সৌদী রাজপরিবারের ক্ষমতার খতিয়ান এবং ইসরাইল প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে [তিন]

সৌদী রাজপরিবারের ক্ষমতার খতিয়ান এবং ইসরাইল প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে [তিন]

মাসউদুর রহমান চৌধুরী


এভাবে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নির আগুন লাগিয়ে দেয়া হল। মুসলমান শতাধিক দলে বিভক্ত হয়ে পড়ল। শিয়া-সুন্নি যুদ্ধের নামে লাখলাখ মুসলমান আপন ভাইয়ের হাতে শহিদ হল। এর পিছনে দাবার গুটিটা চালছিল আমেরিকা। ইরাকে হামলা করা হল। সাদ্দাম হুসেনকে মারা হল। সে আগুন তীব্র হতে লাগল। দাবানলের মত তা ছড়িয়ে পড়ল সিরিয়া-ইয়ামেনসহ পুরো আরব ভূখণ্ডে।

পুরো পশ্চিমা যখন মুসলমানকে ধ্বংস করার জন্য ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছে, নিজেদের গুছিয়ে নিচ্ছে, শক্তি সংগ্রহ করছে তখন মুসলমানরা শক্তি ক্ষয় করছে শিয়া-সুন্নি লড়াইয়ের নামে।

মাজহাবী চেতনা
তারপর সৃষ্টি করা হল মাজহাবি মতবিরোধ। মাজহাব নিয়ে শুরু হয় পরস্পর কাঁদা ছোড়াছুড়ি । মাজহাবের নাম করে মুসলমানদের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে দেয়া হয়। মুসলমানদের একদল স্ব স্ব মাজহাবকে শ্রেষ্ঠ মাজহাব প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে। সমস্ত মেধাগুলো আন্তঃধর্মীয় যুক্তি-তর্কে ব্যয় হতে লাগল। তারা কুফুরী শক্তির মোকাবেলার কথা ভুলে গেল। এটাকেই আসল কাজ মনে করতে লাগল। এভাবে একটি দল পিছিয়ে গেল জিহাদ থেকে। অথচ কোন মাজহাবকে সত্য প্রমাণ করা তেমন কোন জরুরী নয়। এমনকি মাজহাব মানাও একজন আলেমের জন্য তেমন জরুরী না। অথচ সেই আলেমরাই শুরু করল মাজহাব নিয়ে তুমুল লড়াই। আর এই লড়াই-ই সুযোগ করে দিল লা-মাজহাব নামক একটি উদ্ভট দলের উত্থানের। এখন লড়াইটার মেরুকরণ আরো সাংঘাতিক হয়ে গেল। মুসলমানদের মধ্যে জন্ম নিল আরেকটি অন্তঃকলহের।

জঙ্গিবাদ


এভাবেই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করা হল মুসলিম বিশ্বের শক্তিকে। তারপর পুরো দুনিয়া জুড়ে মুসলিম নিধন শুরু হল। ইহুদি নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া উল্টো মুসলিমদের সন্ত্রাস বলে অপবাদ দিতে লাগল। কোন মুসলমান যাতে জিহাদের ডাক দিয়ে বসতে না পারে তার জন্য আগে থেকেই জিহাদকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বলে প্রোপাগান্ডা চালানো হল। ইসলামের নিরাপত্তার ক্যান্টনমেন্ট জিহাদকে স্বয়ং মুসলমানরাই বিভ্রান্তির জালে পড়ে সন্ত্রাস ভাবতে শুরু করল। মুহুর্মুহু জুলুমের স্বীকার হলেও কেউ জিহাদের ডাক দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। সন্ত্রাস আর জিহাদকে গুলিয়ে ফেলা হল। বিচ্ছিন্ন কিছু উগ্রবাদকে দিয়ে জিহাদের নামে চালানো হলো বেসামরিক হত্যাযজ্ঞ। ধীরেধীরে জিহাদ মানে হয়ে উঠল ভয়ংকর এক ত্রাসের প্রতিচ্ছবি।

