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম ছিলো ইবরাহীম। তিনিও শৈশবে মারা যান।
সহধর্মিণী খাদীজা ও চাচা আবু তালিব মারা যাওয়ার এ দুঃখের সময় নবীজী (সা.) কাফিরদের অধিক অত্যাচার ও নিগ্রহের শিকার হন। তখন তিনি তাদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে হতাশ হয়ে অন্যত্র ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে তায়েফ গমন করেন।
কিন্তু তায়িফে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি তায়িফবাসীদের চূড়ান্ত অপমান, ক্রোধ ও উপহাসের শিকার হন। এমনকি তায়েফের লোকজন তাদের কিশোর-তরুণদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পিছনে লেলিয়ে দেয়। তারা ইট-প্রস্তরের আঘাতে নবীজীকে রক্তাক্ত করে।
তাদের সীমাহীন অত্যাচার সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের ধ্বংস কামনা না করে তাদের হিদায়াতের জন্য দু‘আ করেন। অতঃপর ভারাক্রান্ত মনে মক্কায় ফিরে আসেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এ দুঃখের পর দুঃখের সময়েই মহান আল্লাহর করুণায় কিছু শুভ ঘটনা ঘটে। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহান মর্যাদার প্রতীক ঐতিহাসিক মি‘রাজ সংঘটিত হয়। এমনি করে মদীনার বেশকিছু লোক ইসলামের প্রতি উৎসাহী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা মূলত হজ্ব করতে এসে ইসলামের দাওয়াত পেয়েছিলেন। তাঁরা আকাবা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট বাই‘আত গ্রহণ করেন যে, তারা যে কোন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা.)কে সাহায্য-সহায়তা করবেন এবং ইসলামের প্রসারের কাজ করবেন। এ শপথ “বাই‘আতে আকাবা” নামে পরিচিত।
এই শপথের মাধ্যমেই মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এ সূত্রেই একসময় মদীনার ১২টি গোত্রের নেতারা একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)কে মদীনায় আসার আমন্ত্রণ জানান। এর ভিত্তিতেই ৬২২ খৃস্টাব্দে (নবুয়্যতের ত্রয়োদশ বছর) রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণ মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন।
মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা.) দৃঢ়তার সাথে ব্যক্তি ও পরিবারিক জীবনের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করেন। উক্ত কল্যাণময় ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)। এ পর্যায়ে তিনি সেখানে শাস্তি ও সমৃদ্ধি আনয়ন করেন এবং চিরাচরিত গোত্রীয় হানাহানি বন্ধ করেন। সে সময় মদীনায় পৌত্তলিক ও ইয়াহুদীরা বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিলো। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেখানে সকল সম্প্রদায়ের লোকদের নিয়ে একটি শান্তিসনদ প্রণয়ন করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে ‘মদীনার সনদ’ নামে পরিচিত। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই ছিল প্রথম লিখিত সংবিধান। উক্ত সংবিধানে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, জান, মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করা হয়।
মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের মাধ্যমে শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার দ্বারা যখন সর্বত্র ইসলামের জয়জয়কার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইসলামে দীক্ষিত মুহাজির ও আনসার সাহাবায়ে কিরামের (রা.) আদর্শিক চরিত্র, অমায়িক ব্যবহার, উন্নত চালচলন, মাধুর্যপূর্ণ কথাবার্তা, অনন্য সততা ও অকৃত্রিম উদারতায় মুগ্ধ হয়ে যখন দলে দলে লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো, তখন মক্কার কুরাইশ নেতাদের মনে হিংসা ও শত্রুতার আগুন উস্কে ওঠে। তেমনি পাশ্ববর্তী কিছু বিধর্মী কায়েমী স্বার্থবাজ নেতা ও শাসকগোষ্ঠী ইসলামের উত্থানে ঈর্ষান্বিত হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ওঠেপড়ে লাগে। অপরদিকে মদীনার কতিপয় বিশ্বাসঘাতক ইসলামের উত্থান সহ্য করতে না পেরে গোপনভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিরদের এ বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র ও বিধ্বংসী অভিযান প্রতিহত করার জন্য মহান আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন সাহাবায়ে কিরামকে (রা.) নিয়ে জিহাদ করেন। এ পর্যায়ে ঐতিহাসিক বদর, উহুদ ও খন্দকসহ অনেকগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং ২৭টি যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ সকল যুদ্ধে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানগণকে বিজয় দান করেন এবং ইসলামকে পৃথিবীর বুকে সমূন্নত করেন।
অতঃপর মহান আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬ হিজরী সনের শাওয়াল মাসে হজ্বের উদ্দেশ্যে ১৪০০ সাহাবী নিয়ে মক্কার পথে যাত্রা করেন। কিন্তু কুরাইশরা বাধা প্রদান করে । অগত্যা রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীগণকে নিয়ে মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামক স্থানে ঘাঁটি স্থাপন করেন।
এখানে কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ইতিহাসে “হুদাইবিয়ার সন্ধি” নামে পরিচিত। এই সন্ধি মতে মুসলিমরা সে বছর হজ্ব করা ছাড়াই মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং পরবর্তী বছর হজ্ব করার সিদ্ধান্ত হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সারা বিশ্বের রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সুতরাং পৃথিবীর সব জায়গায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়া তাঁর দায়িত্ব ছিল। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলো থেকে আশ্বস্ত হয়ে তিনি এ কাজে মনোনিবেশ করেন। সে সময় পৃথিবীর প্রধান রাজশক্তিগুলো ছিল ইউরোপের রোম সাম্রাজ্য, এশিয়ার পারস্য সাম্রাজ্য এবং আফ্রিকার হাবশা সাম্রাজ্য। এছাড়াও মিশরের শাসক মুকাউকিস, ইয়ামামার সর্দার এবং সিরিয়ার গাসসানী শাসনকর্তাও বেশ প্রতাপশালী ছিলেন। তাই ষষ্ঠ হিজরীর জিলহজ্ব মাসের শেষদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) একইদিনে তাঁদের কাছে ইসলামের দাওয়াতপত্র দিয়ে ছয়জন দূত প্রেরণ করেন। এদের মধ্য হতে শুধুমাত্র বাদশাহ নাজ্জাসী ছাড়া আর কেউ ইসলাম গ্রহণ করেননি।

