সৌদী রাজপরিবারের ক্ষমতার খতিয়ান এবং ইসরাইল প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে [এক]

সৌদী রাজপরিবারের ক্ষমতার খতিয়ান এবং ইসরাইল প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে [এক]

মাসউদুর রহমান চৌধুরী


আরব ভূখন্ড। নবীজীর জন্মভূমি। মুমিনদের প্রাণস্পন্দন। এ ভূখন্ডেই নবীজীর কদম মোবারকের দাগ পড়েছে, রক্তের ছোপ লেগেছে। তাঁর প্রিয় সাহাবীদের রক্তে সিক্ত হয়েছে এ ভূমি। সমগ্র আরবভূমিই হাজার হাজার অলি-বুজুর্গের পদধূলিতে ধন্য। তাই তো মুহাম্মদ বিন সালমানের আধুনিক সৌদিআরব ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চলছে আলোচনা-পর্যালোচনা। যুবক-বৃদ্ধ-পৌঢ় সবার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নতুন চাঞ্চল্য। কোন পথে এগুচ্ছে সৌদিআরব? এ কি অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের মতো গতানুগতিক পাশ্চাত্যের অনুকরণ? পূণ্যভূমি কি হারাতে বসেছে তার ঐতিহাসিক স্বকীয়তা? এমনই শংকা-আশংকা ঘুর-পাক খাচ্ছে সচেতন মুসলিম সমাজে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে ইতিহাসের নিরিখে। ইতিহাসের বিশ্লেষণী চোখে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে আসল বাস্তবতা। তাই আসুন বক্ষমাণ প্রবন্ধে খন্ড-বিখন্ড আরবের মূল গোড়ার দিকে নজর দিই।

মূলত শতাব্দি-সহস্রাব্দি ধরেই ইহুদী-নাসারারা এই আলোকোজ্জ্বল ভূমিতে মুসলিমদের মাঝে ফাটল সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। মুসলিমদের খেলাফতি শাসনের মাধ্যমে যে ঐক্য বহাল ছিল তাতে সুকৌশলে চিড় ধরাতে তারা প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল। শেষ দিকে তুর্কি খেলাফতের মাধ্যমে আরববিশ্বের মুসলমানরা যখন ঐক্যবদ্ধ হয় তখন মুসলমানদের চির শত্রু ইহুদিদের তা সহ্য হয় নি। এই আরবে ফাটল সৃষ্টির জন্য তারা ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করে। নামধারী কিছু মুসলমানকে তারা অর্থের বিনিময়ে কিনে নেয়। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্লোগান তৈরী করে প্রথমত বিভ্রান্তির জাল ছড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে ধীরেধীরে তাদের মূল মিশনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শ্লোগান আর যুক্তিগুলো এতটাই শাণিত ছিল যে, সাধারণ মুসলিমজনতার বুঝার উপায় ছিল না যে, কীভাবে তা ধারালো ছুরির মতো তাদের ঐক্যের বুকটাকে চিড়ে শতধা বিভক্ত করে দিচ্ছে। তদুপরি মুসলিম নেতারা যখন তাদের দ্বীনধর্ম ভুলে ক্ষমতার নেশা আর নারীভোগে মত্ত তখন তাদের পাজরের ঠিক মাঝখানটায় নিপুণ ও সুদক্ষ হাতে ছুরিটি চালানো হয়। শুধু পাজর নয়, একে একে যখন সবক’টি অঙ্গকে পৃথক করে দেয়া হয় তখনও তারা নেশা কাটিয়ে উঠতে পারে নি।

পাশ্চত্যের শব্দ আবিষ্কার এবং মুসলিম বিভক্তির পরিকল্পনা 
মুসলিমদের বিভক্তির ক্ষেত্রে ইহুদী-নাসারারা মুসলমানদের ঐক্যচেতনা বিনাশ, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং নতুন নতুন সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি তারা কিছু শব্দ আবিষ্কর করে যেগুলোর বাহিরটা অত্যন্ত চাকচিক্যময় ও রঙিন আর ভিতরটা চরম কাদাকার ও বিভৎস। যে শব্দগুলোর বিভৎসতা আজ শুধু মুসলিম নয় বরং পুরো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তছনছ করে ছেড়েছে সবকিছুকে। শান্তির বিশ্ব অশান্ত হয়ে উঠেছে বিদ্বেষ আর জাতিবিভেদের ভ্রষ্ট চেতনায়। তার মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি যা মূলত আরব বিভক্তির ক্ষেত্রে সব চেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।