অপরদিকে মুসলিম দেশগুলোতে বিভিন্ন অজুহাত সৃষ্টি করে হামলা চালিয়ে একের পর এক দখল করতে লাগল। এ চিত্র সারা বিশ্বের মুসলিমকে বিচলিত করলেও আরব দেশের গোফওয়ালা শায়খদের কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। তারা এসব তামাশার নীরব দর্শক হয়ে থাকল। যেমন আজ আরাকান, চেচনিয়া, কাশ্মীর আর ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে তারা নির্লজ্জভাবে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এ ঘোমটাওয়ালাদের না আল্লাহর সাথে সম্পর্ক না নববী জীবনে রয়েছে তাদের জন্য কোন আদর্শ। না কোরআনে তাদের জন্য মান্য কোন সংবিধান। না ইসলামী জীবনসংবিধান থেকে তাদের নেয়ার কিছু আছে। তারা তো মত্ত তাদের মসনদ, প্রবৃত্তির চাহিদা, ধন-সম্পদ, গদির স্থায়িত্ব চিন্তায়। আর এই দীর্ঘ সময়ে জনগণের সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে গেছে। পক্ষান্তরে পৃথিবী জুড়ে গণতন্ত্রের জোয়ার বইছে। ক্ষমতার পালাবদল চলছে। মিশর, লিবিয়া এবং তিউনিসিয়াসহ কিছু আরব দেশে নামেমাত্র গণতন্ত্র চলছে। ভোটের নামে ধোকাবাজি করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। জনগণের টুটি চেপে ধরে রাখা হয়। মিডিয়ার মুখে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। ধীরেধীরে জনগণের মধ্যে ক্ষোভের দানা বাধতে শুরু করে। সে ধারাবাহিকতায় তিউনিসিয়ায় বিপ্লব উঠে। যুবকেরা রাস্তায় নেমে পড়ে। তারা বুলেটের মোকাবেলায় নিজেদের বুক উন্মুক্ত করে দেয়। অবশেষে বিন আলীকে ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে হয়। আর সৌদি আরব সে বিপ্লব প্রশ্রয় দেয়। এবং ইসলামী বিপ্লবকে দমানোর জন্য যাবতীয় যোগাযোগ বজায় রাখে। এ বিপ্লব সংক্রামক হয়ে লিবিয়া, মিশরেও এসে পড়ে। এমন কি সুদূর ইয়ামানেও বড় ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। তখন ইয়ামানের শাসক সৌদি সরকারের কাছে রক্ষা তলব করে। অত:পর সিরিয়াতেও এ আন্দোলনের অগ্নিশিখা জ্বলে উঠে। সিরিয়ার বাশার আল আসাদ ইতিহাসর ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠতে এতটুকুও দ্বিধা করে নি। ঘরের ছাদে বোম ফিট করে হাজার হাজার নারী ও শিশুকে নিঃশব্দে হত্যা করে। তাদের আওয়াজটুকুও বের হয় নি। শহরের পর শহর ধ্বংস করে দেয়া হল। চারিদিকে শুধু ধ্বংসযজ্ঞ আর বোমাবিস্ফোরণের দৃশ্য। এমন জালিম শাসক পৃথিবী কি আর দেখেছে? রাশিয়া তো লক্ষ লক্ষ মুসলমানের হত্যার স্মৃতি তো এখনো ধারণ করে আছে। আর সে রাশিয়ার মদদে বাশার তার আপন জাতির উপর ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। সোভিয়ত ইউনিয়ন সেখানে আট লাখ মুসলমানকে হত্যা করেছিল। মুসলিমদের অধিবাস করা শহরগুলোকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল।