দশবছর মেয়াদী হুদাইবিয়ার সন্ধি মক্কার কাফিরদের দ্বারা মাত্র দু’বছর পরেই ভেঙ্গে যায়। বনী খুযা‘আহ গোত্র ছিল মুসলমানদের মিত্র, অপরদিকে তাদের শত্রু বনী বকর গোত্র ছিল কুরাইশদের মিত্র। একরাতে বনী বকর গোত্র বনী খুযা‘আহর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। কুরাইশরা এই আক্রমণে অন্যায়ভাবে বনী বকর গোত্রকে অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে। কোন কোন বর্ণনা মতে, কুরাইশদের কিছু যুবকও এই হামলায় অংশগ্রহণ করে। এই ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্তসহ পত্র প্রেরণ করেন এবং কুরাইশদেরকে এই তিনটি শর্তের যে কোন একটি মেনে নিতে বলেন। শর্ত তিনটি হলো : কুরাইশরা বনী খুযা‘আহ গোত্রের নিহতদের রক্তপণ শোধ করবে, অথবা তারা বনী বকর গোত্রের সাথে তাদের মৈত্রীচুক্তি বাতিল ঘোষণা করবে, অথবা এ ঘোষণা দিবে যে, হুদাইয়বিয়ার সন্ধি বাতিল করা হয়েছে এবং কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। কুরাইশরা জানালো যে, তারা শুধু তৃতীয় শর্তটি গ্রহণ করবে। সে মতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট তাদেরকে প্রতিহত করতে প্রস্তুতি গ্রহণ করা ছাড়া কোন পথ ছিলো না ।
কিন্তু খুব দ্রুত কুরাইশরা তাদের ভুল বুঝতে পারলো এবং আবু সুফিয়ানকে সন্ধি নবায়নের জন্য দূত হিসেবে মদীনায় প্রেরণ করলো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) কুরাইশদের এ ছলচাতুরী প্রত্যাখ্যান করলেন এবং মক্কা আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন।

অতঃপর ৬৩০ খৃস্টাব্দে রাসূলুল্লাহ (সা.) দশহাজার সাহাবীর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হন। সেদিন ছিল অষ্টম হিজরীর রমজান মাসের দশ তারিখ। তখন বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া মোটামুটি বিনা-প্রতিরোধে মক্কা বিজিত হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন।

মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কাবাসীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তবে দশজন পুরুষ ও নারী এই ক্ষমার বাইরে ছিল। তারা বিভিন্নভাবে ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরম বিরুদ্ধাচরণে গেলে থাকতো। তবে এদের মধ্য হতেও পরবর্তীতে কয়েকজনকে ক্ষমা করা হয়।

মক্কায় প্রবেশ করেই রাসূলুল্লাহ (সা.) সর্বপ্রথম কা‘বাঘরে গমন করেন এবং সেখানকার সকল মূর্তি ধ্বংস করেন। মুসলমানদের শান-শওকত দেখে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ক্ষমাগুণে মুগ্ধ হয়ে অধিকাংশ মক্কাবাসীই তখন ইসলাম গ্রহণ করেন।
৬৩১ খৃষ্টাব্দ মুতাবিক দশম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (সা.) লক্ষাধিক সাহাবীকে নিয়ে বিদায় হজ্ব সম্পাদন করেন এবং হজ্ব শেষে আরাফাতের বিশাল ময়দানে প্রায় ১,১৪,০০০ সাহাবীর সম্মুখে জীবনের অন্তিম ভাষণ প্রদান করেন, যা ইতিহাসে ‘বিদায় হজ্বের ভাষণ’ নামে পরিচিত।
বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পর হিজরী ১১ সনের সফর মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ হন। অবশেষে ১১ হিজরী সনের ১২ রবিউল আউয়াল তিনি ওফাতবরণ করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।) এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
এ সামগ্রিক জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা.) রিসালাতের মহান দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করেন। তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণের সময় উম্মতের মাঝে দ্বীনের গাইডরূপে মহান আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআন ও স্বীয় আদর্শ সুন্নাহ-হাদীস রেখে যান।