পাশ্চাত্য ও ইসলামী দর্শনের মৌলিক সংঘাতে মর্ডান দায়ীর মানসিক বৈকল্য

আরিফুল ইসলাম


একটা পুরাতন বির্তক আছে। বির্তকটা হল কোন বিষয় তার নিজ অবস্থান থেকে ভালো বা মন্দ হওয়ার কারনেই কি ভালো বা মন্দ ? নাকি আল্লাহ ইচ্ছার কারনে ভালো বা মন্দ।

এই বিষয়ে মহান দুটি মাজহাবের মত ভিন্ন ভিন্ন। আমার মতটি একটু ব্যতিক্রম। আমার মত হল আল্লাহর ইবাদত সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আল্লাহর ইচ্ছার কারনে ভালো বা মন্দ । আর বান্দার লেনদেন, আচার আচরন সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো স্বীয় অবস্থানের কারনে ভালো বা মন্দ। একটু ব্যতিক্রম ভাবে বললে বলা যেতে পারে যে ঐ কাজটি মানুষের জন্যই ভালো বা মন্দ বিধায় তা ভালো বা মন্দ রূপে বিবেচ্য হচ্ছে। এবং মানুষের কল্যানের জন্যই আল্লাহ ঐ সমস্ত বিষয়কে হালাল বা হারাম ঘোষনা করেছেন।

আলোচনাটি আপাতত তোলার ইচ্ছা ছিল না, কিন্ত এক ভ্রান্ত দাঈয়ের কারনে আলোচনাটি তুললাম। অবশ্য আলোচনাটি বোঝাও অত্যন্ত জরূরী। কেন জরূরী তা মনযোগ সহকারে এই লেখাটি পড়তে উপলব্ধি করতে পারবেন ইন শা আল্লাহ।

আসুন প্রথমে উপরের মতামতটি উদাহরনসহ বোঝার চেষ্টা করি। যেমন ধরুন ফজরের নামাজ দুই রাকাত বা নামাজে প্রতি রাকাতে দুটি সেজদা। রোজা রমযান মাসে বাধ্যতামূলক হওয়া কিংবা হজ্বের বিধি বিধানগুলি। এই গুলি আল্লাহ ইচ্ছার কারনে ভালো বা মন্দ। অপরদিকে মিথ্যা কথা বলা, ধোকা দেওয়া, জেনা করা, সমকামিতা ইত্যাদী মানুষের জন্য অকল্যানকর বিধায় আল্লাহ এটি নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছেন। অর্থাৎ বিষয়গুলো স্বভাবগতই মন্দ মানুষের জন্য।

আমাদের আজকের আলোচনা দ্বিতীয় অংশ নিয়ে। কারন প্রথম অংশ নিয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব মেনে নেওয়ার পর আর কোন বির্তক থাকে না। কিন্তু দ্বিতীয় অংশ নিয়ে ইসলাম বিরোধী ও দূর্বল ঈমান সম্পন্ন লোক বা যাদের অন্তরে শয়তান ওয়াসওয়াসা ঢালে তাদের প্রশ্ন থাকে আবার অনেকের কৌতুহল বশত বা ইসলাম বিরোধীদের জবাব দেওয়ার জন্য প্রশ্ন গুলোর উত্তর প্রয়োজন হয়। যার ফলে কারন বর্ননা প্রয়োজন হয়।

দ্বিতীয় অংশের বিষয়গুলোকে আবার আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি ইসলাম বিরোধীদের ধারনা অনুযায়ী। প্রথম ভাগ হল এমন বিষয় যা অন্যের ক্ষতি করে আর দ্বিতীয় ভাগ হল এমন যা অন্যের ক্ষতি করে না। যেমন চুরি করা , ডাকাতি করা , ধোকা দেওয়া , মিথ্যা বলা এমন বিষয় যা অন্যের ক্ষতি করে। তাই এই বিষয়গুলো ভালো নাকি মন্দ তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। এগুলো মন্দ হওয়া সম্পর্কে মানবজাতি একমত। আর এগুলোর সাথে শালীনতার বিষয়কে যুক্ত করা হয় না। শালীনতার সাথে যুক্ত অর্থাৎ সেক্সুয়াল বিষয়গুলো নিয়েই প্রশ্ন , যখন তা অন্যের ক্ষতি না করে উভয়পক্ষের সম্মতিতে করা হয়।

আমাদের বর্তমান পয়েন্টা এখানেই । অর্থাৎ পাশ্চাত্যের বর্তমান প্রচার হল যদি কোন বিষয় দ্বারা তৃতীয় কোন পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তবে কেন সেটার বিরোধীতা করা হবে ?

