সৌদী রাজপরিবারের ক্ষমতার খতিয়ান এবং ইসরাইল প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে [দুই]

সৌদী রাজপরিবারের ক্ষমতার খতিয়ান এবং ইসরাইল প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে [দুই]

মাসউদুর রহমান চৌধুরী


ইহুদী-নাসারাদের লক্ষ্য ছিল তারা মুসলিম ভূখন্ডকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে রাখবে। তাদের এজেন্টরা সে পথেই সবকিছু করে যাচ্ছে। মুস্তফা কামাল পাশা আরো আগ্রাসী হয়ে তুর্কিতে কোরআন, আযানসহ যাবতীয় ইসলামী বিধানাবলীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মসজিদ-মাদরাসা বন্ধ করে দেয়। তুর্কি ভাষার পরিবর্তে ল্যাটিন ভাষা চালু করল। কারণ, তুর্কিভাষা আরবীর মতো ডানদিক থেকে লেখা হতো।আর ল্যাটিন ভাষা লেখা হতো বামদিক থেকে।যাতে পুরো কালচারটাই বদলে যায়। পরবর্তী প্রজন্ম নিজেদের নতুন পরিচয়ে জানতে শুরু করে। তারা ভুলে যায় তাদের আসল পরিচয়। পরে জালিম কামাল পাশাই হয়ে উঠলো ইতিহাসের হিরো। তাদের লক্ষ্যটি কত সুদূরপ্রসারী ছিল তা অনুধাবনের জন্য পাঠকের সামনে বিষয়টি ঐতিহাসিক তথ্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করছি-

১৯০৮ সালের ৩রা জুলাই তরুণ তুর্কি বিপ্লব শুরু হয় এবং খুব দ্রুত তা সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়লো । ফলে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ১৮৭৬ সালের সংবিধান পুনঃস্থাপন এবং সংসদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন । এই সময়কে দ্বিতীয় সাংবিধানিক যুগ বলা হয়ে থাকে । ১৯০৮সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তরুণ তুর্কিরা তাদের কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেসের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রিন্স শাবাহাদ্দিনের দলকে পরাস্ত করতে সমর্থ হলেন । সিইউপি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে উদারনৈতিক ছিলেন । সেইসাথে তারা ব্রিটিশদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সুলতানের নিকটবর্তী ছিল । নতুন সংসদে ১৪২ জন তুর্কি, ৬০ জন আরব, ২৫ জনআলবেনিয়ান, ২৩ জন গ্রীক, ১২ জন আর্মেনিয়ান, ৫ জন ইহুদি, ৪ জন বুলগেরিয়ান, ৩ জন সার্ব ও ১ জন ভ্লাচ নিয়ে গঠিত হয় । উসমানীয় সংসদে সিইউপি কেন্দ্রীকরণ এবং আধুনিকীকরণের উপর অধিক জোর দেন ।

সংসদের আরব সদস্যরা ১৯০৯ সালের পাল্টা অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেন । এবং এই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল সংবিধানের বিলুপ্তি সাধন ও দ্বিতীয় আবদুলহামিদের পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণ করা । ক্ষমতাচ্যুত সুলতান তরুণ তুর্কিদের সেকুলার নীতি বাতিলের মাধ্যমে খিলাফত লাভ করতে চেষ্টা করে । কিন্তু ৩১ মার্চের পরিস্থিতির পর তাকে সেলোনিকায় নির্বাসনে যেতে হয়। তার ভাই পঞ্চম মেহমেদ তার স্থলাভিষিক্ত হন।

১৯১৩ সালে আরব মাশরিকের বুদ্ধিজীবী রাজনীতিবিদরা প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্রথম আরব কংগ্রেসে মিলিত হলেন । উসমানীয় সাম্রাজ্যের ভেতরে স্বায়ত্বশাসনের জন্য তারা একগুচ্ছ দাবি উত্থাপন করেন । সেই সাথে এত্ত দাবি করেন যে বাধ্যতামূলকাভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া আরবদেরকে যুদ্ধের সময় ছাড়া অন্য অঞ্চলে পাঠানো যাবে না । সূত্র: নজদ ও হিজাজের ইতিহাস, )

এভাবে খেলাফতকে ধ্বংস করা হল এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে খানখান করা হল।

