কিতাবমেলায় মহিলাদের ব্যাপক উপস্থিতি; যা বললেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ ও লাবীব আব্দুল্লাহ

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম | শাদমান ইবনে শহীদ


পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে মানুষের প্রতি সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর প্রথম নির্দেশ- পড়। পড়ার সবচেয়ে প্রাচীন, জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে বই। বই আমাদের খুব প্রিয় সঙ্গী। জ্ঞান, আনন্দ ও বিনোদনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বই মানুষের খুব কাছের বন্ধু। বই আনন্দের প্রতীক। বই পড়ে একজন মানুষ তার চিন্তার পৃথিবীকে অনেক সমৃদ্ধ করতে পারেন। মাকতাবাতুল আজহারের উদ্যোগে চলছে দেশব্যপী ধারাবাহিক ’আঞ্চলিক কিতাবমেলা’। মূলত সুসাহিত্যের সঙ্গে পাঠকদের মিতালী গড়ে তুলতে এবং পাঠকরা যেন সুলভ মূল্যে নিজ এলাকাতেই ইসলামী বইগুলো পেতে পারে এ লক্ষ্যে ‘কিতাবমেলা’ নামে ব্যতিক্রমধর্মী এই আয়োজন। কিতাবমেলার এবারের পর্ব চলছে ময়মনসিংহে। শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। ময়মনসিংহ বড় মসজিদ চত্বরে আয়োজিত কিতাব মেলায় মহিলাদের জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যাবস্থা। পাঠক মহলে এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেলেও কেউ কেউ করছেন সমালোচনা। বিষয়টি নিয়ে ইনসাফের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি শাদমান ইবনে শহীদ কথা বলেছিলেন মাকতাবাতুল আজহারের সত্ত্বাধিকারী মাওলানা উবায়দুল্লাহ আজহারী ও শিকড় সাহিত্য মাহফিলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মাওলানা লাবীব আব্দুল্লাহ‘র সাথে। এছাড়াও কথা হয় মেলার বর্তমান পরিস্থিতি, পাঠাকদের আগ্রহ ও পরবর্তী পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।

মাওলানা উবায়দুল্লাহ আজহারী ও মাওলানা লাবীব আব্দুল্লাহ’র সাথে কথা বলছেন শাদমান ইবনে শহীদ

তিনদিনব্যাপী ময়মনসিংহের এই কিতাবমেলায় কেমন সাড়া পাচ্ছেন? এমন প্রশ্নে মাকতাবাতুল আজহারের সত্ত্বাধিকারী মাওলানা উবায়দুল্লাহ আজহারী বলেন, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ তায়ালার লাখো কোটি শোকর, আমরা ৪র্থ পর্বে এসে মোটেও হতাশ না, বরং অনেক বেশি উৎসাহ পাচ্ছি শিক্ষানগরী ময়মনসিংহে এসে। শুধু বিক্রিই সব কিছু নয়, তবুও বিক্রির দিক থেকে আলহামদুলিল্লাহ ভাল পর্যায়ে আছি। এবং সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছি আমরা।

সত্যি বলতে ময়মনসিংহ তো ময়মনসিংহই; এখানকার সবাই এত অতিথিপরায়ণ আর এতবেশি আপন করে নিয়েছে আমাদের, বিশেষত মনে হচ্ছে আমি বোধহয় শিকড়ের একজন সদস্যই হয়ে গেছি। বেশ আন্তরিকতার বরণ করে নিয়েছে সবাই।
ব্যাপক সাড়া বলতে দূরদূরান্ত থেকে অনেকে এসেছে।

মহিলারা অনেকে এসেছে। মহিলাদের এরকম উপস্থিতি আর কোথাও হয়নি, হবেও কিনা সন্দেহ। আমরা মহিলাদের জন্য আলাদা কর্ণারও করেছি। মাদরাসা, স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির শিক্ষার্থী-শিক্ষক এসেছে। জেনারেল পড়ুয়া অনেক ভাই এসেছে। এইতো গতকাল একজন এসেছে সেই ৭০কিলোমিটার দূর শ্রীপুর থেকে শুধুমাত্র মেলায় বই কিনতে। এবং তিনি ৪ হাজার টাকার বই কিনেছেন। আরেকজন এসেছে জামিয়া গাফুরিয়া থেকে, তিনি ২০ হাজার টাকার কিতাব নিয়ে গেছেন। এভাবে আমরা বলতে পারি আমাদের কষ্টের চাইতে প্রাপ্তি অনেক বেশি। সেই সাথে সবাই আমাদের প্রতি যে সহযোগিতা করেছে তাদের সবাইকে অসংখ্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বিশেষ করে শিকড় সাহিত্য মাহফিলকে।