অপরদিকে নির্বাচনের মাধ্যমে মিশরে মুসলিম শক্তি ক্ষমতায় আসল। মুরসি ক্ষমতায় বসেই মুসলিম বিশ্বের সাথে যোগাযোগ শুরু করল। একটি নতুন মোড় নিতে শুরু করল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে। বছর ঘুরতেই মিশর অনন্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু হল। মধ্যপ্রাচ্যের খনিজগুলোর উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ (যা নাদাবী, আবুল আলা মওদুদি, সাইয়েদ কুতুব এবং ইউসুফ আল কারযাভীসহ সকলের দীর্ঘদিনের প্রয়াস) ধীরেধীরে বাস্তবায়ন হতে শুরু করল। লক্ষলক্ষ যুবকদের তাজা রক্ত যখন পরিবর্তনের অঙ্কুর গজাতে আরম্ভ করল। সত্য ন্যায়ের শাসন কায়েম হতে যাচ্ছে। মুরসির এক বছরে কোন একজন না হত্যা করা হয়েছে, না বিরোধীদের কাউকে জেলে দেয়া হয়েছে । এমন কি মুরসির বিরুদ্ধবাদিকে পুলিশ গ্রেফতার করলে বলা হয়- ছেড়ে দাও, আমার কারণে কাওকে জেলে দেয়ার দরকার নেই। যে সংস্কৃতির বিপ্লব শুরু করল, পুরো দেশজুড়ে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টি করল, ফিলিস্তিনে হামাসের পাশে দাঁড়াল। তাদের জন্য রাস্তা খোলে দেয়া হল। আমেরিকার জুলুমের প্রতিবাদ করল। তাকেও ধীরেধীরে সরানোর ষড়যন্ত্র শুরু হল। আমেরিকার পা চাটা সেনাবাহিনী আপন মনিবের হুকুমে বিদ্রোহ শুরু করল। আর পরিতাপের বিষয় যে, সৌদি তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসল। তাদের জন্য লক্ষকোটি ডলারের রিয়াল পাঠাতে লাগল। বিদ্রোহীরা সৌদি রিয়ালের শক্তিতে আরো বলিয়ান হয়ে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। তাদের রিয়াল জনগণের একটা অংশকে প্রলোভন দেখিয়ে কেনা হল। টিভি-চ্যানেল, সংবাদপত্রকে কেনা হল। সেখানে প্রোপাগান্ডা চালানো হল মুরসির বিরুদ্ধে। সাদাকে কালো কালোকে সাদা করা হল। এভাবে মুরসিকে পতন করা হল।

শতাব্দির পর শতাব্দি ইয়াহুদিরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে এহেন হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। বর্তমান ইসরাইলে ত্রিশটিরও বেশী সংস্থা আছে, যারা মুসলমানদের সাইক্লোজি নিয়ে গবেষণা করে। তারপর সেভাবে মুসলমানদের উপর আক্রমণ চালায়। তারা ধীরেধীরে মুসলিম শক্তি নির্মূলের অপচেষ্টায় মগ্ন। আর তাদের সহযোগিতা করছে আমাদেরই মুসলিম নামধারী কিছু ভাই।

শুধু তাই নয়, এ মোনাফেকি করছে যাদেরকে মুসলিম বিশ্ব মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নেতৃত্বের আসনে বসিয়েছে। আপন ভায়ের এই বিশ্বাস নিয়ে তারা হলিখেলা খেলছে অবলিলায়। ক্ষমতা, অর্থ আর নেতৃত্বের লোভ তাদের অন্ধ করে রেখেছে। অতএব সহজে অনুমেয় সৌদিআরব কোন দিকে এগুচ্ছে।

আজকের সারা বিশ্বের মুসলিম আরব রাজাদের প্রতি যে ভালবাসা ও শ্রদ্ধা লালন করে তা কেবল নবীর দেশের সাথে তাদের নাড়ির সম্পর্ক আছে বলেই। যদি বিশ্ব বিখ্যাত, যুগশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ আল্লামা আবুল হাসান আলী নাদাবীর ভাষায় বলি, ফিরিয়ে দাও সেই মক্কা-মদিনা, নবীর ভূমি আর জমজমের কূপ আমাদের দিয়ে দাও; তারপর দেখো! পৃথিবীতে তোমাদের আর কোন মূল্য থাকে কিনা। তোমাদের আর কোন বৈশিষ্ট্য বাকি থাকে কিনা।

অথচ সেই আরবের রাজা-বাদশারা লম্বা লম্বা ধর্মীয় আলখেল্লা পরে, মাথায় ঘোমটা লাগিয়ে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছে যা ভাবতেই গা শিওরে উঠে। সঠিক ইতিহাস চর্চার অভাবের কারণে আবেগী যুবকেরা যাদের দ্বারা চরম বিভ্রান্ত হচ্ছে। তারা আরবদের যে কোন আচরণকে মান্য বলে বিশ্বাস করছে। এমনকি জিহাদের ক্ষেত্রেও তারা আরবদের চিন্তার বাইরে কোন কিছু গ্রহণ করতে রাজি নয়। আরো উদ্বেগজনক হলো, কেউ এই রাজতন্ত্রের ক্ষমতায়নকেও খেলাফতের স্থানে বসাতে দ্বিধা করছে না।

দ্বীনদার এবং নবীপ্রেমিক সেই সব যুবকদের বিভ্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচাতেই এই প্রবন্ধের প্রয়াস। আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুক। সমাপ্ত