জাতীয়তাবাদ


কুচক্রী ইহুদিগোষ্টী গবেষণা করে দেখলো যে, আরববিশ্বকে দুর্বল করে ফেললে মুসলমানদের কোমর ভেঙ্গে যাবে। তাই বিভিন্ন উপায়ে তারা এই হীনকর্মে তাদের অপতৎপরতা চালাতে থাকে। প্রথমে তারা আরবদের মাঝে জাতীয়তাবাদী চেতনার বীজ বপন করল। সহজ সরল উদারমনা আরবদের মাঝে হঠাৎ সৃষ্টি হল জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতা। তারা ভৌগলিকভাবে নিজেদেরকে বিভক্ত করা শুরু করলো। তাদের মাঝে আরবী-আজমী শ্লোগান জমে উঠল। তাদের মাঝে মান্য-অমান্য হওয়ার মাপকাটি হয়ে গেল- ভৌগলিক জাতীয়তাবোধ; শাশ্বত ধর্মীয় চেতনা নয়। বৃহত্তর উম্মাহর কথা ভুলে তারা বিভক্ত হতে লাগল নিছক জাত্যাভিমানকে রক্ষার স্বার্থে। নিজেদের আত্মম্ভরিতার কারণে তুর্কিদের খেলাফত ও কর্তৃত্বকে তারা তুচ্ছ জ্ঞান করতো। আরবদের উপর তুর্কিদের শাসনকে তারা আত্মমর্যাদার পরিপন্থী মনে করতো। অথচ তা কখনো আত্মমর্যাবোধের পরিপন্থী ছিলো না; ছিলো সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধের উপর কষাঘাত! যে সংকীর্ণতার ব্যাপারে নবিজি (সা:) চরম নেতিবাচক উক্তি করে গেছেন। হাদিস শরীফে নবিজি সা: বলেছেন-
হযরত যাবের রাঃ থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন আমরা তখন কোন এক যুদ্ধে রত ছিলাম। ইত্যবসরে এক মুহাজির কোন এক আনসারীর পশ্চাতে আঘাত করলো। তখন আনসারী সাহাবী (ক্ষোভে) বলে উঠলো- ও হে আনসারীরা ( কোথায় তোমরা) ! ( এ দেখে) মুহাজির সাহাবীও বলে উঠলেন- আরে মুহাজিররা! ( তোমরা কোথায়) সাহাবাদের এমন সন্বোধন শুনে নবিজী সাঃ বলে উঠলেন- হলোটা কী তোমাদের?!  জাহেলী যুগের মতো সম্বোধন করছো যে! তখন সাহাবীরা জানালেন- হে আল্লাহর রাসুল! এক মুহাজির কোন এক আনসারীর পশ্চাতে আঘাত করেছে।নবিজী তখন বললেন- যা হোক, তোমরা (পরস্পর) এসব সম্বোধন ছাড়ো! এসব সম্বোধন মন্দ প্রভাব ছড়ায়! ( বুখারী -৪৯০৫, মুসলিম- ২৫৮৪)
নবীর সেসব শিক্ষা ভুলে গেলে বিশ্বায়নের এ যুগে তাদের টিকে থাকার মত আর কী-বা আছে। নতুবা আগে তো তারা পৃথিবীর সবচেয়ে অশিক্ষিত, অসভ্য জাতি হিসেবেই ছিল। যাযাবর, দস্যু, লুটেরা আর লম্পট ছাড়া কী-বা পরিচয় ছিল তাদের?

কিন্তু সেই আরবজাতি সব ভুলে জাতীয়তার বিবাদে জড়িয়ে পড়ল। আরব-আজমী-তুর্কি-হিন্দুস্তানী শিরোনামে শুরু হল জাতীয়তাবাদের মারপ্যাঁচ। আরবদেরকে জাতীয়তাবাদের চেতনা উস্কে দিয়ে তুর্কি খেলাফত থেকে পৃথক করা হল। আরব ভূখন্ড থেকে সালতানাত হারিয়ে ফেলল তুর্কি খলিফা। ইসলামী সীমানা সংকীর্ণ হয়ে পড়ল। মুসলিমরা হয়ে পড়ল বিভক্ত। তদুপরি খলিফাদের অদূরদর্শিতা, দুনিয়ার মোহ এবং বিলাসপ্রিয় জীবন মুসলমানদেরকে আরো দুর্বল করে দেয়। পরে ইহুদি বংশে জন্ম নেয়া মুস্তফা কামাল পাশা খলিফার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে সেনা বাহিনীকে খলিফার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে পুরো উসমানী সালতানাতকে ভেঙে ১৯২৪ সালে তুরস্ককে ধর্মনিরেপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। উন্নতি এবং ঐক্যের নামে সে জনগণকে ধোকা দিয়ে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খলিফা আবদুল হামিদকে কারান্তরীণ করে।

চলবে