ইসলামি বইমেলায় এভাবে মহিলাদের অংশগ্রহণ পূর্বে কোথাও দেখা যায়নি, এটা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে পক্ষে-বিপক্ষে বেশ আলোচনা-সমালােচনা হচ্ছে, এ ব্যাপারে মাওলানা লাবিব আবদুল্লাহ’র কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বিষয়টি হল গতকাল সকালে পরিচিত একজন মহিলা আমার কাছে ৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছে বই সংগ্রহের জন্যে। বইমেলা আসলে সবার। মহিলাদের জন্যে প্রচুর বই রয়েছে। মহিলারা আসছে।
আপনি ছবিতে দেখবেন, যারা এসেছে সবাই বোরকা পরিহিতা। এবং বিভিন্ন অঙ্গন থেকে, শুধু মহিলা মাদরাসার ছাত্রী মনে করলে ভুল হবে। এরা অনেকেই কলেজের। আর আমরা যে শিকড়ের ক্রোড়পত্র বের করেছি সেটার প্রথম কপিও একজন মহিলাই নিয়েছে। আমি মনে করি মাকতাবাতুল আযহার বা অন্যান্য যারা আছে তারা যেন মহিলাদের জন্যে পৃথক বইমেলার ব্যবস্থা করেন, যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতা সকলেই মহিলা থাকবে। অবশ্যই এরকম হওয়া দরকার।
মহিলাদদের বই মহিলারা কিনবে। এমনকি আজকে আমার মেয়েকেও আমি এখানে নিয়ে এসেছি। ও বই কিনেছে। টাকা যখন শেষ হয়ে গেছে আমার কাছে এসে বলছে ‘আব্বু টাকা শেষ হয়ে গেছে’ তখন আরও ৫০০ টাকা দিয়েছি বই কেনার জন্য।
এক্ষেত্রে আমি বলবো মহিলারা যেন তাদের মাহরামের সঙ্গে আসেন।

ময়মনসিংহ কিতবমেলায় মহিলাদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়।

এভাবে মেলায় মহিলাদের অংশগ্রহণের উদ্যোগ কী এবারই প্রথম করলেন আপনারা? নাকি এর আগে কোথাও হয়েছে? মাওলানা ওবায়দুল্লাহ আযহারী’র কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এর আগে প্রথম মিরপুরে যখন কিতাবমেলা করি তখনও এরকম আবেদন ছিল কিন্তু আমরা তেমন সুন্দরভাবে আয়োজন করতে পারিনি। মুহাম্মদপুরেও আবেদন ছিল এবং আলাদাভাবে করাও হয়েছে কিন্তু ভিড়ের কারণে তারা আসতে পারেনি, কারণ টাইমিং ফিক্সড করা ছিল না। কিশোরগঞ্জেও ছিল, সামনের দিকে পুরুষরা ছিল আর পিছনের দিকে পর্দার ব্যবস্থা ছিল, ওখান দিয়ে তারা বইয়ের তালিকা আর টাকা দিতো আমরা ভেতর থেকে বই দিতাম। আমাদের সামনে তাদের আসতেও হয়নি। এরকম একটা পদ্ধতি ছিল।
তবে এখানে তো পিছনের সাইটও নেই। তো গত কয়েকদিন যাবতই অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন আসছে, একারণে আমরা একটা টাইম ফিক্সড করে দিয়েছি। সামনে হয়তো আমরা আরও সুন্দরভাবে করতে পারবো ইনশাল্লাহ। তবে ঢাকা থেকে অনেকদূরে এভাবে মহিলাদের মাধ্যমে সামাল দেয়াটা অনেক কঠিন হয়ে যাবে আমার মনে হচ্ছে এই বর্তমান প্রেক্ষাপটে। সামনে যদি ঢাকার মধ্যে হয় তাহলে আমরা কাছের কাউকে দিয়ে, নির্দিষ্ট সময় করে এটা ইচ্ছা করলে করতে পারবো। দূরে এভাবে মহিলাদের দিয়ে করানোর পরিবেশ এখনো বাংলাদেশে তৈরি হয়নি।

