ঐতিহাসিক ৫ মে: নয়া রাজনৈতিক ফেনোমেনন

ঐতিহাসিক ৫ মে: নয়া রাজনৈতিক ফেনোমেনন

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও তারেকুল ইসলাম


আমাদের জাতীয় জীবনে ঐতিহাসিক ৫ মে’র কালরাত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। হেফাজতের নেতৃত্বে জালিম রাষ্ট্রশক্তির ভিত কাঁপানো বৃহত্তর তৌহিদি জনতার গণ-আন্দোলন এবং ৫ মে’র রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলাম-প্রশ্নে সক্রিয় ও আত্মনিবেদিত এক নয়া গণশক্তির উদ্বোধন ঘটিয়েছে, যার ঔজ্জ¦ল্য ও সম্ভাবনা সুদূর ভবিষ্যতমুখী। হেফাজতের দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন এবং তৃণমূল পর্যায়ে তার নিরঙ্কুশ প্রভাব ও শক্তিমত্তা আজ ক্ষমতাসীন সেকুলার শাসকগোষ্ঠী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহকে ইসলাম-প্রশ্নে আপস করতে বাধ্য করেছে এবং একইসাথে সমাজের বিভিন্ন চিন্তাচর্চার জায়গায় এক নতুন রাজনৈতিক ভাবনার জন্ম দিয়েছে। ফলস্বরূপ বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্লাটফর্মে সেকুলারদের এতদিনকার একচেটিয়া দাপট ও কর্তৃত্ব যথেষ্ট খর্ব হয়েছে বলা যায়।
উগ্র ও ইসলামবিদ্বেষী সেকুলার দুষ্টচক্র এতদিন এদেশের প্র্যাকটিকাল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুদিন যাবত একতরফা আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল। এক শ্রেণির চিহ্নিত হলুদ মিডিয়াকেও তাদের কোলাবোরেটর হিসেবে ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। এমনকি সেকুলারদের পলিটিক্যাল পেট্রোন আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় আসীন। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন ব্লগ ও স্যোশাল মিডিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তথাকথিত মুক্তচিন্তা ও সেকুলারিজমের আড়ালে ইসলামবিদ্বেষী উগ্র নাস্তিকগোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ইসলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর নামে জঘন্য কটূক্তি ও কটাক্ষ করে অব্যাহতভাবে লেখালেখি করতে থাকে, যা স্বাভাবিকভাবেই শান্তিপ্রিয় ধর্মপ্রাণ জনতার ধর্মীয় অনুভূতিতে উপর্যুপরি আঘাত দিয়েছিল। এরই প্রতিবাদে ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার দায়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছে ঐসব কালপ্রিট ইসলামবিদ্বেষী উগ্র নাস্তিকদের বিচারের দাবিতে হেফাজতে ইসলাম ব্যাপকভিত্তিক আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে নামে; অবশ্যই সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে, ৬ এপ্রিল ২০১৩’র লংমার্চ যার প্রমাণ। কিন্তু তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার হেফাজতের বৃহত্তর গণ-আন্দোলন সত্ত্বেও কোনো এক অজানা কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। আমাদের ধারণা, ঐসব কালপ্রিট ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক ব্লগাররা শাহবাগ আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ সক্রিয় কর্মী হওয়ায় সরকার সুস্পষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, কেননা ঐসময় সরকার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গ্রেপ্তারকৃত জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জুডিশিয়াল