এই কুতর্কটি খুব জোরে প্রচার হওয়ার মৌলিক কারন হল আধুনিকতার নামে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ। অর্থাৎ অন্য কারো ক্ষতি না করে যে কোন কিছু মানুষ করতে পারে। এটাকে খারাপ বলার কিছু নেই। অথচ আমাদের এটি বুঝতে হবে ব্যক্তি সম্পূর্ন স্বতন্ত্র বিষয় নয়। তার ক্রিয়া কালাপ সমাজে প্রভাবক ভূমিকা পালন করে।

আমাদের বুঝতে হবে তাদের এই কথাটি কতটুকু বাস্তবসম্মত যে , অন্য কারো ক্ষতি না করে যে কোন কিছু মানুষ করতে পারে। প্রশ্ন হল মানুষের আচার আচরন বা মেলামেশা সংক্রন্ত বিষয়গুলো কি এমন যার লাভ বা ক্ষতি থেকে তৃতীয় পক্ষ সম্পূর্ন মুক্ত থাকতে পারে । সহজ কথায় উত্তর হল “না” পারে না।

যৌনতার বিষয়ে প্রথম প্রশ্ন ব্যক্তি আকাংখা সেটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে কিন্তু সমস্ত মানব জাতির বিবেচনায়, সমাজ বা রাষ্ট্রের বিবেচনায় সেটা ব্যক্তি আকংখা নয় বরং মানবজাতি রক্ষা।

এখানে ইসলাম এমন সমস্ত কাজকে ফাহেশা বলে ঘোষনা দেয় যেটা মানব জাতির জন্য ধংসের কারন। বাকি কারো এই প্রশ্ন নিতান্তই নিবুর্দ্ধিতা সুলভ যে মানুষের মধ্যে এই ধরনের বিষয় যেহেতু আছে তাই তা প্রাকৃতিক একটা বিষয়। কারন এই যুক্তিতে তো মিথ্যা বলা, ধোকা দেওয়া এগুলো প্রাকৃতিক বিষয় হয়ে যায়। অথচ এই বিষয়ে সার্বজনীন মত হচ্ছে বিষয়গুলো খারাপ।

কোন সমাজে একটা কাজের যখন প্রচলন হয় এবং সেটার সামাজিক স্বীকৃতি থাকে বা আইনগত স্বীকৃতি থাকে অর্থাৎ বিষয়টিকে ঘৃন্য হিসাবে দেখা হয় না বা আইনগত বাধা নেই তখন সেটির ব্যপকতা বৃদ্ধি পায়।

তাই সমকামিতা সহ অন্যান্য যৌনাচারের ক্ষেত্রে যেসব ধরন আইনগত স্বীকৃতি না থাকায় এবং সামাজিক ভাবে ঘৃন্য না হওয়ায় বা ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা থাকায় ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়নি সেগুলো ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাবে যদি এটার বিরুদ্ধে ঘৃনা ছড়ানো না হয়।

আর এর ব্যপকতা মানব সমাজকে ধংস করা সুনিশ্চিত বিষয়। কমপক্ষে এটা তো ঠিক যে সমকামীরা মানবজাতি বেচে থাকার মূল স্রোতের বিপরীত। এবং তাদের ক্রিয়া কর্ম যত ব্যপক হবে তত দ্রুত মানবজাতির ধংসের নিশ্চয়তা বাড়বে। তাই এটি নিয়ে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত যৌক্তিক এবং আলিমদের এর বিরুদ্ধে প্রচার প্রচরনাও যৌক্তিক।

অযৌক্তিক বিষয় হল যেই মূলনীতির উপর সমাকামিতাতে বৈধ বলার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে সেই মূলনীতির আরো অনেক বেশী মূলে আঘাত হানে সমকামিতা। অর্থাৎ কেউ যদি অপর কাউকে হামলা করে তবে কেবল মাত্র যাকে হামলা করা হয়েছে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিন্তু সমকামিতা মানব সভ্যতাকেই আঘাত করে এইরকম একটি বিষয়। তাই এর বিরুদ্ধে ঘৃনা প্রকাশ মানব বংশ রক্ষার জন্য আবশ্যক একটা বিষয়।

সবশেষে এটুকু বলব যে, পাশ্চাত্য ও ইসলামী দর্শনের যে মৌলিক পার্থক্য তার উপলব্ধি করতে না পেরে যারা ইসলামের বিষয়ের আধুনিক উপস্থাপন করছেন তাদের পা পিছলে যাবার সম্ভবনা অত্যন্ত বেশী। তাই সতর্কতা কাম্য। পাশ্চাত্য দর্শনের মৌলিক ভ্রান্তি উপলব্ধি করতে না পারলে অবজেক্টিভ যে কোন বিষয় বুঝতে অবশ্যই ব্যর্থ হবেন।


ফেসবুক থেকে


Notice: Undefined index: email in /home/insaf24cp/public_html/wp-content/plugins/simple-social-share/simple-social-share.php on line 74