এবিষয়ে বিভিন্ন মহলের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা নিয়ে মাওলানা ওবায়দুল্লাহ আযহারী বলেন, যারা এমনটা করছেন আমি তাদেরকে বিনয়ের সাথে বলব আসলে এমন না যে আমরা টাইমিং জানিয়ে মহিলাদের আহ্বান জানিয়েছি, মূলত তারাই বারবার আবেদন জানিয়েছে। এজন্যই আমরা তাদের জন্য একটা সময় রেখেছি যেন তারা পর্দার ভেতরে থেকে সুন্দর পরিবেশে কয়েকটা বই কিনতে পারে। এতটুকু আয়োজনের চেষ্টা করা আর কী! লাবিব ভাই যেটা বলেছেন মাহরামের সঙ্গে আসা এই বিষয়টা খেয়াল রাখা। আর আমরাও সর্বাত্মক চেষ্টা করবো সুন্দর ব্যবস্থাপনা করার জন্য।

এইযে ধারাবাহিক কিতাবমেলার এটা কততম এবং এই বিষয়ে সামনের প্ল্যান কী? জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এই বিষয়ে কোন ঘোষণা দেইনি। তবে আমরা পর্যায়ক্রমে ৫০টা করার ইচ্ছা নিয়ে মাঠে নেমেছি। এটা ৪র্থ তম। সামনের সপ্তাহে সিলেটে হবে। তারপরেরটা ঢাকা উত্তরা। এরপর ফরিদাবাদ, নারায়ণগঞ্জ। আমাদের টার্গেট ঢাকার ভেতরে ১০টা এবং ঢাকার বাইরে ৪০টা। আর ঢাকার বাইরের দিকটাতে আমরা বেশি মনযোগ দিচ্ছি। ঢাকার ভেতরে তো অনেক মেলাই হয়, একুশে বইমেলা, মাসে মাসে অনেক মেলাই দেখতে পাই। কিন্তু ঢাকার বাইরে এমন জায়গাও আছে যেখানে কখনো মেলাই হয়নি। আমরা সবদিক চিন্তা করেই মাঠে নেমেছি। ইনশাল্লাহ আমরা যেভাবেই হোক ৫০ পর্যন্ত পৌঁছুবো। এবং আমাদের দেখাদেখি আরও কেউ এমন উদ্দ্যোগ গ্রহণ করলে আমরা তাদের সাথেও থাকবো ইনশাল্লাহ।

২০০৭ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এই বড় মসজিদ চত্বরে শিকড়ের উদ্দ্যোগে বইমেলা হয়েছে। মাঝে অনেকটা গ্যাপ, আবার এবছর মাকতাবাতুল আযহার ও শিকড়ের সমন্বিত আয়োজনে বইমেলা হচ্ছে। সামনে কী প্রতিবছর এরকম বইমেলা আশা করতে পারে বইপ্রেমীরা? মাওলানা লাবিব আব্দুল্লাহ’কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আগে যে সপ্তাহব্যাপী মেলাগুলো হয়েছে ওগুলো শিকড় ও আবাবীলের সমন্বিত প্রয়াস ছিল। এবারেরটা মাকতাবাতুল আযহার মুল উদ্দ্যোক্তা। আয়োজন সহযোগী হিসেছে রয়েছে শিকড় সাহিত্য মাহফিল। যদিও এটা একক বইমেলা কিন্তু এটা আসলে একক বইমেলা থাকেনি। এখানে ১০/১২টি প্রকাশনীর স্টল রয়েছে। তো আমরা আশাকরি মাকতাবাতুল আযহার, শিকড় ও অন্যান্য যারা আছে তারা সকলেই উদ্দ্যোগ নিলে পাঠক উপকৃত হবে।
আমরা যেখানে বসে আছি বড় মসজিদ চত্বরে, এই মসজিদের খতিব আল্লামা আবদুল হক সাহেব গতকাল সকালে লিখিত মন্তব্যে তিনি লিখেছেন, ‘আমি আশা রাখবো এরকম কিতাবমেলা প্রতিবছরই যেন হয়। এটার ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক। এটা আসলে ছাত্র-শিক্ষক, শিশু-কিশোর, থেকে শুরু করে সবাই চায়।’ একটা পাঠ আন্দোলন দরকার যেটা চরিত্র বিনির্মাণ করবে। এবং এটা অব্যাহত থাকবে।
মাকতাবাতুল আযহারের এই চমৎকার উদ্দ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং আমি মনে করি বাংলাদেশে এটা একটা মডেল হয়ে দাঁড়াবে।