সেই ধারাবাহিকতায় ইরাক এবং সিরিয়া অঞ্চলেও শুরু হল ইহুদী-নাসারাদের আগ্রাসন। মিশরে আনা হল ইসলামের চির শত্রু জামাল আল-নাসেরকে। মূলত তার হাত ধরেই আরব জাতীয়তাবাদ বাস্তবায়িত হয়।

পরে জাজিরাতুল আরব বা বর্তমানের সৌদিআরবে এমন শাসক আনা হল যাদের সাথে পশ্চিমাদের রয়েছে গোপন যোগাযোগ। তারা আমেরিকা বৃটেনের সাথে গোপন আঁতাত করল এবং তাদের থেকে নিরাপত্তা নিয়ে এমন এক শাসন প্রতিষ্ঠা করল যাতে হারামাইনে দ্বীন চর্চা হবে, নামায, রোজা, হজ্জ্ব ইত্যাদি চলবে কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা হবে পশ্চিমার দিকনির্দেশনায়। জনগণের জীবনাচার হবে ইহুদি কালচারের, আর রাষ্ট্র পরিচালনা হবে স্বৈরাচারমূলক এবং অর্থনৈতিক পদ্ধতি থাকবে আমেরিকান। খনিগুলো থাকবে পশ্চিমা শক্তির নিয়ন্ত্রণে। এছাড়াও এমন এক শাসন চালু হল, যা মিসরে আবদুন নাসেরের শাসনামলে ছিল। যা তিউনিসিয়াতে বিন আলীর আগে হয়েছিল। আরব সাগরের তীরেও এমন এক অবস্থা হল, যা ছিল আরবের জন্য সত্যিই অনাকাংক্ষিত। যাতে যদিও বাহিরের সৈন্যদের বের করে দেয়া হল কিন্তু তাদেরই গড়া সৈনিককে মোতায়েন করা হল। পুলিশগুলো ছিল তাদের দ্বারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আদালত থেকে ইসলামী আইন-কানূন উঠিয়ে দেয়া হল। তেরশো  সাল থেকে নিয়ে যে আদালতে ইসলাম ন্যায় বিচারকে প্রতিষ্ঠা করে আদর্শ শহর হিসেবে খ্যাতি ছড়িয়ে দিল সে ইসলামকে সরিয়ে দেয়া হল। যেখানে কোন সুদভিত্তিক ব্যাংক ছিল না, সেখানে নতুনভাবে চালু করা হল সুদভিত্তিক ব্যাংক। সেনাবাহিনীকে জালিম অফিসার দ্বারা বিন্যস্ত করা হলো। এবং জনগণ বিদ্রোহ করতে পারে এ আশংকায় মোকাবেলার জন্য ভয়াবহ মারণাস্ত্র কেনা হল। অথচ চাইলে সে অস্ত্র দিয়ে তৎকালীন উদীয়মান ক্ষুদে শক্তির অধিকারী ইসরাইলকে নির্মূল করে দেয়া যেত। কিন্তু হায়! তাদের যে কেবল জনগণকেই শত্রু মনে হয়েছিল! ইসরাইল তো তাদের দুশ্চিন্তার কারণ নয়! আফসোস! তখনো নয়; এখনো নয়!!

মূলত এই সৌদিবংশের উত্থান হয়েছিল ইহুদিদেরই সহযোগিতায়, সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশা আবদুল আজীজ ইবনে সাওদের ঐতিহাসিক একটি গোপন চিঠি তাই প্রমাণ করে। পাঠকের সামনে সেই চিঠিটি তুলে ধরা হল–

“বর্তমান সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পূবর্সূরি তথা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সহায়তায় হিজাজ অঞ্চলের শাসক হওয়ার সুযোগ পান। তুর্কি খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে ভূমিকা রাখা এবং ইসলামের নামে বিকৃত ও উগ্র চিন্তাধারায় ভরপুর ওয়াহাবি মতবাদের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার পুরস্কার হিসেবেই ব্রিটেন সৌদ বংশকে ক্ষমতাসীন করেছে। আর এর বিনিময়ে ইবনে সৌদ  ইসরাইলকে মেনে নেবেন বলে ওয়াদা দিয়েছিলেন এবং কিয়ামত পযর্ন্ত (এ বংশের পক্ষ থেকে) ব্রিটেনের অভিমতের বিরুদ্ধে কিছু না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ১৯১৭ সালের দোসরা নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যালফোর ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই ঘোষণা ব্যালফোর ঘোষণা নামে ইতিহাসে খ্যাত। এ ঘোষণা দেয়ার আগে ব্রিটিশরা সৌদি রাজা আবদুল আজিজের কাছ থেকে লিখিত সম্মতিপত্র আদায় করেছিল। ওই চিঠিতে লেখা ছিল:

‘আমি বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে আবদুর রহমান–ফয়সলের বংশধর ও সৌদের বংশধর– হাজার বার স্বীকার করছি ও জেনেশুনে বলছি যে, মহান ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি স্যার কুকাস-এর সামনে স্বীকারোক্তি করছি এই মর্মে যে, গরিব ইহুদিদেরকে বা অন্য কাউকে ব্রিটিশ সরকার যদি ‘ফিলিস্তিন’ দান করে দেন তাহলে এতে আমার কোনো ধরনের আপত্তি নেই। বস্তুত: আমি কিয়ামত পযর্ন্ত ব্রিটিশ সরকারের অভিমতের বাইরে যাব না।’ (নাসিরুস সাইদ প্রণীত ‘আলে সৌদের ইতিহাস’ )
উল্লেখ্য, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুর্কি খেলাফতের বিরুদ্ধে ব্রিটেন সৌদিদেরকে তথা সৌদি বংশের লোকদের ব্যবহার করে। ফলে তুর্কি সরকার ওয়াহাবিদের রাজধানী ‘দারইয়া’ শহরটি দখল করে নেয়। আর সৌদি সর্দার আমির আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করে প্রথমে কায়রোতে ও পরে তুরস্কে পাঠিয়ে দেন মিশরের শাসক মুহাম্মাদ আলী পাশা। তুর্কি খেলাফতের সরকার আমির আবদুল্লাহকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।

কিন্তু বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের অবস্থা দুবর্ল হয়ে গেলে ব্রিটিশরা আবারও সৌদ গোত্রের লোকদের নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ব্রিটেন ইবনে সৌদের সঙ্গে কুখ্যাত ‘দারান’ চুক্তি স্বাক্ষর করে ১৯১৫ সালে। কুয়েতের শেখ জাবির আল সাবাহ ছিল সে সময় ব্রিটিশদের আরেক দালাল। ব্রিটিশরা এই দালালের মাধ্যমে ইবনে সৌদের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী ব্রিটিশ সরকার সৌদ-পরিবারকে প্রতি বছর ষাট হাজার পাউন্ড ভাতা দিতে থাকে। পরে এ ভাতা বাড়িয়ে এক লাখ পাউন্ড করা হয়। এ ছাড়া তুরস্কের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য সৌদ গোষ্ঠীকে তিন হাজার রাইফেল ও তিনটি মেশিনগান উপহার দেয় ব্রিটেন। (সূত্র: নজদ ও হিজাজের ইতিহাস, পৃ-২১০)

শুধু তাই নয়, সৌদি-ইসরাইল আর গোপন বন্ধু নয়, তারা এখন ওপেনে চলে আসতে চায়। সমাজের বাধা লোকচক্ষুর লাজ-লজ্জার তোয়াক্কা করে চলার তর আর সইছে না তাদের। গোপন অভিসার ছুড়ে মেরে কচি প্রেমিকাকে সবার সামনেই নিয়ে আসতে চায় ‘সাহসী’ প্রেমিক সৌদরা। দেখুন দৈনিক নয়াদিগন্তের ২১ জুন ২০১৭,বুধবার, এর রিপোর্টটি।

“নিউজ উইককে সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা সম্প্রতি বলেছেন, ইসরাইলের সাথে সন্ত্রাস দমন ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের মতবিনিময় বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ আছে। ইসরাইলের সাথে উপসাগরীয় দেশগুলোর এ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে- সংযুক্ত আরব আমিরাত। দুবাইয়ে ইসরাইলের একটি কূটনৈতিক অফিসের মাধ্যমে আরব দেশগুলোর লিয়াজোঁ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এখন ইসরাইলের সাথে উপসাগরীয় দেশগুলোর এই যোগাযোগ প্রকাশ্য রূপ নেয়ার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য ও গণমাধ্যমকে কাজে লাগানো হবে। কাতারের ওপর অবরোধ আরোপের তাৎপর্য ও প্রভাব নিয়ে একজন সৌদি সাংবাদিক এই প্রথম ইসরাইলের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে স্কাইপের মাধ্যমে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।”

চলবে