কিলিং তথা নির্বিচার ফাঁসি দেওয়ার গোপন মতলব করছিল; কিন্তু জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর বিচার-প্রক্রিয়া অসংখ্যবার ত্রুটিপূর্ণ ও অস্বচ্ছ বলে বিবেচিত হয়, তাই এমতাবস্থায় কৃত্রিম দৃশ্যমান জনসমর্থন সরকারের দরকার ছিল, যাতে করে তথাকথিত জনসমর্থনের দোহাই দিয়ে এবং এর মাধ্যমে বিচারকে প্রভাবিত করে তাদের জুডিশিয়াল কিলিং সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। দেশের কর্পোরেট শ্রেণির অবাধ টাকা ও বিরিয়ানি-পিকনিকের উৎসবে এবং একটি বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মদদে আয়োজিত শাহবাগ মোড়স্থ তথাকথিত ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নামক সরকার কর্তৃক পৃষ্ঠপোষিত একটি আন্দোলনের মাধ্যমে সেই কৃত্রিম জনসমর্থন সৃষ্টি করা হয়। এ পর্যায়ে সরকারের পরিকল্পনা সফল হলেও সমস্যা তৈরি হয় যখন গণজাগরণ মঞ্চের কিছু নেতা বা কর্মীর ইসলামবিদ্বেষী কর্মকান্ড ও তৎপরতা জনসম¥ুখে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। এমনকি শাহবাগের সমাবেশে প্রকাশ্যে কুকুরকে টুপি পরিয়ে ‘রাজাকার’ বানানোর নামে ইসলামবিদ্বেষী উস্কানি দেওয়ার নজিরও আমরা দেখেছিলাম। এরপর শাহবাগ আন্দোলনের কতিপয় উগ্র ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক ব্লগার কর্তৃক ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর শানে বেয়াদবিপূর্বক নোংরা লেখালেখি হলে বিচারের দাবিতে হেফাজতে ইসলাম দেশব্যাপী বৃহত্তর গণ-আন্দোলন গড়ে তুললে এবং তীব্র সমালোচনার মুখে এক পর্যায়ে খোদ গণজাগরণ মঞ্চই সরকারের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে ৬ মে ২০১৩ ভোরেই পুলিশ কর্তৃক গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙে দেওয়া হয়। এর আগে ৫ মে’র মধ্যরাতে কয়েক লক্ষ তৌহিদি জনতার অংশগ্রহণপূর্বক হেফাজতের বৃহত্তর গণজমায়েতের ওপর জালিম রাষ্ট্রশক্তির লেলিয়ে দেওয়া হিং¯্র যৌথ বাহিনীর ট্যাংক-গেলাবারুদসমেত সশস্ত্র অভিযানে সাম্প্রতিককালের এক নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। এই অভিযানে নিরীহ প্রান্তিক নাগরিকরা রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে একটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তির ফ্যাসিবাদী চরিত্রকে উলঙ্গ করে দিয়েছিল। এই জালিম রাষ্ট্রশক্তি আসলেই যে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের পক্ষে নয়, বরং জুলুমের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তার খোলনলচে তারা উদাম করে দেখিয়ে দিয়েছিল।

এই উপমহাদেশের কলোনিয়াল শাসনামলে ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত সিপাহী বিদ্রোহের মর্মান্তিক ট্রাজেডির পর সাম্প্রতিককালের তথাকথিত আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তির নিপীড়ন ও জুলুমের বিরুদ্ধে এবং মজলুমের পক্ষে বৃহত্তর গণলড়াই গড়ে তোলার প্রেরণা হিসেবে হেফাজতের আন্দোলন বা ৫ মে’র শহিদি আত্মত্যাগ যুগ যুগ ধরে আমাদের জাতীয় জীবনে দেদীপ্যমান হয়ে থাকবে। তাই হেফাজতের আন্দোলন ও ৫ মে’র শাহাদাত বরণের ইতিহাস প্রতি বছরের ৫ মে আমাদেরকে ঈমান-আকিদা ও ইসলামী মূল্যবোধ সংরক্ষণের চেতনায় উদ্দীপ্ত ও জাগ্রত করে তোলে। পাক হানাদার কর্তৃক ২৫’শে মার্চের কালরাত বা মধ্যরাতের গণহত্যা আমাদের জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা ঘটিয়েছিল এবং অবশেষে আমরা স্বাধীনতা অর্জনেও সক্ষম হই। অনুরূপভাবে ৫ মে’র ঐতিহাসিক কালরাত আমাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব সংরক্ষণ এবং পাশাপাশি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জাতীয় গণলড়াইকে এখনো চলমান রাখতে প্রেরণা যোগায়।

হেফাজত তার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এদশের ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক ও সেকুলার অপশক্তি বিরুদ্ধে এবং শহুরে ভোগবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণির তথাকথিত আলট্রা-মডার্ন একটি অংশের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রতি বিরাজমান বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে দেশের বৃহত্তর ধর্মপ্রাণ তৌহিদি জনতার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ-আন্দোলনকে জাতীয় পর্যায়ে অপরিহার্য করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত মজলুম প্রান্তিক ও অবহেলিত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ইসলামী মূল্যবোধ, তাওহিদ ও ঈমানি চেতনা এবং প্রিয় রাসূল (স.)-এর সম্মান রক্ষার লড়াইকে শহুরে মডার্ন রাজনৈতিক অঙ্গনে নয়া ফেনোমেনন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে হেফাজতে ইসলাম। সুতরাং এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আর যে-কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা দল যদি শাসনক্ষমতার ভরকেন্দ্রে জায়গা পেতে চায়, তাহলে এই নয়া ফেনোমেনন তথা ইসলাম-প্রশ্নের মোকাবেলা তাদের জন্য অবধারিত। হেফাজত কর্তৃক উত্থিত জনশক্তির সাথে ইসলাম-প্রশ্নে নেগোসিয়েশন না করে তারা আর যাই হোক সফল হতে পারবে না। আমরা কিন্তু ইতোপূর্বে দেখেছিলাম, বিগত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রত্যেকটিতেই খোদ ক্ষমতাসীন দল গোহারা হেরেছিল, শুধুমাত্র হেফাজতের প্রচারণার প্রভাবেই। সুতরাং হেফাজতের সাথে কিম্বা এই বিপুল তৌহিদি জনগোষ্ঠীর সাথে শত্রুতা করে প্রচলিত ক্ষমতাকেন্দ্রিক কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এখন কেউ কেউ হয়ত বোকার মতো একটি প্রশ্ন করতে পারেন যে, তাহলে এতদ্সত্ত্বেও হেফাজত কেন এই জালিম অবৈধ সরকারের পতন ঘটাচ্ছে না। তাদেরকে বলবো, একটু স্মরণ করুনÑহেফাজতের দাবিনামা ও আন্দোলনের কারণগুলো কী-কী ছিল। হেফাজত মাঠে নেমেছিল কটূক্তিকারীদের বিচারের দাবিতে। ফলস্বরূপ উল্টো জুলুম ও ম্যাসাকারের শিকার হয়েছিল ঠিক, তবে বুলেট, ট্যাঙ্ক, আধুনিক সমরাস্ত্র ও রণসজ্জিত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো উপযুক্ত প্রস্তুতি তাদের ছিলনা, এখনো নেই। এমনকি তারা সেটা চায়ও না। তারা যদি পাল্টা উপযুক্ত সমরসজ্জা নিয়ে গেরিলা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত, তাহলে সেই আপনারাই তো হেফাজতকে বরং ‘জঙ্গি’ বলতেন। আক্ষেপ করে আরো বলতেন যে, হেফাজতের কারণেই এই দেশটা আফগাস্তিান হয়ে গেলো। প্রকৃতপক্ষে সরকারপতনের দায়িত্ব প্রধান বিরোধী দলের, কিন্তু তারা নিজেরাই ব্যর্থ। অথচ তারা আশা করেন, সরকারের পতন ঘটিয়ে হেফাজতে ইসলাম তাদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। আশা করেন ভালো কথা, কিন্তু তাই বলে কোনো ধরনের প্রতিশ্রুতি বা নেগোসিয়েশন ছাড়া!! তাদেরকে বুঝতে হবে, রাজননৈতিক স্বার্থ কখনোই মাগনা পূরণ হয়না। ১৩ দফার কোথাও সরকার পতনের কথা উল্লেখ নেই। আর তাছাড়া হেফাজত কেন সরকারপতনের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব নেবে? একটু রাজনৈতিক স্বার্থচিন্তার জায়াগায় ভাবুন। ধরেন, হেফাজত সরকারের পতন ঘটালো, তাহলে এর সুফল ভোগ করবে কারা? নিশ্চয়ই বিরোধী জোট। তো বিরোধী জোট ক্ষমতায় যাওয়ার পর হেফাজতের দাবি-দাওয়া মেনে নেবে কিনা, আর মেনে নিলেও কতটুকু মানবে, এসব বিষয় আগে নেগোসিয়েশন করতে হবে। অন্যথায় বিনামূল্যের এই সরকারপতনের রাজনীতি করার মতো ঝুঁকি হেফাজত নেবে না।

হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক ও কওমী ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন। অরাজনৈতিক বটে, তবে কনভেনশনাল বা প্রচলিত তথাকথিত নির্বাচনকেন্দ্রিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক নোংরা রাজনীতির অর্থে অরাজনৈতিক। অবশ্য ইতোমধ্যে হেফাজতের একটি রাজনৈতিক চরিত্র দাঁড়িয়ে গেছে। তবে সেটা নির্বাচনমুখী ও ক্ষমতামুখী রাজনীতি চর্চার বাইরে গড়ে উঠেছে। হেফাজত নির্বাচনেও যাবেনা এবং ক্ষমতাচর্চাও করবে না, কিন্তু যারা ক্ষমতায় আছে বা যাবে তাদেরকে জনস্বার্থে প্রয়োজনমাফিক নিয়ন্ত্রণ করবে এবং শাসনক্ষমতা ও গণক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য জারি রাখতে রাজনৈতিক রেফারি হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে শাসকবর্গের অবাধ ক্ষমতাচর্চা, দলীয়করণ, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও লাগামহীন অনধিকারচর্চার প্রবণতা ক্রমশ সীমিত হবে বলে হেফাজত মনে করে।

এছাড়া হেফাজতে ইসলাম ও সমমনা ইসলামী দলগুলো এবং দেশের কওমী মাদ্রাসাসমূহ সমাজে ধর্মীয় অনুভূতি ও ঈমানি চেতনাকে জাগ্রত রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সাধারণ মানুষের অন্তরে তাকওয়া ও আধ্যাত্মিকতার উন্নয়ন সাধনে তারা নিরন্তর মেহনত করে থাকে। কারণ প্রচলিত রাজনীতি ভোগবাদ ও বস্তুবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ক্ষমতাচর্চাকারী রাজনৈতিক দলগুলো প্রকারান্তরে কর্পোরেট পুঁজিপতিদের মুৎসুদ্দী হিসেবেই ফাংশন করে। তাদের মধ্যে ব্যক্তিক বা সামাজিক নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বালাই নেই। সুতরাং তৃণমূল জনসমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ধীরে ধীরে পুরো সমাজ ও জাতির মধ্যে খোদাভীতি বা তাকওয়া হ্রাস পায়। ঈমানি চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ে। কোরআন-সুন্নাহ থেকে মানুষ দূরে সরে যেতে থাকে। অন্যদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রও হয়ে পড়ে নীতিহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত। ধর্মীয় অনুভূতিহীন বেশিরভাগ মানুষ পুঁজিবাদ ও বস্তুবাদের গোলাম হয়ে যায়। সবমিলিয়ে এর পরিণাম ভয়াবহ। এক পর্যায়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব-গজব নেমে আসে। সমাজে জুলুম-অনাচার, অস্থিরতা ও খুন-খারাবি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। আল্লাহর ইচ্ছায় শাসকগোষ্ঠীও চরম জালিমরূপে আবির্ভূত হয়। হাহাকার, আহাজারি ও হা-হুতাশে আকাশ-বাতাস গুমোট হয়ে ওঠে। এইমুহূর্তে আমাদের বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র কি ঠিক এই পর্যায়ে নেই? এমতাবস্থায় এইসব খোদায়ী আজাব-গজব থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সমাজে ঈমান-আকিদার সংরক্ষণ, তাকওয়ার চর্চা, কোরআন-সুন্নাহর পন্থা অবলম্বন ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের কোনো বিকল্প নেই। আন্দোলনের শুরু থেকেই হেফাজতে ইসলাম এসব বলে আসছে। ঈমান-আকিদার কথা বলা, সমাজকে ইসলামী মূল্যবোধে পরিগঠিত করা, মানুষের নৈতিক ও আত্মিক উন্নয়ন এবং ইসলামের দাওয়াতের কাজ করাই হেফাজতের মূল সামাজিক রাজনীতি। সুতরাং ক্ষমতা ও নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি হেফাজতের জন্য নয়।
সম্প্রতি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে এবং ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ (স.)-কে কটূক্তি ও কটাক্ষ করে কথিত ‘মুক্তচিন্তা’র নামে ব্লগিং করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বহুলকাক্সিক্ষত বক্তব্যকে সাধুবাদ জানাতে আমাদের মোটেও কার্পণ্য নেই। তিনি বলেছেন, ‘আমার ধর্ম সম্পর্কে কেউ যদি নোংরা কথা লেখে, সেটা কেনো আমরা বরদাশত করবো? ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই তারা মুক্তচিন্তার ধারক বলে দাবি করাটা যেনো ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু আমি এখানে কোনো মুক্তচিন্তা দেখি না। আমি দেখি নোংরামি।’ এই বক্তব্য যদি তিনি আরো আগে দিতেন এবং যথাসময়ে আইনগত পদক্ষেপ নিতেন, তাহলে দেশের মানুষকে হয়ত অনেক অঘটন ও নৈরাজ্য দেখতে হতো না। তবুও তিনি দেরিতে হলেও বলেছেন। ইংরেজিতে প্রবাদ আছে, বেটার লেট দ্যান নেভার।
লেখকদ্বয়:ইদানীং একের পর এক ব্লগারহত্যার ব্যাপারে আমদের বক্তব্য হচ্ছে, প্রধানত আমরা সকল প্রকারের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিরোধী। শুধু নিহত ব্লগারদের ব্যাপারেই নয়, বহুদিন যাবত দেশব্যাপী ভিন্ন মতাবলম্বীদের ধরে ধরে গুম-খুন ও র‌্যাব-পুলিশ কর্তৃক নির্বিচারভাবে বিরোধী পক্ষের লোকজনকে গুলি করে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডেরও বিরোধী আমরা। যাই হোক, আমাদের দাবি আমলে নিয়ে সরকার যদি যথাসময়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রমাণসাপেক্ষে বিচারের ব্যবস্থা করতো, তাহলে নিশ্চয়ই হয়ত নিহত ব্লগাররা এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হতো না। বিচারহীনতার অনিবার্য প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ক্ষুব্ধ ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতপ্রাপ্ত কে বা কারা নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে এইসব হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছে, তা আমরা সাধারণ মানুষ জানি না। অধ্যাবধি কোনো প্রকৃত খুনিকে তথ্যপ্রমাণসমেত চিহ্নিত করে বিচারপূর্বক শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করতে প্রশাসন ন্যক্কারজনক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সবদিক থেকে সমূহ ঘটনাবলীর দায় একান্তই সরকারের ওপর বর্তায় বলে আমরা মনে করি।


মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী
কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ
উপদেষ্টা সম্পাদক: ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম
তারেকুল ইসলাম
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Email: [email protected]